¦
বাংলাদেশের বাহারি ফার্ন

চয়ন বিকাশ ভদ্র | প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০১৫

Pteridophytes-এর Filicophyta বা Pterophyta বিভাগের Filicineae শ্রেণীর Filicinae বর্গের সদস্যরাই মূলত ফার্ন হলেও Pterophyta বিভাগের সদস্যদের প্রচলিতভাবে ফার্ন বলা হয়। ফার্ন উদ্ভিদ স্পোরোফাইটিক। এদের দেহ মূল, কাণ্ড ও পাতায় বিভক্ত। কাণ্ড শাখাবিহীন রাইজোম জাতীয়। অপুষ্পক এ উদ্ভিদের পাতা মেগাফাইলাস অর্থাৎ বড় এবং প্রধান শিরার একাধিক শাখা শিরা রয়েছে। পাতা সাধারণত পক্ষল যৌগিক। পাতাগুলো কচি অবস্থায় কুণ্ডলিত থাকে। একে Circinate vernation বলে। সাধারণত এদের ক্ষেত্রে স্পোরাঞ্জিয়া উর্বর পাতার পত্রকের কিনারা দিয়ে অথবা সমরূপ বা রূপান্তরিত উর্বর পাতার পত্রকের অংকীয় তলে জন্মায়। সংযুক্ত স্পোরাঞ্জিয়াকে সোরাস বলে। ফার্নের পাতাকে বলে Frond. কাণ্ড ও কচিপাতা সাধারণত বাদামি বর্ণের রোমযুক্ত আঁশ দ্বারা আবৃত থাকে। আঁশগুলোকে Ramenta বলে। এটি এ উদ্ভিদকে অনাবৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করে। ফার্ন বংশবৃদ্ধি করে স্পোর এবং রাইজোমের সাহায্যে।
ফার্ন পৃথিবীর সব দেশেই কমবেশি দেখা যায়। তবে সবচেয়ে বেশি জন্মায় ক্রান্তীয় অঞ্চলের আর্দ্র পার্বত্য ভূমিতে। রাস্তার পাশে, বনে-জঙ্গলে, পুরনো দালানের ভাঙা কার্নিশে অনেক ফার্ন জন্মায়। বনের গাছের ছায়াময় পরিবেশেও এদের ব্যাপক উপস্থিতি।
ফার্ন জাতীয় সদস্যদের মধ্যে কতকগুলো প্রকৃত জলজ যেমন Azolla, Salvinia এবং Ceratopteris. Marsilea জলাশয়ের কিনারে বা নিম্নভূমিতে উভচর হিসেবে জন্মায়। টাইগার ফার্ন Acrostihum aureum লোনা মাটির ফার্ন। অনেকগুলো ফার্ন পরাশ্রয়ী হিসেবে জন্মে। যেমন- Drynara, Pyrrosia, Microsorum, Ophioglossum ইত্যাদি। কিছু ফার্ন পাথুরে এবং অত্যন্ত শুষ্ক পরিবেশে জন্মে। যেমন- Adiantum, Pteris, Gleichenia ইত্যাদি। জলজ ফার্নের কিছু সংখ্যক প্রজাতি ছাড়া সবাই বহুবর্ষজীবী। বৃক্ষ ফার্ন Cyathea gigantea আকারে বড়।
বাহারি ফার্নের পরিবারগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- Oleandraceae, Pteridaceae, Marsileaceae, Adiantaceae I Salviniaceae.
প্রধানত রাইজোমকে খণ্ড খণ্ড করে বাহারি ফার্নের বংশবিস্তার করা যায়। কোনো কোনো প্রজাতি পাতার কিনারায় চারা উৎপাদন করে। বর্ষাকালে পাতার নিুপৃষ্ঠের কিনারার দিকে কতকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বৃক্কাকৃতি সোরাস দেখা যায়। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বংশবৃদ্ধির জন্য সাধারণত সোরাস ব্যবহৃত হয়। জাত অনুযায়ী জীবাণুমুক্ত মাধ্যমের ওপর স্পোর ছিটিয়ে আর্দ্র ও অন্ধকার স্থানে রাখার পর তিন থেকে ছয় সপ্তাহের মাথায় চারা উৎপন্ন হয়। সাধারণত টব বা ঝোলানো ঝুড়িতে ফার্নের চাষ হয়। ছায়াঘরে প্রায় ১০০ থেকে ৩০০ প্রজাতি জন্মে। ঘরের বারান্দায় বা অন্য গাছের ছায়ায় টব রাখা যায়। ঘরে ফার্ন রাখলে মনে একটা স্নিগ্ধ আমেজ আনে। ফুলের তোড়াতেও ফার্নের পাতা ব্যবহৃত হয়।
Nephrolepis exaltata: এর ইংরেজি নাম Sword fern. এটি Oleandraceae পরিবারের। টেবিল বা ঘরের ভেতরে ঝুলন্ত ঝুড়িতে রাখার উপযোগী। এ ফার্নটি ৪৫ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার উঁচু হতে পারে। টবে রাখলে এটি নিচের দিকে ঝুলে থাকে। অগ্রভাগ ছড়ানো, পাতা সরু ও লম্বা। পত্রক বা অনুফলকগুলো উপবৃত্ত- বল্লমাকৃতি। যৌগিক পাতা দেখতে খুবই সুন্দর।
Adiantum tenerum : ইংরেজিতে একে Maiden hair fern. এর আরেক নাম গোয়ালে লতা। হিন্দিতে নাম হংসরাজ। এটি Polipodiaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। পাতা পক্ষল যৌগিক, পত্রকগুলো অনিয়মিতভাবে গোলাকৃতি বা আয়তাকৃতি, অগ্রভাগ দাঁতের মতো খাঁজকাটা। পাতার বোঁটা বাদামি। রাইজোম ভাগ করে এর বংশবৃদ্ধি করা হয়। এর আদি বাসস্থান হচ্ছে আমেরিকার উষ্ণ অঞ্চল। স্যাঁতসেঁতে ও ছায়াঘরে এটি ভালো জন্মে। শীতের শেষে পাতা ঝরে যায়। বর্ষার শুরুতে নতুন ঘন সবুজ পাতায় সারা গাছ ভরে ওঠে। প্রখর সূর্যকিরণ থেকে এ ফার্নকে দূরে রাখতে হয়। শিকড়ের কাটিং থেকে এর বংশবৃদ্ধি। ঘরের বারান্দায় স্যাঁতসেঁতে স্থানে এ ফার্নটি বাহারি উদ্ভিদ হিসেবে বেশ সমাদৃত।
Asplenium nidus: এই ফার্নকে ইংরেজিতে Birdnest tree বলে। এটি Polypodiaceae পরিবারের। এ উদ্ভিদটি খাড়া, গুল্ম। পাতা সরল, উপবৃত্তাকৃতি, প্রায় আশি থেকে নব্বই সেন্টিমিটার লম্বা হয় এবং রোজেটের আকারে সাজানো থাকে। টবে খুব সুন্দর মানায়। রাইজোম ভাগ করে এর বংশবৃদ্ধি করা যায়। এর আদি বাসস্থান আমাদের উপমহাদেশ।
Polypodium polycarpon : এটিও Polypodiaceae পরিবারের সদস্য। উদ্ভিদ বেশ ঝোপালো। পাতা সরু ও লম্বা। টবের গাছ হিসেবে সমাদৃত। রাইজোম ভাগ করে এর বংশবৃদ্ধি করা হয়।
Pteris cretica : এই ফার্ন Pteridaceae পরিবারের সদস্য। ইংরেজিতে একে Ribbon fern বলে। পাতা চামড়ার মতো এবং পক্ষল যৌগিক। পত্রকগুলো উপবৃত্তাকৃতি, সরু ও লম্বা। এ ফার্ন ঝুলন্ত ঝুড়ির উপযোগী। ইরান, ভারত, জাপান ও ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপগুলো এ ফার্নের আদি নিবাস।
Platycerium bifurcatum : এই ফার্ন Polypodiaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। Staghorn fern নামে পরিচিত এ ফার্ন। বন্ধ্যা এবং উর্বর- এই দু’রকমের পাতা হয় এ ফার্নের। বন্ধ্যা পাতা পুরু, গোলাকৃতির ও দেখতে চাকতির মতো। উর্বর পাতা পাতলা, ঝোলানো, হরিণের শিঙের মতো শাখান্নিত। গাছের ডালে ঝুলে থাকতে দেখা যায়। এ ফার্নকে কাঠের বাক্সেও জন্মানো যায়। এর আদি নিবাস অস্ট্রেলিয়ার উষ্ণ অঞ্চল।
Osmunda regalis : এটি Osmundaceae পরিবারের সদস্য। দেহ খাটো, খাড়া অথবা আরোহী স্বভাবের হয়। পাতা যৌগিক এক পক্ষল এবং দ্বি পক্ষল- উভয় ধরনের হয়। কাণ্ডের শাখাগুলোর অগ্রভাগ থেকে গুচ্ছাকারে পাতা উৎপন্ন হয়। পাতার দৈর্ঘ্য .৩০ থেকে ৩.০০ মিটার পর্যন্ত হয়। পাতাগুলো বর্ষজীবী এবং বছর শেষে মারা যায়। পাতাগুলো কচি অবস্থায় কুণ্ডলিত থাকে এবং সেসময় হালকা বাদামি বর্ণের ঘন রোমে আবৃত থাকে। পাতার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোমগুলো ঝরে পড়ে। টবে চাষের উপযোগী। প্রধানত উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধের উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে জন্মায়। ভারতবর্ষে Osmunda- এর পাঁচটি প্রজাতি জন্মে।
Pteris pellucida: রাইজোম খাড়া, স্কেল যুক্ত। স্টাইপ ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়, ঘন বাদামি বর্ণের। পাতা ৬৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। পাতায় তিন জোড়া পর্যন্ত পত্রক থাকে। পত্রক বৃন্তহীন, রৈখিক বল্লমাকৃতি। ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা এবং দুই সেন্টিমিটার প্রশস্ত হয়। নিবাস ভারত ও বাংলাদেশ। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, সিলেট ও পঞ্চগড় জেলায় পাওয়া গেছে। এ ফার্নকে টবে সুন্দর দেখায়।
পৃথিবীতে ফার্ন প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ১১০০০। অধিকাংশই আর্দ্র উষ্ণমণ্ডলে। বাংলাদেশে ফার্নের প্রায় ২৫০টি প্রজাতি রয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কোনো কোনো ফার্নের কুণ্ডলিত পাতা সবজি হিসেবে (ঢেঁকিশাক) ব্যবহৃত হয়। বেশিরভাগ ফার্নই দেখা যায় উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায়। লতানো ও পরাশ্রয়ী জাতের ফার্নও আছে। বর্ষাকালে Azolla, Salvinia, Ceratopteris গণের অনেক জলজ প্রজাতির ফার্ন দেখা যায়। সুন্দরবন ও উপকূলের অন্যান্য এলাকায় টাইগার ফার্ন (Acrostichum aureum) জন্মে। আবাসস্থলের পরিস্থিতি বদলের ফলে Cyathea, Ctenitis, Lygodium circinnatum ও অন্যান্য কয়েক প্রজাতির ফার্ন প্রজাতি বর্তমানে বিপন্ন।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহ
 

প্রকৃতি ও জীবন পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close