¦
নেপাল ছাড়ছে বিদেশী উদ্ধারকারী দল

শিপন হাবীব, কাঠমান্ডু থেকে | প্রকাশ : ০৮ মে ২০১৫

নেপালের অধিকাংশ লোকজন এখনও ঘরের বাইরেই তাঁবুতে, খোলা আকাশের নিচে থাকছেন। এমন অবস্থায় বৃহস্পতিবার ভোর রাতে দু’বার এবং বিকালের দিকে আরও দু’বার মৃদু ভূমিকম্প হয়েছে। ফলে ফাটল ধরা ভবনগুলো আরও ফেটে যাচ্ছে। যাদের ঘর-বাড়ি, দোকানপাট ও অফিসে সামান্য ফাটল রয়েছে তাদের প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। নেপাল সরকার ফাটল স্থাপনাগুলো বিশেষজ্ঞ টিম দ্বারা সমীক্ষা করে যাচ্ছে। বর্তমানে শুধু নেপাল আর্মি, পুলিশসহ বিভিন্ন আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন। নেপাল সরকার বুধবার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা উদ্ধারকর্মীদের নিজ নিজ দেশে ফিরে যেতে বলে দিয়েছে। ফলে নেপাল আর্মি, পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদেরই শুধু উদ্ধারে কাজ করতে দেখা গেছে। বাংলাদেশ থেকে আসা আর্মির চিকিৎসক দলটি আগামীকাল দেশে ফিরে যাবে বলে বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে। এমন অবস্থায় দেশটির ভেঙে পড়া ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাসহ ধ্বংস হয়ে যাওয়া হাজার হাজার ভবনে উদ্ধার তৎপরতা আরও জোরেশোরে শুরু করেছে নেপাল প্রশাসন। ভূমিকম্পে আহত রোগীদের হাসপাতালে জায়গা না হওয়ায় খোলা আকাশের নিচে তাঁবু টাঙ্গিয়ে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে বৃষ্টি হওয়ায় উদ্ধার তৎপরতায় যেমন গতি কমেছে তেমনি আরও দুর্ভোগে পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। খোলা আকাশের নিচে ও তাঁবুতে থাকা লোকজন নতুন করে সমস্যায় পড়েছেন। এদিকে ক্ষণে ক্ষণে ভূমিকম্পের কারণে প্রতিদিনই ফাটলকৃত ভবন কোথাও না কোথাও ভেঙে পড়ছে। এখনও দুর্গম এলাকায় যথাযথ ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি। পাহাড় ঘেরা ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে যাওয়ার রাস্তা বিভিন্ন স্থানেই ভেঙে রয়েছে। এদিকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কাঠমান্ডু শহরের মীন ভবনের সামনে ১০ লাখ আলোপ্রজ্বল্লন করা হয়েছে।
কাঠমান্ডু উপ-শহরের প্রাণ কেন্দ্রে অবিস্থত বুদ্ধদের প্রধান স্বয়ংবু নাথ মন্দিরটি প্রায় পুরোপুরিই ভেঙে গেছে। দুটি মন্দির ফাটল অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকলেও ধসে গেছে বাকি প্রায় ৭০-৭৫টি ছোট-বড় মন্দির। প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ১ হাজার ৯০০ ফুট উঁচুতে স্বয়ংবু নাথ মন্দিরটি অবস্থিত। বেশ কয়েটি মন্দির স্বর্ণ দিয়ে গড়ায় ওখানে অতিরিক্ত নেপালি আর্মি ও পুলিশ অবস্থান করতে দেখা গেছে। ধসে যাওয়া বিভিন্ন মন্দিরে সাধারণ লোক যেতে পারলেও এ মন্দিরটিতে কাউকে যেতে দেয়া হচ্ছে না। সরেজমিন মন্দিরটি ঘুরে জানা যায়, প্রাচীনতম এ মন্দিরটি প্রায় ৮০০ বছর পুরোনো। ভূমিকম্পে মন্দিরের প্রধান প্রধান ১০-১২টি ঐতিহ্যবাহী মন্দিরসহ প্রায় ছোট-বড় প্রায় ৭৫টি মন্দির ধসে গেছে। হারতি মাতা মন্দিরটি অক্ষত রয়েছে, যে মন্দিরটির পুরোটাই স্বর্ণ ও পিতল দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। মন্দিরটির চারপাশে আর্মি ও পুলিশ টহল দিতে দেখা গেছে। বেশ কয়েকজন আর্মি ও পুলিশ সদস্য জানান, এ মন্দিরটি অনেক পুরোনো, মন্দিরের দেয়ালগুলো নানা নকশার কারুকাজ ছিল। এসব এখন শুধুই স্মৃতি। ভাঙা মন্দিরটিতে ভক্তরা আসতে চাচ্ছেন জানিয়ে তারা বলেন, নিরাপত্তার জন্য এখন কাউকেই ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। এখানে ১২৫ জনেরও বেশি লোক মারা গেছেন।
২ দিন চেষ্টা করে বৃহস্পতিবার দুপুরে নেপাল আর্মি হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ঢোকা সম্ভব হয় এ প্রতিবেদকের। কাঠমান্ডুতে অবস্থিত এ হাসপাতালটিতে ঢুকে দেখা যায়, পুরো হাসপাতালের চারপাশে শত শত তাঁবু টাঙানো। ৩০০ শয্যার এ হাসপাতালটিতে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ১০০ রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ভূমিকম্পে গুরুতর আহত ব্যক্তিদের হেলিকপ্টারে করে এ হাসপাতালে আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। সিন্ধুপাল চক থেকে আসা মধ্যবয়সী নারী পিংকী আচারের পায়ে প্রায় ১২-১৩টি রড ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে। পিংকী জানালেন, ভূমিকম্পে তার স্বামীসহ পরিবারের ৪ জন মারা গেছেন। হাসপাতালটির দক্ষিণ দিকে একটি ত্রিপলের নিচে প্রায় শতাধিক আহত রোগীর চিকিৎসা চলছিল। হাসপাতালটির বিভিন্ন ভবনে ফাটল রয়েছে, ফলে রোগীদের বাইরে রেখে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে। ডা. বাওয়ানি গরি জানান, ভূমিকম্পে আহত এ হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের অধিকাংশেরই হাত-পা, পাজর ভাঙা রয়েছে। তাদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাদের মানসিক চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ৭০ বছর বয়সী আহত ধারপানা কাস্তে জানান, তার পরিবারের ৬ জন সদস্য ছিলেন। দু’জন মারা গেছেন। বাকিরা শহরে তাঁবুতে থাকলেও দু’দিন আগে তারা গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। প্রতিদিন ক্ষণে ক্ষণে ভূমিকম্প হওয়ায় বর্তমানে নেপালে পর্যটক প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। কাঠমান্ডু শহরে প্রায় দু’হাজার ছোট-বড় আবাসিক হোটেল মালিকরা এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
বাংলাদেশ সোসাইটি কাঠমান্ডু নেপালের সেক্রেটারি সাদাফ রহমান জানান, ১৪ মে বাংলাদেশের ঢাকার কলাবাগান মাঠে কনসার্ট ফর নেপাল স্টেজ-শো করা হচ্ছে। টিকিট বিক্রি থেকে যে অর্থ আসবে তা নেপালের ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে প্রদান করা হবে।
বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি খান মো. মঈন হোসেন যুগান্তরকে জানান, নেপাল সরকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা উদ্ধারকারী দলগুলোকে ইতিমধ্যে চলে যেতে অনুরোধ করেছে। অনেকেই চলে যাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ৯ টন ত্রিপল ও আড়াই টন মেডিসিন নেপাল আর্মির কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। সকালের দিকে বাংলাদেশ থেকে ২৫টি ট্রাক পৌঁছেছে নেপালে। ৬২৫ টন চাল এসব ট্রাকে করে আসে। আরও ৯ হাজার ৭৫ টন চাল আগামী ১ সপ্তাহের মধ্যে নেপালে আসবে বলেও তিনি জানান।
 

শেষ পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close