¦
কঠোর নজরদারি তবুও থামছে না সহিংসতা

সৈয়দ আতিক | প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

আইনশৃংখলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি ও নিরাপত্তা সত্ত্বেও নাশকতা থামছে না। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও আনসার সদস্যরা সারা দেশে নিরাপত্তা তৎপরতায় নিয়োজিত। গোয়েন্দা সদস্যরা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও নিয়মিত প্রতিবেদন প্রদান করছেন। তারপরও আইনশৃংখলা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না। একের পর এক ঘটছে পেট্রলবোমা ও ককটেল নিক্ষেপ, গাড়ি ও রেলে হামলা আগুনসহ বিভিন্ন ধরনের নাশকতা। থামছে না নিরীহ মানুষের প্রাণহানি। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে নাশকতায় আটজনের প্রাণহানি সবাইকে নাড়া দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, র‌্যাব, রেলওয়ে বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষে নাশকতার সময় অপরাধীদের ধরিয়ে দিলে বা নাশকতাকারীর তথ্য দিলে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। পুলিশ ও র‌্যাব চলমান অস্থিরতা দমনে নানা কৌশল গ্রহণ করে। এর মধ্যে ফাঁকা গুলি বা পেট্রলবোমা নিক্ষেপের সময় নাশকতাকারীকে দমনে গুলিও করছে। এ পর্যন্ত বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে ১০ জন। নাশকতা বা বিশৃংখলা নিয়ন্ত্রণে এত কৌশল গ্রহণের পরও মানুষের ভেতরে শংকা কাটছে না।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, বিএনপি-জামায়াতের যে নাশকতা চলছে, এর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ সোচ্চার হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে মানুষ আইনশৃংখলা বাহিনীকে সহায়তা করছে। তারপরও কোথাও কোথাও বিএনপি-জামায়াত নাশকতার চেষ্টা করছে। তাদের দমনে নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দারা কৌশল অবলম্বন করছে। আশা করি কয়েকদিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
তথ্য অনুযায়ী, সোমবার চট্টগ্রাম মিরসরাই রেলওয়ে এলাকায় হরতাল-অবরোধ সমর্থকরা প্রায় ২শ গজ রেললাইনের হুক খুলে ফেলে। এ ঘটনা জনমনে শংকা তৈরি করেছে। নাশকতার ফলে ময়মনসিংহ-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী কমিউটার ট্রেন লাইনচ্যুত হয়। এতে ইঞ্জিনসহ ৩টি যাত্রীবাহী বগি লাইনচ্যুত হয়। একই দিন গাজীপুর রেলওয়ে স্টেশনের অদূরে দুর্বৃত্তরা যাত্রীবাহী ট্রেনে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে। রেলে এ পর্যন্ত ১০ দফা নাশকতা হয়েছে। রেলওয়ে পুলিশের ডিআইজি (চলতি দায়িত্ব) এসএম রুহুল আমিন যুগান্তরকে জানান, নাশকতা প্রতিরোধে রেলওয়ে পুলিশ, নিরাপত্তাবাহিনীর পাশাপাশি যৌথ বাহিনীর সদস্যরাও সতর্কাবস্থায় থাকছেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মিরসরাই নাশকতার ঘটনায় ১৬ এবং গাজীপুরে ট্রেনে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনায় ১০ জনকে আটক করা হয়েছে।
আইনশৃংখলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধীরা গ্রেফতার হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে বলেও তারা দাবি করছেন। তাদের মতে, খুব শিগগিরই এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
মঙ্গলবার গাবতলীতে বাস মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, চলমান নাশকতা আগামী ৭ দিনের মধ্যে বন্ধ করা হবে। বুধবার কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, নাশকতাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিশোধ নেয়া হবে। চলমান পরিস্থিতি সাতদিনের মধ্যে উত্তরণ হবে বলে ১৯ জানুয়ারি ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। তিনি বলেছিলেন, সাতদিনের মধ্যে বর্তমান পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করা হবে। কথা দিলাম। এরপর পেরিয়ে গেছে দুই সপ্তাহ। কিন্তু পরিস্থিতি আগের মতোই আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ৪ জানুয়ারি থেকে অবরোধ, হরতাল ও বিশৃংখলায় মারা গেছে ৫৯ জন। এর মধ্যে পেট্রলবোমায় প্রাণ হারান ৩৯ জন।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি মোকাবেলায় ৩০টির বেশি জেলায় যৌথ বাহিনীর অভিযান চলছে। আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে তারা গুলিও চালাবে। পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সাজার ব্যবস্থা আছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, আইনশৃংখলা বাহিনীর জোরালো তৎপরতার পরও নাশকতা থামছে না। এর কারণ, হচ্ছে ক্রিমিনালাইজেশন ইন পলিটিক্স। বিশেষ করে যাত্রীবোঝাই বাসে পেট্রল নিক্ষেপ করে বোঝানো হচ্ছে আইনশৃংখলা বাহিনীও টহলে ব্যর্থ। আর তা প্রমাণের চেষ্টা করছে সুযোগ সন্ধানী রাজনৈতিক গোষ্ঠী। এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিশ্লেষক টাঙ্গাইলের মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আজিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, সরকার হয়তো আশা করেছিল আইনশৃংখলা বাহিনী দিয়ে নাশকতার সমাধান করা সম্ভব হবে, কিন্তু বাস্তবে তারা পুরোপরি সফল হয়নি। আর সমস্যাটা শুধু আইনশৃংখলা বাহিনী সংশ্লিষ্ট নয়, সমস্যাটা আমাদের রাজনীতির, রাজনৈতিক নেতারা আলোচনায় বসলেই সব সমস্যার সমাধান হবে, আইনশৃংখলা বাহিনীর দরকার হবে না।
তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মাঠের বিরোধী শক্তি জানান দিচ্ছে রাস্তায় গাড়ি চালানো যাবে না, স্কুলে যাওয়া যাবে না, এগুলো হচ্ছে তাদের কৌশল। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য উভয় দলকে রোল প্লে করতে হবে। প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতিকে উভয় দলই তাদের কথা ও দাবি জানাতে পারে। এ জন্য এ মুহূর্তে রাজনৈতিক সদিচ্ছা বেশি প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গত ২১ জানুয়ারির বৈঠকের তথ্য অনুযায়ী, ৭ হাজার ১৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ওইদিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃংখলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে এ তথ্য জানান। বর্তমানে এ গ্রেফতারের সংখ্যা ১৩ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। নাশকতা ও বিশৃংখলায় ঢাকাসহ সারা দেশে থানাগুলোতে প্রায় সাড়ে ৬শ মামলা হয়েছে।
মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ও বিভাগের সহযোগী আধ্যাপক মো. আশরাফুল আলম যুগান্তরকে বলেন, দেশে একের পর এক যেসব নাশকতার ঘটনা ঘটছে তা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃংখলা বাহিনী সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। কিন্তু চোরাগোপ্তা হামলা ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা সামাল দেয়া সম্ভব নয়। কারণ, জনসংখ্যার তুলনায় আমাদের আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা অপ্রতুল। এভাবে চলতে থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে সমাধান একটাই- রাজনৈতিক সমঝোতা। আর সরকার যেহেতু দেশের অভিভাবক তাই তাদেরই সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি উত্তরণে মধ্যবর্তী নির্বাচনকেও বেছে নেয়া যেতে পারে।
শেষ পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close