¦
ময়ুখ চৌধুরীর বেড়ে ওঠা

মুশফিক হোসাইন | প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০১৫

চট্টগ্রাম তার নামের সঙ্গে স্থায়ীভাবে গ্রাম শব্দটি ধারণ করলেও এখানার প্রকৃতি, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি গ্রাম্য নয়। তবে গ্রামীণ অলংকার নিয়ে বন্দর নগরীর কসমোপলিটান আবহের সঙ্গে মিলে-মিশে আছে। এই মেলবন্ধনের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যে তিনি বেড়ে ওঠেন। যা আমরা তার কবিতায় প্রত্যক্ষ করে থাকি। বিশ শতাব্দীর ষাটের দশকে অন্য বাঙালি তরুণদের মতো তিনি কবিতা চর্চা শুরু করেন। সে সময় চট্টগ্রামে যারা কবিতা চর্চা করেন, তারা হচ্ছেন- মেজবা খান, মোস্তফা ইকবাল, আলতাফ মাহমুদ ও আবুল মোমেন। তার কিঞ্চিত পরে ময়ুখ চৌধুরী, স্বপন দত্ত, সুনীল নাথ এবং আরও কেউ কেউ। ষাটের শুরুতে লেখা শুরু করলেও তার প্রথম কবিতা ছাপা হয় ১৯৬৫ সালে। নিজেকে গড়তে গড়তে ১৯৬৮ সালে সম্পাদনা করেন ছোট কাগজ ‘প্রতীতি’। যার প্রচ্ছদ শিল্পীও তিনি নিজে। এর মাঝে দেশজুড়ে শুরু হয় (১৯৬৯) ঊনসত্তরের গণআন্দোলন। চট্টগ্রাম শহরের কবি ও সংস্কৃতিসেবীরা তাকে ঘিরে বেড়ে উঠতে থাকে। তার আবাসস্থল দক্ষিণ নালাপাড়ায় তখন কবি ও সংস্কৃতিসেবিদের কেন্দ্র। তিনি ছিলেন কবিতাকর্মী ও নির্মাতা। সব বয়সের কবিরা তাকে ঘিরে কবিতা চর্চা অব্যাহত রাখেন। তিনি বয়সে নবীন ও প্রবীণদের কবিতা সংশোধন পরিমার্জন করে প্রয়োজনীয় সৎ পরামর্শ দিতে কুণ্ঠা করতেন না। প্রাবন্ধিক সুখময় চক্রবর্তীসহ অনেকেই এই ঋণের কথা অকপটে স্বীকার করে গেছেন। আবার ময়ুখ কখনও অন্য কবিদের কবিতা ছাড়া নিজের কবিতা একা ছাপতেন না। ছোট কাগজ সম্পাদকরা তার কাছে গেলেই পেয়ে যেতেন একগুচ্ছ কবিতা। ময়ুখ চৌধুরী কবিতার উৎকর্ষ সাধনে তৎপর ছিলেন। তাই অপেক্ষাকৃত নবীন ও তরুণদের নিয়ে তিনি এগিয়ে যান। ১৯৭০ সালে ‘কবিতা’ নামে একটি কবিতাপত্র প্রকাশ করেন। তার ধারাবাহিকতায় ‘অসভ্য শব্দ’ নামে যৌথ কাব্য সংকলন প্রকাশ করেন ১৯৭৩ সালে। অথচ গ্রন্থাকারে নিজের গ্রন্থ প্রকাশ না করে বরঞ্চ সতীর্থ কবিদের কবিতা নিয়ে ‘অসভ্য শব্দ’ গ্রন্থটি প্রকাশ করেন। তার সাহচর্য ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতা না পেলে চট্টগ্রামের অনেক কবিই কবি হয়ে উঠত না।
স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে ছোট কাগজের ঢল নামে। সেই প্লাবনের বাইরে নয় চট্টগ্রাম। ময়ুখ চৌধুরী সে ঢলের স্রোতে ভেসে না গিয়ে বাংলা সাহিত্য অধ্যয়নে গভীর মনোনিবেশ করেন। নিয়মিত কবিতা চর্চাই ছিল তার ধ্যান, আরাধনা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭৮-৮৩) গবেষণায় নিমগ্ন থাকেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘শামসুর রাহমান’ এক আধুনিক কবি (গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল) পরবর্তীতে রবীন্দ্র কাব্য বিষয়ে পিএইচডি করেন (গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক : ড. অমিত কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়)। ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত হয় ‘উনিশ শতকের নবচেতনা ও বাংলা কাব্যের গতি প্রকৃতি’ এ গ্রন্থে তিনি তার গদ্যের পাণ্ডিত্য ও কারিশমা উজাড় করে দেন।
ময়ুখ চৌধুরী অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে কাব্য রচনা করেই চলেছেন। অথচ কবি হিসেবে তখন তিনি খ্যাতির শীর্ষে। কবিতা নির্মাণের আন্দোলনে নেতৃত্বের ঝাণ্ডা হাতে অপরিসীম শ্রম ও মেধায় নিয়োজিত। অথচ হালের কবিরা একুশ এলেই শোলমাছের পোনার মতো গ্রন্থ প্রকাশে অস্থির হয়ে ওঠে। সে ক্ষেত্রে তিনি ব্যতিক্রম। গ্রন্থ প্রকাশে তার আগ্রহ অনেকটা নির্লিপ্ততার পর্যায়ে পড়ে। অথবা প্রকাশকরা তার প্রতি যোগ্য সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তার লেখালেখির ২৪ বছর পর ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্য গ্রন্থ ‘কালো বরফের প্রতিবেশী’ তারও ১০ বছর পর ১৯৯৯ সালে প্রকাশ করেন ‘অর্ধেক রয়েছি জলে অর্ধেক জালে’। জীবনের জালে আটকে পড়া মৎস্য কুমার ধরা দেন। ছড়িয়ে দেন কবিতার স্নিগ্ধতা ও সৌরভ। প্রকৃতি ও ঐতিহ্য চেতনায় ভরা। এসেছে তার স্মৃতির যুগী চাঁদ মসজিদ পুকুর, পাহাড় দীঘি। নদীর বর্ণনা। বাংলা কাব্যের ঐতিহ্য চেতনায় অনেকগুলা কবিতা এ গ্রন্থে পাওয়া যাবে। উদাহরণ : ‘জাইল্যানি রে জাইল্যানি,/ভিন গেরামের ভরা গাঙে জাল মাইরা মাছ পাইলা নি?/ মাছ যদি নয়, ঘাই দিলো কে- পুরাণ ইতিহাস?/ একটা মাছের ল্যাইগা কবি চণ্ডিদাস/ শ্যাওলাপড়া পিছল ঘাটে বরষমাস/ছিপ ফেইলা ধ্যান করেছিল,/ ঐপারে এক ধোপার বেটি নীলাম্বরী কাচছিল’। (চণ্ডিদাস-রজকিনী : প্রতিশোধ পর্ব-অর্ধেক রয়েছি জলে অর্ধেক জালে)
কবিতার সাধনা ও ধৈর্য নিয়ে যখন বেড়ে উঠছেন, ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘কবিতার কাগজ’। কবির ৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে চট্টগ্রামে সাহিত্যাঙ্গনের তরুণরা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত সাহিত্যপত্রটি তাকে উৎসর্গ করেন। কবিতা নির্মাণের কারিগরকে তারা শ্রদ্ধা জানান সেদিন। কিন্তু কবি ময়ুখ চৌধুরী নিভৃতে থাকতে বেশি ভালোবাসেন। অসামাজিক বলে একটি বদনাম তিনি বয়ে বেড়ালেও আড্ডা তার জীবনের অতিপ্রিয় অনুষঙ্গ। সাহিত্য, ক্রীড়া, সিনেমা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, মহাকাশ, জীবজগৎ কোনো প্রসঙ্গ বাদ যায় না। সেসব আড্ডার তিনি মধ্যমণি। অনর্গল বলে যেতে পারেন, কৌতুক মেশানো ভঙ্গি রসাত্মক উচ্চারণে। এরি ফাঁকে কারও অপেক্ষায় থাকেন? ‘তোমার জানালায় আমি জেগে আছি চন্দ্র মল্লিকা।’ প্রেম ও আবেগের উদ্ভূত মেলবন্ধন এ গ্রন্থের পাতায় পাতায়। বিদগ্ধ পাঠক লুফে তার এই গ্রন্থ। উদাহরণ : ‘আয়রে আমার উলুত পুলুত খেলা।/ ডাক দিয়ে যায় প্রত্নবালক বেলা/ঘুম ভেঙে যায়- পৌঢ় বিছানাতে/ স্বপ্ন বালিশ ছিঁড়ে উড়ছে তুলা’/ (আয়রে আমার কনকচাঁপা- তোমার জানালায়... চন্দ্র মল্লিকা) কিংবা ‘গোলাপ গোলাপ বলে এতো রাতে কে চিৎকার করে,/ সে চিৎকারে আকাশের তারারা জোনাকী হয়ে ঝরে। অনিদ্রার বুক জুড়ে গোলাপের কাঁটার আঘ্রাণ’। (গোলাপ গোলাপ, তোমার জানালায়- চন্দ্র মল্লিকা)
রোমান্টিক জগতের রেশ কাটতে না কাটতেই তিনি চলে যান পরাবাস্তবতার মায়াবী জগতে। প্রকাশিত হয় ‘প্যারিসের নীলরুটি’ ২০০১ সালে। এ প্রসঙ্গে বলা ভালো শিল্প বিপ্লব মানব ইতিহাসের পটভূমি বদলে দিয়েছে। ফলে শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠা নগরায়ণ এবং সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যে বস্তু ও বাস্তব মানসিকতা প্রসার লাভ করে।
অন্যদিকে প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বিশ্বায়নের হাওয়ায় উড়তে থাকে মানব বসতি। এমনকি আমাদের অজ পাড়া-গাঁয়েও তার ছোঁয়া লাগতে থাকে। এই সুবাতাস শুধু সাধারণ মানুষ নয়, সাতিহ্য ও সংস্কৃতি কর্মীদের মনে স্থান নেয়। আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মসচেতনতার হাত ধরে এগিয়ে যেতে থাকে সমাজ চেতনা ও যুগ চেতনা। বাস্তবতা আর অবাস্তবতা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়। সেই প্রেক্ষাপটে ময়ুখের ‘প্যারিসের নীলরুটি’। উদাহরণত ‘আমার এমন কিছু কথা আছে,/ যা আমি নিজেকেও বলি না।/ ভয় হয়,/ যদি মুখ ফসকে বলে দেই কখনো।’ (প্যা.নীলরুটি কথাটা) কিংবা দু’তীরে কুমারী মাটি, মাঝখানে আগুন্তক নদী;/ দু’পাশে দুইটি পাখা, একই বুকে আমি তাকে বাঁধি।’ (একটি নিষ্পাপ দৃশ্য, প্যারিসের নীলরুটি)
অতঃপর তিনি তার মুগ্ধ পাঠকদের জানিয়ে দেন, তার বিলম্বের কথা। তিনি তার গন্তব্যে পৌঁছাতে আরও সময় নিতে চান। ‘আমার আসতে একটু দেরি হতে পারে’- ২০০২-এ প্রকাশিত গ্রন্থ। কবি ময়ুখ চৌধুরীর হয়তো একটু দেরি হতে পারে। কিন্তু ময়ুখ চৌধুরীর কবিতা যে প্রকৃত পাঠকের কাছে পৌঁছুতে দেরি করেনি, একথা অনেক বেশি সত্য। দেরিতে হলেও কবি নিরন্তর কবিতা লিখে যাচ্ছেন। অপেক্ষা করছেন সত্য ও সুন্দরের। উদাহরণত, ‘কবিতার বাড়ি বহুদূর।/ আমি তার বাড়ি যাচ্ছি বুক ঘষে-ঘষে,/ আমি পথ পাড়ি দিচ্ছি কবিতার;/কবিতা অনেক দূরে থাকে। তার/বাড়িতে যাবার পথ বড় আঁকাবাঁকা কষ্টকর।-’ (হে কবিতা, অপেক্ষা করো) দীর্ঘ এ কবিতায় তিনি কবিতা দুর্গমতার কথা পাঠককে স্মরণ করিয়ে দেন। কাল উত্তীর্ণ কবিতা নির্মাণ অনেক কষ্টের। তিনি বুক ঘষে ঘষে সেই পথ পাড়ি দিচ্ছেন।
তিনি আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, তার আসতে দেরি হবে। পাঠকের ধৈর্যহীন জিজ্ঞাসা, একটু দেরি মানে এত দেরি। তেরো বছর। আগেই বলেছি তার ছাপা লেখার বয়স চল্লিশ বছর হয়ে যাওয়ার পর যার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পায় তার ক্ষেত্রে এটা বেমানান নয়। তিনি অলস নন। পুনরায় বলছি ধৈর্যশীল। কিন্তু বরাবরের মতো উদাসীন। তৎপর নন। লেখাগুলো গোছগাছ করতে কি সময় লেগে যায়? অথচ তেরো বছরে সামান্য পাথর পর্যন্ত নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। অতএব, ময়ুখ চৌধুরীর মতো একজন কবি যে অবিরাম নিজেকে অতিক্রম করে যাবেন, এটাই স্বাভাবিক। তার জন্মদিনে তার জন্যে শুভেচ্ছা।
 

সাহিত্য সাময়িকী পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close