¦
ভাব বিনিময়ে প্রাণীদের ভাষা

ড. নূরজাহান সরকার | প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

প্রাণিজগতের সব প্রাণী তাদের মাতৃভাষায় কথা বলে। জন্মসূত্রে পাওয়া ভাষায় একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। মনের ভাব বিনিময় করে। পৃথিবীর সব প্রাণী তথা এককোষী প্রাণী অ্যামিবা থেকে শুরু করে স্তন্যপায়ী প্রাণী পর্যন্ত নিজের ভাষায় নিজের ভাব প্রকাশ করতে পারদর্শী। তবে এদের ভাষা সবসময় শব্দ দিয়ে তৈরি নাও হতে পারে। যেমন রাসায়নিক নিঃসরণ, গন্ধ, ছোঁয়া, ভঙ্গি, মুখের ভাব, নানা ধরনের সংকেত, শব্দ, ডাক, গান প্রভৃতি দিয়ে তারা একে অপরের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান করে। যে প্রাণীর বুদ্ধিমত্তা যত বেশি সে প্রাণী তত উন্নত। আর বুদ্ধিমত্তা বা Intelligence এর ওপরই নির্ভর করে প্রাণীদের শেখার ক্ষমতা। যেমন অমেরুদণ্ডি প্রাণীদের মধ্যে অক্টোপাসের বুদ্ধিমত্তা বেশি তাই তাদের শেখার ক্ষমতাও বেশি। অন্যদিকে মেরুদণ্ডি প্রাণীদের মধ্যে শিম্পাঞ্জির শেখার ক্ষমতা বেশি। তবে ইদানীং গবেষণায় দেখা গেছে- বুদ্ধিমত্তার দিক দিয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে ডলফিনরা।
শিক্ষণ বা Learning আবার নানা ধরনের। যেমন Habituation, Trial and Error, Conditioning and Association, Insight & latent and Imprinting.এর মধ্যে¨ Imprinting type of learning বা শিক্ষাটা এমনই যে এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রাণী তার নিজের ভাষা ভুলে যায়। তাকে যে ভাষা শেখানো হয় সে ভাষাই স্থায়ী রূপ নেয়। যেমন পাহাড়ি ময়না মানুষের মতো কথা বলতে পারে। ময়নাকে যদি প্রতিদিন একই কথা বলা হয়- ‘ময়না কথা কও’। সে এটা শিখতে গিয়ে এক পর্যায়ে নিজের ডাক, গান বা ভাষা ভুলে যায়। আর এটি হয় চিরদিনের জন্য। প্রকৃতিতে পাখিটিকে ছেড়ে দিলে সে তার নিজের ডাক আর ডাকতে পারবে না, নিজের গান আর গাইতে পারবে না।
প্রাণীদের মধ্যে তিমি ও ডলফিনরা ৫ থেকে ১০ রকম শব্দ করে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে। এদের কেউ কেউ যেমন Bottlenose Dolphin একে অন্যের সঙ্গে একেক শব্দের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। বাদুড় তার শিকারি প্রাণীর বিভিন্ন প্রজাতির ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে প্রায় ৩৩ রকমের শব্দ বা সংকেত তৈরি করতে পারে। হাতি তার দলের একে অপরের শব্দ সুনিশ্চিতভাবে বুঝতে পারে। বানরের প্রজাতিগুলো তাদের ভাষার মাধ্যমেই যোগাযোগ করে। দুই বাড়ির দুই বিড়াল বাড়ির সীমানায় ঝগড়া করলে একটি জিতে অন্যটি হারে। লড়াই শেষে একে অন্যের গায়ে মূত্র লাগিয়ে দেয়। পরে আবার যখন এদের দেখা হয় তখন আর যুদ্ধ নয়। কারণ একে অপরের গন্ধ শুকে বুঝতে পারে আগের লড়াইয়ে কে হেরে গিয়েছিল আর কে জিতেছিল। তবে প্রাণিজগতে কেউ কারও সঙ্গে অহেতুক ঝগড়া বা মারামারি করে সময় ও শক্তির অপচয় করে না।
পাখির ভাষাকে বলা হয়- 'Green Language'. পাখিদের মধ্যে মজার বিষয় হল-Larynx এ বা syrinx Voice boxএ রূপান্তরিত হয়ে যায় ফলে এরা সুস্পষ্ট গান গাইতে পারে। তবে পুরুষ পাখিরাই গান গাইতে ওস্তাদ। ৯ হাজার ৫০০ প্রজাতির পাখিদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই হল গানের পাখি। এরা কত সুরে গান গায়! ভাবতে অবাক লাগে- গায়ক চড়ুইরাই ৯০টি সুরে গান গাইতে পারে!
পাখিরা স্বল্প শব্দ করে তাদের প্রয়োজনীয় কার্যক্রমের জন্য যেভাবে যোগাযোগ করে তাকে বলে ‘ডাক’। লম্বা ছন্দের শব্দের প্রকাশ করে গান গেয়ে। তবে পাখিরা প্রজননকালেই বেশি গান গায়। প্রজননকালে এদের প্রখরতা বেড়ে যায় এবং জোড়া বাঁধার পর তা এতটাই স্তিমিত হয়ে যায় যে পক্ষীবিজ্ঞানী জর্জ মিষ্ বলেন, ‘হঠাৎ করে আমি যখন অনুভব করি একান্ত নীরবতা তখন নিজের মনেই বলতে থাকি এখানকার পুরুষ পাখিরা হয় মরে গেছে, নয়তো তারা সবাই বিয়ে করে ফেলেছে।’ কোনো পুরুষ পাখি সঙ্গী হারালে আবার জোরেশোরে গানজুড়ে দেয় নতুন সঙ্গী পাওয়ার আশায়।
সাধারণত বড় পাখির স্বর নিচু ও ছোট পাখির স্বর স্পষ্ট এবং উঁচু হয়ে থাকে। যেসব পাখি সাধারণত ডাকে না এরা হল- বক, সারস, শকুন, পেলিক্যান প্রভৃতি। আমাদের দেশে গানের পাখিদের মধ্যে দোয়েল, শ্যামা, টুনটুনি, মুনিয়া, কোকিল উল্লেখযোগ্য। এক দোয়েলই সেই ভোরবেলা থেকে শুরু করে সারা দিন কত সুরেই না গান গায়! এদের ডাক ও গানের কারণ অনেক। যেমন- স্ত্রী পাখিকে আকর্ষণ, দল সংঘবদ্ধকরণ, শত্র“র হাত থেকে আবাস রক্ষা করা, শত্র“র আগমন জানিয়ে দেয়া, বাচ্চাকে গান শেখানো, ক্ষুধার কথা বাবা-মাকে জানানো, নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা, অন্য প্রজাতির পাখির সঙ্গে যোগাযোগ এমনকি অন্য প্রাণীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা।
পাখিরা ভিন্ন ভিন্ন ভাব প্রকাশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ডাকে। যেমন টুনটুনি হঠাৎ মানুষের আগমনে ‘চিপ... চিপ... চিপ... চিপ...’ করে। আবার আকাশে চিল উড়তে দেখলে শিশুদের সংকেত দেয় ‘জ্বি...জ্বি...’ শব্দ করে।
সরীসৃপদের মধ্যে কচ্ছপ দৃষ্টি গন্ধ প্রভৃতি দ্বারা যোগাযোগ রক্ষা করে। গুইসাপ-টিকটিকি লেজ নাড়িয়ে, হ্যাঁ করে, রঙ বদলিয়ে এবং শরীর অঙ্গভঙ্গি দ্বারা যোগাযোগ রক্ষা করে। সাপ যোগাযোগ করে Vibration বা কম্পন দ্বারা, গন্ধ নেয় জিহ্বার মাধ্যমে Jacobson's organ এর সাহায্যে। উভচর প্রাণীদের মধ্যে ব্যাঙের জুড়ি নেই। পুরুষ ব্যাঙের Vocal sac বা স্বরথলি রয়েছে। এরা প্রজননকালে ‘ঘ্যাওড় ঘ্যাং... ঘ্যাওড় ঘ্যাং...’ ডাকে স্ত্রী ব্যাঙকে আকর্ষণ করে।
অষবী নামের একটি কাকাতুয়ার (African Grey Parrot) কথা দিয়ে লেখা শেষ করছি। শিশুকাল থেকে কাকাতুয়া তার মালিকের সঙ্গে থাকতে থাকতে ২০০৭ সাল নাগাদ প্রায় ১৫০টি ইংরেজি শব্দ শিখেছিল এবং ৩১ বছর বয়সে মৃত্যুকালে এক রাতে তার মালিককে বলেছিল 'You be good, See you t omorrow, I love you!' বড়ই করুণ, আবেগময়!
লেখক : বন্যপ্রাণীবিদ, সাবেক চেয়ারম্যান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
 

প্রকৃতি ও জীবন পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close