¦
গরমের শুরুতেই বিদ্যুতের ঘাটতি ১৫শ মেগাওয়াট

মুজিব মাসুদ | প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০১৫

১৫শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি নিয়ে শুরু হয়েছে গরমকাল। আগামী মাসের মধ্যে এই ঘাটতি ২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়াবে। ঘাটতি মেটাতে কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাও নেই সরকারের। নতুন কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্রও উৎপাদনে আসছে না এ সময়ে। বাড়ছে না পুরনো কেন্দ্রের উৎপাদনও। বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য- এ অবস্থায় আসছে গরমে ভয়াবহ লোডশেডিং অপেক্ষা করছে গ্রাহকদের জন্য। বিদ্যুৎ ঘাটতির এই প্রভাব পড়বে পানি উত্তোলনেও। সব মিলিয়ে গ্রাহকদের জন্য ভবিষ্যৎ অন্ধকার। বিশেষ করে গ্রামের মানুষদের জন্য অপেক্ষা করছে ভয়াবহ দুর্ভোগ। শিগগিরই লোডশেডিংয়ের তীব্রতা বাড়বে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতেও। দেশের কিছু কিছু জেলায় ইতিমধ্যে ব্যাপক লোডশেডিং শুরু হয়েছে। ঢাকাকে আলোকিত রাখতে ইতিমধ্যে গ্রামের বিদ্যুৎ সরবরাহ কাটছাঁট শুরু হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গরমের তীব্রতা বেড়ে গেলে এক পর্যায়ে অন্ধকার হয়ে যেতে পারে অধিকাংশ গ্রাম। ঢাকার আশপাশে সাভার, গাজীপুর, কোনাবাড়ী, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদীতে ইতিমধ্যে লোডশেডিং বেড়ে গেছে।
পাওয়ার সেলের সাবেক ডিজি বিডি রহমাতুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, নির্ধারিত সময়ে সরকারের গৃহীত বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো উৎপাদনে আসতে ব্যর্থ হওয়ায় এবার লোডশেডিং বাড়বে। তিনি বলেন, এসব প্রকল্প নিয়ে কোনো শুভ সংবাদও নেই। উল্টো যথাসময়ে কাজ করতে না পারায় চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগী ও দেশীয় অর্থ কাটছাঁট করা হবে। তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য ৯ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে নিজস্ব তহবিল থেকে ৪ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা। বাকি ৪ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা দেবে উন্নয়ন সহযোগীরা। অর্থবছরের ৭ মাসে বিদ্যুৎ বিভাগ তাদের বরাদ্দের মাত্র ৩৩ শতাংশ অর্থাৎ ২ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা ব্যয় করেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, সামনের গরমের মধ্যে ৪ থেকে ৫শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হতে পারে জাতীয় গ্রিডে। বিদ্যুৎ সচিব মনোয়ারুল ইসলাম জানান, চাহিদা না থাকায় রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে এতদিন ৩ থেকে ৪শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম নেয়া হতো। গরম বাড়লে এই বিদ্যুৎ যোগ করা হবে। এছাড়া কয়েকটি রেন্টাল কেন্দ্র চুক্তির বাইরে আরও বিদ্যুৎ দিতে পারবে বলে সরকারের কাছে প্রস্তাবনা জমা দিয়েছে। বেসরকারি রেন্টাল পাওয়ার শাহজীবাজার পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড স্বল্প সময়ে তাদের নিজস্ব ক্ষমতার চেয়ে আরও ৪০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে বলে সরকারের কাছে লিখিত প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে। গ্যাস পাওয়া সাপেক্ষে বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় আছে বলেও তিনি জানান। এছাড়া আরও কয়েকটি রেন্টাল পাওয়ার থেকেও এ ধরনের প্রস্তাব পাওয়া গেছে। কয়েকটি সরকারি বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র ওভারহোলিং করেও ২-৩শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। কাজেই গরমের চাহিদা বাড়লে সেটা মেটানোর মতো সক্ষমতা সরকারের আছে।
বিদ্যুৎ ঘাটতি : লোডশেডিং মোকাবেলায় বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহ ঠিক রাখতে বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে যে হিসাব করা হয়েছে, তাতে মার্চের মাঝামাঝি সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা থাকবে সাত হাজার ৮৭৪ মেগাওয়াট। কিন্তু গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে ছয় হাজার ৬০ মেগাওয়াট। ওই হিসাবে বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে দেড় হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র মিলে বর্তমানে বিদ্যুতের স্থাপিত ক্ষমতা রয়েছে ৯ হাজার ৮১ মেগাওয়াট। সংস্কারের কারণে এক হাজার ৮১১ মেগাওয়াট ক্ষমতার সরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। বাকি সাত হাজার ২৭০ মেগাওয়াটের মধ্যে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে সর্বোচ্চ ছয় হাজার মেগাওয়াট। এক হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে গ্যাস ও জ্বালানি তেল সংকটের কারণে। বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রে জানা গেছে, এবার গরম ও সেচ কাজে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সর্বোচ্চ তেলভিত্তিক দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রাখতে হবে। বর্তমানে বেসরকারি খাতে এক হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট কুইক রেন্টাল, ৫৫৮ মেগাওয়াটের রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। তাদের দাবি- এ মুহূর্তে চাহিদা ঠিক রাখতে একমাত্র রেন্টাল খাতে আরও উৎপাদন বাড়াতে হবে। এছাড়া দ্রুততম সময়ে অন্য কোনো উৎস থেকে বিদ্যুৎ জোগান দেয়া সম্ভব নয়।
জানা গেছে, বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে হতাশা কাটছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেটে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। দেয়া হয়েছে চাহিদা মোতাবেক বরাদ্দও। কিন্তু বরাদ্দের এ অর্থ ব্যয় করতে না পারায় যথাসময়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে আসতে পারছে না। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনেও উন্নয়ন ও সম্প্রসারণেও একই হাল। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকদের সঙ্গে বৈঠক করে সংস্থাটি। এতে বরাদ্দের অর্থ ব্যয় করতে না পারার কারণ ও সমাধানে ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ দেয়া হয় পিডিদের। কোনো প্রকল্পে বরাদ্দের অর্থ ব্যবহারে অসামর্থ্য হলে সম্পন্নের বিষয়েও দিকনির্দেশনা দেয়া হয়। আইএমইডি সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইএমইডির ভারপ্রাপ্ত সচিব শহিদ উল্লাহ খন্দকার যুগান্তরকে বলেন, চলমান বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও ট্রান্সমিশন লাইন সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি আশানুরূপ নয়। এর কারণ জানতে ও অগ্রগতি বাড়াতে করণীয় নির্ধারণে পিডিদের সঙ্গে বৈঠকে দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, চলতি বছরে কোনো প্রকল্পে বরাদ্দের অর্থ ব্যবহারে অসামর্থ্য হলে তা কেটে অন্য প্রকল্পে দেয়া হবে। যেন অন্য প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে অর্থায়ন সমস্যা না হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হলেও এসব প্রকল্প নির্দিষ্ট মেয়াদে শেষ হচ্ছে না। এজন্য পরবর্তী সময়ে মেয়াদ বাড়ানোর নামে বাড়ছে ব্যয়। তথ্য অনুসারে, বেশির ভাগ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ চলছে ঢিমেতালে। এর মধ্যে ভেড়ামারা ৩৬০ মেগাওয়াট, হরিপুর ৪১২ মেগাওয়াট, সিদ্ধিরগঞ্জ ৩৩৫ মেগাওয়াট, ভোলা ২২৫ মেগাওয়াট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে সঞ্চালন লাইন, বিতরণ লাইন নির্মাণের কাজও চলছে শ্লথগতিতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছতে ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায় সরকার। কিন্তু কেন্দ্রগুলোর নির্মাণ কাজ যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
এদিকে গৃহীত বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি না থাকায় ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে। জানা গেছে, এ খাতে গৃহীত ১৫টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে জাতীয় গ্রিডে আরও ১ হাজার ৫৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ হবে। কিন্তু নির্বাচনী অগ্রাধিকার খাত হলেও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে গতি না আসায় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে এই ক্ষোভ ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে গত বছরের শেষের দিকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিদ্যুৎ বিভাগকে একটি চিঠি দিয়েছিল পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারি অর্থায়নে নেয়া প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন হলে বিদ্যুতের ঘাটতি অনেকটাই কমে আসত। সরকারি খাতে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়লে বেসরকারি খাতে রেন্টাল এবং কুইক রেন্টাল থেকেও বিদ্যুৎ কেনার প্রয়োজন হতো না। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে সরকারের একটি মহল। এর ফলে প্রতি মাসে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে গচ্চা যাচ্ছে কোটি কোটি টাকা। এই অংক বছরে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা।
শেষ পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close