¦
চট্টগ্রামে বাসায় ঢুকে মা-মেয়েকে জবাই

চট্টগ্রাম ব্যুরো | প্রকাশ : ০৮ মে ২০১৫

চট্টগ্রাম নগরীর সদরঘাট এলাকায় বাসায় ঢুকে মা- মেয়েকে নৃশংসভাবে গলা কেটে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৯টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে দক্ষিণ নালাপাড়ার আল ইসলাম ভবনের চার তলায় এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- স্থানীয় মাংস ব্যবসায়ী শাহ আলমের স্ত্রী নাসিমা আক্তার (৩২) ও তার মেয়ে রিয়া আক্তার ফাল্গুনী (৫)। এ ঘটনায় পুলিশ সন্দেহজনকভাবে বাসার দারোয়ান সিদ্দিক আহমদ ও সুজনসহ চারজনকে আটক করেছে। আটক অপর দু’জনের নাম তদন্তের স্বার্থে জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছে পুলিশ। দুর্বৃত্তরা বাসা থেকে নগদ ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা ও ৮-১০ ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে গেছে বলে দাবি করেছেন গৃহকর্তা শাহ আলম। তবে স্রেফ ডাকাতি করতে গিয়েই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে নাকি এর নেপথ্যে অন্য কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে, সে বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে পুলিশ।
ঘটনার পর সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন) বনজ কুমার মজুমদারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সিআইডির ফরেনসিক ও ক্রাইমসিন ইউনিটও ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডের আলামত সংগ্রহ করে। এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের অন্য সদস্যদের কান্নায় এলাকার পরিবেশ ভারি হয়ে উঠে। উৎসুক লোকজন সকাল থেকে ভিড় জমায় সেখানে। হত্যা রহস্য উন্মোচনে ডিবি, সিআইডি ও র‌্যাবের টিমসহ ৬টি টিম একযোগে মাঠে কাজ করছে বলে নিশ্চিত করে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
পুলিশ ও এলাকাবাসী জানান, সদরঘাট রোডে মাংসের ব্যবসা করেন শাহ আলম। তিনি তার স্ত্রী নাসিমা আক্তারসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কিছুদিন আগে আল ইসলাম ভবনের চারতলায় বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে বসবাস শুরু করেন। এর আগে তারা থাকতেন ইসলামী কলেজে জাফর কমিশনারের গলির একটি বাসায়। শাহ আলমের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বাসায় স্ত্রী তিন ছেলেমেয়ে ছাড়াও তার শ্যালক আলালও থাকতেন। বড় ছেলে হৃদয় নগরীর মিউনিসিপ্যাল মডেল স্কুলের সপ্তম শ্রেণী ও রিয়াদ একই স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। তাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর থানার পূর্বধলা গ্রামে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, সকাল সাড়ে ১০টার কিছু পরে কাজের বুয়া আসলে বাসাটির দরজা খোলা দেখতে পায়। বুয়া বাসার ভেতরে প্রবেশ করে নাসিমা ও তার মেয়ে রিয়ার রক্তাক্ত লাশ দেখতে পেয়ে চিৎকার দেয়। তার চিৎকারে ভবনের আশপাশের ভাড়াটিয়ারা ঘটনাস্থলে যান এবং পরে সদরঘাট থানায় খবর দেন।
নিহতের স্বামী শাহ আলম কান্নাজড়িত কণ্ঠে যুগান্তরকে বলেন, ‘সকাল ৯টা ৭ মিনিটে দুই ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে স্ত্রী নাসিমার সঙ্গে শেষ কথা হয় তার। সাড়ে ১০টার কিছু পর কাজের বুয়া এসে তাদের লাশ দেখতে পায়।’ তিনি বলেন, ডাকাত দল জিনিসপত্র নিয়ে গেলে আমার কোনো দুঃখ থাকত না। ওরা আমার সব শেষ করে দিয়ে গেছে। আমার স্ত্রী ও অবুঝ মেয়েকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে।’ দুর্বৃত্তরা স্টিলের আলমারি থেকে প্রায় ৮ থেকে ১০ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা নিয়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি। শাহ আলম দম্পতি জানুয়ারি মাসে এই আল ইসলাম ভবনে বাসা ভাড়া নেন।
নিহত নাসিমার ভাই আলাল জানান, ‘সকালে কাজের বুয়া এসে তাকে হত্যাকাণ্ডের কথা জানান। সে কাজ করতে বাসায় গিয়ে দেখে দরজা খোলা, ভেতরে রক্তাক্ত লাশ। এরপর থানায় খবর দেয়া হলে পুলিশ এসে ওই বাসা ঘিরে ফেলে এবং আলামত সংগ্রহে কাজ শুরু করে। আমি আর কিছু জানি না।’
ঘটনার পর সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, সদরঘাট এলাকার মেইন রোডের রাস্তার পশ্চিম পাশে একটি ভবনের কাছে ছয় তলাবিশিষ্ট আল ইসলাম ভবন। আগে পুরো ভবনটি আল ইসলাম আবাসিক হোটেল নামে পরিচিত ছিল। হোটেল ব্যবসা ভালো না হওয়ার কারণে ভবনের একাংশ এখনও আগের মতোই হোটেল রয়েছে অপর অংশ ভাড়া দিয়ে দেয়া হয়েছে। বাসার ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, ড্রয়িং রুমের উত্তর-পূর্ব কোনায় নাসিমার রক্তাক্ত নিথর দেহ পড়ে আছে। তার সারা শরীর ও পেটে একাধিক ছুরিকাঘাত ও কোপের চিহ্ন। গলার প্রায় অর্ধেক কাটা। আর একটু সামনে বাথরুমের ভেতরে তার মেয়ে রিয়ার গলাকাটা দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। তার চোখ দুটি খোলা। শরীরের পোশাক রক্তে ভেজা। লাশ দুটির চারপাশে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। নিহত নাসিমার হাতে ছিল চায়ের কাপ। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তাক্ত ছোরাটি ড্রয়িংরুমের পাশের ওয়ারড্রোবের ওপর পাওয়া গেছে। ছোরাটিতে বেশ কয়েকটি ছাগল অথবা খাসির লোমও লক্ষ্য করা গেছে। বাসার দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার সিঁড়িতে দেখা গেছে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। বাসায় ঢুকে ড্রয়িংরুমের একটু আগে আরও একটি রুম রয়েছে। ওই রুমে ঢুকে দেখা যায় স্টিলের আলমারিটা খোলা। কাপড়- চোপড় অনেকটা অগোছালো। পাশে রয়েছে আরেকটি শোকেস। শোকেসটি মোটামুটি পরিপাটি। জিনিসপত্র গোছানো।
এলাকার পরিবেশ : মা-মেয়েকে নৃশংসভাবে খুন করার ঘটনা এলাকায় জানাজানি হলে পুরো এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। ভবনটি ঘিরে শত শত উৎসুক মানুষ ভিড় জমায়। হত্যাকাণ্ডের পরপরই ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) বনজ কুমার মজুমদার। এর আগেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন ডিবি পুুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার তানভীর আরাফাত, কোতোয়ালি জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার শাহ মো. আবদুর রউফ ও সদরঘাট থানার ওসি আবুল কালাম। এ সময় অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বনজ কুমার মজুমদারকে কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় দিকনিদের্শনা দিতে দেখা যায়। একইসঙ্গে তিনি নিহতের স্বামী শাহ আলমকে একান্তে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। বেলা সোয়া ১২টার দিকে নগরীর দামপাড়া থেকে আসে সিআইডির ফরেনসিক ও ক্রাইমসিন বিশেষজ্ঞ দল। তারা ঘটনাস্থল থেকে হাতের ছাপ, পায়ের ছাপ, রক্তের দাগ ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছোরাসহ আরও বেশকিছু আলামত সংগ্রহ করেন। কিছুক্ষণ পর ঘটনাস্থলে আসে র‌্যাব-৭-এর একটি দল। তারাও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বিভিন্ন আলমত এবং ঘটনায় কারা জড়িত থাকতে পারে এমন সন্দেহভাজন ব্যক্তির নাম ঠিকানা সংগ্রহ করেন।
ওই ভবনের একাধিক ভাড়াটিয়া অভিযোগ করে বলেন, ‘ভবনটির মালিক তার হোটেলে দারোয়ান রাখলেও ভাড়াটিয়াদের নিরাপত্তায় কোনো দারোয়ান রাখেননি। এ ব্যাপারে ভবনটির মালিক মোবাশ্বের আলী বাবুল যুগান্তরকে বলেন, ভাড়াটিয়াদের নিরাপত্তায় দারোয়ান নেই এ কথা সঠিক নয়। দারোয়ান আছে তারা একইসঙ্গে হোটেল ও আবাসিক দুটিতে দায়িত্ব পালন করে।
হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছোরা রহস্য : নৃশংসভাবে মা- মেয়েকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছোরা নিয়ে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। যে ছোরা দিয়ে মা-মেয়েকে জবাই করা হয়েছে ওই ছোরাতে ১৩-১৪টি খাসি কিংবা ছাগলের লোম দেখা গেছে। কোনো ডাকাত কিংবা কেউ পূর্বশত্র“তার জের ধরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটালে ওই ছোরায় পশুর লোম আসল কোথা থেকে এমন প্রশ্ন উঠেছে। আর ওই ছোরা যদি বাসায় ব্যবহৃত ছোরা হয়ে থাকে তাহলে ছোরায় লোম থাকার কথা নয়। স্বামী শাহ আলম খাসির মাংস বিক্রেতা। তার কসাই কাজে ব্যবহৃত ছোরা হত্যাকাণ্ডে কিভাবে আসল পুলিশ তাও খতিয়ে দেখছে। তবে অন্য একটি সূত্র পরকীয়ার জের ধরে এ হত্যকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে ধারণা করছে।
প্রেস ব্রিফিং : মা-মেয়ে হত্যাকাণ্ডের এ ঘটনার পর দুপুর দেড়টার দিকে আল ইসলাম ভবনের নিচে এক আনুষ্ঠানিক প্রেস ব্রিফিং করে কোতোয়ালি জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার শাহ মো. আবদু রউফ। তিনি বলেন, ‘মা-মেয়েকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে নগর গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক টিম মাঠে রয়েছে। ইতোমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই দারোয়ানসহ ৩-৪ জনকে আটক করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে তদন্ত করা হবে।’ তবে খুব শিগগরই এ নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের জট খুলবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
 

শেষ পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close