jugantor
পাবার জন্য আমি আকাঙ্ক্ষা রাখিনি : সৈয়দ শামসুল হক

   

২৫ ডিসেম্বর ২০১৫, ০০:০০:০০  | 

পঞ্চাশের দশকের অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হকের ৮০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তার জীবন ও সমাজ ভাবনা এবং সাহিত্য সৃষ্টির বিভিন্ন দিক নিয়ে কবির সঙ্গে কথা বলেন কবি আহমেদ বাসার

আলোচনার অংশবিশেষ পত্রস্থ হল : বি.স.

আহমেদ বাসার : আগামী ২৭ ডিসেম্বর আপনি ৮১তম জন্মদিনে পা রাখতে যাচ্ছেন। জীবনের এ লগ্নে দাঁড়িয়ে আপনার জীবন, সমাজ ও সাহিত্যিক সৃষ্টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

সৈয়দ শামসুল হক : কোনোভাবেই না। আমার মূল্যায়ন আমি যা করবার সেটা তোমাদের নাই বা বললাম। তোমরা কী মূল্যায়ন কর, সেটা শোনারই আগ্রহ। অনেকদিন ধরেই লেখালেখির মধ্যে রয়েছি, কেমন কতটা কী হল তোমরা কীভাবে মূল্যায়ন করছ সেটা শুনলেই বরং ভালো লাগত। কী হয়েছে বা কী হয়নি। আমার মূল্যায়ন আমি যে কাজ করতে চেয়েছি সে কাজ এখনও করে যাচ্ছি।

আপনি কি মনে করেন আপনি যা পেতে চেয়েছিলেন তা পেয়েছেন?

: না, পাওয়ার জন্য আমি আকাঙ্ক্ষা রাখিনি কখনও। পাওয়া না পাওয়া এগুলো আমার চিন্তার বাইরে। আমি লিখতে চেয়েছি, সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, মানুষের ভেতরে বসবাস করছি, প্রতিনিয়ত মনের ভেতরে একটা অনুরণন পাচ্ছি; সেটাই ধ্বনিতে শব্দে ভাষায় কবিতায় গল্পে নাটকে বলবার চেষ্টা করেছি। এবং করে যেতে পারছি এখনও এটাই আমার কাছে একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। পাওয়া না পাওয়ার কোনো ব্যাপারই নয়।

এই যে চারদিকে আপনার এত নাম যশ, এটাকে কীভাবে উপভোগ করেন?

: মনে হয় দশজন আমাকে তাদের আপন বলে মনে করে। যারা আমাকে ভালোবাসেন তারা নিশ্চয়ই আমার এ চেহারাটার জন্য ভালোবাসেন না। আমি সামান্য যে কাজটা করতে চেয়েছি সেটা যার হাত দিয়ে হয়েছে তাকে তারা ভালোবাসছেন। এটা তো ভালো। এতে সবার সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।

লেখার সময় কি কোনো কাল্পনিক পাঠক আপনার সামনে থাকে?

: না না। তা নয়। যদি সামনে রাখার কথা হয়, তাহলে যে ভাষায় আমি লিখছি, যে ভাষাভাষীর মানুষের জন্য লিখছি, সে ভাষাভাষীর মানুষরা সামগ্রিকভাবে তো সামনে থাকেই। আমি এ জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করছি। আমি তো ইংরেজদের জন্য লিখছি না, ফরাসিদের জন্য, জাপানিদের জন্য কিংবা হিন্দিভাষীর জন্য লিখছি না। আমি লিখছি বাঙালির জন্য। এ বাঙালি হচ্ছে বাংলাদেশের বাঙালি। এরাই আমার পাঠক।

আপনি যখন যাত্রা শুরু করেছিলেন তখনকার সাহিত্যিক প্রেক্ষাপট কেমন ছিল ?

: এর অনেক বিশদ উত্তর হয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে এই ছিল যে, পঞ্চাশের দশকে আমরা যারা লিখতে শুরু করি, আমাদের সামনে দু-একটা ঐতিহাসিক কাজ অপেক্ষা করছিল। সেটা হচ্ছে যে, আধুনিকতা সমসাময়িকতার সঙ্গে সাহিত্যিক রুচিকে যুক্ত করা, এদেশের মানুষকে যুক্ত করা। এটাই একটা কাজ ছিল। পরিপ্রেক্ষিত ছিল এই রকম যে, আমাদের লেখার ভেতর দিয়ে শুধু আমি একা নই, আমরা অনেকেই, পঞ্চাশের আমাদের অনেকের ওপরই এ কাজটি করবার একটা দায় ইতিহাস চাপিয়ে দিয়েছিল। যে আধুনিকতার সঙ্গে এদেশের সাহিত্যকে যুক্ত করা এবং সাহিত্যিক রুচিকে তৈরি করা। এদেশের মানুষকে পাঠের জন্য তৈরি করা।

আপনারা যখন যাত্রা শুরু করলেন তখন তো আপনাদের বাংলাদেশের সাহিত্যের নতুন ভাষাভঙ্গি তৈরি করে নিতে হয়েছিল....

: এটা তোমরা বলবে। আমি আর কী বলব। ওই সময়ে কোনো সাহিত্যিক ঐতিহ্য ছিল না। রুচি ছিল না। আমাদের পাঠক তৈরি করতে হয়েছে। বারবার তো একই কথা বলছি সমসাময়িকতা ও আধুনিকতার সঙ্গে পাঠককে যুক্ত করতে হয়েছে।

একজন নবীন লেখকের লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা কি ওই সময়ে ছিল?

: আমি একটা জিনিসে বিশ্বাস করি যে, অনেকে মনে করেন বিশেষ কোনো সিঁড়ি বা সুযোগ না থাকলে লেখা ছাপানো যায় না। তা নয়। লেখা ভালো হলে যে কোনো অজ্ঞাত বা অখ্যাত যে কোনো লেখকের লেখাও ছাপানো যায়। প্রতিবন্ধকতা যদি থাকে তবে সেটা নিজের মধ্যেই। নিজের অক্ষমতা, নিজের লেখার দুর্বলতা সেটার মধ্যেই। না, তা কোনো কালেই নয়। শুধু আমাদের কালে কেন? কোনো কালেই এ জিনিসটি সত্য নয়, যে প্রতিবন্ধকতা। হ্যাঁ, কিছু বিশেষ পরিস্থিতি থাকে, যেমন পরাধীন দেশে অনেক কথা বলবার অনেক রকম সীমাবদ্ধতা থাকে। সেই পরিস্থিতিতে একজন লেখকের কী দায়, বা কী কর্তব্য বা কী করা উচিত; তা ওই লেখককেই নির্ধারণ করে নিতে হবে।

লেখা হচ্ছে একেবারেই একা মানুষের কাজ। এবং এ মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কীভাবে তিনি দাঁড়াবেন, কীভাবে তিনি হাঁটবেন, কীভাবে তিনি বলবেন, কী বলবেন। যদি প্রতিকূল অবস্থা থাকে, তাহলে কীভাবে সেই প্রতিকূলতাকে পার হয়ে আসবেন তা তাকেই ঠিক করে নিতে হবে।

পঞ্চাশের দশকের সাহিত্যিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বর্তমান প্রেক্ষাপটের কী ধরনের সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য আপনি লক্ষ করেন?

: আমি সৃজনশীল মানুষ। আমি লেখক, আমি লিখি। এবং লিখছি। যারা সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেন তারাই এটা ভালো বলতে পারবেন। আমার লেখা থেকেই সেটি উপলব্ধি করা যাবে।

‘কবির বয়স বাড়ে কবিতার বাড়ে না’ এই গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত আপনার ‘তরঙ্গের অস্থির নৌকায়’ কাব্যগ্রন্থের একটি লাইন। কবির বয়স কি আসলেই বাড়ে?

: (হেসে) বয়স তো শরীরী ব্যাপার। শরীর থাকলে বয়স তো বাড়ে। তো ওই যে বলেছি, হ্যাঁ কবির হাত দিয়ে যে কবিতা বের হয় তার বয়স বাড়ে। মনের বয়সের বার্ধক্য বা শৈশব বলে কিছু নেই। সজীবতা, সপ্রাণতা এটা হচ্ছে মনের একটা আদর্শ অবস্থা; যে সপ্রাণ আছি সক্রিয় আছি, সজীব আছি। সজীব মানে কী, চারদিকে যা ঘটছে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হচ্ছে ভেতরে। নতুন নতুন ভাবনা আসছে। তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে নিজের সঙ্গে। নতুন ছবি ফুটছে চোখের সম্মুখে। এই যে সৃজনশীলতা, এই কাজটি যার মধ্যে চলে তাকে আমি তরুণও বলব না, বৃদ্ধও বলব না, বালক বা বালিকাও বলব না। তিনি সজীব তিনি সপ্রাণ। আমি চেষ্টা করি সজীব সপ্রাণ থাকতে। এবং এখন পর্যন্ত আমি নিজের দিকে নিজে তাকিয়ে দেখতে পাই যে হ্যাঁ, প্রথম দিকে আমি যে রকম বোধ করতাম কাগজে কলম ধরে, এখনও সে রকম বোধ করি এত বছর পরও। বয়সের এতটা পেরিয়ে আসবার পরও।

গল্পসমগ্রের ভূমিকায় আপনি আপনার গল্পকে ‘গল্প-প্রবন্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ বিষয়ে যদি কিছু বলতেন...

: ওর ভেতরেই বলা আছে। গল্প এবং প্রবন্ধ। প্রবন্ধ মানে কী? বিশেষভাবে যেটা বন্ধিত, নিবন্ধিত। একটা গল্পকে সেভাবেই দেখবার চেষ্টা করেছি। সেখানের কলাকৌশলগুলো তো তোমরা সাহিত্যের ছাত্র তোমাদের জানা উচিত, লক্ষ করা উচিত যে সেখানে একটা সমবায়ী কণ্ঠস্বর আছে আমরা বলে। অনির্দিষ্ট অনির্ণেয় একদল মানুষ আছে। যারা দেখছে গল্পটার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, বলছে। তো এটাকে আমি প্রবন্ধের সঙ্গে তুলনীয় মনে করি।

সফোক্লিসের শিল্পশৈলীর প্রতি আপনার এক ধরনের পক্ষপাত লক্ষ করা যায়। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ কাব্যনাট্যের কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়। এর কোনো বিশেষ কারণ আছে কি?

: এটা শুধু সফোক্লিসের শিল্পশৈলী নয়। বরং গ্রিক নাটকের কাঠামোকে আমি অবলম্বন করেছিলাম। ওটা আমার প্রথম নাটক ছিল এবং আমি মনস্থির করেছিলাম যে নাটকের কাঠামোটা ওখান থেকে নেব। কাজেই ওটা সফোক্লিস বলে নয়। গ্রিক নাটকেরই যে ইউনিটি অব টাইম, ইউনিটি অব প্লেস, ইউনিটি অব ক্যারেক্টার এগুলোই এখানে এসেছে।

‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাসের বিলকিস চরিত্রের সৃষ্টিতে সফোক্লিসের আন্তেগোনে চরিত্র কি আপনাকে কোনোভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল?

: নিশ্চয়ই। ওটা আছে তো। আমি তো একাধিকবার বলেওছি। যে ওইটুকু ওখান থেকে নেয়া। হয় কিংবদন্তি সে যে দেশেরই হোক প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্য তা লেখার মধ্যে একটা বীজ হিসেবে কাজ করে। কোনোটা প্রত্যক্ষ স্পষ্ট কোনোটা ভেতরে এমনভাবে লুকানো থাকে যে বোঝা যায় না। যেমন আমাদের দেশে আমাদের ভাষায় যে প্রেমের গল্প বা নরনারীর সম্পর্কের গল্প তার ভেতরে একটা মূল নকশা রয়ে গেছে । সেটা হচ্ছে রাধাকৃষ্ণ। আরেকটা মডেল রয়েছে হর-পার্বতী। তো দেখবে যে বহু উপন্যাসে এর ছায়া রয়ে গেছে। তো তাই বলে এটা বলা যাবে না যে ধরে বেঁধে ওটা লক্ষ করেই লেখা হয়েছে। এসব থেকেই যায়। পৃথিবীতে যা কিছু হয়েছে, কিংবদন্তির মধ্যে যা আছে তার একটা উত্তরাধিকার কিন্তু আমরা বহন করি।

আপনার একটা গুরুত্বপূর্ণ কাব্যনাটক ‘নূরলদীনের সারাজীবন’। আমাদের ইতিহাসের সংগ্রামী চরিত্রগুলোর মধ্যে নূরলদীন আপনাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। এর কোনো বিশেষ কারণ আছে কি?

: বিশেষ কারণ কী। আকৃষ্টও কোনো কথা নয়। নূরলদীনকে আমি দুটো দিক থেকে দেখার চেষ্টা করেছি। একটা হচ্ছে যখন তিনি সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হন তখন তার ইংরেজ প্রশাসক যারা ছিলেন ওই এলাকার, তাদের রিপোর্টে দেখতে পাই তিনি যে বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন কৃষক-শ্রমিক মক্তবের ছাত্র এরা যোগ দিয়েছিল। এটার সঙ্গে আমি একাত্তরের একটা সমান্তরালতা লক্ষ করি। তখন আমার মনে হয় যে এটা আমার কোনো না কোনোভাবে বলা দরকার যে একাত্তরের যুদ্ধটা কোনো হঠাৎ করে হওয়া কিংবা ভুঁইফোড় কোনো বিষয় ছিল না। এর একটা ধারাবাহিকতা আছে। আমরা এমনিতে বলি যে হাজার বছর সংগ্রাম করেছে বাঙালি কত কথা বলি। তার নজিরগুলোর একটা আমি পেয়েছি। আরেকটা বিষয় হচ্ছে তিনি কৃষক ছিলেন। সাধারণ একজন দরিদ্র মানুষ ছিলেন। তিনি একটা কারণে উদ্বুদ্ধ হয়ে সংগ্রামে নেমেছিলেন। এবং তাকে লোকরা নবাব বলতে শুরু করেছিল। তো যখন মানুষের ক্ষমতা আসতে থাকে তখন ক্ষমতা মানুষকে নষ্ট করার দিকেও ঠেলে দেয়। এ জিনিসটাও পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছি।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সাহিত্যচর্চাকে পেশা হিসেবে নেয়ার সুযোগ কতটুকু আছে বলে আপনি মনে করেন?

: ষোলো আনাই আছে। শুধু তার ঝুঁকি নেয়ার যে সাহস সেটাই দরকার। আমিতো নিয়েছি। এবং মনে হয় না যে আমি ভুল করেছি। আমার জীবনতো আমি জানি। আমি ভুল করিনি। এটা আমরা যখন শুরু করি তখন ঝুঁকিটা বেশি ছিল। ঝুঁকি এখনও আছে। আর লেখা সাহিত্য বলতে কী বুঝি আমরা? সাহিত্যের ভেতরে সব মাধ্যম যে উপার্জকে বাড়িয়ে দেবে এমনটা নয়। কবিতার চেয়ে উপন্যাসে যদি বলি উপার্জনটা বেশি আসে। তার কারণ হচ্ছে উপন্যাসটা বেশি পড়ে মানুষ। শুধু সাহিত্য কেন, কলম দিয়ে আমরা যে ভাষায় লিখছি তার তো অনেক রকম ক্ষেত্র সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এখনকার সময়ে অনেক ক্ষেত্র সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। তো এভাবে লেখাকে পেশা হিসেবে নেয়া যায়। সাহিত্যকে পেশা নয়, লেখাকে পেশা হিসেবে নেয়া যায় কিনা কথাটা এভাবে আসা দরকার।

বর্তমান সময়ের তরুণদের লেখালেখি বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

: মূল্যায়ন খুবই ভালো। প্রচুর প্রাণশক্তি আমি লক্ষ করি। নতুন নতুন বিষয় নিয়ে তারা ভাবছে। নতুন আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। এবং যেটা চাই সেটা হচ্ছে লেগে থাকা। ছেড়ে দেয়া নয়। হঠাৎ করে কোনো লেখা আসে না। এর জন্য অনেক শ্রম-ঘাম দিতে হয়। সেটাই যেন দেয়া হয়। কারণ অনেককেই দেখি ভালো লিখছেন; কিন্তু হঠাৎ তার আর কোনো লেখা দেখছি না। ছেড়ে দিয়েছেন অথবা যাকে বলে ড্রাইআউট করেছেন যাকে বলে শুকিয়ে যাওয়া। শেকড়ে আর জল পড়ে না। তো এই কাজটা যেন এমনভাবে করা হয় যে আমি লেগে থাকব। আমি শ্রম দেব ঘাম ঝরাব। আমি কিছুতেই পিছপা হব না। একটা লেখা মনের মতো হল না তার জন্য আমি ক্ষুণ্ণ হব না। আমি আবার একটি নতুন লেখা লিখব। আর লেখার প্রতি সততা চাই। দেখাদেখি লেখা বা পাঁচজনে যেরকম করছে সেরকম লেখা কিংবা হঠাৎ করে বলে ওঠা যে আমি নতুন কিছু করতে চাই। কিন্তু নতুন কিছু করতে হলে পুরনো কী হয়েছে সেটা ভালো করে জানতে হবে। নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। আমি কবিতা লিখতে চাই, কিন্তু কবিতার প্রধান কবি যারা আছেন তাদের কি আমি ভালোভাবে পাঠ করেছি? আমি উপন্যাসে কাজ করতে চাই, কিন্তু এই উপন্যাস অন্য ভাষা বাদ দিলাম বাংলা ভাষায় যারা লিখেছেন তাদের কি আমি ভালোভাবে পাঠ করছি? আমি কি শুধু পাঠকের ভার বৃদ্ধি করে চলব যা হয়েছে তা লিখে? নাকি আমার নিজস্ব একটি কণ্ঠস্বর আমি আবিষ্কার করতে পারব? থাকা উচিত। তো এই প্রশ্নগুলো আসতে হবে। যে প্রাণশক্তি আমি লক্ষ করি তার সঙ্গে শ্রম, ঘাম ও সাধনাযুক্ত হওয়া দরকার। এটার অভাব আমি কিছুটা দেখি।


 

সাবমিট

পাবার জন্য আমি আকাঙ্ক্ষা রাখিনি : সৈয়দ শামসুল হক

  
২৫ ডিসেম্বর ২০১৫, ১২:০০ এএম  | 

পঞ্চাশের দশকের অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক সব্যসাচী সৈয়দ শামসুল হকের ৮০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তার জীবন ও সমাজ ভাবনা এবং সাহিত্য সৃষ্টির বিভিন্ন দিক নিয়ে কবির সঙ্গে কথা বলেন কবি আহমেদ বাসার

আলোচনার অংশবিশেষ পত্রস্থ হল : বি.স.

আহমেদ বাসার : আগামী ২৭ ডিসেম্বর আপনি ৮১তম জন্মদিনে পা রাখতে যাচ্ছেন। জীবনের এ লগ্নে দাঁড়িয়ে আপনার জীবন, সমাজ ও সাহিত্যিক সৃষ্টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

সৈয়দ শামসুল হক : কোনোভাবেই না। আমার মূল্যায়ন আমি যা করবার সেটা তোমাদের নাই বা বললাম। তোমরা কী মূল্যায়ন কর, সেটা শোনারই আগ্রহ। অনেকদিন ধরেই লেখালেখির মধ্যে রয়েছি, কেমন কতটা কী হল তোমরা কীভাবে মূল্যায়ন করছ সেটা শুনলেই বরং ভালো লাগত। কী হয়েছে বা কী হয়নি। আমার মূল্যায়ন আমি যে কাজ করতে চেয়েছি সে কাজ এখনও করে যাচ্ছি।

আপনি কি মনে করেন আপনি যা পেতে চেয়েছিলেন তা পেয়েছেন?

: না, পাওয়ার জন্য আমি আকাঙ্ক্ষা রাখিনি কখনও। পাওয়া না পাওয়া এগুলো আমার চিন্তার বাইরে। আমি লিখতে চেয়েছি, সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, মানুষের ভেতরে বসবাস করছি, প্রতিনিয়ত মনের ভেতরে একটা অনুরণন পাচ্ছি; সেটাই ধ্বনিতে শব্দে ভাষায় কবিতায় গল্পে নাটকে বলবার চেষ্টা করেছি। এবং করে যেতে পারছি এখনও এটাই আমার কাছে একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। পাওয়া না পাওয়ার কোনো ব্যাপারই নয়।

এই যে চারদিকে আপনার এত নাম যশ, এটাকে কীভাবে উপভোগ করেন?

: মনে হয় দশজন আমাকে তাদের আপন বলে মনে করে। যারা আমাকে ভালোবাসেন তারা নিশ্চয়ই আমার এ চেহারাটার জন্য ভালোবাসেন না। আমি সামান্য যে কাজটা করতে চেয়েছি সেটা যার হাত দিয়ে হয়েছে তাকে তারা ভালোবাসছেন। এটা তো ভালো। এতে সবার সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।

লেখার সময় কি কোনো কাল্পনিক পাঠক আপনার সামনে থাকে?

: না না। তা নয়। যদি সামনে রাখার কথা হয়, তাহলে যে ভাষায় আমি লিখছি, যে ভাষাভাষীর মানুষের জন্য লিখছি, সে ভাষাভাষীর মানুষরা সামগ্রিকভাবে তো সামনে থাকেই। আমি এ জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করছি। আমি তো ইংরেজদের জন্য লিখছি না, ফরাসিদের জন্য, জাপানিদের জন্য কিংবা হিন্দিভাষীর জন্য লিখছি না। আমি লিখছি বাঙালির জন্য। এ বাঙালি হচ্ছে বাংলাদেশের বাঙালি। এরাই আমার পাঠক।

আপনি যখন যাত্রা শুরু করেছিলেন তখনকার সাহিত্যিক প্রেক্ষাপট কেমন ছিল ?

: এর অনেক বিশদ উত্তর হয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে এই ছিল যে, পঞ্চাশের দশকে আমরা যারা লিখতে শুরু করি, আমাদের সামনে দু-একটা ঐতিহাসিক কাজ অপেক্ষা করছিল। সেটা হচ্ছে যে, আধুনিকতা সমসাময়িকতার সঙ্গে সাহিত্যিক রুচিকে যুক্ত করা, এদেশের মানুষকে যুক্ত করা। এটাই একটা কাজ ছিল। পরিপ্রেক্ষিত ছিল এই রকম যে, আমাদের লেখার ভেতর দিয়ে শুধু আমি একা নই, আমরা অনেকেই, পঞ্চাশের আমাদের অনেকের ওপরই এ কাজটি করবার একটা দায় ইতিহাস চাপিয়ে দিয়েছিল। যে আধুনিকতার সঙ্গে এদেশের সাহিত্যকে যুক্ত করা এবং সাহিত্যিক রুচিকে তৈরি করা। এদেশের মানুষকে পাঠের জন্য তৈরি করা।

আপনারা যখন যাত্রা শুরু করলেন তখন তো আপনাদের বাংলাদেশের সাহিত্যের নতুন ভাষাভঙ্গি তৈরি করে নিতে হয়েছিল....

: এটা তোমরা বলবে। আমি আর কী বলব। ওই সময়ে কোনো সাহিত্যিক ঐতিহ্য ছিল না। রুচি ছিল না। আমাদের পাঠক তৈরি করতে হয়েছে। বারবার তো একই কথা বলছি সমসাময়িকতা ও আধুনিকতার সঙ্গে পাঠককে যুক্ত করতে হয়েছে।

একজন নবীন লেখকের লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা কি ওই সময়ে ছিল?

: আমি একটা জিনিসে বিশ্বাস করি যে, অনেকে মনে করেন বিশেষ কোনো সিঁড়ি বা সুযোগ না থাকলে লেখা ছাপানো যায় না। তা নয়। লেখা ভালো হলে যে কোনো অজ্ঞাত বা অখ্যাত যে কোনো লেখকের লেখাও ছাপানো যায়। প্রতিবন্ধকতা যদি থাকে তবে সেটা নিজের মধ্যেই। নিজের অক্ষমতা, নিজের লেখার দুর্বলতা সেটার মধ্যেই। না, তা কোনো কালেই নয়। শুধু আমাদের কালে কেন? কোনো কালেই এ জিনিসটি সত্য নয়, যে প্রতিবন্ধকতা। হ্যাঁ, কিছু বিশেষ পরিস্থিতি থাকে, যেমন পরাধীন দেশে অনেক কথা বলবার অনেক রকম সীমাবদ্ধতা থাকে। সেই পরিস্থিতিতে একজন লেখকের কী দায়, বা কী কর্তব্য বা কী করা উচিত; তা ওই লেখককেই নির্ধারণ করে নিতে হবে।

লেখা হচ্ছে একেবারেই একা মানুষের কাজ। এবং এ মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কীভাবে তিনি দাঁড়াবেন, কীভাবে তিনি হাঁটবেন, কীভাবে তিনি বলবেন, কী বলবেন। যদি প্রতিকূল অবস্থা থাকে, তাহলে কীভাবে সেই প্রতিকূলতাকে পার হয়ে আসবেন তা তাকেই ঠিক করে নিতে হবে।

পঞ্চাশের দশকের সাহিত্যিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বর্তমান প্রেক্ষাপটের কী ধরনের সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য আপনি লক্ষ করেন?

: আমি সৃজনশীল মানুষ। আমি লেখক, আমি লিখি। এবং লিখছি। যারা সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেন তারাই এটা ভালো বলতে পারবেন। আমার লেখা থেকেই সেটি উপলব্ধি করা যাবে।

‘কবির বয়স বাড়ে কবিতার বাড়ে না’ এই গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত আপনার ‘তরঙ্গের অস্থির নৌকায়’ কাব্যগ্রন্থের একটি লাইন। কবির বয়স কি আসলেই বাড়ে?

: (হেসে) বয়স তো শরীরী ব্যাপার। শরীর থাকলে বয়স তো বাড়ে। তো ওই যে বলেছি, হ্যাঁ কবির হাত দিয়ে যে কবিতা বের হয় তার বয়স বাড়ে। মনের বয়সের বার্ধক্য বা শৈশব বলে কিছু নেই। সজীবতা, সপ্রাণতা এটা হচ্ছে মনের একটা আদর্শ অবস্থা; যে সপ্রাণ আছি সক্রিয় আছি, সজীব আছি। সজীব মানে কী, চারদিকে যা ঘটছে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হচ্ছে ভেতরে। নতুন নতুন ভাবনা আসছে। তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে নিজের সঙ্গে। নতুন ছবি ফুটছে চোখের সম্মুখে। এই যে সৃজনশীলতা, এই কাজটি যার মধ্যে চলে তাকে আমি তরুণও বলব না, বৃদ্ধও বলব না, বালক বা বালিকাও বলব না। তিনি সজীব তিনি সপ্রাণ। আমি চেষ্টা করি সজীব সপ্রাণ থাকতে। এবং এখন পর্যন্ত আমি নিজের দিকে নিজে তাকিয়ে দেখতে পাই যে হ্যাঁ, প্রথম দিকে আমি যে রকম বোধ করতাম কাগজে কলম ধরে, এখনও সে রকম বোধ করি এত বছর পরও। বয়সের এতটা পেরিয়ে আসবার পরও।

গল্পসমগ্রের ভূমিকায় আপনি আপনার গল্পকে ‘গল্প-প্রবন্ধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ বিষয়ে যদি কিছু বলতেন...

: ওর ভেতরেই বলা আছে। গল্প এবং প্রবন্ধ। প্রবন্ধ মানে কী? বিশেষভাবে যেটা বন্ধিত, নিবন্ধিত। একটা গল্পকে সেভাবেই দেখবার চেষ্টা করেছি। সেখানের কলাকৌশলগুলো তো তোমরা সাহিত্যের ছাত্র তোমাদের জানা উচিত, লক্ষ করা উচিত যে সেখানে একটা সমবায়ী কণ্ঠস্বর আছে আমরা বলে। অনির্দিষ্ট অনির্ণেয় একদল মানুষ আছে। যারা দেখছে গল্পটার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, বলছে। তো এটাকে আমি প্রবন্ধের সঙ্গে তুলনীয় মনে করি।

সফোক্লিসের শিল্পশৈলীর প্রতি আপনার এক ধরনের পক্ষপাত লক্ষ করা যায়। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ কাব্যনাট্যের কথা এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়। এর কোনো বিশেষ কারণ আছে কি?

: এটা শুধু সফোক্লিসের শিল্পশৈলী নয়। বরং গ্রিক নাটকের কাঠামোকে আমি অবলম্বন করেছিলাম। ওটা আমার প্রথম নাটক ছিল এবং আমি মনস্থির করেছিলাম যে নাটকের কাঠামোটা ওখান থেকে নেব। কাজেই ওটা সফোক্লিস বলে নয়। গ্রিক নাটকেরই যে ইউনিটি অব টাইম, ইউনিটি অব প্লেস, ইউনিটি অব ক্যারেক্টার এগুলোই এখানে এসেছে।

‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাসের বিলকিস চরিত্রের সৃষ্টিতে সফোক্লিসের আন্তেগোনে চরিত্র কি আপনাকে কোনোভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল?

: নিশ্চয়ই। ওটা আছে তো। আমি তো একাধিকবার বলেওছি। যে ওইটুকু ওখান থেকে নেয়া। হয় কিংবদন্তি সে যে দেশেরই হোক প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্য তা লেখার মধ্যে একটা বীজ হিসেবে কাজ করে। কোনোটা প্রত্যক্ষ স্পষ্ট কোনোটা ভেতরে এমনভাবে লুকানো থাকে যে বোঝা যায় না। যেমন আমাদের দেশে আমাদের ভাষায় যে প্রেমের গল্প বা নরনারীর সম্পর্কের গল্প তার ভেতরে একটা মূল নকশা রয়ে গেছে । সেটা হচ্ছে রাধাকৃষ্ণ। আরেকটা মডেল রয়েছে হর-পার্বতী। তো দেখবে যে বহু উপন্যাসে এর ছায়া রয়ে গেছে। তো তাই বলে এটা বলা যাবে না যে ধরে বেঁধে ওটা লক্ষ করেই লেখা হয়েছে। এসব থেকেই যায়। পৃথিবীতে যা কিছু হয়েছে, কিংবদন্তির মধ্যে যা আছে তার একটা উত্তরাধিকার কিন্তু আমরা বহন করি।

আপনার একটা গুরুত্বপূর্ণ কাব্যনাটক ‘নূরলদীনের সারাজীবন’। আমাদের ইতিহাসের সংগ্রামী চরিত্রগুলোর মধ্যে নূরলদীন আপনাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে। এর কোনো বিশেষ কারণ আছে কি?

: বিশেষ কারণ কী। আকৃষ্টও কোনো কথা নয়। নূরলদীনকে আমি দুটো দিক থেকে দেখার চেষ্টা করেছি। একটা হচ্ছে যখন তিনি সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হন তখন তার ইংরেজ প্রশাসক যারা ছিলেন ওই এলাকার, তাদের রিপোর্টে দেখতে পাই তিনি যে বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন কৃষক-শ্রমিক মক্তবের ছাত্র এরা যোগ দিয়েছিল। এটার সঙ্গে আমি একাত্তরের একটা সমান্তরালতা লক্ষ করি। তখন আমার মনে হয় যে এটা আমার কোনো না কোনোভাবে বলা দরকার যে একাত্তরের যুদ্ধটা কোনো হঠাৎ করে হওয়া কিংবা ভুঁইফোড় কোনো বিষয় ছিল না। এর একটা ধারাবাহিকতা আছে। আমরা এমনিতে বলি যে হাজার বছর সংগ্রাম করেছে বাঙালি কত কথা বলি। তার নজিরগুলোর একটা আমি পেয়েছি। আরেকটা বিষয় হচ্ছে তিনি কৃষক ছিলেন। সাধারণ একজন দরিদ্র মানুষ ছিলেন। তিনি একটা কারণে উদ্বুদ্ধ হয়ে সংগ্রামে নেমেছিলেন। এবং তাকে লোকরা নবাব বলতে শুরু করেছিল। তো যখন মানুষের ক্ষমতা আসতে থাকে তখন ক্ষমতা মানুষকে নষ্ট করার দিকেও ঠেলে দেয়। এ জিনিসটাও পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছি।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সাহিত্যচর্চাকে পেশা হিসেবে নেয়ার সুযোগ কতটুকু আছে বলে আপনি মনে করেন?

: ষোলো আনাই আছে। শুধু তার ঝুঁকি নেয়ার যে সাহস সেটাই দরকার। আমিতো নিয়েছি। এবং মনে হয় না যে আমি ভুল করেছি। আমার জীবনতো আমি জানি। আমি ভুল করিনি। এটা আমরা যখন শুরু করি তখন ঝুঁকিটা বেশি ছিল। ঝুঁকি এখনও আছে। আর লেখা সাহিত্য বলতে কী বুঝি আমরা? সাহিত্যের ভেতরে সব মাধ্যম যে উপার্জকে বাড়িয়ে দেবে এমনটা নয়। কবিতার চেয়ে উপন্যাসে যদি বলি উপার্জনটা বেশি আসে। তার কারণ হচ্ছে উপন্যাসটা বেশি পড়ে মানুষ। শুধু সাহিত্য কেন, কলম দিয়ে আমরা যে ভাষায় লিখছি তার তো অনেক রকম ক্ষেত্র সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এখনকার সময়ে অনেক ক্ষেত্র সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। তো এভাবে লেখাকে পেশা হিসেবে নেয়া যায়। সাহিত্যকে পেশা নয়, লেখাকে পেশা হিসেবে নেয়া যায় কিনা কথাটা এভাবে আসা দরকার।

বর্তমান সময়ের তরুণদের লেখালেখি বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

: মূল্যায়ন খুবই ভালো। প্রচুর প্রাণশক্তি আমি লক্ষ করি। নতুন নতুন বিষয় নিয়ে তারা ভাবছে। নতুন আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। এবং যেটা চাই সেটা হচ্ছে লেগে থাকা। ছেড়ে দেয়া নয়। হঠাৎ করে কোনো লেখা আসে না। এর জন্য অনেক শ্রম-ঘাম দিতে হয়। সেটাই যেন দেয়া হয়। কারণ অনেককেই দেখি ভালো লিখছেন; কিন্তু হঠাৎ তার আর কোনো লেখা দেখছি না। ছেড়ে দিয়েছেন অথবা যাকে বলে ড্রাইআউট করেছেন যাকে বলে শুকিয়ে যাওয়া। শেকড়ে আর জল পড়ে না। তো এই কাজটা যেন এমনভাবে করা হয় যে আমি লেগে থাকব। আমি শ্রম দেব ঘাম ঝরাব। আমি কিছুতেই পিছপা হব না। একটা লেখা মনের মতো হল না তার জন্য আমি ক্ষুণ্ণ হব না। আমি আবার একটি নতুন লেখা লিখব। আর লেখার প্রতি সততা চাই। দেখাদেখি লেখা বা পাঁচজনে যেরকম করছে সেরকম লেখা কিংবা হঠাৎ করে বলে ওঠা যে আমি নতুন কিছু করতে চাই। কিন্তু নতুন কিছু করতে হলে পুরনো কী হয়েছে সেটা ভালো করে জানতে হবে। নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। আমি কবিতা লিখতে চাই, কিন্তু কবিতার প্রধান কবি যারা আছেন তাদের কি আমি ভালোভাবে পাঠ করেছি? আমি উপন্যাসে কাজ করতে চাই, কিন্তু এই উপন্যাস অন্য ভাষা বাদ দিলাম বাংলা ভাষায় যারা লিখেছেন তাদের কি আমি ভালোভাবে পাঠ করছি? আমি কি শুধু পাঠকের ভার বৃদ্ধি করে চলব যা হয়েছে তা লিখে? নাকি আমার নিজস্ব একটি কণ্ঠস্বর আমি আবিষ্কার করতে পারব? থাকা উচিত। তো এই প্রশ্নগুলো আসতে হবে। যে প্রাণশক্তি আমি লক্ষ করি তার সঙ্গে শ্রম, ঘাম ও সাধনাযুক্ত হওয়া দরকার। এটার অভাব আমি কিছুটা দেখি।


 

 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র