¦
বর্ষবরণে টিএসসিতে পুলিশের সামনেই পাশবিকতা

বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার | প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৫

বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পাশবিকতার শিকার হয়েছেন অনেক নারী। নিপীড়নকারীদের নিবৃত করতে গিয়ে আহত হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র। পুলিশের উপস্থিতিতেই অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলের কয়েক গজ দূরেই ঘটেছে এসব ঘটনা। ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে বিচার দাবি করেছে কয়েকটি ছাত্র সংগঠন। বুধবার ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সংগঠনগুলো এ দাবি জানায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পহেলা বৈশাখের দিন সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ আসতে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি চত্বরই ছিল লোকে-লোকারণ্য। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ও টিএসসিতে ভিড় ছিল বেশি। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বহিরাগত যুবকরা হামলে পড়ে নারীদের ওপর। বিকাল পর্যন্ত ইভটিজিংয়ের ঘটনা ছাড়া বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও বিকাল গড়াতেই এক শ্রেণীর বখাটে হামলে পড়ে নারীদের ওপর। ঘটনাস্থলের চারদিক পুলিশ পরিবেষ্টিত থাকলেও তখন তাদের কেউ এগিয়ে আসেনি। বরং পুলিশের উপস্থিতিতেই এ ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে বখাটেদের হামলার শিকার হয়ে হাত ভেঙে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্র ইউনিয়ন সভাপতি লিটন নন্দীর। এসময় আরও বেশ কয়েকজন ছাত্র বখাটেদের হামলায় আহত হন বলে জানান লিটন।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে লিটন জানান, পহেলা বৈশাখের পুরো দিনটিতেই অসংখ্য নারী শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে আমি কয়েকজন বন্ধুসহ শাহবাগ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে আসছিলাম। রাজু ভাস্কর্যের কাছাকাছি এলে দেখতে পাই বিভিন্ন স্থানে জটলা পাকিয়ে আছে। মাঝে মধ্যেই নারী কণ্ঠে বাঁচাও বাঁচাও চিৎকারের আওয়াজ আসছে। পরে দেখি বিভিন্ন স্থানে সংঘবদ্ধ কয়েকটি চক্র নারীদের ভিড়ের মাঝে ঠেলে দিয়ে বস্ত্রহরণ করে শ্লীলতাহানি করছে। রাজু ভাস্কর্যের পূর্ব পাশে একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, সেখানে খুব বেশি মানুষের জটলা দেখছিলাম। তার পাশেই দু’জন পুলিশ দাঁড়িয়েছিল। গিয়ে দেখি, একজন নারীর ওপর সবাই হামলে পড়েছে। পড়ে আমি ও বন্ধুরা মিলে ধাক্কা দিয়ে সবাইকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করি। এসময় আমদের দু’জন আহত হন। অনেক কষ্ট করে সবাইকে যখন সরিয়ে দেই তখন একটি মেয়ে অজ্ঞান অবস্থায় বিবস্ত্র হয়ে রাজু ভাস্কর্যের পাশে পড়ে ছিল। তাকে পাঞ্জাবি দিয়ে ঢেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। এর পাশেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের টিএসসি সংলগ্ন গেট দিয়ে প্রবেশস্থলে আরও অন্তত ছয়টি স্থানে একই ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবাদ করতে গিয়ে আহত অপর একজন রমনা থানা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি অমিত দে যুগান্তরকে জানান, তিনিও একই ধরনের ঘটনা দেখেছেন। এসময় পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তাদের বিভিন্ন সময়ে সহায়তা করতে বললেও তারা কেউ এগিয়ে আসেননি।
ঘটনায় আহত লিটন জানায়, এসব দেখে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. এম আমজাদ আলীকে তৎক্ষণাৎ বিষয়টি জানান। তিনি পুলিশ পাঠানোর কথা বললেও এক ঘণ্টায় কোনো পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে আসেনি। পরে ছাত্র ইউনিয়নের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী প্রক্টর কার্যালয়ে গিয়ে দেখতে পান তিনি সেখানে বসে দাবা খেলছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানান, শুধু টিএসসিতে নয়। ওইদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোড, চারুকলা, শহীদ মিনার, কার্জন হল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, শাহবাগ এলাকায় অন্তত অর্ধশত নারী বিভিন্নভাবে যৌননিপীড়নের শিকার হয়েছেন। অনেকে সম্মানের ভয়ে কোনো প্রতিবাদ না করেই ঘটনাস্থল থেকে সরে পড়েছেন।
যেভাবে শ্লীলতাহানি হয় : প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানান, সকাল থেকেই সংঘবদ্ধ কয়েকটি চক্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে। প্রতিটি চক্রেই ২৫-৩০ জনের মতো সদস্য ছিল। চক্রগুলো ভূভূজেলা বা বাশি বাজিয়ে, কখনও হৈ-হুল্লোড় করে নির্দিষ্ট কাউকে লক্ষ্য করে হাঁটতে শুরু করে। পরে যখন তার পাশ দিয়ে যায় তখন আচমকা টান দিয়ে ভিড়ের মধ্যে নিয়ে এ ধরনের কাজগুলো করে। এর আগে পুলিশের সামনে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও কোনো শাস্তি না হওয়ায় তারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটে যেভাবে শ্লীলতাহানি : সন্ধ্যা নামতে শুরু করলে যখন সবাই উদ্যান থেকে বের হচ্ছিলেন। তখন প্রতিটি গেটেই ব্যাপক ভিড় লেগে যায়। এসময় সংঘবদ্ধ ওইসব চক্র গেটে অবস্থান নেয়। হঠাৎ করে তারা গেট দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করে একটা হট্টগোল পাকায়। এসময় আশাপাশে থাকা নারীদের শ্লীলতাহানি করে তারা। অনেক সময় সঙ্গে থাকা পুরুষসঙ্গী ঘটনার প্রতিবাদ করলে তাদেরও হেনস্থার শিকার হতে হয়।
জড়িতদের বিচার দাবিতে ঢাবিতে বিক্ষোভ : এদিকে ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে প্রগতিশীল ছাত্র জোট। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাজেয় বাংলায় সমাবেশ করে। এছাড়া ঘটনায় জড়িতদের সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। বুধবার বেলা দেড়টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সংগঠনটি সংবাদ সম্মেলন করে। এসময় সংগঠনের নেতারা নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় থাকার কারণ তদন্ত করে জড়িত পুলিশ সদস্যদের অপসারণ দাবি করেন। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জিএম জিলানী শুভ। উপস্থিত ছিলেন, ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি হাসান তারেক, সহ-সভাপতি মারুফ বিল্লাহ তন্ময়, দফতর সম্পাদক আল আমিন, ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক সুমন সেনগুপ্ত ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক তুহিন কান্তি দাশ। হাতে ব্যান্ডেজ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন ঢাবি শাখার সভাপতি লিটন নন্দী। সংবাদ সম্মেলনে তিনটি দাবি করা হয়। এগুলো হল ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ থেকে জড়িতদে শনাক্ত করে বিচার, ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্যদের বহিষ্কার ও এক সপ্তাহের মধ্যে ঘটনার যৌক্তিক সমাধান করে নারীদের নিরাপত্তার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ।
শাহবাগ থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম জানান, পুলিশ তৎপর থাকলেও এ ধরনের বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। তারা অপরাধীদের শনাক্ত করে আটকের চেষ্টা করছেন।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. আমজাদ আলী যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের ঘটনা দুর্ভাগ্যজনক। যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সেজন্য আমরা দু’দফায় মিটিং করেছি। এর পরেও এ ধরনের ঘটনা কাম্য নয়। তিনি বলেন, আমরা শাহবাগ থানাকে আগেই পুলিশের ব্যাপরে বলেছি। কিন্তু থানার ওসি জানিয়েছে পর্যাপ্ত পুলিশ তারা পায়নি। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরই বা কি করার আছে। এছাড়া আমি যখনই এ ধরনের ঘটনার খবর পেয়েছি, তখনই সেখানে ছুটে গিয়েছি। কার্যালয়ের দাবা খেলার বিষয়টিকে ব্যক্তিগত বিষয় বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার দায়িত্ব আমি পালন করলেই হল। বাকি সময় কি করেছি সেই প্রশ্ন তারা করতে পারে না।
 

শেষ পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close