¦
পেইন্টিংয়ে দেখার ভিতরে না দেখার আর্তি

জুননু রাইন | প্রকাশ : ০৮ মে ২০১৫

জুননু রাইন : শিকাগো ইউনিভার্সিটির সুধীজন মহলে আপনার ‘ক্রিমসন রেড’ বইটি প্রশংসিত হয়েছে, আমার জানা মতে এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো শিল্পীর শিল্প বিষয়ক গ্রন্থ বিদেশী নামকরা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় উন্মোচিত হয়েছে। এই প্রাপ্তিকে আপনি কীভাবে ব্যখ্যা করবেন?
রফি হক : সৃষ্টিকাজের প্রাপ্তি বা মূল্যায়নের যে আনন্দ তার কোনো তুলনা হয় না। পুরস্কার, প্রশংসা, মূল্যায়ন- এসব অনেকটা অক্সিজেনের মতো। নতুন করে কাজ করার একটা উদ্যম তৈরি হয়। সৃষ্টিকাজের ভিতরে আরও কিছুদিন বিশুদ্ধ শ্বাস নেয়ার আনন্দটি অনুভব করলে বহুদিন বাঁচতে ইচ্ছে করে। অনেক অনেক কাজ করতে ইচ্ছে করে।
‘ক্রিমসন রেড’ আমার ছবি ও কবিতার বই। আমি ওগুলোকে ঠিক কবিতা বলি না। আমার অনুভবগুলোকে শিল্প-ভাষায় প্রকাশ করতে চেষ্টা করেছি। কবিতা ও ছবির পরস্পরের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। প্রকৃতি, জীবন ও সময়কে অবলম্বন করে একটা অভিজ্ঞতা বা ভ্রমণের মধ্যে দিয়ে পেইন্টিংয়ের জন্ম হয়। আমার কাছে মনে হয়- কবিতাও তাই। দুই মাধ্যমেই একটা স্নায়ুবিক অনুকম্পন থাকে। সেই অনুকম্পনের ভিতরে শব্দমালা যেমন থাকে- তেমনি রঙ রেখার মূর্ছনার ইঙ্গিতও থাকে।
বাংলাদেশের শিল্পকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরও পরিচিত এবং গ্রহণযোগ্য করে তুলতে বইটি কোন কোন দিক থেকে কাজ করতে পারে?
: ‘ক্রিমসন রেড’ একটি বাংলাদেশী শিল্পীর ছবির ও কবিতার বই, সামান্য এই তথ্যটি হতে পারে অসামান্য একটি বার্তা। এর সূত্র ধরে এরপর যারা আগ্রহী হবেন বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে, তারা ঠিকই খুঁজে বের করে নিবেন তাদের কাক্সিক্ষত বিষয় ও তথ্য।
বইটিতে দেখা যাচ্ছে প্রত্যেকটি পেইন্টিংয়ের পাশে চমৎকার চমৎকার কবিতা রয়েছে। কবিতাগুলো পড়লে মনে হয়, পেইন্টিংগুলো কবিতার দৃশ্যমান রূপ। আবার পেইন্টিংগুলো দেখলে মনে হয়- পেইন্টিংসের আক্ষরিক বিশ্লেষণের প্রয়াস। আপনি মূলতই শিল্পী তার পরও প্রশ্ন জাগে, কবিতার জন্য পেইন্টিং না পেইন্টিংয়ের জন্য কবিতা?
: সৃষ্টিকাজের দুটি স্বতন্ত্র ধারা, প্রকাশভঙ্গি আর মাধ্যমে আলাদা হয়েও কবিতা ও পেইন্টিং যেন এক শব্দ ও বর্ণহীন মূর্ছনায় নিয়ে যায়।
পেইন্টিংয়ে যেমন দেখার ভিতরে না দেখার একটা আর্তি লুকিয়ে থাকে, যে আর্তি ও অদৃশ্যকে দেখায় দৃশ্যের কাছে। দেখা না দেখার কাছে মৌন হতে হয়। কবিতাও তাই। কবির শব্দমালা এক-তৃতীয় বা চতুর্থ অর্থের কাছে পৌঁছে দেয়। অন্তরঙ্গ পাঠক নির্বাক বোধে আচ্ছন্ন হন।
আধুনিকতার শর্তে বাংলাদেশের শিল্পকলার অবস্থান কোন পর্যায়ে?
: বাংলাদেশের শিল্পকলা অসাধারণ একটা অবস্থানে আছে, কিন্তু সেটা নিজেদের অনুভবের মধ্যে, নিজেদের পরিমণ্ডলে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে খুব যুক্ত নয় বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলা। তবুও সমকালের তরুণ শিল্পীরা গ্লোবাল কনটেমপোরারী আর্টের সঙ্গে নিজ উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছে। নতুন নতুন শিল্পভাবনা নিয়ে সৃষ্টি উন্মাদনায় তরুণেরা মগ্ন। তরুণ শিল্পীদের এই মগ্নতা আমাকে স্পর্শ করে, ভালো লাগে। তবে একটি কথা হল এই যে, সমকালীন বিশ্ব শিল্পভাবনার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে না পারলে, সমকালীন শিল্পকলা ধারাটির সঙ্গে নিজেকে আপডেটেড করে রাখতে না পারলে এই সময়ে আর্ট নিয়ে সারভাইভ করা অর্থহীন। কারণ কারিগরি দক্ষতাটা সব নয়।
একটা সময় ছিল যখন পেইন্টিং বা শিল্পকর্মকে কেবল দৃষ্টিনন্দনের বার্তাবাহক হিসেবে গণ্য করা হতো। সেইটি ছিল কেবলই দেয়ালে ঝুলানোর একটা অভিপ্রায়। সোফা বা জানালার পর্দার সঙ্গে কালার ম্যাচ করে পেইন্টিং দিয়ে ঘর সাজানোর একটা ছেলেমানুষি আভিজাত্য। এখন শিল্পের ভাষা বদলেছে, আগের রোমান্টিক দর্শনের জায়গা থেকে শিল্পীর অভিব্যক্তি বা প্রকাশভঙ্গীমার অনুষঙ্গগুলোর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। সেখানে নতুনতর আদর্শ, নতুনতর আঙ্গিক সৃষ্টি হচ্ছে। শিল্পকলার পুরনো সংজ্ঞা আমূলে বদলে গেছে। সমকালীন শিল্পকর্মের জগৎটা এখন পুরোটাই বুদ্ধিবৃত্তির জগৎ। যেখানে শিল্পী এবং শিল্পকর্ম- কোনোটাই দাসত্বের বোঝা বহন করে না আর।
আধুনিকতা আর নিজস্বতার প্রশ্নে আমাদের অর্জন এবং বিসর্জনের পরিমাপটি আপনার দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করবেন?
: একটা কথা কি এ দেশে আধুনিক শিল্পভাবনার শুরু হয়েছিল ইংরেজদের এখানে রাজত্ব করার সুবাদে। উপনিবেশিক শাসনের ফলেই ঐতিহ্যবাহী নিজস্ব শিল্প সৃষ্টিতে যেমন বাধা পড়ে,- তেমনি ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক কারণে, নানা সামাজিক প্রয়োজনে পশ্চিমা শিল্প আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে শুরু থেকেই। এ থেকে এখনও পর্যন্ত বের হতে পারিনি।
পশ্চিমা শিল্পকলার একটি ক্রমোন্নতির ইতিহাস আছে। প্রি-রেনেসাঁ থেকে আধুনিক বলেন বা উত্তর আধুনিক বলেন বা একেবারে এখনকার কনটেমপোরারি নিউ আর্ট বলেন- এ সবের একটা ধারাবাহিকতা আছে পশ্চিমে। আমাদের ওই ব্যাপারটি নেই। আমরা নিজেরা দ্বিধান্বিত। আমাদের মৌলিকতা নিয়ে কোনো সংশয় নেই, কিন্তু আবার ধারাবাহিকতাও নেই। আমাদের মাস্টার পেইন্টার কামরুল হাসান, রশীদ চৌধুরী, নিসার হোসেন এবং মেধাবী শিল্পী শিশির ভট্টচার্য ছাড়া কারো কাজের ভিতর এই ভাবনাটি নেই।
অর্জন না থাকলে বিসর্জনের প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলা বেমানন ঠেকে বৈকি...!!
বাংলাদেশে শিল্পচর্চার কী কী অন্তরায় এখনও আছে এবং এর থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?
: শিল্পচর্চা এমন এক বিষয়- যা ধরে-বেঁধে হয় না। আমি তো মনে করি বাংলাদেশে শিল্পচর্চা ক্ষেত্রের পরিসরটি অনেক উন্নত দেশের চেয়ে ব্যাপক। এখানে প্রতিসপ্তাহে নতুন নতুন তরুণ আর তরুণতর শিল্পীদের একাধিক প্রদর্শনীর আয়োজন হচ্ছে। তরুণেরা কারো অপেক্ষায় থাকে না। শিল্পচর্চার কথিত অন্তরাগুলোকেও বাঁধা হিসেবে দেখে না তরুণেরা। তরুণদের ধর্মই হচ্ছে ছাঁচে গড়া নিয়মটাকে উল্টে দেয়া। তা তারা করতে পারছেন এখন। কিন্তু আমাদের তরুণকালে এটা ভাবতে পারতাম না।
মূল কথা এখানে শিল্পকলার বড়, অনেক বড়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। যা দেশের অর্থনীতির উন্নয়নের সূচকের ওপর নির্ভর করে। অর্থনীতি চাঙ্গা হলে শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রটিও প্রসারিত হবে বলে বিশ্বাস করি। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন যোগ্য মেধাবী শিল্পসমালোচকের। আর্ট কিউরেটিং নেই এখানে। এই জায়গাটি একদম ফাঁকা। মেধাবী চৌকস আর্টক্রিটিক, আর্ট-কিউরেটর ছাড়া গ্লোবাল আর্ট ওয়ার্ল্ডে পদচারণা অবিশ্বাস্য ব্যাপার। সেটাই আমাদের একমাত্র অন্তরায়...
আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের শিল্পকলাকে কোন পর্যায়ে দেখতে চান?
: বিশ্বের বড় বড় মিউজিয়ামে বাংলদেশের শিল্পীদের শিল্পকর্মের প্রদর্শন ও সে সব মিউজিয়ামে বাংলদেশের শিল্পীদের শিল্পকর্মের স্থায়ী সংগ্রহ দেখতে চাই।
শিল্পী রফি হকের জন্ম কুষ্টিয়াতে ১৯৬৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। ১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে সর্বোচ্চ কৃতিত্বে এমএফএ ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রিন্টমেকিংয়ে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি নানা সময়ে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল : ২০০৩ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত Fifth World triennale of Print থেকে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার; ২০০০ সালে প্রথম কোনো বাংলাদেশী শিল্পী হিসেবে জাপানের ফুকুওকা এশিয়ান আর্ট মিউজিয়ামের Artist in Residence-এর সম্মান পান।
শিল্পী রফি হক একক ও দলীয় প্রদর্শনী করেছেন বাংলদেশ, ভারত, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, আমেরিকা, জাপান, চীন, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া, মালয়েশিয়া, মেসেডোনিয়া, আর্জেন্টিনা, পোল্যান্ড, রুমানিয়া এবং মিশরে।
রফি হক গত বছরে দ্য ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো’তে ভিজিটিং স্কলার, আর্টিস্ট হিসেবে আমন্ত্রিত হন। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে রফির প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত হয় ছবি ও কবিতার বই ‘ক্রিমসন রেড’। বি.স.
 

সাহিত্য সাময়িকী পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close