¦
রবীন্দ্রনাথের গ্রামোন্নয়ন

আহমদ রফিক | প্রকাশ : ০৮ মে ২০১৫

সামাজ গঠন ও চরিত্র সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে মার্কস কৃষি, বয়নশিল্প এবং জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় ভিন্ন পেশায় সংশ্লিষ্ট মানুষের (শিক্ষক থেকে নাপিত পর্যন্ত) সমন্বয়ে গঠিত স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ সমাজের কথা উল্লেখ করেছেন। তার বিচারে এ সহজ-সরল সংগঠনই এশীয় তথা ভারতীয় গ্রামীণ সমাজের অপরিবর্তনীয় (চিরন্তন) চরিত্র তৈরি করেছে। সমাজের এই গঠন বৈশিষ্ট্য ও অর্থনৈতিক চরিত্রের কারণে রাজা ও রাজ্যের উত্থান-পতন ও ভাঙাগড়ার রাজনৈতিক মেঘ-বৃষ্টি-ঝড় একে স্পর্শ করেনি। একই কথা বলেছেন রবীন্দ্রনাথ এ দেশের প্রাচীন গ্রামীণ সমাজ সম্পর্কে।
কিন্তু মার্কস এ অনড় ব্যবস্থা ভেঙে ফেলে তরুণ অগ্রসর সমাজব্যবস্থা গড়ার পক্ষে কথা বলেছেন। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ওই সমাজের মূল আদল ঠিক রেখে একে আধুনিকতায় অর্থাৎ জ্ঞান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে গড়ে তুলতে চেয়েছেন। মার্কস বা রবীন্দ্রনাথ উভয়ের মতে, ব্রিটিশ শাসনের পুঁজিবাদী স্বার্থ নিজ প্রয়োজনে এই গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থার পুরনো কাঠামোটা ধ্বংস করেছে কিন্তু সেখানে নতুন অগ্রসর চেতনার সমাজ গড়ে উঠতে সাহায্য করেনি। তবু মার্কস এ ভাঙাকে স্বাগত জানিয়েছেন সেখানে ভবিষ্যতে নতুন সমাজ গড়ে উঠবে এ আশায়। তবে কোথাও বলেছেন যে, এর ফলে ভারতীর গ্রামীণ সমাজ চরম দুর্দশা ও দারিদ্র্যের সম্মুখীন হয়েছে (British Rule in India, New york Daily tribune, June 25, 1853) অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের বিচারে ‘বিদেশী শাসন এখানেই দেশকে আঘাত করেছে, গ্রামের সামাজিক স্বারাজ নষ্ট করেছে। রোগে-তাপে-দৈন্যে-অজ্ঞানে দেশ রসাতলে গেছে। মানুষের বোধশক্তি এমন অসাড়তায় ছেয়ে গেছে যে দেশ দেশের লোকের কাছে কিছু চাইলেও সাড়া পায় না।’ রবীন্দ্রনাথ পল্লী সমাজের এ জড়ত্ব ও উপার্জনহীন অবস্থার জন্য ব্রিটিশ ‘রাজ’কে দায়ী করেছেন। সার্কসও অবশ্য কৃষি ও কুটিরশিল্প ধ্বংস করার সাম্রজ্যবাদী বর্বরতার উল্লেখ করেছেন, কিন্তু সেই সঙ্গে বর্ণাশ্রমের বৈষম্যদুষ্ট প্রাচীন ব্যবস্থার পশ্চাদমুখী চরিত্রের সমালোচনাও করেছেন। ওই সমাজের আধুনিক চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে ওঠার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। বলেছেন, ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি’ই জনগণের মুক্তির সনদ।
রবীন্দ্রনাথও লক্ষ্য করেছেন ইংরেজ শাসনের শোষণ ও লুণ্ঠন, উল্লেখ করেছেন বিভিন্ন লেখায় বাংলার বস্ত্রশিল্প ধ্বংসের করুণ কাহিনী। সেই মঙ্গে এসেছে গ্রামীণ সমাজ ধ্বংসের কথাও। রবীন্দ্রনাথ এ অবস্থা থেকে দেশের মুক্তি খুঁজেছেন গ্রামভিত্তিক আদর্শ স্বদেশী সমাজ গঠনের মধ্যে। তিনি অতীত, সনাতনী গ্রামীণ সমাজর হুবহু পুনরুজ্জীবন ঘটাতে চান না। বরং চেয়েছেন আধুনিক শিক্ষা ও প্রযুক্তির সহযোগিতায় সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিবর্তন। তবে চাননি রক্তাক্ত বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সামাজিক পরিবর্তন।
রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, তিনি যখন চান ‘গ্রামগুলো আবার আত্মনির্ভরশীল হয়ে বেঁচে উঠুক, তার অর্থ এই নয় যে গ্রাম্যতা ফিরে আসুক।’
একাধিকবার তিনি বলেছেন, কৃষিতে যান্ত্রিক সহায়তার কথা, আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহারের কথা চরকার বদলে যন্ত্র তার কাম্য, তবে যান্ত্রিকতা নয়। এখানেই গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রে গান্ধীর সঙ্গে রবীন্দ্রচিন্তার পার্থক্য। একজন চেয়েছেন নিরুপদ্রব সনাতনী পল্লী সমাজ, অন্যজন চেয়েছেন আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তিনির্ভর স্বশাসিত সমাজ-প্রবণ গ্রামীণ জীবনের নবরূপায়ন। পার্থক্যটা কম নয়।
রবীন্দ্রনাথ উল্লিখিত সমাজ দর্শনের ওপর ভিত্তি করে তার গ্রামোন্নয়ন ও পল্লী পুনর্গঠন পরিকল্পনা বাস্তবের দেখা পেতে চেয়েছে। তার ‘স্বদেশী সমাজ’ সংস্কারধর্মী হলেও অতীতে পুনরুজ্জীবনবাদী নয়। তার বিশ্বাস ছিল; সুস্থ চরিত্রের স্বনির্ভর স্বদেশী সামাজ গঠনের মধ্য দিয়ে প্রকৃত স্বরাজ্যের পথ প্রশস্ত হবে। তার ভাষায় ‘স্বরাজ আগে আসবে, স্বদেশের সাধনা তার পরে’ রবীন্দ্রনাথের আকাক্সিক্ষত আদর্শ স্বদেশী সমাজ অনেকটা পরস্পর-নির্ভর বড় পরিবারের মতো, পরস্পর বিচ্ছিন্ন আধুনিক নাগরিক সমাজের মতো নয়। গ্রামোন্নয়ন প্রসঙ্গে এ ধরনের আদর্শ গ্রামীণ সমাজ গড়ে তোলার প্রয়োজন ও গুরুত্ব তার লেখা ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধে প্রতিফলিত হয়েছে (১৯০৪)। এক কথায় রবীন্দ্রনাথের পল্লী উন্নয়ন ভাবনায় মূল বিষয় ছিল কৃষিতে ও অন্যান্য গ্রামীণ পেশায় আধুনিকতার পত্তন, গ্রামে গ্রামে ছোট ছোট কুটিরশিল্পের বিকাশ ঘটানো এবং সমবায়ভিত্তিক কার্যক্রমের মাধ্যমে আÍশক্তিতে বিশ্বাসী, আÍনির্ভরশীল মানুষ ও স্বনির্ভর অর্থনীতির সমাজ গঠন। এজন্য প্রয়োজন ছিল রাজনৈতিক শক্তির সহায়তা ও সংশ্লিষ্টতা। কিন্তু দেশে সব স্বার্থ-প্রধান জাতীয়তাবাদী রাজনীতি রবীন্দ্রনাথের গ্রামোন্নয়ন পরিকল্পনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠেনি; সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। তাদের ধারণা ছিল এসব নিছকই কবি-কল্পনা।
রবীন্দ্রনাথের সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তাদের পারিবারিক জমিদারি, বিশেষ করে নিজস্ব জমিদার কালিগ্রাম পরগণায় ছোটখাটো ‘মডেল’ হিসেবে পরীক্ষাভিত্তিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সুচনা করেন। তার এই পরিকল্পনা সফল করে তুলতে কিছুসংখ্যক আদর্শবাদী তরুণ এগিয়ে এসেছিল। কিন্তু প্রশাসনিক চাপ, পুলিশ তৎপরতায় ওদের কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। অবস্থাদৃষ্টে রবীন্দ্রনাথ বিস্ময় বোধ করে, কিন্তু তাই বলে হাল ছেড়ে দেয়ার মতো লোক তিনি ছিলেন না। তাই কালিগ্রাম পরগণায় শেষ পর্যন্ত একটি উন্নয়নের ‘মডেল’ ছোট আকারে বাস্তবায়িত করতে পেরেছেন তিনি। নানা কারণে অবশেষে পতিসর থেকে শ্রীনিকেতন তার পরিকল্পনার পরীক্ষাগার হয়ে ওঠে। তাতে বেশ কিছু পরিবর্তনও ঘটে সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে।
রবীন্দ্রনাথের গ্রামোন্নয়ন ‘মডেল’-এর মূল কথা ছিল সমবায় নীতির যথাযথ ব্যবহার- কথাটা এ পর্যন্ত বহুবার বিভিন্ন প্রসঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে। তবু বলতে হয় এ কারণে যে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন সামাজিক জীবনে, ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমবায়ী আদর্শের ঐক্যবোধ-পারস্পরিক মিলন শুধু স্বার্থনির্ভর নয়, মানবিক চেতনা-নির্ভরও বটে। আর এ মিলনের মধ্য দিয়ে একাধারে অর্থ-সামাজিক ও মানসিক সাফল্য ধরা দেবে।
গ্রন্থনা : মুসাররাত নওশাবা
 

সাহিত্য সাময়িকী পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close