¦
ব্যাংক-বীমার ওপর চাপ বাড়ছে ব্যবসায়ীদের

দেলোয়ার হুসেন ও মনির হোসেন | প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষতি মোকাবেলা করতে নানা ধরনের আর্থিক সুবিধা আদায়ের জন্য ব্যাংক ও বীমা কোম্পানিগুলোর ওপর ব্যবসায়ীদের চাপ বাড়ছে। তারা ক্ষতি মোকাবেলায় ঋণের সুদ মওকুফ, ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানো, কিস্তি পরিশোধ স্থগিত করা, সুদের হার কমানো, স্বল্পমেয়াদি ঋণ দীর্ঘমেয়াদি ঋণে রূপান্তর করা, বীমার প্রিমিয়াম কমানোর সুপারিশ করেছেন। এর বাইরে রফতানিকারকদের জন্য কারেন্সি বা মুদ্রা বিনিময় হারের সুবিধা, বন্দর অবকাঠামোর চার্জ কমানোর প্রস্তাবও করা হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ব্যাংক ট্যাক্স বিষয়ক একটি উপকমিটি রফতানি খাতের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে যে ধরনের সুবিধা দেয়া দরকার সে বিষয়ে একটি সুপারিশ তৈরি করেছে। এসব সুপারিশ নিয়ে তারা আগামী ২ মার্চ অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতির ফেডারেশন (এফবিসিসিআই) থেকেও এসব বিষয়ে একমত পোষণ করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করা হবে।
এ বিষয়ে ব্যাংক ও ট্যাক্স বিষয়ক উপকমিটির প্রধান আবদুস সালাম মুর্শেদী যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা অচিরেই বন্ধ না হলে ক্ষতির তালিকা আরও দীর্ঘ হবে। তখন আমাদের এখনকার তালিকা বাদ দিয়ে আবার নতুন তালিকা করতে হবে। আমরা আর ক্ষতিপূরণ চাই না। আমরা চাই ব্যবসা করতে। দয়া করে আমাদের সে পরিবেশ দিন।
এছাড়া চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা বলেছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ কারণে প্রতিবাদস্বরূপ তারা আগামী দুই কোয়ার্টারের সুদ পরিশোধ করবে না। এর আগে একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিজিএমইএ।
প্রচলিত নিয়মে ব্যাংকের ঋণের সুদ তিন মাস পরপর পরিশোধ করতে হয়। এখন তারা তিন মাস করে ছয় মাসের সুদ পরিশোধ স্থগিত রাখবে।
এদিকে ব্যাংকগুলোতে রাজনৈতিক অস্থিরতায় ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা তাদের ঋণ পুনর্গঠনের ব্যাপারে আবেদন করছেন। পাশাপাশি খাতভিত্তিক বাণিজ্য সংগঠনগুলোও তাদের ক্ষতি নিরূপণ করে এ নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
এছাড়ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে ঋণের একটি অংশ ব্লক অ্যাকাউন্টে নিয়ে কিস্তি পরিশোধ স্থগিত, ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পের বিপরীতে বীমা কোম্পানি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে তৎপর রয়েছেন। এসব আদায়ে তারা বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কর্মসূচিও ঘোষণা করেছেন।
এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যবসায়ীদের ঋণ পুনর্গঠনের ব্যাপারে বিশেষ ছাড় দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকার বেশি বড় অংকের ঋণ গ্রহীতাদের এ সুযোগ দেয়া হয়েছে। এর আওতায় সুবিধা পেতে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে আবেদন করা যাবে। ফলে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন তারা এই সুবিধা নিতে আবেদন করতে পারবেন। এদিকে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় কৃষকরাও ব্যাপক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। তাদের কৃষি ঋণ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ভালো গ্রাহকদের বিশেষ সুবিধা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এ ব্যাপারে একটি নতুন নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। এসএমই ঋণের গ্রাহকদের জন্য বিশেষ ছাড় দেয়া হবে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সূত্র।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, হরতাল-অবরোধের কারণে অর্থনীতির যে ক্ষতি হচ্ছে এগুলো নীতি সহায়তা দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। এগুলোর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধান।
সূত্র জানায়, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ক্ষতি পোষাতে ব্যবসায়ীদের যেহেতু বিশেষ ছাড় দিতে হবে, সে কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যবসা খাতের ক্ষতি নিরূপণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসাবে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে চিঠি দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই দুই বছরে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ, আদায়, খেলাপি ঋণ, বিতরণযোগ্য তহবিল সম্পর্কে মাসওয়ারি তথ্য জানাতে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রফতানি খাত ও ব্যাংকিং খাতের ক্ষতির বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ করছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।
১৮ ফেব্রুয়ারি বিদেশী কূটনীতিকদের কাছে দেয়া এফবিসিসিআইর তথ্য অনুসারে প্রতিদিনের হরতাল-অবরোধে অর্থনীতিতে ক্ষতি হচ্ছে ২ হাজার ৭শ’ কোটি টাকা। এ হিসাবে ওই সময় পর্যন্ত এফবিসিসিআইর দেয়া তথ্য অনুসারে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে গার্মেন্টস খাতের ৪০ হাজার কোটি টাকা। পরিবহন ১২ হাজার ৭শ’ কোটি টাকা, খুচরা ও পাইকারি বিক্রিতে ২০ হাজার কোটি টাকা, আবাসন খাতে ১০ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা, কৃষি ও পোলট্রি খাতে ১২ হাজার ৭শ’ কোটি টাকা, পর্যটন খাতে ৯ হাজার কোটি টাকা এবং উৎপাদন খাতে ৫ হাজার ৮শ’ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এসব টাকার বড় অংশই ব্যাংক ঋণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে সরবরাহ না থাকলেও ব্যবসায়ীদের ঋণের সুদ, কিস্তি পরিশোধ এবং শ্রমিকদের বেতন দিতে হচ্ছে। এতে তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
সংগঠনটি বলছে, রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫ হাজার গাড়ি আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ২শ’ গাড়ি পুড়ে গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ কবির হোসেন যুগান্তরকে বলেন, হরতাল-অবরোধে একদিকে তাদের আয় কমছে, অপরদিকে বিভিন্ন খাত থেকে ক্ষতি পূরণের দাবি আসছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের ভবিষ্যৎ খুবই খারাপ হবে। তিনি বলেন, কর্মসংস্থানের দিক থেকেও এটি অত্যন্ত বড় খাত। ফলে এই খাতে বিপর্যয় এলে দেশের অর্থনীতিতে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতায় একদিকে বীমা কোম্পানিগুলোর আয় কমে গেছে। অন্যদিকে বীমা গ্রহীতা ক্ষতিগ্রস্ত কোম্পানিগুলো ক্ষতিপূরণ চাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ক্ষতিপূরণ দেয়া সম্ভব হবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কৃষি খাতে ২৫ হাজার ১৩০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। শিল্প খাতে মেয়াদি ঋণ ৭৪ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ। শিল্প খাতের চলতি মূলধন ঋণ ৯১ হাজার ৯০১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ। নির্মাণ খাতে ৪৩ হাজার ৫১৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯ শতাংশ। বাণিজ্য খাতে ১ লাখ ৯৭ হাজার ২৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪১ শতাংশ। পরিবহন খাতে ৫ হাজার ১৯৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১ দশমিক ০৭ শতাংশ। ভোক্তা ঋণ ৩৪ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতে ১২ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
প্রাপ্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঋণের বেশির ভাগই রয়েছে শিল্প, কৃষি ও বাণিজ্য খাতে। রাজনৈতিক অস্থিরতায় এসব খাতেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। ফলে এসব ঋণ খেলাপি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ব্যাংক ঋণের বড় অংশই যায় বেসরকারি খাতে। তাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যাংকে এর প্রভাব পড়বে। তবে ঢালাওভাবে যেভাবে ক্ষতির কথা বলা হচ্ছে, প্রকৃত ক্ষতি ওই পরিমাণ নাও হতে পারে।
 

শেষ পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close