¦
সাপ নিয়ে খেলা

নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর | প্রকাশ : ০৮ মে ২০১৫

সাপের ঝাঁপি নিয়ে সাপুড়ে আমাদের গাঁয়ে আসে। আমরা দেখি, তার মাথায় লাল পাগড়ি, চোখ লাল জবার ফুল, কাঁধে ঝাঁপি আর হাতে বীণ। সে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায় আর হাঁকে, ‘সাপের খেলা কে কে দেখবি- আয়।’
সাপখেলা দেখতেও তো পয়সা লাগে। পকেটে পয়সা থাকবে কি, আসলে তো আমাদের পকেটই নেই। আমরা গাঁয়ের লোক, পকেটওয়ালা কোর্তাও কোথায় পাব? তবু সাপের খেলা দেখার সাধ আমাদের মনেও জাগে। আমরা তাই সাপুড়ের পিছে পিছে হাঁটি। তার পিছে হাঁটতে হাঁটতে আমরা মোড়ল বাড়ির সীমানায় পৌঁছে যাই। মোড়লের ছেলেরা সাপুড়েকে ওদের বাড়ি ডেকে নিয়ে গেলে আমরা চৌহদ্দির বাইরে দাঁড়িয়ে সাপের খেলা আর মোড়লের ছেলেদের উল্লাস দেখে দেখে আনন্দ পাই।
একদিন আবডালে দাঁড়িয়ে দেখি, সাপুড়ে মোড়লবাড়ির ছেলেদের সাপ নিয়ে খেলাও শেখায়। মোড়লের ছেলেরা আমাদের ডাকে, বলে, ‘তবে বিনা পয়সায় সাপখেলা শিখবি- আয়।’ প্রবীণ ব্যক্তির কথা আমাদের মনে পড়ে, ‘সাপ নিয়ে খেলা ভয়ঙ্কর। কখনও কখনও চরমমূল্য দিতে হয়।’
আরেক দিন দেখি, সাপুড়ে শূন্যহাতে ফিরে যায়। আমরা জিজ্ঞেস করি, ‘সাপুড়ে, তোমার সাপের ঝাঁপি আর বীণ কই?’ সে বলে, ‘মোড়লদের ছেলেরা রেখে দিয়েছে।’ আমরা অবাক হই এবং জানতে চাই, ‘ওসব নিয়ে কী করবে মোড়লের বেটারা?’ সাপুড়ে বলে, ‘বিষধর সাপ নিয়ে কী করে খেলতে হয়, ইত্যবসরে ওরা বেশ ভালো করে শিখে নিয়েছে।’ আমরা বলি, ‘তাহলে আমাদের আর সাপের খেলা দেখা হবে না!’ সাপুড়ে ম্লান হাসে। চলে যেতে যেতে বলে, ‘এতদিন যা দেখেছ, সে তো ছিল বিষদাঁতহীন সাপের খেলা। এবার দেখবে আসল সাপখেলা।’
আমরা সঙ্গত কারণেই সাপুড়ে আর সাপখেলার কথা ভুলে যাই। কিন্তু অচিরেই আমরা সাপের উপদ্রবের কথা শুনতে পাই। তার পর সর্পদংশনের খবরও পাড়ায় পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে। তখন মোড়ল বলেন, ‘সাপুড়ে ডাক। সে এসে সাপ ধরে নিয়ে যাক।’
সাপুড়ে ফের গ্রামে আসে। সাপের উপদ্রব থেকে রক্ষা পাব, এই ভেবে নয়, আবার সাপের খেলা দেখতে পারব ভেবে আমরা যারপরনাই খুশি হই। আমরা দেখি, সাপুড়ে গ্রামের আনাচে-কানাচে সাপ খুঁজে বেড়ায়। পথে-ঘাটে-মাঠে আবার বীণ বাজে; কিন্তু এখন আর সাপ নয়, বীণের সুরে সুরে সাপুড়েই কেবল নাচে। কারণ, পুরো গ্রাম তন্ন তন্ন করেও তবু সাপের লেজ কিংবা সাপের কোনো খোলসেরও দেখা মেলে না। অবশেষে সাপুড়েও অবাক হয়ে বলে, ‘আমার বীণ সাপ বের করে আনতে পারে না, এ জীবনে এমন ঘটনা আর ঘটেনি।’ তখন মোড়ল বাড়ির ছেলেরা মুখ টিপে হাসে। তারা বলে, ‘বুঝেছো সাপুড়ে, তোমার খেল শেষ।’ বিষণ্ণ বদনে ফিরে যাওয়ার আগে সাপুড়ে বলে যায়, ‘তোমরা যখন সাপ নিয়ে খেলতে শুরু করেছিলে তখনই জেনেছিলাম আমার খেলা শেষ।’ মোড়ল বাড়ির ছেলেরা তার কথায় আবারও মিটি মিটি হাসে।
যদিও আমরা গুরুশিষ্যের কথার মর্মার্থ বুঝতে পারি না তবু ভাবি, এত সাপ কোথা থেকে আসে। তখন গ্রামের প্রবীণ লোকেরা এরকম স্মৃতিচারণ করেন, ‘নয়া বসতি গড়বার কালে হিংস পশুর সঙ্গে আমাদের লড়তে হয়েছিল। অনেক সাহসী সন্তান তখন হিংস পশু তাড়াতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছে। কেবল হিংস পশু নয়, জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসত সাপ। আমাদের সাপও মারতে হয়েছে। তার পরেও দু’একটি সাপের বাচ্চা কচুর লতার মতো চোখের সামনে দিয়েই সরে যেতে দেখেছি। আন্দাজ করি, এগুলো কোথাও না কোথাও চোখের আড়ালে লুকিয়ে বেঁচে গিয়ে থাকবে। তা না হলে এতদিন পর গ্রামে সাপ আসবে কোথা হতে? এছাড়া আশপাশের কোনো কোনো গ্রামে তো সাপের উপদ্রবের কথা শোনা যায়। ওখানকার সাপ তো আর মোড়লের অনুমতি নিয়ে এ গাঁয়ে আসবে না।’
প্রবীণ ব্যক্তিরা আমাদের সতর্ক করে দেন, ‘নিজেদের বিপদ নিজেদেরই মোকাবেলা করতে হবে। অতীতে পাহাড়ের ওপার থেকে পঙ্গপাল এসে হামলে পড়লে এ গাঁয়ের জোয়ানরাই মোকাবেলা করেছিল। আমাদের তো বয়স হয়ে গেছে, চোখেও কম দেখি। আমাদের কাল শেষ, এটা তোমাদেরই কাল। তাই তোমাদের বলি, তোমরা চোখকান খোলা রাখ, যদি বিষধর সাপ কোথাও দেখ, সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তা না করলে আরও খেসারত দিতে হবে।’ আমরা বলি, ‘বিষধর সাপ আমরা চিনব কী করে? আপনারা তো কখনও সাপের উৎপাত সম্পর্কে আমাদের বলেননি।’ প্রবীণ ব্যক্তিরা পরস্পরের মুখের দিকে তাকান। আর প্রবীণতম ব্যক্তি বলেন, ‘সাপের বিষয়ে আমরা আসলে ভুলে গিয়েছিলাম। ক্ষুদ্র সাপের বাচ্চা যে বড় হয়ে একসময় ফণা তুলবে, আমরা সে কথা সময়মতো ভাবিনি।’
তারপরও সাপের ছোবলে মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। আমরা এখন সব সময় সর্পাতঙ্কে কাটাই; কাউকে না কাউকে প্রতিদিনই সর্পদংশনের খবর পাই।
 

সাহিত্য সাময়িকী পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close