¦
রঙে রঙিন কৃষ্ণচূড়া

দ্বিজেন শর্মা | প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৫

কৃষ্ণচূড়া এ দেশে সুপরিচিত। বৈশাখের খরাদীর্ণ আকাশের নিচে প্রচণ্ড তাপ ও রুক্ষতায় ওর আশ্চর্য প্রস্ফুটনের তুলনা নেই। নিষ্পত্র শাখায় প্রথম মুকুল ধরার অল্প দিনের মধ্যেই সারা গাছ ফুলে ফুলে ভরে যায়। তখন তো ‘পুষ্পপাগল কৃষ্ণচূড়ার শাখা’। এত উজ্জ্বল রঙ, এত অক্লান্ত প্রস্ফুটন তরুরাজ্যে দুর্লভ।
কৃষ্ণচূড়া ফুলের বর্ণ-বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। গাঢ় লাল, লাল, কমলা, হলুদ, হালকা হলুদ পর্যন্ত এক দীর্ঘ বর্ণালিতে বিস্তৃত এই পাপড়ির রঙ। প্রথম প্রস্ফুটনের উচ্ছ্বাস পরবর্তীকালে ক্রমে স্তিমিত হয়ে এলেও বর্ষার শেষেও গাছ থেকে ফুলের রেশ শেষ হয় না। শুধু ফুল নয়, পাতার ঐশ্বর্যেও কৃষ্ণচূড়া অনন্য। এই পাতার কচি সবুজ রঙ এবং সূক্ষ্ম কারুকর্ম আকর্ষণীয়। নম্র, নমনীয় পাতাদের আন্দোলন দৃষ্টিশোভন। এ গাছে পাতার নিবিড়তা নেই, তবু রৌদ্রশাসনে সক্ষম।
মধ্যমাকৃতি গাছের কাণ্ড নাতিদীর্ঘ, দেহবর্ণ লঘু ধূসর, মাথা ছত্রাকৃতি। শাখারা দীর্ঘ ও আভূমি আনত।
কৃষ্ণচূড়া শিম জাতীয় উদ্ভিদের গোত্রভুক্ত, তাই ফলের সঙ্গে চ্যাপ্টা শিমের সাদৃশ্য স্পষ্ট। অবশ্য ফলেরা আকারে শিমের চেয়ে বহুগুণ বড়। কৃষ্ণচূড়ার কচি ফলেরা সবুজ, তাই পাতার ভিড়ে সহজে দেখা যায় না। শীতের হাওয়ায় পাতা ঝরে গেলেই ফল চোখে পড়ে। পাকা ফল গাঢ় ধূসর ও কাষ্ঠকঠিন। নিষ্পত্র কৃষ্ণচূড়ার শাখায় যখন ফল ছাড়া আর কিছুই থাকে না তখন তাকে শ্রীহীন দেখায়। বসন্ত শেষে কৃষ্ণচূড়ার দিন ফেরে, একে একে ফিরে আসে পাতার সবুজ, প্রস্ফুটনের বহুবর্ণ দীপ্তি, নিঃশব্দে ঝরে পড়ে বিবর্ণ ফলেরা। কৃষ্ণচূড়া আবার দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে।
গাছটি আমাদের দেশে সহজপ্রাপ্য হলেও আদি নিবাস আফ্রিকার মাদাগাস্কার। ১৮২৪ সালে সেখান থেকে প্রথম মরিশাস, পরে ইংল্যান্ড এবং শেষাবধি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিস্তার ঘটে।
‘পইনসিয়ানা’ হল ওয়েস্ট ইন্ডিজের এক আঞ্চলিক গভর্নর এমডি পইনসির স্মারক। ডেলোনিক্স গ্রিক শব্দ, অর্থ থাবার মতো। সম্ভবত কৃষ্ণচূড়া ফুলের পাপড়ির বৈশিষ্ট্যেই নামটি অর্থবহ। ‘রিজিয়া’ অর্থ রাজকীয়। নামের এ অংশে কৃষ্ণচূড়ার ঐশ্বর্য পরিস্ফুট। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কৃষ্ণচূড়া নামটি সঠিক কি না তাতে সন্দেহ আছে। কৃষ্ণচূড়া হল আসলে ‘সিসালপিনা পালচেরিমা’। সে একটি সম্পূর্ণ আলাদা জাতের গাছ। ডেলোনিক্সকে তাই অনেকে রক্তচূড়া বলার পক্ষপাতী। কেউ কেউ মনে করেন, এই ফুলকে বায়ান্ন সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনাবলির আবেগাশ্রিত করার জন্য কৃষ্ণচূড়া নামে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আজ কৃষ্ণচূড়া নামটি প্রতিষ্ঠিত, এটি বদলানোর চেষ্টা থেকে বিরত থাকাই ভালো। সিসালপিনা পালচেরিমার অন্য নাম রাধাচূড়াই ওর জন্য নির্দিষ্ট থাক। বৃদ্ধি অত্যন্ত দ্রুত বিধায় গ্রামাঞ্চলে জ্বালানি হিসেবে গাছটি জনপ্রিয়। ওর কাছাকাছি এমন গাছ লাগানো দরকার যারা প্রস্ফুটনে ওদের সমকালীন এবং বর্ণে কিছুটা নমনীয় ও মধুর। কৃষ্ণচূড়ার প্রকট ঔজ্জ্বল্যকে সহনীয় শোভন করার পক্ষে এরূপ রোপণ জরুরি।
কৃষ্ণচূড়ার কাণ্ড ও শাখা-প্রশাখা তেমন শক্ত নয়। ঝড়ে এই গাছ সহজেই ভেঙে পড়ে। এদের নিচে ঘাস কিংবা অন্য কোনো গুল্মজাতীয় গাছপালা জন্মানো কঠিন। রোপণকালে এসব ক্রটির প্রতি নজর রাখা প্রয়োজন। কোনো দারুমূল্য নেই, কাঠ হালকা এবং জ্বালানি হিসেবেই প্রধানত ব্যবহার্য। কৃষ্ণচূড়া ঢাকার অন্যতম প্রধান বীথিতরু। পার্ক এভিনিউ, ময়মনসিংহ রোডে অঢেল কৃষ্ণচূড়া। শেরেবাংলা নগরে এখন একটি সুদৃশ্য বীথি আছে।
বীজ থেকে চারা জন্মানো সহজ। তিন-চার বছরেই গাছে ফুল ধরে। পথ ছাড়া বিস্তৃত অঙ্গন, বাড়ির সীমানা, লেকের পাড়েও রোপণ প্রশস্ত। অন্তত সিকি বিঘা চওড়া সবুজ তৃণাচ্ছন্ন এক ফালি জমির ওপর সারিবদ্ধভাবে কৃষ্ণচূড়া লাগানোই আদর্শ রোপণ। এতে এ গাছের পরিপূর্ণ সৌন্দর্য ফোটে।
লেখক : নিসর্গবিদ
 

প্রকৃতি ও জীবন পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close