¦

এইমাত্র পাওয়া

  • হালনাগাদ ভোটার তালিকার খসড়া প্রকাশ; নতুন ভোটার ৪৩ লাখ ৬৮ হাজার ৪৭ জন
আইএস ত্রাস মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে ইউরোপে

মাসুদ করিম | প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০১৬

জঙ্গি সংগঠন আইএস অভাবনীয় গতিতে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করছে তাদের নেটওয়ার্ক। ২০১৪ সালের জুনে আত্মপ্রকাশকালে সংগঠনটি ইরাক, সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নিজেদের খেলাফত ঘোষণা করেছিল। প্যারিসে সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা এই নেটওয়ার্ক মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে ইউরোপে সম্প্রসারিত হওয়ার বার্তা দিয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে ২০১৫ সালকে আইএসের নেটওয়ার্ক বিস্তৃতির বছর বলা যায়। বিশ্বের প্রায় সব স্থানই এখন আইএস হামলার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। গোটা বিশ্বে সংক্রমিত হয়ে পড়েছে আইএস আতংক।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসের ভিত্তি ঘোষিত হলেও তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হচ্ছে সৌদি আরব, ইয়েমেন, মিসর, লিবিয়া, আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান পর্যন্ত। সেখান থেকে এখন পশ্চিমা লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানার পরিকল্পনা করেছে এই জঙ্গিগোষ্ঠী। মসজিদ, হোটেল, নগরীর ব্যস্ত রাজপথ ও অপরাপর টার্গেটে নির্বিচারে হামলা করছে তারা। সিরিয়া ও ইরাকের বাইরেই এই গোষ্ঠীর ভয়ংকর প্রাণঘাতী হামলায় ২০১৫ সালে প্রায় এক হাজার নিরীহ মানুষ মারা গেছেন।
বিদায়ী বছরে আইএস তিন ধরনের হামলা চালিয়েছে। ইরাক ও সিরিয়ার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে বিবদমান বিভিন্ন গ্রুপের সংঘাতে নিজেরা যুক্ত হয়ে হামলা চালিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় বিভিন্ন জিহাদি সংগঠনকে নিজেদের পক্ষে টেনে তাদের মাধ্যমে হামলা চালানো হয়। তার বাইরে আইএসের প্রতি সহানুভূতিশীল গোষ্ঠীগেিলাকেও হামলায় উদ্বুদ্ধ করা হয়।
২০১৫ সালে আইএসের সবচেয়ে আলোচিত হামলার ঘটনাটি ঘটেছে প্যারিসে ১৩ নভেম্বর। গুলি ও আত্মঘাতী বোমায় চালানো ওই সিরিজ হামলায় ১৩৭ জন নিহত এবং ৩৬৮ জন আহত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই হামলার ঘটনাতেই ফ্রান্সে সবচেয়ে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও ইরাক ও সিরিয়ার বাইরে বিদায়ী বছরে আইএস যতগুলো বড় হামলা করেছে তার মধ্যে আছে জানুয়ারিতে প্যারিসেই শার্লো হেবদো ম্যাগাজিন অফিসে হামলার ঘটনা। ওই ঘটনায় ১২ নিহত ও ১১ জন আহত হয়। গত এপ্রিলে ইয়েমেনে একটি মসজিদে আইএসের বোমা হামলায় মারা যায় ১৩০ জন। আইএসের ওপর রাশিয়ার বিমান হামলা পরিচালনার পর রাশিয়াও তাদের টার্গেটে পরিণত হয়। বছরের শেষ দিকে মিসরে একটি রুশ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ২২৪ জনের মৃত্যু হয়, যে ঘটনার দায় স্বীকার করেছে আইএস।
নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য মতে, ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত আইএস ৫১টি বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। তার মধ্যে ৪০টি হামলা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। ছয়টি হামলা চালানো হয়েছে পশ্চিমা বিশ্বে।
হামলার মধ্যে আরও আছে : গত জানুয়ারিতে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে হামলায় ৮ জন মারা যায়। একই মাসে মিসরের সিনাইয়ে আইএসের সমন্বিত বোমা হামলায় ২৪ সেনা, ৬ পুলিশ ও ১৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়। এ ছাড়া ফেব্র“য়ারিতে একটি তেল খনিতে হামলা চালিয়ে চার বিদেশীসহ ১২ জনকে হত্যা করা হয়। মার্চে তিউনিসিয়ার একটি জাদুঘরে হামলা চালিয়ে ২২ জনকে হত্যা করা হয়, যাদের বেশিরভাগই বিদেশী পর্যটক। একই মাসে ইয়েমেনে একটি শিয়া মসজিদে আÍঘাতী হামলা চালিয়ে ১৩০ জনকে হত্যা করা হয়। এপ্রিলে লিবিয়ায় গাড়ি বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হত্যা করা হয় ১৩ জনকে।
আইএস সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেও হামলা চালিয়েছে। এপ্রিলে মিসরে সামরিক বাহিনীর ওপর পৃথক হামলা চালিয়ে ১২ জনকে হত্যা করে তারা। ওই মাসেই আইএস একটি ভিডিও চিত্র প্রকাশ করে, যেখানে দেখা যায় গ্রুপটি ইয়েমেনের ১৫ জন সরকারি সৈন্যকে হত্যা করেছে। মে মাসে সৌদি আরবে একটি শিয়া মসজিদে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ২১ জনকে হত্যা করা হয়। জুনে ইয়েমেনে এক সিরিজ গাড়ি বোমা হামলায় ৩০ জন নিহত হয়। ওই মাসেই তিউনিসিয়ায় এক হোটেলে একজন বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হয় ৪০ জন। তাদের বেশিরভাগ ব্রিটিশ পর্যটক। জুলাইয়ে তুরস্কের একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে এক তুর্কি নাগরিকের হামলায় ৩২ জন নিহত হয়। আগস্টে সৌদি আরবে পুলিশের ওপর আইএসের হামলায় ১৫ জন নিহত হয়, যাদের মধ্যে ১২ জনই সৌদি পুলিশের সদস্য। সেপ্টেম্বরে আইএসের এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় ইয়েমেনের রাজধানী সানায় ২০ জন নিহত হয়। একই মাসে ঈদুল আজহার নামাজ আদায়কালে পৃথক বোমা হামলায় ২৫ জন নিহত হয়। নভেম্বরে বৈরুতে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয় ৪৩ জন। এসব হল বড় ধরনের হামলার তথ্য।
আইএসের উত্থান খুব বেশি দিনের নয়। এই গোষ্ঠীর মূল নাম হল দায়েস। আরবিতে দায়েস শব্দের অর্থ হল ‘ইসলামিক স্টেট ফর ইরাক অ্যান্ড আল-শামস’ (আইসিস)। আল কায়দা নেতা ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর আল কায়েদার ইরাকের অংশ ভাগ হয়ে যায়। ২০১৪ সালের জুনে বিভক্ত আল-কায়েদার কট্টরপন্থীরা ইরাকের মসুল ও তিকরিত শহরে জর্ডানের বংশোদ্ভূত ইরাকি আল কায়েদা নেতা আবু মুসাব আল জারকাউয়ির নেতৃত্বে সংগঠিত হয়। মার্কিন বিমান হামলায় জারকাউয়ি নিহত হওয়ার পর তার অনুসারীরা দায়েস বা আইসিস গঠন করে। তারা যে খেলাফত গঠন করতে চায় তার নাম দেয়া হয় ‘ইল-দাওলা’ অর্থাৎ দ্য স্টেট-রাষ্ট্র। আইসিসের নেতৃত্ব গ্রহণকারী আবু বকর আল বাগদাদি নিজেকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন। জানা যায়, বাগদাদি দীর্ঘদিন মার্কিন বাহিনীর হাতে বন্দি ছিলেন। মুক্তি পেয়ে তিনি ফের সক্রিয় হন।
ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেন নিহত হওয়ার পর তার বাথ পার্টির অনেক অনুসারী আইসিসে যোগ দিয়েছে। ইরাকে ওই সময়ে সুন্নিরা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। ফলে তাদেরও অনেকে আইসিসে যোগ দেয়। সিরিয়ায় শিয়া-সুন্নি যুদ্ধ শুরু হলে সেখান থেকে অনেক সুন্নি, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরোধীদের অনেকে আইসিসে যোগ দেয়। এভাবে আইসিস তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে। ইরাকে নুরি আল মালিকি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আইসিস সহিংস রূপ ধারণ করে। রাজধানী বাগদাদের পর ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুল দখল করে নেয় তারা। সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় রাকা শহরকে আইসিস তাদের রাজধানী হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। সেখানেই গ্র“পটি তাদের স্টাইলে পুলিশ, বিচার-ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।
আইএসের আয়ের উৎস : আইএস অর্থের জোগান পায় মূলত তাদের দখলে থাকা তেল ক্ষেত্র থেকে। বলা হয়ে থাকে, সিরিয়ায় নিজেদের দখলে থাকা অঞ্চল থেকে এই গোষ্ঠী প্রতিদিন ৪৪ হাজার ব্যারল তেল উত্তোলন করে থাকে। কেবল ইরাকি ভূখণ্ড থেকেই প্রতিদিন চার হাজার ব্যারল তেল উত্তোলন করা হয়। পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই আইএসের কাছ থেকে সরাসরি তেল ক্রয় করে না। তবে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ তেল ঠিকই বিক্রি হয়ে যায়। শুধু তেল বিক্রি করেই আইসিস প্রতিদিন তিন মিলিয়ন ডলার আয় করে থাকে।
তেল বিক্রি ছাড়াও আইএসের আয়ের অন্য উৎসও আছে। এই গোষ্ঠী তাদের দখলে থাকা অঞ্চলে বসবাসরত অমুসলিমদের কাছ থেকে ট্যাক্স হিসেবে মাসে প্রায় আট মিলিয়ন ডলার আয় করে থাকে। এছাড়া মুক্তিপণ হিসেবেও তাদের আয় হয়। আইএস তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় বিদেশী যোদ্ধা সংগ্রহ করে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দরিদ্র অঞ্চল থেকে সংগৃহীত যোদ্ধাদের মাসে ৩৫০ ডলার ভাতা দিয়ে থাকে। অনেককে আবার ধর্মীয় উন্মাদনায় উদ্বুদ্ধ করে এই গ্রুপে টেনে আনা হয়। আইএসের বিদেশী যোদ্ধার সংখ্যা কয়েক হাজার।
শেষ পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close