¦
বাংলা ভাষায় প্রকৃতি চর্চা

ড. মোঃ শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া | প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

প্রকৃতি ও জীবন এক অতি অন্বিষ্ট দুটি সত্তা। জীবন ছাড়া প্রকৃতির চলছিল না বলেইতো জীবনের উদ্ভব। আবার প্রকৃতি ছাড়া যে জীবন চলে না সেওতো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের চারপাশের জীবজগৎ আর প্রকৃতি মিলে পৃথিবীটাকে এত সুন্দর করে তুলেছে। এ নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত, সাগর-মহাসাগর একেবারেই অর্থহীন হয়ে পড়ত যদি এদের মধ্যে জীবনের সন্তরণ না ঘটত। আমাদের চারপাশের প্রাণহীন এ প্রকৃতিকে প্রাণ দিয়েছে নানা রকম গাছগাছালি, পাখপাখালি আর বিচিত্র সব ছোট-বড় জলজ ও স্থলজ প্রাণী মিলে। আর সবকিছুকে ধারণ করেই গড়ে উঠেছে মানুষের সাম্রাজ্য। খানিকটা বেশি বুদ্ধিমান বলে চারপাশের প্রকৃতি আর জীবকূলকে সে ব্যবহার করেছে তার নিজের মতো করে। প্রকৃতি আর জীববৈচিত্র্যের প্রতি সানুগ্রহ মনোযোগ ছাড়াই একে ব্যবহার করেছে মানুষ অকাতরে। প্রকৃতি আর জীববৈচিত্র্যের প্রতি আমাদের এই যে অবিবেচনাপ্রসূত আচরণ প্রকৃতি তা আর সইতে নারাজ। এমনকি দ্রুত হ্রাসমান জীববৈচিত্র্য আজ আমাদের বাঁচা মরার এক কঠিন সংকটময় অবস্থায় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।
বাংলা ভাষায় প্রকৃতি বন্ধনার নমুনা আমাদের নেই তা কিন্তু নয়। আমাদের সাহিত্য সংস্কৃতিতে প্রকৃতি এক বড় অনুসঙ্গ হয়েই এসেছে। কাব্যে তো প্রকৃতি বড় উজ্জ্বল আর কমনীয় হয়েই প্রতিভাত হয়েছে। এমনকি আমাদের জীবজগতের নান্দনিক বিষয়গুলোও কোনো কোনো কবি-লেখকের লেখনীতে উঠে এসেছে নানাভাবে। এসব লেখার মধ্য দিয়ে আমরা মুগ্ধতার দিকটি যত স্পষ্ট করে পেয়েছি ততটা পাইনি এর বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ। নদী, পাহাড়, ফুল, গাছগাছালি, পাখি এসব নিয়েও কিছু গ্রন্থ যে বাংলা ভাষায় রচিত হয়নি তা কিন্তু নয়। তবে এসব গ্রন্থের মধ্য দিয়ে আমরা এদের বর্ণনামূলক বিষয়-আশয়ই বেশি পেয়েছি। আমাদের প্রাকৃতিক ও জীব পরিবেশ কীভাবে নষ্ট হচ্ছে এবং এদের রক্ষা করার কৌশল কি হতে পারে তা নিয়ে আমাদের মাতৃভাষায় রচনা বড় কম। আমাদের নানা স্তরের পাঠ্যপুস্তকে এসব বিষয় এখন অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বটে তবে এসব বিষয়ে গণসচেতনতা সৃষ্টি করা ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজন জনপ্রিয় বিজ্ঞান নিবন্ধ বা প্রবন্ধ প্রকাশ। আমাদের প্রকৃতি ও জীবজগতের এসব কঠিন বাস্তবতাকে সবার বোধগম্য করে তুলে ধরার জন্য প্রয়োজন বাংলা ভাষায় গ্রন্থ রচনা। আমাদের প্রকৃতি ও জীবজগৎ নিয়ে যে আনন্দময় ও উচ্ছ্বসিত প্রকাশ আগামী প্রজন্মের জন্য তা ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন আমাদের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ। আমাদের লেখনীর মধ্য দিয়ে এসব ব্যবস্থাপত্রের বিষয়-আশয়ও অবশ্যই তুলে আনা বড় আবশ্যক হয়ে পড়েছে।
নদী-নালা, খাল-বিল আজ মরতে বসেছে। আমাদের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ড আর তাৎক্ষণিক কিছু অর্জনের আকাক্সক্ষা আমাদের এসব প্রাকৃতিক জলাশয়কে বিপর্যস্ত করে তুলছে। বিপর্যস্ত করছে একইসঙ্গে আমাদের জলজ পরিবেশকে। জলে বাস করা মৎস্যকূল আর জলজপ্রাণীর জন্য তা হয়ে উঠেছে বিপদ সংকুল। জলজ গাছগাছালিও পড়ছে মারাত্মক হুমকির মুখে। আমাদের আনন্দের উৎস যে, পাখপাখালি এবারও ক্রমশ পড়ছে বিপদের মুখে। কমছে এদের বসবাসের আশ্রয়স্থল, কমছে এদের খাদ্যের উৎসও। নিরাপদ প্রজনন কর্মকাণ্ড এদের বিঘ্নিত হচ্ছে। আমাদের নিধনের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না বনবনানীও। এমনকি প্রাকৃতিক বন আজ দেদারছে উজাড় হচ্ছে। আমাদের বনে বাস করা পশুপাখি হারাচ্ছে তাদের আবাসস্থল। বৃক্ষরোপণ হচ্ছে বটে ঘটা করে, তবে এতে সংযোজিত হচ্ছে অনেক বিদেশী বৃক্ষ। আমাদের পাখপাখালির জন্য এদের অনেকেই বড় অচেনা। বনবনানী আমাদের অনেক ফসলাদির বুনো আত্মীয়স্বজনের আবাসস্থল। এদের আবাসস্থল নষ্ট হওয়ায় এসব মূল্যবান জিন সম্পদও দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে। এসব কথা আজ আমাদের তুলে আনতে হবে নানা লেখায়। প্রকৃতি ও জীবন নিয়ে আমাদের যে আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ তাকে তুলে আনতে হবে। আমাদের শিল্প-সাহিত্যে কেবল এর নান্দনিকতা নয়, তুলে আনতে হবে এর অনান্দনিক কর্মকাণ্ডকেও যা আমাদের চিরচেনা জানা পরিবেশকে বিনষ্ট করছে। মাতৃভাষায় সহজবোধ্য করে এসব কথা ছড়িয়ে দিতে হবে মানুষের মধ্যে। কঠিন নিরস পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে কেবল সীমাবদ্ধ না রেখে গণমানুষকে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন প্রচুর লেখালেখি। প্রচুর প্রবন্ধ-নিবন্ধ আর গ্রন্থ রচনা ও তার সুলভ প্রকাশনা।
প্রকৃতি আর জীবজগতের রূপমুগ্ধ মানুষ আমরা। এর কত বিষয়-আশয় উঠে এসেছে আমাদের শিল্পীদের তুলির আঁচড়ে। আমাদের ভাবনার জগতে এদের জন্য রয়েছে এক গোপন নিবাস। আজ তাকে আমাদের শানিত করে তুলতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রয়াসই কেবল রক্ষা করতে পারে আমাদের বিপন্ন প্রকৃতি ও জীবজগৎ। আর সবাইকে এগিয়ে আসার জন্যই প্রয়োজন সচেতনতা সৃষ্টি। সে কাজটি করতে হলে প্রয়োজন আরও বেশি জীবনঘনিষ্ঠ লেখালেখি। আর তার উত্তম ও সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম হল আমাদের বাংলা ভাষা।
লেখক : ফসল উন্নয়ন গবেষক, উদ্ভাবক ও লেখক
 

প্রকৃতি ও জীবন পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close