jugantor
সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন

  আসাদ উল্লাহ  

২৫ ডিসেম্বর ২০১৫, ০০:০০:০০  | 

যথার্থ অর্থে আমাদের সাহিত্যে বাঙালির মুক্তির স্বপ্ন রূপায়িত হয় ১৯৪৭ পরবর্তী সাহিত্যের ভেতর। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১, এ সময়কাল বাংলাদেশের মানুষের জীবনের সবচেয়ে ঘটনাবহুল কাল। ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে মুক্তির যে চেতনা এ অঞ্চলের মানুষের মন ও মননে প্রোথিত হয় একাত্তরের সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে তা চরম উৎকর্ষতা লাভ করে। বাঙালি অর্জন করে তার কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যাপক আকারে উদ্ভাসিত। গল্প কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, রম্যসহ এমন কোনো শাখা নেই যেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কমবেশি প্রতিফলিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য অনিবার্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে এবং হচ্ছে বাংলাদেশের লেখকদের কাছে। কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের দুঃসহ দিনের অর্থাৎ পাকিস্তানিদের শোষণ, নির্যাতন, অত্যাচার উৎপীড়ন ছবির মতো ফুঠে উঠেছে। একই সঙ্গে বীর বাঙালির প্রতিবাদ প্রতিরোধের চিত্রও অঙ্কিত হয়েছে অসাধারণ মুন্সীয়ানায়।

বাংলাদেশের নাট্যকররা অসাধারণ দক্ষতায় নাটকের ভেতর দিয়ে এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ আর এ যুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখেছেন। তবে এ কথা উজ্জ্বল সত্য, বাংলাদেশের কবিরা কবিতার ভেতর অসাধারণ শক্তিমত্তায় মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় দিনগুলোর চিত্র যেমন অঙ্কিত করেছেন, তেমনি বাঙালির মন-প্রাণকে প্রদীপ্ত করার প্রয়াস পেয়েছেন। আমরা যদি জীবন ও সমাজের খুব গভীরে দৃষ্টি দিই তাহলে একটি বিষয় স্পষ্টতই ধরা পড়ে- তা হল যে অর্থে মুক্তির বিষয়টি আমরা উপলব্ধি করি সে অর্থে আসলে আমাদের মুক্তি আসেনি। ফলে লড়াইটি থেমে নেই, আর এই যে থেমে নেই এর মূলে নিয়ত ক্রিয়াশীল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংবলিত কবিতার সঞ্জীবনী সুধা। প্রবন্ধ ও রম্য রচয়িতারাও অত্যন্ত যুক্তিনিষ্ঠ ভাষায় মুক্তির চেতনা তাদের রচনায় যথাযথ মর্যাদায় অভিসিক্ত করেছেন।

বাংলা কথাসাহিত্যে উপন্যাস নিঃসন্দেহ সমৃদ্ধধারার নাম। আমাদের ঔপন্যাসিকরা সমাজের বিভিন্ন চিত্র যেমন শব্দশিল্পে ফুটিয়ে তুলেছেন, তেমনি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলীকে প্রতিপাদ্য করে শিল্প সার্থক উপন্যাস রচনায় দক্ষতা দেখিয়েছেন। একাত্তরের পর থেকে আজকের দিন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আবর্তিত করে অগুণতি উপন্যাস রচিত হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে বোধ করি।

আমাদের ঔপন্যাসিকদের মধ্যে শওকত ওসমান এক দ্যুতিময় নক্ষত্রের নাম। শওকত ওসমানের বেশ কিছু উপন্যাসের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংবলিত চারটি উপন্যাস- ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’, ‘নেকড়ে অরণ্যে’, ‘দুই সৈনিক’ ও ‘জলাঙ্গী’ আমাদের অমূল্য সম্পদ। ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’ উপন্যাসটি যুদ্ধের ভয়াবহতা কাটতে না কাটতেই প্রকাশি হয়। এ উপনাসে একদিকে পাকিস্তানিদের বর্বরতা যেমন চিত্রিত হয়েছে, তেমনি বাঙালির প্রতিরোধের দুর্দমনীয় শক্তির কথাও অঙ্কিত হয়েছে। বর্বর পাকিস্তানিরা যুদ্ধকালীন এ দেশের নারীদের ওপর অকথ্য পাশবিকতা চালিয়ে মধ্যযুগীয় অসভ্যতাকেও হার মানিয়েছিল। শওকত ওসমান তার ‘নেকড়ে অরণ্যে’ উপন্যাসে অত্যন্ত মায়াময় ভাষায় পাকিস্তানিদের নারী নির্যাতনের বিষয়টি লিপিবদ্ধ করেছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতাই বলি আর বিপন্ন সামাজিকতাই বলি- যে কোনো পরিবেশ পরিস্থিতিতে মানুষের হৃদয়বৃত্তিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া অবদমিত থাকে না। বরঞ্চ বিপন্ন সময়ের ক্যানভাসে হৃদয়ের কোমলতা যেন আরও গভীর থেকে সাবানের ফেনার মতো বুদ বুদ করে ওঠে। শওকত ওসমান তার ‘জলাঙ্গী’ উপন্যাসের ভেতর স্বদেশ প্রেমিক এক মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধ ও প্রেমে দ্বন্দ্ব মুখর মানসিকতার দুয়ার উন্মোচন করেছেন এবং যুদ্ধের মাঠে সেই যোদ্ধার নিহত হওয়ার বর্ণনা দরদমাখা ভাষায় তুলে ধরেছেন। ‘দুই সৈনিক’ উপন্যাসে যুদ্ধের উত্তাল দিনে এ দেশের নারীরাও যে পিছিয়ে থাকেনি এ বাস্তবতা উচ্চকিত হয়ে উঠেছে।

মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাক্রম নিয়ে উপন্যাস লিখিয়েদের মধ্যে শওকত আলী নিঃসন্দেহে অন্যতম। তার রচিত ‘যাত্রা’ উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ উপন্যাসে একাত্তরের ২৫ মার্চের কালোরাত্রির বর্ণনা যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে ভেতো ও ভীতু বাঙালির তকমা ভূলণ্ঠিত করে সংঘবদ্ধ ও সুসংহত হয়ে বাঙালির জেগে ওঠার বর্ণনা। উপন্যাসে অধ্যাপক হাসানের বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত। অধ্যাপক হাসান তার বক্তব্যে স্বপ্ন আর আশা জাগানিয়া বাঙালির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বলেছেন ‘আশাবাদী না হয়ে আমাদের গত্যন্তর নেই। এখন আমাদের জীবনের আরেক নাম হয়ে উঠেছে স্বাধীনতা’। সৈয়দ শামসুল হকের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক লেখা অজস্র। সব্যসাচী লেখক বলে খ্যাত এ লেখকের ‘নীল দংশন’ ও ‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাস দুটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তির উপন্যাসগুলোর ভেতর আলোকিত নাম। উপন্যাস দুটিতেই লেখক শুধু যুদ্ধ দিনের ভয়বহতা তুলে ধরেননি, একই সঙ্গে তুলে ধরেছেন বীর বাঙালির বীরত্বের কথাও। ফলে দুটি উপন্যাসই হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল চেতনার ধারক।

আর একজন কথা সাহিত্যিক আনোয়ার পাশা। যতদিন বাঙালি বাংলাদেশ আর বাংলা ভাষা থাকবে ততদিনই কথা সাহিত্যের ভুবনে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে তার রচিত উপন্যাস ‘রাইফেল রুটি আওরাত’। যুদ্ধকালীন এ উপন্যাসে আনোয়ার পাশা একদিকে আত্মজৈবনিক উপাদান আরেক দিকে মুক্তিযুদ্ধের সত্যাসত্যতা শিল্পসার্থক প্রক্রিয়ায় উপস্থাপন করেছেন। তিনি তুলে ধরেছেন ২৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় বর্বর পাকহানাদারদের ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। এ উপন্যাসের একটি অন্যতম বিষয়- অসাম্প্রদায়িক চেতনা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে গতিসিদ্ধ করেছে এ অনিবার্য বাস্তবতা।

‘বিরহ বিজয়’ ফাইজুস সালেহীনের এক অনন্য সাধারণ উপন্যাস। এ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের ভূমিকা তুলে ধরায় শিল্পের নিপুণ কারিগরি প্রদর্শন করেছেন। উপন্যাসে তুলে ধরা নূরুল ফয়েজের অন্যরকম দেবদাস হয়ে ফিরে আসার ভেতর যেমন যুদ্ধবিধ্বস্ত সৈনিক ও বিরহাক্রান্ত প্রেমিকের ছবি ফুটে উঠেছে, তেমনি ফুটে উঠেছে যুদ্ধপরবর্তী দেশের ধ্বংসাবশেষের ছবি। যুদ্ধে শহীদ মজিবুর স্যারের বুকে বিছিয়ে দেয়ার জন্য মকসুদ খলিফা যে ছোট একটি পতাকা নিয়ে আসে, তা যতই ছোট হোক, আসলে ছোট নয়; মকসুদ খলিফা যেন প্রকারান্তরে বাংলাদেশটিই বিছিয়ে দিচ্ছেন এ শহীদের বুকে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসংবলিত উপন্যাসের ধারাক্রম খাটো নয়, দীর্ঘ। এ ধারার অপরাপর উপন্যাসগুলোর মধ্যে রশীদ হায়দারের ‘খাঁচায়’, ‘অন্ধকথামালা’, সেলিনা হোসেনের ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’, মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন’, রশীদ করিমের ‘আমার যত গ্লানি’, রাবেয়া খাতুনের ‘ফেরারি সূর্য’, হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ অন্যতম। উপন্যাস ছাড়াও আমাদের কথাশিল্পীদের রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগানিয়া অসংখ্য ছোটগল্প।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সবচেয়ে বেশি স্পন্দিত করেছে কবিতা শিল্পকে। চৈনিক কথাশিল্পী লু শুন যদিও বলেছেন ‘কবিতা লিখে বিপ্লব করা যায় না, বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন বন্দুকের’। তারপরও এ কথা ঠিক যুদ্ধাস্ত্রই সব নয়, যুদ্ধাস্ত্রই একমাত্র নয়। যদি তাই হতো তাহলে ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার পরাজয় হতো না, বর্বর পাকবাহিনীও পরাহত হতো না বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে। অস্ত্র আসলে লড়াই করে না, লড়াই করে মূলত মানুষই। আর লড়াকু মানুষকে সবচেয়ে বেশি উজ্জীবিত করে কবিতা এবং গান। সুতরাং আমাদের মানতেই হবে যুদ্ধ জয়ের জন্য যেমন বন্দুক চাই, তেমনি কবিতাও চাই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ ও সুকান্তের কবিতা মুক্তিফৌজের ভেতর সীমাহীন প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়েছে এ কথা বলাই বাহুল্য। পাশপাশি মুক্তিযুদ্ধকালীন ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়কাল থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনানির্ভর কবিতা রচয়িত হয়েছে পর্যাপ্ত এবং বর্তমানেও হচ্ছে। এসব কবিতায় যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা উঠে আসছে এবং উঠে আসছে বাঙালির বীরত্ব ও আত্মোৎসর্গের গৌরব গাথা।

শামসুর রাহমানের ‘সন্ত্রাসবন্দী বুলেটবিদ্ধ দিনরাত্রি’ কবিতায় হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের কথা বর্ণিত হয়েছে অসাধারণ কাব্য কারিশমায়-

‘কখনো নিঝুম পথে হঠাৎ লুটিয়ে পড়ে কেউ গুলির আঘাতে,

মনে হয় ওরা গুলিবিদ্ধ করে স্বাধীনতাকেই।

দিন-দুপুরেই জীপে একজন তরুণকে কানামাছি করে নিয়ে যায় ওরা,

মনে হয় চোখ-বাঁধা স্বাধীনতা যাচ্ছে বধ্যভূমিতে’।

হেলাল হাফিজের-

‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়

এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’।

‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ শিরোনামের এ কবিতাটি মুক্তিকামী মানুষের ভেতর জাগিয়ে তুলেছিল আরেক মানুষ, যে মানুষ স্বপ্ন বাস্তবায়নের স্বপ্নে মানসিক দৃঢ়তায় অনেক বেশি উচ্চকিত হয়েছিল।

আত্মপ্রতিষ্ঠা আর অধিকার প্রতিষ্ঠার অপ্রতিরোধ্য তৃষ্ণাই বাঙালিকে করেছে দুরন্ত-দুর্বার। বাঙালি জানে কী করে মাথা উঁচিয়ে বাঁচতে হয়। যে কারণেই একাত্তর এ জাতির কাছে বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত কোনো ঘটনা নয়, দীর্ঘদিনের লড়াই সংগ্রামের চূড়ান্ত ফলস। হাসান হাফিজুর রহমান তার ‘গেরিলা’ কবিতায় বিষয়টির চমৎকার রেখাচিত্র অঙ্কন করেছেন-

‘বাংলার আপদে আজ লক্ষ কোটি বীর সেনা

ঘরে ও বাইরে হাঁকে রনধ্বনি একটি শপথে

আজ হয়ে যায় শৗর্য ও বীরগাঁথার মহান

সৈনিক, যেন সূর্যসেন, যেন স্পার্টকাস স্বয়ং সবাই।’

কোনো আন্দোলনই একক হয় না। সব শ্রেণী-পেশার মানুষের সংঘবদ্ধ আর সুশৃংখল অংশগ্রহণের ভেতর দিয়েই আন্দোলন তার চূড়ান্ত রূপ লাভের যোগ্যতা অর্জন করে। মানুষের এই যে সংঘবদ্ধ অবস্থান, তাও সুসংহত হয় ভাষার কারিশমায়। যে ভাষা শিল্পাশ্রয়ী, সাহিত্যাশ্রয়ী। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান খুব সাদা-মাঠা ভাষায় যদি বাঙালিকে এক কাতারে আনার চেষ্টা করতেন তাহলে সফল নাও হতে পারতেন। তিনি যে ভাষার আশ্রয় নিয়েছেন তা শিল্পাশ্রয়ী তো বটেই এর সাহিত্যমানও তর্কাতীত। হয়তো এ জন্যই নির্মলেন্দু গুণ জাতির জনকের এ ভাষণকে কবিতা বলেছেন, বলেছেন অমর কবিতা। এ নিয়ে ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হল’ শিরোনামে গুণ’যে কবিতা রচনা করেছেন তার অংশবিশেষ এ রকম-

‘একটি কবিতা পড়া হবে তার জন্য কী ব্যাকুল প্রতীক্ষা মানুষের।

‘কখন আসবে কবি? ‘কখন আসবে কবি?

শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে

অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।

তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,

হৃদয়ে লাগিল দোলা

জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা-

কে রোধে তাঁহার বজ কণ্ঠ বাণী?

গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তার অমর কবিতা খানি:

এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম

এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

নির্মলেন্দু গুণ তার এ কবিতার ভেতর দুটি সংবাদ তুলে ধরেছেন। প্রথম সংবাদ ইতিহাসের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান, দ্বিতীয় সংবাদ একাত্তরের মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে জ্বলে ওঠা দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করা কবি ও কবিতা বাংলা সাহিত্যের দরবারে এক অনিন্দ্য সুন্দর ঝুল বারান্দার নাম। এ ধারার কবিতার মধ্যে জসীম উদ্দীনের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ সুফিয়া কামালের ‘উদাত্ত বাংলা’ আহসান হাবীবের ‘স্বাধীনতা’ হাসান হাফিজুর রহমানের ‘তোমার আপন পতাকা’ আবু জাফর ওবায়দুল্লার ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ আবু হেনা মোস্তফা কামালের আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘মুক্তিযুদ্ধ’ মহাদেব সাহার ‘ফিরে আসা গ্রাম’ হুমায়ুন আজাদের ‘মুক্তিবাহনীর জন্যে’ আবিদ আজাদের ‘এখন যে কবিতাটি লিখব আমি’ রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লার ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ আবুল হাসানের ‘উচ্চারণগুলি শোকের’ শিরোনামে কবিতার মতো অসংখ্য কবিতা রয়েছে যা পাঠ করে আমরা শুধু আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে পরিচিত হাচ্ছি না, একই সঙ্গে আমাদের নিজস্ব চেতনাকে শানিত করারও প্রয়াস পাচ্ছি।

মুক্তির চেতনা যেদিন থেকে বাঙালির মনে জাগরিত হয়েছে, মূলত সেদিন থেকেই যুদ্ধ শুরু হয়েছে। মানুষের মনোজাগতিক এ গোপন চেতনার কথা সাহিত্যেই প্রথম প্রতিফলিত হয়। যুদ্ধের দামামা যখন বেজে ওঠে সাহিত্যও তখন সরব হয়ে ওঠে। যুদ্ধের ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করা প্রতিটি দেশের সাহিত্যের বেলায় একথা উজ্জ্বল সত্য। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে পৃথিবীর নানা দেশে রচিত সাহিত্য সেই সাক্ষ্য দেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে আবর্তিত করে গড়ে উঠা সাহিত্যের বিশাল ভুবন সঙ্গতই কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, সময় ও সাহিত্যের ধারাবাহিক ফসল। মুক্তিযুদ্ধ যেমন বাঙালির

গৌরব করার জায়গা, তেমনি এ যুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য এ জাতির উচ্ছ্বাসের জায়গা, আবেগের জায়গা, ভালোবাসার জায়গা। আগামীদিনের জাতিকে এ সাহিত্য দুর্যোগ, দুর্বিপাকে পথ দেখাবে, অনুপ্রেরণা জোগাবে একথা অনিবার্য সত্য। এ সাহিত্যের ভেতর দিয়েই জাতি তার ইতিহাস, ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হবে; পাবে নিজস্ব ঠিকানালয়ের সন্ধান।


 

সাবমিট

সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন

 আসাদ উল্লাহ 
২৫ ডিসেম্বর ২০১৫, ১২:০০ এএম  | 

যথার্থ অর্থে আমাদের সাহিত্যে বাঙালির মুক্তির স্বপ্ন রূপায়িত হয় ১৯৪৭ পরবর্তী সাহিত্যের ভেতর। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১, এ সময়কাল বাংলাদেশের মানুষের জীবনের সবচেয়ে ঘটনাবহুল কাল। ভাষা আন্দোলনের ভেতর দিয়ে মুক্তির যে চেতনা এ অঞ্চলের মানুষের মন ও মননে প্রোথিত হয় একাত্তরের সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে তা চরম উৎকর্ষতা লাভ করে। বাঙালি অর্জন করে তার কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যাপক আকারে উদ্ভাসিত। গল্প কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, রম্যসহ এমন কোনো শাখা নেই যেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কমবেশি প্রতিফলিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের তাৎপর্য অনিবার্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে এবং হচ্ছে বাংলাদেশের লেখকদের কাছে। কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের দুঃসহ দিনের অর্থাৎ পাকিস্তানিদের শোষণ, নির্যাতন, অত্যাচার উৎপীড়ন ছবির মতো ফুঠে উঠেছে। একই সঙ্গে বীর বাঙালির প্রতিবাদ প্রতিরোধের চিত্রও অঙ্কিত হয়েছে অসাধারণ মুন্সীয়ানায়।

বাংলাদেশের নাট্যকররা অসাধারণ দক্ষতায় নাটকের ভেতর দিয়ে এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ আর এ যুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখেছেন। তবে এ কথা উজ্জ্বল সত্য, বাংলাদেশের কবিরা কবিতার ভেতর অসাধারণ শক্তিমত্তায় মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় দিনগুলোর চিত্র যেমন অঙ্কিত করেছেন, তেমনি বাঙালির মন-প্রাণকে প্রদীপ্ত করার প্রয়াস পেয়েছেন। আমরা যদি জীবন ও সমাজের খুব গভীরে দৃষ্টি দিই তাহলে একটি বিষয় স্পষ্টতই ধরা পড়ে- তা হল যে অর্থে মুক্তির বিষয়টি আমরা উপলব্ধি করি সে অর্থে আসলে আমাদের মুক্তি আসেনি। ফলে লড়াইটি থেমে নেই, আর এই যে থেমে নেই এর মূলে নিয়ত ক্রিয়াশীল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংবলিত কবিতার সঞ্জীবনী সুধা। প্রবন্ধ ও রম্য রচয়িতারাও অত্যন্ত যুক্তিনিষ্ঠ ভাষায় মুক্তির চেতনা তাদের রচনায় যথাযথ মর্যাদায় অভিসিক্ত করেছেন।

বাংলা কথাসাহিত্যে উপন্যাস নিঃসন্দেহ সমৃদ্ধধারার নাম। আমাদের ঔপন্যাসিকরা সমাজের বিভিন্ন চিত্র যেমন শব্দশিল্পে ফুটিয়ে তুলেছেন, তেমনি অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলীকে প্রতিপাদ্য করে শিল্প সার্থক উপন্যাস রচনায় দক্ষতা দেখিয়েছেন। একাত্তরের পর থেকে আজকের দিন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আবর্তিত করে অগুণতি উপন্যাস রচিত হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে বোধ করি।

আমাদের ঔপন্যাসিকদের মধ্যে শওকত ওসমান এক দ্যুতিময় নক্ষত্রের নাম। শওকত ওসমানের বেশ কিছু উপন্যাসের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংবলিত চারটি উপন্যাস- ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’, ‘নেকড়ে অরণ্যে’, ‘দুই সৈনিক’ ও ‘জলাঙ্গী’ আমাদের অমূল্য সম্পদ। ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’ উপন্যাসটি যুদ্ধের ভয়াবহতা কাটতে না কাটতেই প্রকাশি হয়। এ উপনাসে একদিকে পাকিস্তানিদের বর্বরতা যেমন চিত্রিত হয়েছে, তেমনি বাঙালির প্রতিরোধের দুর্দমনীয় শক্তির কথাও অঙ্কিত হয়েছে। বর্বর পাকিস্তানিরা যুদ্ধকালীন এ দেশের নারীদের ওপর অকথ্য পাশবিকতা চালিয়ে মধ্যযুগীয় অসভ্যতাকেও হার মানিয়েছিল। শওকত ওসমান তার ‘নেকড়ে অরণ্যে’ উপন্যাসে অত্যন্ত মায়াময় ভাষায় পাকিস্তানিদের নারী নির্যাতনের বিষয়টি লিপিবদ্ধ করেছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতাই বলি আর বিপন্ন সামাজিকতাই বলি- যে কোনো পরিবেশ পরিস্থিতিতে মানুষের হৃদয়বৃত্তিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া অবদমিত থাকে না। বরঞ্চ বিপন্ন সময়ের ক্যানভাসে হৃদয়ের কোমলতা যেন আরও গভীর থেকে সাবানের ফেনার মতো বুদ বুদ করে ওঠে। শওকত ওসমান তার ‘জলাঙ্গী’ উপন্যাসের ভেতর স্বদেশ প্রেমিক এক মুক্তিযোদ্ধার যুদ্ধ ও প্রেমে দ্বন্দ্ব মুখর মানসিকতার দুয়ার উন্মোচন করেছেন এবং যুদ্ধের মাঠে সেই যোদ্ধার নিহত হওয়ার বর্ণনা দরদমাখা ভাষায় তুলে ধরেছেন। ‘দুই সৈনিক’ উপন্যাসে যুদ্ধের উত্তাল দিনে এ দেশের নারীরাও যে পিছিয়ে থাকেনি এ বাস্তবতা উচ্চকিত হয়ে উঠেছে।

মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাক্রম নিয়ে উপন্যাস লিখিয়েদের মধ্যে শওকত আলী নিঃসন্দেহে অন্যতম। তার রচিত ‘যাত্রা’ উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ উপন্যাসে একাত্তরের ২৫ মার্চের কালোরাত্রির বর্ণনা যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে ভেতো ও ভীতু বাঙালির তকমা ভূলণ্ঠিত করে সংঘবদ্ধ ও সুসংহত হয়ে বাঙালির জেগে ওঠার বর্ণনা। উপন্যাসে অধ্যাপক হাসানের বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত। অধ্যাপক হাসান তার বক্তব্যে স্বপ্ন আর আশা জাগানিয়া বাঙালির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বলেছেন ‘আশাবাদী না হয়ে আমাদের গত্যন্তর নেই। এখন আমাদের জীবনের আরেক নাম হয়ে উঠেছে স্বাধীনতা’। সৈয়দ শামসুল হকের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক লেখা অজস্র। সব্যসাচী লেখক বলে খ্যাত এ লেখকের ‘নীল দংশন’ ও ‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাস দুটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তির উপন্যাসগুলোর ভেতর আলোকিত নাম। উপন্যাস দুটিতেই লেখক শুধু যুদ্ধ দিনের ভয়বহতা তুলে ধরেননি, একই সঙ্গে তুলে ধরেছেন বীর বাঙালির বীরত্বের কথাও। ফলে দুটি উপন্যাসই হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল চেতনার ধারক।

আর একজন কথা সাহিত্যিক আনোয়ার পাশা। যতদিন বাঙালি বাংলাদেশ আর বাংলা ভাষা থাকবে ততদিনই কথা সাহিত্যের ভুবনে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে তার রচিত উপন্যাস ‘রাইফেল রুটি আওরাত’। যুদ্ধকালীন এ উপন্যাসে আনোয়ার পাশা একদিকে আত্মজৈবনিক উপাদান আরেক দিকে মুক্তিযুদ্ধের সত্যাসত্যতা শিল্পসার্থক প্রক্রিয়ায় উপস্থাপন করেছেন। তিনি তুলে ধরেছেন ২৫ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় বর্বর পাকহানাদারদের ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। এ উপন্যাসের একটি অন্যতম বিষয়- অসাম্প্রদায়িক চেতনা আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে গতিসিদ্ধ করেছে এ অনিবার্য বাস্তবতা।

‘বিরহ বিজয়’ ফাইজুস সালেহীনের এক অনন্য সাধারণ উপন্যাস। এ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের ভূমিকা তুলে ধরায় শিল্পের নিপুণ কারিগরি প্রদর্শন করেছেন। উপন্যাসে তুলে ধরা নূরুল ফয়েজের অন্যরকম দেবদাস হয়ে ফিরে আসার ভেতর যেমন যুদ্ধবিধ্বস্ত সৈনিক ও বিরহাক্রান্ত প্রেমিকের ছবি ফুটে উঠেছে, তেমনি ফুটে উঠেছে যুদ্ধপরবর্তী দেশের ধ্বংসাবশেষের ছবি। যুদ্ধে শহীদ মজিবুর স্যারের বুকে বিছিয়ে দেয়ার জন্য মকসুদ খলিফা যে ছোট একটি পতাকা নিয়ে আসে, তা যতই ছোট হোক, আসলে ছোট নয়; মকসুদ খলিফা যেন প্রকারান্তরে বাংলাদেশটিই বিছিয়ে দিচ্ছেন এ শহীদের বুকে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসংবলিত উপন্যাসের ধারাক্রম খাটো নয়, দীর্ঘ। এ ধারার অপরাপর উপন্যাসগুলোর মধ্যে রশীদ হায়দারের ‘খাঁচায়’, ‘অন্ধকথামালা’, সেলিনা হোসেনের ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’, মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন’, রশীদ করিমের ‘আমার যত গ্লানি’, রাবেয়া খাতুনের ‘ফেরারি সূর্য’, হুমায়ূন আহমেদের ‘আগুনের পরশমণি’ অন্যতম। উপন্যাস ছাড়াও আমাদের কথাশিল্পীদের রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগানিয়া অসংখ্য ছোটগল্প।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সবচেয়ে বেশি স্পন্দিত করেছে কবিতা শিল্পকে। চৈনিক কথাশিল্পী লু শুন যদিও বলেছেন ‘কবিতা লিখে বিপ্লব করা যায় না, বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন বন্দুকের’। তারপরও এ কথা ঠিক যুদ্ধাস্ত্রই সব নয়, যুদ্ধাস্ত্রই একমাত্র নয়। যদি তাই হতো তাহলে ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার পরাজয় হতো না, বর্বর পাকবাহিনীও পরাহত হতো না বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে। অস্ত্র আসলে লড়াই করে না, লড়াই করে মূলত মানুষই। আর লড়াকু মানুষকে সবচেয়ে বেশি উজ্জীবিত করে কবিতা এবং গান। সুতরাং আমাদের মানতেই হবে যুদ্ধ জয়ের জন্য যেমন বন্দুক চাই, তেমনি কবিতাও চাই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ ও সুকান্তের কবিতা মুক্তিফৌজের ভেতর সীমাহীন প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়েছে এ কথা বলাই বাহুল্য। পাশপাশি মুক্তিযুদ্ধকালীন ও মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়কাল থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনানির্ভর কবিতা রচয়িত হয়েছে পর্যাপ্ত এবং বর্তমানেও হচ্ছে। এসব কবিতায় যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা উঠে আসছে এবং উঠে আসছে বাঙালির বীরত্ব ও আত্মোৎসর্গের গৌরব গাথা।

শামসুর রাহমানের ‘সন্ত্রাসবন্দী বুলেটবিদ্ধ দিনরাত্রি’ কবিতায় হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারের কথা বর্ণিত হয়েছে অসাধারণ কাব্য কারিশমায়-

‘কখনো নিঝুম পথে হঠাৎ লুটিয়ে পড়ে কেউ গুলির আঘাতে,

মনে হয় ওরা গুলিবিদ্ধ করে স্বাধীনতাকেই।

দিন-দুপুরেই জীপে একজন তরুণকে কানামাছি করে নিয়ে যায় ওরা,

মনে হয় চোখ-বাঁধা স্বাধীনতা যাচ্ছে বধ্যভূমিতে’।

হেলাল হাফিজের-

‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়

এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’।

‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ শিরোনামের এ কবিতাটি মুক্তিকামী মানুষের ভেতর জাগিয়ে তুলেছিল আরেক মানুষ, যে মানুষ স্বপ্ন বাস্তবায়নের স্বপ্নে মানসিক দৃঢ়তায় অনেক বেশি উচ্চকিত হয়েছিল।

আত্মপ্রতিষ্ঠা আর অধিকার প্রতিষ্ঠার অপ্রতিরোধ্য তৃষ্ণাই বাঙালিকে করেছে দুরন্ত-দুর্বার। বাঙালি জানে কী করে মাথা উঁচিয়ে বাঁচতে হয়। যে কারণেই একাত্তর এ জাতির কাছে বিচ্ছিন্ন, বিক্ষিপ্ত কোনো ঘটনা নয়, দীর্ঘদিনের লড়াই সংগ্রামের চূড়ান্ত ফলস। হাসান হাফিজুর রহমান তার ‘গেরিলা’ কবিতায় বিষয়টির চমৎকার রেখাচিত্র অঙ্কন করেছেন-

‘বাংলার আপদে আজ লক্ষ কোটি বীর সেনা

ঘরে ও বাইরে হাঁকে রনধ্বনি একটি শপথে

আজ হয়ে যায় শৗর্য ও বীরগাঁথার মহান

সৈনিক, যেন সূর্যসেন, যেন স্পার্টকাস স্বয়ং সবাই।’

কোনো আন্দোলনই একক হয় না। সব শ্রেণী-পেশার মানুষের সংঘবদ্ধ আর সুশৃংখল অংশগ্রহণের ভেতর দিয়েই আন্দোলন তার চূড়ান্ত রূপ লাভের যোগ্যতা অর্জন করে। মানুষের এই যে সংঘবদ্ধ অবস্থান, তাও সুসংহত হয় ভাষার কারিশমায়। যে ভাষা শিল্পাশ্রয়ী, সাহিত্যাশ্রয়ী। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান খুব সাদা-মাঠা ভাষায় যদি বাঙালিকে এক কাতারে আনার চেষ্টা করতেন তাহলে সফল নাও হতে পারতেন। তিনি যে ভাষার আশ্রয় নিয়েছেন তা শিল্পাশ্রয়ী তো বটেই এর সাহিত্যমানও তর্কাতীত। হয়তো এ জন্যই নির্মলেন্দু গুণ জাতির জনকের এ ভাষণকে কবিতা বলেছেন, বলেছেন অমর কবিতা। এ নিয়ে ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হল’ শিরোনামে গুণ’যে কবিতা রচনা করেছেন তার অংশবিশেষ এ রকম-

‘একটি কবিতা পড়া হবে তার জন্য কী ব্যাকুল প্রতীক্ষা মানুষের।

‘কখন আসবে কবি? ‘কখন আসবে কবি?

শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে

অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।

তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,

হৃদয়ে লাগিল দোলা

জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা-

কে রোধে তাঁহার বজ কণ্ঠ বাণী?

গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তার অমর কবিতা খানি:

এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম

এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

নির্মলেন্দু গুণ তার এ কবিতার ভেতর দুটি সংবাদ তুলে ধরেছেন। প্রথম সংবাদ ইতিহাসের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান, দ্বিতীয় সংবাদ একাত্তরের মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে জ্বলে ওঠা দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দ্রোহের আগুন।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করা কবি ও কবিতা বাংলা সাহিত্যের দরবারে এক অনিন্দ্য সুন্দর ঝুল বারান্দার নাম। এ ধারার কবিতার মধ্যে জসীম উদ্দীনের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ সুফিয়া কামালের ‘উদাত্ত বাংলা’ আহসান হাবীবের ‘স্বাধীনতা’ হাসান হাফিজুর রহমানের ‘তোমার আপন পতাকা’ আবু জাফর ওবায়দুল্লার ‘আমি কিংবদন্তির কথা বলছি’ আবু হেনা মোস্তফা কামালের আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘মুক্তিযুদ্ধ’ মহাদেব সাহার ‘ফিরে আসা গ্রাম’ হুমায়ুন আজাদের ‘মুক্তিবাহনীর জন্যে’ আবিদ আজাদের ‘এখন যে কবিতাটি লিখব আমি’ রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লার ‘বাতাসে লাশের গন্ধ’ আবুল হাসানের ‘উচ্চারণগুলি শোকের’ শিরোনামে কবিতার মতো অসংখ্য কবিতা রয়েছে যা পাঠ করে আমরা শুধু আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে পরিচিত হাচ্ছি না, একই সঙ্গে আমাদের নিজস্ব চেতনাকে শানিত করারও প্রয়াস পাচ্ছি।

মুক্তির চেতনা যেদিন থেকে বাঙালির মনে জাগরিত হয়েছে, মূলত সেদিন থেকেই যুদ্ধ শুরু হয়েছে। মানুষের মনোজাগতিক এ গোপন চেতনার কথা সাহিত্যেই প্রথম প্রতিফলিত হয়। যুদ্ধের দামামা যখন বেজে ওঠে সাহিত্যও তখন সরব হয়ে ওঠে। যুদ্ধের ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করা প্রতিটি দেশের সাহিত্যের বেলায় একথা উজ্জ্বল সত্য। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কালে পৃথিবীর নানা দেশে রচিত সাহিত্য সেই সাক্ষ্য দেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে আবর্তিত করে গড়ে উঠা সাহিত্যের বিশাল ভুবন সঙ্গতই কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, সময় ও সাহিত্যের ধারাবাহিক ফসল। মুক্তিযুদ্ধ যেমন বাঙালির

গৌরব করার জায়গা, তেমনি এ যুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য এ জাতির উচ্ছ্বাসের জায়গা, আবেগের জায়গা, ভালোবাসার জায়গা। আগামীদিনের জাতিকে এ সাহিত্য দুর্যোগ, দুর্বিপাকে পথ দেখাবে, অনুপ্রেরণা জোগাবে একথা অনিবার্য সত্য। এ সাহিত্যের ভেতর দিয়েই জাতি তার ইতিহাস, ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হবে; পাবে নিজস্ব ঠিকানালয়ের সন্ধান।


 

 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র