¦
৬৮ বছরের দুঃখ মুক্তির হাতছানি

যুগান্তর ডেস্ক | প্রকাশ : ০৮ মে ২০১৫

সীমান্ত বিল পাসের খবরে বাংলাদেশের পতাকা হাতে দাসিয়ারছড়া ছিটমহলবাসীর উচ্ছ্বাস

৬৮ বছরের দুঃখগাথার অবসান হয়ে মুক্তির স্বাদ পেতে যাচ্ছেন- এই ভেবে বাঁধভাঙা আনন্দের বন্যা বইছে ছিটমহলগুলোতে। বাদ্য, লাঠি খেলা, মিষ্টি বিতরণ, উন্নত খাওয়া-দাওয়া, গরু জবাই এবং শোকরানা আদায়ের মধ্যদিয়ে বৃহস্পতিবার গোটা দিনই উৎসব আমেজে কাটায় ছিটমহলবাসী। আনন্দধারা বইতে থাকে বুধবার ভারতের রাজ্যসভায় সীমান্ত চুক্তি পাসের পর থেকেই। বৃহস্পতিবার লোকসভায় চুক্তি চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার পর সে আনন্দ যেন বাঁধ ভেঙে যায়। নারী-পুরুষ-শিশুসহ সর্বস্তরের মানুষ নেমে আসেন রাস্তায় বা মাঠে। নেচে-গেয়ে উল্লাস করতে থাকেন তারা। এ সময় বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে একে অপরের সঙ্গে কোলাকোলি করতে দেখা যায়। তাদের উচ্ছ্বাস দেখে মানে হয়েছে যেন তারা কোনো স্বর্গ হাতে পেতে যাচ্ছেন। আনন্দের পাশাপাশি অনেককে কাঁদতে দেখা গেছে। এ যেন সুখের কান্না। দুঃখের রাত পোহাতে যাচ্ছে, নতুন সকাল দেখবেন তারা- এ জন্যই এ কান্না। ১৯৪৭ সালে অদ্ভুত এক দেশ বিভাগের ফলে যে অবর্ণনীয় কষ্ট, পরাধীনতা তাদের জীবনে নেমে এসেছিল তা আর থাকবে না- তাই ভারত ও বাংলাদেশের সরকারকে তাদের কৃতজ্ঞতার যেন শেষ নেই। এখন তারা দ্রুত চুক্তি বাস্তবায়ন চান।
প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
কুড়িগ্রাম : ভারতের লোকসভায় সীমান্ত চুক্তি পাস হওয়ার খবর শুনে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অভ্যন্তরে অবস্থিত ভারতীয় ছিটমহল ১৫০নং দাসিয়ার ছড়ায় আনন্দ র‌্যালি, লাঠি খেলা উৎসব ও ভারত সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কালিরহাট বাজারে অনুষ্ঠিত সমাবেশে শত শত নারী-পুরুষের উপস্থিতি হয়। দীর্ঘদিনের বন্দিজীবনের অবসানের আনন্দে আত্মহারা ছিটমহলের বাসিন্দারা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ-উল্লাস করেন।
ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফার সভাপতিত্বে সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি মো. জাফর আলী। বক্তব্য রাখেন অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন, গোলাম রব্বানী, আলতাফ হোসেন, অধ্যাপক খন্দকার শামসুল আলম, সাঈদ হাসান লোবান, মইনুল হক প্রমুখ। বক্তারা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা সমাধান করায় বাংলাদেশ ও ভারত সরকারকে ধন্যবাদ জানান।
বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিমিয় সমন্বয় কমিটি ভারত ইউনিটের সহসাধারণ সম্পাদক দীপ্তিমান সেনগুপ্ত জানান, মন্ত্রিসভায় ও রাজ্যসভায় বিলটি পাসের পর বৃহস্পতিবার লোকসভা বিলটি পাস করে। তিনি বলেন, এর মধ্যদিয়ে ৬৮ বছরের বঞ্চনার অবসান ঘটল। আনন্দ প্রকাশের ভাষা আমাদের নেই।
গোলাম মোস্তফা বলেন, লোকসভায় বিলটি পাস হওয়ায় আমরা খুশি। এখন আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে ছিটমহল বিনিময় বাস্তবায়ন দ্রুত হবে বলে আশা করছি।
কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার অভ্যন্তরে ভারতের ১৫০ নম্বর ছিটমহল দাসিয়ার ছড়ায় গিয়ে দেখা যায় নারী- পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সবার মাঝে বাঁধভাঙা আনন্দ-উল্লাস। কৃষক এছাহক আলী (৭০), আয়শা সিদ্দিকা (৫৪), আলেকজন বিবি (৫০), রাহেলা বেগম (৪০), শরিফ (২০) জানান, ছিটমহল বিনিময় চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে তারা বাংলাদেশের নাগরিক হতে পেরে আনন্দিত। তাদের আর মিথ্যা পরিচয় দিয়ে জীবনযাপন করতে হবে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য,সামাজিক নিরাপত্তাসহ সব সুযোগ-সুবিধা বৈধভাবে ভোগ করতে পারবেন। এটি তাদের হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো স্বপ্নময় প্রাপ্তি বলে উল্লেখ করেন ছিটমহল বিনিময় আন্দোলনের নেতা আলতাফ হোসেন।
জহুরুল হক, বাচ্চু শেখ, শাহ আলমগীর, জোবায়দুল হক বলেন, ‘খাঁচার বন্দি পাখি কেবল বোঝে, স্বাধীনতার কী স্বাদ? তাই এর মর্ম আমরা বুঝতে পারছি হৃদয় দিয়ে। দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল ঘরে উঠছে। এ আনন্দে আর চাওয়ার কিছু নেই। আমাদের সন্তানরা একটা পরিচয় পাবে। তারা গর্ববোধ করবে। এটাই অনেক বড় পাওয়া।’ আনন্দের ঢেউ লেগেছে ১৬২ ছিটমহলে। চলছে আনন্দ র‌্যালি, মিষ্টি খাওয়া ও সমাবেশ। মুক্তির আনন্দে উদ্বেলিত সবাই। চলছে করমর্দন ও কোলাকুলি। এসব কথা জানান ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ ইউনিটের সভাপতি মইনুল হক। তবে আক্ষেপ বাপ-দাদারা অস্বাভাবিক জীবন নিয়ে পরপারে চলে গেছেন। তারা জানতে পারলেন না এ আনন্দের খবর। বন্দি দাসত্বের জীবন থেকে মুক্তি লাভের খবর। জীবনের পরন্ত বিকালে এসে একটাই সান্ত্বনা বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করতে পারব।
পঞ্চগড় : বন্দি জীবনের অবসান হতে যাচ্ছে- এই আনন্দে বাদ্য, লাঠি খেলা, মিষ্টি বিতরণ, উন্নত খাওয়া-দাওয়া এবং শোকরানা আদায়ের মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার পঞ্চগড়ের ৩৬টি ছিটমহলের বাসিন্দারা অনন্দ-উৎসব করেছেন। তাদের প্রত্যেকের চোখে-মুখে এখন উচ্ছ্বাস আর প্রাপ্তি যোগের মহাআনন্দ। দীর্ঘ ৬৮ বছরের বন্দি জীবনের অবসান হতে যাচ্ছে- এ যেন স্বর্গ হাতে পাওয়া।
বৃহস্পতিবার পঞ্চগড়ের গারাতি, শালবাড়ি, বোদেশ্বরী, নাটোক টোকা বেউলাডাঙ্গা, কোটভাজিনী এবং বোদা উপজেলার মসলিমপুর ছিটমহলসহ জেলার অভ্যন্তরের সব ছিটমহলের বাসিন্দাদের মধ্যে একই রকম আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। ভারতের রাজ্যসভায় সীমান্ত চুক্তি বিল পাস উপলক্ষে পঞ্চগড়ের গারাতি ছিটমহলে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির চেয়ারম্যান মো. মফিজার রহমানের সভাপতিত্বে এতে পঞ্চগড় সদর উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার সাদাত সম্রাট প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় ছিটমহলবাসীর পক্ষ থেকে সবাইকে মিষ্টিমুখ করানো হয়।
ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) : ভারতের রাজ্যসভায় স্থলসীমান্ত চুক্তি পাস হওয়ায় কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর ভেতর ভারতীয় ছিটমহল দাসিয়াড়ায় ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির কেন্দ্রীয় অফিস থেকে বৃহস্পতিবার বিকালে আনন্দ মিছিল বের করা হয়। মিছিল থেকে ৬৮ বছর ধরে অবরুদ্ধ ছিটমহলবাসী মুক্তির পাশাপাশি তাদের সমস্যাগুলোর সমাধান করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
বুধবার স্থলসীমান্ত চুক্তিটি ভারতের রাজ্যসভায় অনুমোদিত হওয়ার সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যম ছড়িয়ে পড়ায় ছিটমহলবাসী মুক্তির আলো দেখতে পাচ্ছেন। ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির দাসিয়ার ছড়া ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা জানান, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো থেকে তারা বঞ্চিত। তারা কুসংস্কারের মধ্যে বসবাস করছেন। চুক্তি বাস্তবায়নের পর থেকে ছিটমহলগুলোতে ডিজিটাল বাংলাদেশের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাস্তবায়নের দাবি জানান তিনি।
গংগারহাট বালিকা বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্রী আয়শা সিদ্দিকা জানায়, চুক্তি বাস্তবায়নের পর জন্মস্থানে স্বাধীনভাবে বসবাস করতে পারবে তারা। তখন আর ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ ও বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাফেরা করতে হবে না তাদের। এ প্রাপ্তির এজন্য দু’দেশের সরকারকে ধন্যবাদ জানায় সে।
কল্পনা আক্তার (২৮) জানান, তিনি গর্ভবতী হওয়ার পরও সরকারি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের কোনো সুযোগ পাচ্ছেন না। চুক্তি বাস্তবায়ন হলে ছিটমহলগুলোতে বড় ধরনের কল্যাণ হবে বলে তিনি আশা করছেন।
 

শেষ পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close