jugantor
দুটি লাল পাখি থেকে সব্যসাচী

  মুহম্মদ নূরুল হুদা  

২৫ ডিসেম্বর ২০১৫, ০০:০০:০০  | 

আট সন্তানের মধ্যে প্রথম, পিতা সদৃশবিধানসম্মত চিকিৎসক, মাতা সনাতন বাংলার এক পল্লীজননী। শৈশবে গ্রামের স্কুলে পাঠগ্রহণকালে রবীন্দ্রনাথের ‘আমাদের ছোট নদী’ পড়েই পদ মেলানোর নেশায় মেতে ওঠেন। তারপর এগারো-বারো বছর বয়সে বাড়ির রান্নাঘরের পাশে সজনেগাছে একটি লাল টুকটুকে পাখি দেখে দুলাইনের একটি পদ মেলালেন মুক্তক সাধুগদ্যবয়ানে, ‘আমার ঘরে জানালার পাশে গাছ রহিয়াছে / তাহার উপরে দুটি লাল পাখি বসিয়া আছে’। পড়েই বোঝা যায়, এই বর্ণনায় একটি ব্যতিক্রমী চিত্রকল্প আছে যেখানে ‘লাল’ শব্দটির ব্যবহার নিরীক্ষাপ্রবণ। ফলে এ বয়ানপঙ্ক্তির স্রষ্টা যে কালে কালে বাংলা ভাষায় একজন আপন মুদ্রাধারী সাহিত্যস্রষ্টা হবেন এমনটি আঁচ করা যায়। এ নিরীক্ষা মানুষ আর কেউ নন, আমাদের কালের বহুমাত্রিক শীর্ষসাহিত্যস্রষ্টা সৈয়দ শামসুল হক। সাতাশে ডিসেম্বর আশি পেরিয়ে তিনি একাশিতে পা দিচ্ছেন। আমরা তাকে বলি সব্যসাচী।

গত চারদশকেরও অধিক কালজুড়ে তিনি এ অভিধায় অভিহিত। কে কখন কোথায় এ অভিধা তাকে দিয়েছিল, তা আমাদের জানা নেই; কিন্তু এ অভিধার প্রতি নীরব সমর্থন জানিয়ে রেখেছেন তার সময়ের বাংলা ভাষাভাষী তাবৎ লেখক ও পাঠকসমাজ। ভবিষ্যতে এ অভিধা যে আরও পোক্ত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা এ সুপরিচিত অভিধা নিয়ে কথা বলছি এ জন্য যে, এর ভেতরেই নিহিত আছে সৃষ্টিশীল শিল্পী হিসেবে তার শক্তিমত্তা ও ব্যাপ্তি। সাধারণত যারা বহুমাত্রিক ও অতিপ্রজ লেখক তাদের সবারই একটি মুখ্য পরিচিতি থাকে বিশেষ কোনো আঙ্গিকে, যাকে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই প্রধান ও পছন্দসই মনে করেন। আবার এ-ও সত্য, সবগুলো ধারার মধ্যে একটি ধারাতেই তার মূল পরিচয়, অন্যগুলো সম্পূরক মাত্র। আসলে এমনটিই হয়ে থাকে প্রায় সবার ক্ষেত্রে। কিন্তু অবাক করার বিষয় এই যে, এটি সৈয়দ শামসুল হকের জন্য প্রযোজ্য বলে মনে হয় না। যারা তার নিবিষ্ট পাঠক, তারা খুব ভালো করেই জানেন, গদ্য-পদ্যে তো বটেই, গল্প-কবিতা-নাটক-উপন্যাস-প্রবন্ধ-কাব্যনাট্য-অনুবাদ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকরণেও তিনি প্রায় সমান দক্ষতার পরিচয় অব্যাহত রেখে লিখে চলেছেন ষাট বছরেরও অধিক কাল ধরে, যা যে কোনো সাহিত্যেই সহজ লক্ষ্য নয়। সেই ১৯৫৪ সালে ‘তাস’ শীর্ষক গল্পগ্রন্থ দিয়ে তার প্রকাশনা শুরু, তারপর আর পেছন ফেরা নেই। আমি নিজেও তার গল্প ‘রক্তগোলাপ’ পাঠ করেই তার প্রতি আকৃষ্ট হই সেই বিশ শতকের ষাটের দশকে, তারপর আমাকে প্রবলভাবে আক্রান্ত করে তার একটি দীর্ঘ কবিতা : ‘বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালা’, যার অসংখ্য পঙ্ক্তি আমার স্মৃতিতে দীর্ঘদিন জাগ্রত ছিল। মানবজীবন, মনোবিবর্তন, তৎসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবয়ান ও সামষ্টিক স্বীকারোক্তির কারণেই এ কাব্যটি এখনও আমার কাছে অনন্য। সম্ভবত এটিই বাংলাদেশের কবিতায় কনফেশনাল পয়েট্রির এক আদি সফল নমুনা। দেশ, ইতিহাস, ব্যক্তিমানুষ ও জাতিমানুষের এক বিশেষ সময়খণ্ডের এমন সাহসী ও শৈল্পিক দলিল সহজে দেখা যায় না। সবচেয়ে বড় কথা, এ বয়ানের অক্ষরবৃত্তীয় গতি ও বিবর্তিত চিত্রকল্প, যা এ কবিতাকে সহজবোধ্য ও রহস্যসঞ্চারী এই দুই বিপরীত বৈশিষ্ট্যে ঋদ্ধ করে রেখেছে।

‘রক্তগোলাপ’ ও ‘বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালা’ পাঠ করার পর বিশ শতকের সেই মধ্য-ষাটেই আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম, আমি এক বিশ্বমানের লেখকের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি, যদিও তিনি তখনও পূর্ণভাবে বিকশিত হওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ। আর আজ তার বিপুল সাহিত্য-সম্ভারের তুঙ্গীয় কর্মের দিকে তাকিয়ে নির্দ্বিধায় বলতে পারি : না, আমার বা আমাদের সময়ের অনেকের অনুমান মিথ্যে হয়নি। আজ তিনি শুধু বাংলাদেশেরই শীর্ষতম বহুমাত্রিকদের একজন নন, বরং সমগ্র বাংলা ভাষায়, এমনকি সমসাময়িক বিশ্বের সাহিত্যস ষ্টাদের মধ্যেও তার অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণভাবে সুনির্ণীত। কেননা এ-যাবৎ রচিত তার শতাধিক গ্রন্থের মধ্যে বিভিন্ন আঙ্গিকে এমন কিছু রচনা আছে যা শৈল্পিক সংহতি, ব্যাপ্তি, বাণী ও ইশারাময়তার জন্য মাস্টারপিস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। আর এ সব রচনায় তিনি অর্জন করেছেন এমন এক মুদ্রা, যা একান্তভাবেই তার। এটাকে আমরা বলতে পারি হক-মুদ্রা। এমন হক-মুদ্রার সতর্ক ব্যবহার তার যে কোনো গদ্যে-পদ্যে সুলভ, তবে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই তার বহুল-পরিচিত ‘পরানের গহীন ভিতর’, ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘নুরলদীনের সারা জীবন’, ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ ইত্যাদির মধ্যে, যেখানে তিনি স্বভাষা, ব্যক্তিপুরাণ, স্বকাল, ইতিহাস ও মানবসভ্যতার নানাকৌণিক সংশ্লেষ সম্পন্ন করেছেন। আমি জানি, এ মন্তব্য বৈধকরণের জন্য যে বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন তার সুযোগ এখানে নেই। তবে এটুকু বলতে পারি, আজীবন অনন্য ব্যক্তিমুদ্রার সাধক সৈয়দ হক তার শব্দে, বাক্যে, পুরাণের নবায়নে, ব্যক্তির বিবর্তিন পরিচিতি নির্মাণে, ঐতিহাসিক সত্যের স্বতন্ত্র ব্যাখ্যায়, বাঙালি জাতির প্রকৃতিসম্মত ও ইতিহাসবাহিত বিবর্তনের সচেতন নিরীক্ষক ও রূপকার। তাই তার রচনায় বাঙালির আদি পরিচয় থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধা বাঙালি ও একাত্তরোত্তর বিজয়ী বাঙালির পরিচয় সুবিধৃত। আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্বসভ্যতা ও বিশ্বমানুষ। তার যে কোনো স্বাতন্ত্র্যবাহী কবিতায় এর প্রতিফলন শনাক্তযোগ্য।

এ মুহূর্তে আমার সামনে আছে তার ‘ব্রহ্মপুত্রের প্রতি’ শীর্ষক একটি দীর্ঘ কবিতা। আমি এ কবিতার অংশবিশেষ উদ্ধৃতি করছি :

‘দশ লক্ষ ধর্ষিতার আর্তনাদে যখন নষ্টমান আমার শ্র“তি,

তিরিশ লক্ষ মানুষের রক্তে যখন প্লবমান আমার শ্রতি,

তিনকোটি মানুষের গৃহত্যাগে যখন বিলীয়মান আমার সভ্যতা,

বলীবর্দের দ্বিখণ্ডিত খুরে যখন কম্পমান আমার স্বপ্ন

... ... ...

তখন,

মহৎ ব্রহ্মপুত্র, স্মৃতিধর ব্রহ্মপুত্র,

আমার পিতামহের কৃষি-প্রতিভার আবিষ্কারক ব্রহ্মপুত্র,

অতীত ও ভবিষ্যতব্যাপী বিষয়সমূহের জন্যে

আমি আর কোথায় যাবো? - আমার প্রজাতির নিকটতম আত্মীয়,

কার কাছেই বা যাবো, তুমি ব্রহ্মপুত্র, তোমার কাছে ছাড়া?’

লক্ষ্য করার বিষয়, পুরো কবিতাটির ভাষাভঙ্গি যেমন চমকপ্রদ, তেমনি মানুষ, প্রকৃতি ও সমাজসভ্যতার বিবর্তনের নির্ণায়ক সূত্রটিও এখানে কাব্যিক স্বজ্ঞায় প্রত্যায়িত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র এখানে প্রকৃতি, ব্যক্তি, জনতা ও বিশ্বমানুষের দ্যোতক। এ-ধরনের প্রতীকায়ন একজন মহৎ স্বপ্নভাষকের শনাক্তিচিহ্ন। গোত্রীয় শেকড়ে স্থিত থেকে বিশ্বব্যাপ্ত নীলিমায় ডানা মেলার এই শিল্পীত অঙ্গীকারই একটি নামকে ব্যক্তিনাম থেকে সর্বগ্রাহ্য একটি ‘সর্বনাম’-এ পরিণত করে। সৈয়দ হকের কর্মে সেই উপাদান লক্ষ্যযোগ্য।

এই উপাদান সবার কাছে দৃশ্যমান করার জন্য প্রয়োজন তার রচনার নিমগ্ন পাঠ ও সতর্ক বিশ্লেষণ। এটি গবেষক সম্প্রদায়ের জন্য তোলা রইল। ব্যক্তিনাম সর্বনামে পরিণত হওয়ার উদাহরণ ইতিহাসে সুপ্রচুর। যখন এমনটি ঘটে, তখন এ নামটিই হয়ে যায় কালান্তরে ভিন্ন অর্থজ্ঞাপক। যেমন মহাভারতের অর্জুন। দুই হাতে তীর চালনায় সমান দক্ষ তিনি। সেহেতু তাঁকেই বলা হতো সব্যসাচী।

একালের সৈয়দ হক তীর চালান না, কলম চালান। যতদূর জানি, এই বয়সে তিনি কলমের ব্যবহার কম করেন, বরং কী-বোর্ডেরই ব্যবহার করেন সমধিক। ফলে তীর থেকে কলম আর কলম থেকে কী-বোর্ড হয়ে উঠেছে একজন লক্ষ্যভেদীর অস্ত্র। এ বিবর্তন কালে কালে আরও পরিবর্তিত হতে পারে। এ বিবর্তন কেবল বস্তুর নয়, মানবমনীষার- তার ব্যক্তিক ও সামগ্রিক সৃষ্টিশীলতার। আশিতে উপনীত সব্যসাচী সৈয়দ হকের মধ্যে এই মনীষা ও সৃষ্টিশীলতার নবোদ্ভাবন লক্ষ্য করা যায়। তাই তার প্রতিটি জন্মদিনই এক ধরনের নবজন্ম। তার প্রতি উত্তর-প্রজন্মের সশ্রদ্ধ প্রণতি।

২৪.১২.২০১৫



সাবমিট

দুটি লাল পাখি থেকে সব্যসাচী

 মুহম্মদ নূরুল হুদা 
২৫ ডিসেম্বর ২০১৫, ১২:০০ এএম  | 
আট সন্তানের মধ্যে প্রথম, পিতা সদৃশবিধানসম্মত চিকিৎসক, মাতা সনাতন বাংলার এক পল্লীজননী। শৈশবে গ্রামের স্কুলে পাঠগ্রহণকালে রবীন্দ্রনাথের ‘আমাদের ছোট নদী’ পড়েই পদ মেলানোর নেশায় মেতে ওঠেন। তারপর এগারো-বারো বছর বয়সে বাড়ির রান্নাঘরের পাশে সজনেগাছে একটি লাল টুকটুকে পাখি দেখে দুলাইনের একটি পদ মেলালেন মুক্তক সাধুগদ্যবয়ানে, ‘আমার ঘরে জানালার পাশে গাছ রহিয়াছে / তাহার উপরে দুটি লাল পাখি বসিয়া আছে’। পড়েই বোঝা যায়, এই বর্ণনায় একটি ব্যতিক্রমী চিত্রকল্প আছে যেখানে ‘লাল’ শব্দটির ব্যবহার নিরীক্ষাপ্রবণ। ফলে এ বয়ানপঙ্ক্তির স্রষ্টা যে কালে কালে বাংলা ভাষায় একজন আপন মুদ্রাধারী সাহিত্যস্রষ্টা হবেন এমনটি আঁচ করা যায়। এ নিরীক্ষা মানুষ আর কেউ নন, আমাদের কালের বহুমাত্রিক শীর্ষসাহিত্যস্রষ্টা সৈয়দ শামসুল হক। সাতাশে ডিসেম্বর আশি পেরিয়ে তিনি একাশিতে পা দিচ্ছেন। আমরা তাকে বলি সব্যসাচী।

গত চারদশকেরও অধিক কালজুড়ে তিনি এ অভিধায় অভিহিত। কে কখন কোথায় এ অভিধা তাকে দিয়েছিল, তা আমাদের জানা নেই; কিন্তু এ অভিধার প্রতি নীরব সমর্থন জানিয়ে রেখেছেন তার সময়ের বাংলা ভাষাভাষী তাবৎ লেখক ও পাঠকসমাজ। ভবিষ্যতে এ অভিধা যে আরও পোক্ত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা এ সুপরিচিত অভিধা নিয়ে কথা বলছি এ জন্য যে, এর ভেতরেই নিহিত আছে সৃষ্টিশীল শিল্পী হিসেবে তার শক্তিমত্তা ও ব্যাপ্তি। সাধারণত যারা বহুমাত্রিক ও অতিপ্রজ লেখক তাদের সবারই একটি মুখ্য পরিচিতি থাকে বিশেষ কোনো আঙ্গিকে, যাকে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই প্রধান ও পছন্দসই মনে করেন। আবার এ-ও সত্য, সবগুলো ধারার মধ্যে একটি ধারাতেই তার মূল পরিচয়, অন্যগুলো সম্পূরক মাত্র। আসলে এমনটিই হয়ে থাকে প্রায় সবার ক্ষেত্রে। কিন্তু অবাক করার বিষয় এই যে, এটি সৈয়দ শামসুল হকের জন্য প্রযোজ্য বলে মনে হয় না। যারা তার নিবিষ্ট পাঠক, তারা খুব ভালো করেই জানেন, গদ্য-পদ্যে তো বটেই, গল্প-কবিতা-নাটক-উপন্যাস-প্রবন্ধ-কাব্যনাট্য-অনুবাদ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রকরণেও তিনি প্রায় সমান দক্ষতার পরিচয় অব্যাহত রেখে লিখে চলেছেন ষাট বছরেরও অধিক কাল ধরে, যা যে কোনো সাহিত্যেই সহজ লক্ষ্য নয়। সেই ১৯৫৪ সালে ‘তাস’ শীর্ষক গল্পগ্রন্থ দিয়ে তার প্রকাশনা শুরু, তারপর আর পেছন ফেরা নেই। আমি নিজেও তার গল্প ‘রক্তগোলাপ’ পাঠ করেই তার প্রতি আকৃষ্ট হই সেই বিশ শতকের ষাটের দশকে, তারপর আমাকে প্রবলভাবে আক্রান্ত করে তার একটি দীর্ঘ কবিতা : ‘বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালা’, যার অসংখ্য পঙ্ক্তি আমার স্মৃতিতে দীর্ঘদিন জাগ্রত ছিল। মানবজীবন, মনোবিবর্তন, তৎসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবয়ান ও সামষ্টিক স্বীকারোক্তির কারণেই এ কাব্যটি এখনও আমার কাছে অনন্য। সম্ভবত এটিই বাংলাদেশের কবিতায় কনফেশনাল পয়েট্রির এক আদি সফল নমুনা। দেশ, ইতিহাস, ব্যক্তিমানুষ ও জাতিমানুষের এক বিশেষ সময়খণ্ডের এমন সাহসী ও শৈল্পিক দলিল সহজে দেখা যায় না। সবচেয়ে বড় কথা, এ বয়ানের অক্ষরবৃত্তীয় গতি ও বিবর্তিত চিত্রকল্প, যা এ কবিতাকে সহজবোধ্য ও রহস্যসঞ্চারী এই দুই বিপরীত বৈশিষ্ট্যে ঋদ্ধ করে রেখেছে।

‘রক্তগোলাপ’ ও ‘বৈশাখে রচিত পঙ্ক্তিমালা’ পাঠ করার পর বিশ শতকের সেই মধ্য-ষাটেই আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম, আমি এক বিশ্বমানের লেখকের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছি, যদিও তিনি তখনও পূর্ণভাবে বিকশিত হওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ। আর আজ তার বিপুল সাহিত্য-সম্ভারের তুঙ্গীয় কর্মের দিকে তাকিয়ে নির্দ্বিধায় বলতে পারি : না, আমার বা আমাদের সময়ের অনেকের অনুমান মিথ্যে হয়নি। আজ তিনি শুধু বাংলাদেশেরই শীর্ষতম বহুমাত্রিকদের একজন নন, বরং সমগ্র বাংলা ভাষায়, এমনকি সমসাময়িক বিশ্বের সাহিত্যস ষ্টাদের মধ্যেও তার অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণভাবে সুনির্ণীত। কেননা এ-যাবৎ রচিত তার শতাধিক গ্রন্থের মধ্যে বিভিন্ন আঙ্গিকে এমন কিছু রচনা আছে যা শৈল্পিক সংহতি, ব্যাপ্তি, বাণী ও ইশারাময়তার জন্য মাস্টারপিস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। আর এ সব রচনায় তিনি অর্জন করেছেন এমন এক মুদ্রা, যা একান্তভাবেই তার। এটাকে আমরা বলতে পারি হক-মুদ্রা। এমন হক-মুদ্রার সতর্ক ব্যবহার তার যে কোনো গদ্যে-পদ্যে সুলভ, তবে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই তার বহুল-পরিচিত ‘পরানের গহীন ভিতর’, ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘নুরলদীনের সারা জীবন’, ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ ইত্যাদির মধ্যে, যেখানে তিনি স্বভাষা, ব্যক্তিপুরাণ, স্বকাল, ইতিহাস ও মানবসভ্যতার নানাকৌণিক সংশ্লেষ সম্পন্ন করেছেন। আমি জানি, এ মন্তব্য বৈধকরণের জন্য যে বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন তার সুযোগ এখানে নেই। তবে এটুকু বলতে পারি, আজীবন অনন্য ব্যক্তিমুদ্রার সাধক সৈয়দ হক তার শব্দে, বাক্যে, পুরাণের নবায়নে, ব্যক্তির বিবর্তিন পরিচিতি নির্মাণে, ঐতিহাসিক সত্যের স্বতন্ত্র ব্যাখ্যায়, বাঙালি জাতির প্রকৃতিসম্মত ও ইতিহাসবাহিত বিবর্তনের সচেতন নিরীক্ষক ও রূপকার। তাই তার রচনায় বাঙালির আদি পরিচয় থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধা বাঙালি ও একাত্তরোত্তর বিজয়ী বাঙালির পরিচয় সুবিধৃত। আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্বসভ্যতা ও বিশ্বমানুষ। তার যে কোনো স্বাতন্ত্র্যবাহী কবিতায় এর প্রতিফলন শনাক্তযোগ্য।

এ মুহূর্তে আমার সামনে আছে তার ‘ব্রহ্মপুত্রের প্রতি’ শীর্ষক একটি দীর্ঘ কবিতা। আমি এ কবিতার অংশবিশেষ উদ্ধৃতি করছি :

‘দশ লক্ষ ধর্ষিতার আর্তনাদে যখন নষ্টমান আমার শ্র“তি,

তিরিশ লক্ষ মানুষের রক্তে যখন প্লবমান আমার শ্রতি,

তিনকোটি মানুষের গৃহত্যাগে যখন বিলীয়মান আমার সভ্যতা,

বলীবর্দের দ্বিখণ্ডিত খুরে যখন কম্পমান আমার স্বপ্ন

... ... ...

তখন,

মহৎ ব্রহ্মপুত্র, স্মৃতিধর ব্রহ্মপুত্র,

আমার পিতামহের কৃষি-প্রতিভার আবিষ্কারক ব্রহ্মপুত্র,

অতীত ও ভবিষ্যতব্যাপী বিষয়সমূহের জন্যে

আমি আর কোথায় যাবো? - আমার প্রজাতির নিকটতম আত্মীয়,

কার কাছেই বা যাবো, তুমি ব্রহ্মপুত্র, তোমার কাছে ছাড়া?’

লক্ষ্য করার বিষয়, পুরো কবিতাটির ভাষাভঙ্গি যেমন চমকপ্রদ, তেমনি মানুষ, প্রকৃতি ও সমাজসভ্যতার বিবর্তনের নির্ণায়ক সূত্রটিও এখানে কাব্যিক স্বজ্ঞায় প্রত্যায়িত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্র এখানে প্রকৃতি, ব্যক্তি, জনতা ও বিশ্বমানুষের দ্যোতক। এ-ধরনের প্রতীকায়ন একজন মহৎ স্বপ্নভাষকের শনাক্তিচিহ্ন। গোত্রীয় শেকড়ে স্থিত থেকে বিশ্বব্যাপ্ত নীলিমায় ডানা মেলার এই শিল্পীত অঙ্গীকারই একটি নামকে ব্যক্তিনাম থেকে সর্বগ্রাহ্য একটি ‘সর্বনাম’-এ পরিণত করে। সৈয়দ হকের কর্মে সেই উপাদান লক্ষ্যযোগ্য।

এই উপাদান সবার কাছে দৃশ্যমান করার জন্য প্রয়োজন তার রচনার নিমগ্ন পাঠ ও সতর্ক বিশ্লেষণ। এটি গবেষক সম্প্রদায়ের জন্য তোলা রইল। ব্যক্তিনাম সর্বনামে পরিণত হওয়ার উদাহরণ ইতিহাসে সুপ্রচুর। যখন এমনটি ঘটে, তখন এ নামটিই হয়ে যায় কালান্তরে ভিন্ন অর্থজ্ঞাপক। যেমন মহাভারতের অর্জুন। দুই হাতে তীর চালনায় সমান দক্ষ তিনি। সেহেতু তাঁকেই বলা হতো সব্যসাচী।

একালের সৈয়দ হক তীর চালান না, কলম চালান। যতদূর জানি, এই বয়সে তিনি কলমের ব্যবহার কম করেন, বরং কী-বোর্ডেরই ব্যবহার করেন সমধিক। ফলে তীর থেকে কলম আর কলম থেকে কী-বোর্ড হয়ে উঠেছে একজন লক্ষ্যভেদীর অস্ত্র। এ বিবর্তন কালে কালে আরও পরিবর্তিত হতে পারে। এ বিবর্তন কেবল বস্তুর নয়, মানবমনীষার- তার ব্যক্তিক ও সামগ্রিক সৃষ্টিশীলতার। আশিতে উপনীত সব্যসাচী সৈয়দ হকের মধ্যে এই মনীষা ও সৃষ্টিশীলতার নবোদ্ভাবন লক্ষ্য করা যায়। তাই তার প্রতিটি জন্মদিনই এক ধরনের নবজন্ম। তার প্রতি উত্তর-প্রজন্মের সশ্রদ্ধ প্রণতি।

২৪.১২.২০১৫



 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র