¦
পানির অভাবে বিপন্ন প্রকৃতি

মুকিত মজুমদার বাবু | প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৫

নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ। এদেশে জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নদ-নদী, হাওর-বাঁওড়, ঝরনা-ছড়া, পুকুর-ডোবা, বিল-ঝিলসহ অসংখ্য জলাশয়। দেশের মানুষের বড় একটা অংশের জীবনযাত্রা আবর্তিত হয় নদীকে কেন্দ্র করে। কিন্তু দিনে দিনে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, কর্ণফুলী, মধুমতিসহ দেশের বড় বড় নদী ও তাদের শাখা-প্রশাখা জীর্ণতার বেড়াজালে আটকে স্রোতস্বীনী থেকে স্রোতহীন হয়ে পড়ছে। কোনো কোনো নদ-নদীগুলোতেও গ্রীষ্ম মৌসুমে পানিস্বল্পতা দেখা দিলেও কোনো কোনো নদী একেবারে শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে বিপর্যস্ত হচ্ছে চাষবাস। বিপন্ন হচ্ছে প্রকৃতি। বাধাগ্রস্ত হচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা।
এক সময় বাংলাদেশ ছিল সহস্র নদীর দেশ। বৈরী জলবায়ু, মানুষের অবহেলা, অসচেতনতা, নদী শাসনসহ নানাবিধ কারণে দেশের অধিকাংশ নদীই আজ জীবন্মৃত। কালের স্রোতে থেমে গেছে অনেক নদীর স্রোত। নদী মরে গেলে যে রেখা থাকে; তাও আজ বিলীন হয়ে গেছে। পানির দেশ বাংলাদেশ হলেও আজ এ দেশেই পানির জন্য উঠেছে হাহাকার। বলতে গেলে প্রায় সব ঋতুতেই এ হাহাকার পরিলক্ষিত হয়। তবে পানির প্রাপ্যতা শেষ প্রান্তে গিয়ে ঠেকে গ্রীষ্ম মৌসুমে। পানি ছাড়া জীবনের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। খাদ্যের প্রয়োজনে পানি, সেচের জন্য পানি, বলতে গেলে জীবনের প্রয়োজনে পানির ভূমিকা অপরিহার্য।
দিন দিন এ পানির আধারগুলো দূষিত হওয়ার পাশাপাশি পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ফসলি ক্ষেতে গভীর গর্ত করে সেচযন্ত্র বসিয়েও পানি পাওয়া যাচ্ছে না। পুকুরে পানি নেই। নদীতে পানি নেই। বিশেষ করে মাছ চাষে এবং বোরো ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে পানির বিশেষ প্রয়োজন। এ সময় মাছ চাষ করতে সেচযন্ত্রের সাহায্যে পুকুর ভর্তি করে রাখতে হচ্ছে। অন্যদিকে বোরো ফসল পানিনির্ভর হওয়ার কারণে গোটা মৌসুমেই দেখা দিচ্ছে অতিরিক্ত পানির প্রয়োজনীয়তা। নদীমাতৃক দেশে আজ পানির আকাল! কথাটা ভাবতেই অবাক লাগে। তারপরও এটাই সত্যি।
ছোট-বড় ২৩০টি নদী রয়েছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে তিনটি নদীর উৎস মিয়ানমার এবং ৫৪টি নদীর উৎস ভারতের আসাম রাজ্য। দেশের বড় নদীগুলো ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। উজানের দেশ হওয়ায় ভারত আসাম রাজ্যের অনেক স্থানে বাঁধ দিয়েছে। আর সে কারণে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য, কৃষি, মৎস্য, শিল্প, জ্বালানি, নৌ-চলাচল ও সেচের ওপর পড়ছে ভয়াবহ ক্ষতিকর প্রভাব।
নদ-নদীর অকাল মৃত্যুর বড় একটা কারণ ফারাক্কা বাঁধ। পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে পানির স্তর দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। গঙ্গা, মহানন্দা ও গড়াই নদীর পানির নেমে গেছে। হারিয়ে গেছে নৌপথ। কৃষির ক্ষতি হয়েছে অপূরণীয়। পানিতে দেখা দিয়েছে আর্সেনিক। ফারাক্কার কারণে প্রমত্তা পদ্মায় পানি থাকে না গ্রীষ্ম মৌসুমে। রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চল দিন দিন মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। কয়েক কিলোমিটার দূরে সরে গেছে পদ্মা। পাল্টে গেছে বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রকৃতি ও পরিবেশ। ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে এ দেশের কৃষি, শিল্প, বনজসম্পদ ও প্রাণিবৈচিত্র্য। ফারাক্কার কারণে সাগরের লবণাক্ততা উঠে আসছে ওপরের দিকে। এ লবণাক্ততার সর্বশেষ শিকার মধুমতি ও নবগঙ্গা নদী। এমনকি গোপালগঞ্জ ও নড়াইল পর্যন্ত উঠে এসেছে লবণাক্ত পানি। ক্রমশ লবণপানির আগ্রাসনে বিপন্ন হচ্ছে আমাদের জীববৈচিত্র্য।
নদ-নদী ও জলাশয়গুলোতে পানি না থাকার কারণে গ্রীষ্মের এই মৌসুমে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাচ্ছে। আর এ সমস্যা বেশি মোকাবেলা করছে বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষসহ অন্যান্য অঞ্চলের মানুষ। তবে লবণাক্ততা ও পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় আসন্ন বিপর্যয়ের তালিকা থেকে রাজধানী ঢাকাও বাদ পড়ছে না। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক গবেষণা রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘ঢাকা শহরের পানির স্তর এখন সমুদ্রপৃষ্ঠের চেয়ে ১৭০ ফুট নিচে নেমে গেছে। ফলে সাগরের লোনাপানি দক্ষিণাঞ্চল পার হয়ে এখন ঢাকা মহানগরীসহ দেশের মধ্যাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের দিকে আসছে। অপরিকল্পিতভাবে পানি উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ঢাকার পানিতে লবণাক্ততা দেখা দিতে পারে। এরই মধ্যে দক্ষিণাঞ্চলের ৬ কোটি মানুষ ভূগর্ভস্থ লবণাক্ততা বৃদ্ধিজনিত বিপর্যয়ের হুমকিতে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এ পরিস্থিতি বিশেষ করে খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশ আরও সংকটজনক পর্যায়ে উপনীত হতে পারে।’
নদ-নদীতে পানি না থাকা, পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং লবণাক্ততা ছাড়াও নদীর স্বচ্ছ পানির উৎসগুলো দিন দিন শিল্পবর্জ্য, পলিথিন বর্জ্য, পয়ঃবর্জ্যসহ নানা বর্জ্যে বিষাক্ত হয়ে উঠছে। হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশী প্রজাতির মাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির জলজপ্রাণী। উদাহরণ হিসেবে বুড়িগঙ্গার কথাই ধরা যাক- আজ এ নদীতে কালো রঙের গাঢ় পানি। বিষাক্ততায় প্রায় সব মাছ মরে গেছে। এছাড়া নদীর তলদেশের মাটির ওপর জমা হয়েছে পলিথিনের পুরু আস্তর। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকবর্জ্য। অথচ এ দূষিত বর্জ্য আগুনে পুড়িয়ে কিংবা মাটিতে গর্ত করে পুঁতে ফেলার নিয়ম রয়েছে। বুড়িগঙ্গায় আরও যোগ হয়েছে হাজারীবাগের ট্যানারির দূষিত বর্জ্য। এছাড়া প্রতিদিনই নদীর দু’পাড়ে অবস্থিত টেক্সটাইলের রঙ ও কেমিক্যাল পানিতে মিশে দূষণের মাত্রাকে বাড়িয়ে তুলছে কয়েকগুণ। ইটিপির মাধ্যমে দূষিত পানি পরিশোধনের নিয়ম থাকলে তা অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত হচ্ছে। স্বচ্ছ জলের বুড়িগঙ্গা বুড়িয়ে যাওয়ার পেছনে আমাদের যে বড় দায় রয়েছে এটা কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারি না। শুধু বুড়িগঙ্গা নয়, দেশের অধিকাংশ নদী আজ দখল, দূষণ আর পানিশূন্য হয়ে পড়ছে। এর জন্য কৃষিকাজ যেমন ব্যাহত হচ্ছে তেমনি ধ্বংসের মুখে পতিত হচ্ছে দেশের জীববৈচিত্র্য। পাশাপাশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা।
পানি ধরে রাখার জন্য দেশের বিভিন্ন নদ-নদী খননের প্রয়োজন। সুপেয় পানির জন্য বৃষ্টির পানিকে সংরক্ষণ করতে হবে। শিল্পবর্জ্য, পলিথিন বর্জ্য, পয়ঃবর্জ্যসহ নানা বর্জ্যে যাতে বিষাক্ত হয়ে না ওঠে নদী সেদিকে সবার সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। দেশের নদ-নদীতে পানিপ্রবাহ যাতে ঠিক থাকে সেদিকে জোর তৎপরতা চালাতে হবে। কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই ভূগর্ভস্থ অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের ফলে অদূর ভবিষ্যতে পানির সংকট চরমে পৌঁছাবে। বর্তমানে চাষের জন্য বেশিরভাগ পানিই ভূগর্ভস্থ থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে। এর বিকল্প ব্যবস্থা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব খুঁজে বের করতে হবে।
জীববৈচিত্র্যের অবস্থান অক্ষুণ্ণ রেখে জীবনের স্বাভাবিকতাকে ধরে রাখতে পানির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও সামাজিকতার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রবৃদ্ধির ভিত রচনায় পানির কোনো বিকল্প নেই। ‘পানিই জীবন’ এ কথা মাথায় রেখে পানি দূষণ, অপচয় রোধ ও পানির ব্যবস্থাপনার কৌশল নির্ধারণ করা আজ সময়ের দাবিত পরিণত হয়েছে।
লেখক : চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন
 

প্রকৃতি ও জীবন পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close