¦
৪০ ভাগ বন্দিই বিএনপি জামায়াত নেতাকর্মী

আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল ব্যুরো | প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

এমনিতেই ধারণক্ষমতার বেশি বন্দি থাকে সব সময়, তার ওপর ইদানিং বিএনপি-জামায়াতের বিপুল সংখ্যক হাজতি নিয়ে বিপাকে আছে বরিশাল বিভাগের ৬ জেলার কারা কর্তৃপক্ষ। কোনো কোনো জেলখানায় বর্তমানে আটক আছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দুই থেকে আড়াইশ পর্যন্ত নেতাকর্মী। চলতি শীত মৌসুমে গরম কাপড় দেয়াসহ বাড়তি এ বন্দিদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে গিয়ে নানা ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে জেলারদের। অবশ্য এসব নিয়ে মুখ খোলার কোনো উপায় নেই। হাসিমুখে মেনে নিতে হচ্ছে সব। কেননা মুখ খুললেই পড়তে হবে তাদের রোষানলে। যাদের খুশি-অখুশির ওপর নির্ভর করে বদলি, প্রমোশন এমনকি চাকরি থাকা না থাকার বিষয়টি।
সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগত কারাগারের ভেতরের খবর বলতে গেলে প্রায় কখনোই আসে না বাইরে। তবে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের সাম্প্রতিক আন্দোলনে মামলার শিকার হয়ে বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী জেলে যাওয়ায় কারা অভ্যন্তরের অনেক কিছুই ইদানিং জানতে পারছে সবাই। সেখানকার বন্দিদের দুরবস্থা, থাকা-খাওয়ার সংকটসহ নানা বিষয় এখন মানুষের মুখে মুখে। অবশ্য এসব কিছু ছাপিয়ে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে জেলখানাগুলোতে বিএনপি-জামায়াতের শত শত নেতাকর্মীর উপস্থিতি। একদিকে আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেরোচ্ছে একদল অন্যদিকে নতুন করে জেলে যাচ্ছে অন্যরা। সবমিলিয়ে জেলখানাগুলো সরগরম বিরোধী দলের নেতাকর্মীতে। ২৫ ফেব্র“য়ারি বুধবার পর্যন্ত পাওয়া হিসাব অনুযায়ী একটি কেন্দ্রীয় কারাগারসহ পুরো বিভাগে থাকা মোট ৬টি কারাগারের ধারণক্ষমতা যেখানে ১ হাজার ৪৯৩ সেখানে বন্দি রয়েছে ৩ হাজার ১৮৬ জন। আর এদের মধ্যে ১ হাজার ২৯২ জনই বিরোধী দলের নেতাকর্মী। শতকরা হিসেবে যা ৪০ শতাংশেরও বেশি। এই হিসাবটি অবশ্য বিএনপি এবং জামায়াতের নেতাদের কাছ থেকে পাওয়া। এ হিসাবের ৮৯২ জন বিএনপির নেতাকর্মী। বাকিরা জামায়াত-শিবিরের। যদিও জেলখানাগুলোর কর্তৃপক্ষের কাছে এদের পরিচয় কেবলই হাজতি। এসেছে বিভিন্ন মামলার আসামি হিসেবে গ্রেফতার হয়ে। তবে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তারা স্বীকার করেছেন যে, সাম্প্রতিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কারাগারে ব্যাপকহারে বেড়েছে হাজতিদের আনাগোনা। হরতাল-অবরোধের দিনগুলোয় কখনও কখনও একসঙ্গে ৮০-১০০ জন করেও এসেছে জেলখানায়।
কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বরিশাল মহানগর সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার বলেন, ৫ জানুয়ারির পর থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার যে দমন পিড়ন চালাচ্ছে তাতে এ পরিস্থিতি খুবই স্বাভাবিক। মাত্র দেড় মাসে বরিশাল বিভাগের ৬ জেলায় বিএনপির ১০ হাজারের বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে দায়ের হয়েছে প্রায় দেড়শ মামলা। ২ হাজার ছাড়িয়েছে গ্রেফতারের সংখ্যা। যারা জামিন পেয়েছেন তারা আছেন কারাগারের বাইরে। আর জামিন না পাওয়া হাজারখানেক নেতাকর্মী এখনও কারাগারে। ঝালকাঠী জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি মিঞা আহম্মেদ কিবরিয়া বলেন, আমার জেলায় ৮টি মামলায় আসামি করা হয়েছে ১২শ নেতাকর্মীকে। গ্রেফতার হয়ে ৩৪ জন বর্তমানে রয়েছে জেলে। পিরোজপুর জেলা কারাগার সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, সেখানে ১৭৭ জন ধারণক্ষমতার বিপরীতে বুধবার পর্যন্ত মোট বন্দি ছিল ৪১৪। এদের মধ্যে ১২৭ জনই বিএনপির নেতাকর্মী বলে জানিয়েছেন পিরোজপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আলমগীর হোসেন। একইভাবে ভোলায় ১০০ ধারণক্ষমতার বিপরিতে ৪৮৮, বরগুনায় ১২০ ধারণক্ষমতার বিপরিতে ৩১৫, পটুয়াখালীতে ২৯৮ ধারণক্ষমতার বিপরিতে ৪২২ এবং বরিশালে ৬৩৩ ধারণক্ষমতার বিপরিতে প্রায় ১৩০০ জন কারাবন্দি থাকার খবর দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জেলখানাগুলোর কর্মকর্তারা। আর বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান, বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবুল কালাম শাহিন, বরিশাল মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জিয়াউদ্দিন সিকদার, ভোলা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মো. ফারুক মিয়া, বরগুনা জেলা বিএনপির সভাপতি মাহবুবুল আলম ফারুক এবং পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক স্নেহাংশু সরকার কুট্টির দেয়া তথ্যানুযায়ী বর্তমানে কারাগারে আছে এসব জেলার ৭৩১ জন বিএনপি নেতাকর্মী। এছাড়া জামায়াত নেতারা দাবি করেন যে, তাদের ৪ শতাধিক নেতাকর্মী রয়েছে এসব কারাগারে।
স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এ বন্দির সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত কিনা জানতে চাইলে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জেলা কারাগারগুলোর একাধিক কর্মকর্তা বলেন, অতিরিক্ত তো অবশ্যই। দলীয় নেতাকর্মীদের আনাগোনা বর্তমানে এতটাই বেশি যে কখনও কখনও পরিস্থিতি সামাল দেয়া মুশকিল হয়ে উঠে। তবে এই অতিরিক্ত বন্দিদের রাখার ক্ষেত্রে খাদ্য কিংবা আনুসঙ্গিক কোনো বিষয়ে ঝামেলা পোহাতে হয় না বলে দাবি করেন বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের এক কর্মকর্তা। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তিনি বলেন, কখনও কখনও এর চেয়েও বেশি বন্দি থাকে কারাগারে। ফলে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার অভ্যাস রয়েছে। শীতে পর্যাপ্ত সংখ্যক কম্বল থাকাসহ সবরকম প্রস্তুতি আছে আমাদের। কর্মকর্তারা এভাবে বললেও কারা অন্তরীণ থেকে বাইরে আসা দলীয় নেতাকর্মীদের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। গত সপ্তাহে বরিশাল কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়া বরিশাল মহানগর বিএনপির এক নেতা জানান, স্থানাভাবের কারণে ভেতরে যে কী কষ্ট করে বন্দিদের থাকতে হয় তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করানো যাবে না। ঢালা বিছানায় চিৎ হয়ে শোয়ার অবস্থা থাকে না। শুতে হয় কাত হয়ে। তার ওপর রয়েছে চরম নিুমানের খাবার। দুপুরে ভাত-ডাল। রাতে ভাত আর অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে হয় এমন সাইজের মাছ। যে চাল দিয়ে ভাত রান্না হয় তার মান এত খারাপ যে খেতে দেয়ার পর ১০-১৫ মিনিট রাখলেই তা নষ্ট হয়ে যায়। জিজ্ঞেস করলে বলা হয়, নির্ধারিত বাজেটে অনেক বেশি জনকে খাওয়াতে হচ্ছে। বন্দির সংখ্যা বেশি তাই এ পরিস্থিতি। পরিচয় না প্রকাশের শর্তে একজন জেলার জানান, যে হারে প্রতিদিন বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীরা গ্রেফতার হয়ে জেলে আসছে তাতে জামিনের গতি না বাড়লে একপর্যায়ে হয়তো এদের রাখার জন্য আলাদা সাব জেলের ব্যবস্থা করতে হবে।
শেষ পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close