¦
সুনীল দা মারা যাওয়ার পর লেখার চাপ আরও বেড়ে গেছে

সমরেশ মজুমদার | প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০১৩

বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় লেখক সমরেশ মজুমদারের জন্ম ১৯৪৮ সালে। শৈশব কেটেছে ডুয়াসের চা বাগানে। নিজের লেখায় কৈশোরের সেই চা বাগানের স্মৃতি অম্লান। কলকাতায় আগমন ১৯৬০ সালে। ১৯৬৭ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রথম লেখা প্রকাশ এবং প্রথম উপন্যাস ‘দৌড়’ প্রকাশের সাল ১৯৭৫, তাও ‘দেশ’-এ। লেখালেখির স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮২ সালে পান আনন্দ পুরস্কার। এছাড়া ১৯৮৪ সালে ‘কালবেলা’ উপন্যাসের জন্য পেয়েছেন সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার। সম্প্রতি এই প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক ঢাকায় এসেছিলেন। লেখালেখি এবং বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন ফারুক আহমেদ এবং জুননু রাইন। সেই আলোচনার অংশবিশেষ যুগান্তর সাময়িকী পাঠকদের জন্য পত্রস্থ হল বি.স.
প্রশ্ন : ‘দৌড়’ দিয়ে আপনার লেখালেখির এই যে দৌড় শুরু হল, এতদিন পর এ সময়ে এসে আপনার কি মনে হয়- ভালো লাগা অক্ষুণ্ন আছে? ক্লান্তি কি ভর করেনি?
সমরেশ মজুমদার : লেখালেখি করছি ৪৫ বছর ধরে। ৪৫ বছর তো আর কম সময় নয়। এটা এ রকম একটা ব্যাপার, আপনাকে একটা ঘোড়ার ওপর উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ঘোড়াটা দৌড়াচ্ছে, আপনাকে লাগামটা ধরে রাখতে হবে। আপনি যদি না পারেন, যদি আলস্য এসে যায়, তাহলে আপনি পড়ে যাবেন। বলে না, সিংহের ওপরে ওঠা সহজ, কিন্তু নামা সহজ নয়- এ রকমই একটি অবস্থা। ৪৫ বছরের মধ্যে প্রথম ৫ বছর বাদ দিলে থাকে ৪০ বছর, ওই ৪০ বছর ধরে আমার একটা মান রেখে লিখে যেতে হচ্ছে। সেটা ধরে রাখা অত্যন্ত ক্লান্তিকর। আর লিখতেই ইচ্ছা করে না। সমস্যাটা কোথায়? সুনীল দা মারা যাওয়ার পর লেখার চাপ আরও বেড়ে গেছে। এ চাপ সামলানো কঠিন। এই যে এখানে এসেছি, বলা যায় অনেকটা পালিয়েই এসেছি। এমন যদি বলত, তুমি সারা বছরে একটা লেখা লিখবে। তাহলে আমি খুব খুশি হতাম। কিন্তু আমাকে প্রতিটা পূজা সংখ্যায় লিখতে হয়। আমি না না বলে এক সময় হ্যাঁ বলি। আর একবার হ্যাঁ বলে ফেললে তো আর কথা নেই।
প্রশ্ন. আপনার ‘উত্তরাধিকার-কালবেলা-কালপুরুষ’ ট্রিলজি দারুণ জনপ্রিয়। এই তিন উপন্যাসের মূল উপজীব্য উপমহাদেশের বামধারার রাজনীতি- রাজনীতিকে কেন বেছে নিলেন উপন্যাসের চরিত্রদের পাঠকের সামনে তুলে আনার ক্ষেত্রে?
সমরেশ মজুমদার : না না, দর্শক ছিলাম, আমার কোনো রাজনৈতিক দর্শন ছিল না। আপনারা দেখবেন ‘কালবেলা-কালপুরুষ-উত্তরাধিকার’-এ একজন দর্শকের চোখ দিয়ে রাজনীতি দেখার বিষয়টা আছে। মানে ইনভল্ব হয়ে যে রাজনীতি, সেটা নয়। রজনীতি ম্যানফেস্ট করেনি, আর রাজনীতি ম্যানফেস্ট করলে তা আর সাহিত্য থাকে না। তো তাও ’৮৪ সাল, তার মানে ‘কালবেলা’ থ্রিলজি ধরেছি, ২৮-২৯ বছর হয়ে গেল। তার পরের অংশ কখন লিখব, অনেকে জানতে চাইতেন। আমি বলতাম, লিখব না। এই করতে করতে যখন বামফ্রন্ট সরকার ২৩-২৪ বছর রাজত্ব করার শেষ দুই বছর মানুষের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হল, তাদের অত্যাচারে মানুষ পরিবর্তন চায়। তারপর পরিবর্তন হল। কিন্তু দেখা গেল, কোনো পরিবর্তনই হয়নি। জামা বদল হয়েছে মাত্র। আমি লিখলাম ‘মৌসুমকাল’ নামে একটি উপন্যাস। এখানেও রাজনীতি, তবে সে রাজনীতির শিকার মানুষ। ধরুন, আপনি একটি বাড়ি করতে গেলেন। আপনার বাবার সারা জীবনের সঞ্চিত সবকিছু দিয়ে বাড়ির ভিত শুরু করলেন। দেখলেন, রাজনীতির ছোট দাদা এসে বলছেন, তিনি সব সাপ্লাই দেবেন। দেখলেন, তিনি যে রেট দিয়েছেন, তা বাজার থেকে অনেক বেশি এবং আপনি জানেন সে মালও অনেক খারাপ। আর আপনি যদি সে মাল না নেন, তাহলে সারা জীবনেও বাড়ি করতে পারবেন না। এবার আপনি চলে গেলেন বড়দাদার কাছে। তিনি বলবেন, ওরা আমাদের লোক নয়। আপনি বলবেন, আপনার দলের পতাকা ওদের কাছে। তারপরও ওরা কোনো মতেই স্বীকার করবে না, ওই লোক ওদেরই।
তাদের বোঝাতে পারবেন না। কারণ তারা বুঝতে চাইবে না। এই যে প্যাটার্ন অব রাজনীতির পরিবর্তন। তখন দাদাদের বোঝাতে পারতেন না। এখন বোঝাতে পারছেন, কিন্তু তারা বুঝতে চাইছে না। এই ব্যাপারটা সবখানে। ভোট দেয়ার ক্ষেত্রেও। হয়তো কোনো জায়গায় সরকার পক্ষের ৪ জন আর বিরোধী ৭ জন। ভোটের দিন ওই ৭ জনকে আসতে মানা করা হবে, অথবা ঘরেই আটকে রাখার বন্দোবস্ত করা হবে। এই ব্যাপারটা কিন্তু আগে ছিল না। এসব কারণেই উপন্যাসের নাম ‘মৌসুমকাল’। আমাদের ‘মহাভারত’-এ কৃষ্ণ চরিত্রটি হল ভগবান, তিনি মুখের মধ্যে পুরো পৃথিবীটাকে নিয়ে নিতে পারেন। সেই ‘মহাভারত’-এ বর্ণিত যুদ্ধ শেষে সে যখন নিজের রাজত্বে ফিরে গেলেন, গিয়ে দেখলেন তার ভাই-ব্রাদাররা বিবাদে লিপ্ত। সে থামাতে পারল না, শেষে তার পায়ে তীর বিঁধল। তাও কোনো মতেই পা থেকে ছুটানো গেল না। ফলে এই যন্ত্রণা বহন করে করে মারা গেল, এ পর্বটাকে বলে ‘মৌসুম পর্ব’। সেটা নিয়েই ‘মৌসুমকাল’। মানুষজন মারপিট করে পশ্চিম বাংলায় দুটা ভাগ হয়ে গেছে, একটা সরকার এবং অন্যটা সরকারবিরোধী- ধ্বংস অনিবার্য। এখানে আপনি আওয়ামী লীগ বা বিএনপির বিরুদ্ধে যদি কিছু বলতে চান তাহলে অনেক ঝুঁকি নিয়েই বলতে হবে, ওখানেও তাই। আপনি সরকারের বিরুদ্ধে কথা বললে আপনাকে বলা হবে মাওবাদী। তা আপনি হোন বা হোন। এটাও রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে অরাজনৈতিক উপন্যাস।
প্রশ্ন : কৈশোর একজন লেখকের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। সে সময়ের পারিপার্শ্বিকতা, মানুষ, পাঠ ইত্যাদি একজন লেখককে গড়ে তুলতে সহায়তা করে। আপনার কৈশোর কেমন ছিল?
সমরেশ মজুমদার : এটা ঠিকই বলেছেন, একজন লেখকের জন্য কৈশোর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমারও তাই। আমার লেখায় বারবার উত্তরবঙ্গের চা বাগান উঠে এসেছে, উত্তরবঙ্গের ধন-মান-নদী, মানুষ, গাছপালা ইত্যাদি উঠে এসেছে। সেসবের কথা লিখতে খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, খুব আরাম লাগে। কিন্তু এক জায়গায় তো সারা জীবন আটকে থাকা যায় না। আমি কৈশোরেই কলতাকা চলে এলাম, পড়তে। এখানে এসে মানুষের চেহারা দেখতে লাগলাম, অদ্ভুত অদ্ভুত সব মুখ। তাদের মধ্যে যারা খুব ভালো মানুষ, নিপাট মানুষ- আমাকে সেসব মানুষ আকর্ষণ করেনি। আমার কাছে সেই মানুষটাই কাম্য- যে ভালো-মন্দ মিশিয়ে। যার মন্দের ভাগ বেশি, ভালো কম। আমাকে সেসব মানুষ আকর্ষণ করেছে বেশি।
প্রশ্ন : লেখক মানে একজন স্পর্শকাতর মানুষ। তেমন একজন স্পর্শকাতর মানুষ হিসেবে আপনার জীবন এবং লেখালেখি- এই দুইয়ের মধ্যে কি কোনো যোগসূত্র রয়েছে?
সমরেশ মজুমদার : দেখুন, আমি লেখায় নিজের জীবনকে জড়াতে চাই না। তাহলে লেখা একপেশে হয়ে যাবে। আমি সব সময় চাই- ভালো এবং মন্দের যে সংজ্ঞা, তাতে পার্থক্য খুব বেশি নয়। একটা বিষয়ে হুট করে আমি যে রি-অ্যাক্ট করলাম সেটা মন্দ, আবার সে বিষয়ে আমি কোনো রি-অ্যাক্টই করলাম না, সেটাও মন্দ। তো কোনটা ভালো কোনটা মন্দ, তার উত্তর কী? একজনের কাছে যেটা মন্দ, তা আমার কাছে হয়তো ভালো। আবার সেটাও পাল্টে যায়। আজ থেকে কুড়ি বছর আগে একটা মেয়ে যদি প্রেম করত এবং তার মা-বাবা তা জানতে পারত, তাহলে প্রচণ্ড শব্দ হতো, এমনকি মারধরও করত। আর এখন বাবা মাকে প্রশ্ন করছে- কী তোমার মেয়ের কোনো বয়ফ্রেন্ড নেই? এক সময় আমি ভাবতাম, এই লোকটা ভালো, কারণ সে তার মেয়েকে প্রেম করতে দেয় না। আজকে কী বলব, এই লোকটা ভালো, কারণ সে তার মেয়েকে প্রেম করতে দেয়। ফলে এই সমাজব্যবস্থা পাল্টে যাওয়ায় আমার মনের ওপরও ছাপ পড়ছে। সুতরাং মননের এই ব্যাপারটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টায়।
প্রশ্ন : ভাষাটাই যুক্ত করেছে- এপার থেকে ওপার। তারপরও ভাষার ক্ষেত্রে, সাহিত্যের ক্ষেত্রে দুই বাংলার পার্থক্য কোথায় আর মিলটাই বা কী?
সমরেশ মজুমদার : বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রায় ১৫ বছর অবধি কোনো অমিল ছিল না। আমি লিখিত ভাষার কথা বলছি। তারপর হয়তো একটা সচেতনতা প্রচেষ্টা এলো আমাদের ভাষাটা একটু আলাদা করতে হবে। তাদের ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক- কিছু কিছু আরবি-ফার্সি ভাষা ছিল। কবিতায় থাকলেও তা গদ্যে ছিল না। এই ধরেন, জিম্মা একটি শব্দ। বাংলা একাডেমীর অভিধানে বাংলা শব্দটি কিন্তু নেই। এই যেমন বলা হচ্ছে, বাহ্ খুব মজার রান্না। এই যে একটা খাবার খেয়ে খুব মজা লাগল, এই মজার মানেটা কী? মজা মানে ফান। খেয়ে সুস্বাদু লাগল, আনন্দ লাগল। কিন্তু মজা লাগবে কেন? তো এভাবে একটু একটু করে দূরে চলে যাওয়ার বিষয়টা আছে। বাংলা একাডেমী বা ভাষা নিয়ে কাজ করে যারা, তারা ভাষার একটা মান নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেই মাপকাঠিটা, যদিও ভাষা সব সময় পরিবর্তনশীল। কিন্তু ভাষা এগিয়ে যায়, পিছিয়ে যায় না। তখনই অস্বস্তিটা হয়। এপার বাংলা কিছু কিছু গদ্য পড়লে মনে হয় যে, এখন তারা আরবি-ফার্সিমুখী হচ্ছে। এটা কিন্তু পিছিয়ে যাওয়া। যেমন- আমি এখন স্টেশনে। আগে এমন বলা হতো- আমি এখন এয়ারপোর্ট আছি। এখানে আছি শব্দটা যদি কেটে দিই, তাতে অর্থ বোঝাতে তো কোনো সমস্যা হবে না। এটা বরং আরও জমাট হয়। এগিয়ে যাওয়া মানে কম শব্দ ব্যবহার করে ঠিকঠাক অর্থ বোঝানো। ভাষা এভাবে গতিশীল হলে তা সুখপ্রদ।
 

সাহিত্য সাময়িকী পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close