¦
আগুনঝরা লালমাথা কুচকুচি

শিহাব খালেদীন | প্রকাশ : ১৬ মে ২০১৫

কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানের রামপাহাড়ে বন্যপ্রাণি পর্যবেক্ষণে বের হয়েছি আমরা। সকাল ৯টা কি সাড়ে ৯টা হবে। ঢোকার জন্য বেশ কয়েকটি পথ। হাতি গেটের কাছাকাছি একটা পথ দিয়ে আমরা ভেতরে ঢুকি। পথ না বলে একে ছড়া বলাই ভালো। ছোট্ট একটা পাহাড় পেরিয়ে আঁকাবাঁকা ছড়ার পাশ দিয়ে হাঁটছি তো হাঁটছি। চোখ-কান খোলা। কোথাও কোনো শব্দ বা নড়াচড়া টের পেলেই চুপ করে দাঁড়িয়ে যাই। বুঝতে চেষ্টা করি- এটা প্রাণী, পাখি না অন্যকিছু। হঠাৎ ঝোপের আড়ালে বেশ জোরেই কিছু একটা নড়ে ওঠে। একটি মাঝারি আকৃতির পাখি উড়ে গিয়ে বসে গাছের ডালে। আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে পাখিটি দেখার চেষ্টা করি।
পাখিটির নাম লালমাথা কুচকুচি। ইংরেজিতে বলে Red-headed Trogon. বৈজ্ঞানিক নাম Harpactes erythrocephalus. অপূর্ব সুন্দর এ পাখিটি খুব কমই দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। Trogonidae পরিবারের এ সদস্যের স্বগোত্রীয় পাখি রয়েছে পৃথিবীতে আরও ৩৮টি। তবে এ প্রজাতিটি পাওয়া যায় শুধু ভারত উপমহাদেশ আর দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায়। লালমাথা কুচকুচি দুর্লভ হলেও সিলেট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের চিরসবুজ বনেই এদের বেশি দেখা যায়। এছাড়া বাংলাদেশের লাউয়াছড়া, রেমা-কালেঙ্গা, সাতছড়ি, পাবলাখালী, কাপ্তাইসহ টেকনাফের বনাঞ্চলেও এদের দেখা মেলে।
লালমাথা কুচকুচির শরীরের রঙ বেশ আকর্ষণীয়। পুরুষ ও স্ত্রী পাখি আলাদা আলাদা রঙের হয় বলে এদের সহজেই চেনা যায়। প্রাপ্তবয়স্ক একটি পাখির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার। পুরুষ পাখির মাথা, ঘাড় ও বুক গাঢ় লাল। পিঠ মরচে বাদামি। ডানার পালক ধূসর ও সূক্ষ্ম কালো দাগে ভরা। মেয়ে পাখিটির মাথা, ঘাড় ও বুক দারুচিনি রঙের। উভয়ের লেজ লম্বা, ক্রমেই ছোট থেকে বড় পালকে বিন্যস্ত। লেজের পালকগুলোর শেষের দিকটা সাদা। উভয়ের চোখই লাল। তবে চোখের বাইরের গোলকটি বেগুনি রঙের। এদের ওপরের ঠোঁটের বাইরের দিক নীলচে বেগুনি এবং নিচের ঠোঁটে হালকা বেগুনি রঙ দেখা যায়। লালমাথা কুচকুচি একা কিংবা জোড়ায় জোড়ায় থাকতে দেখা যায়। পুরুষ পাখিটি সারাজীবন একটি স্ত্রী পাখির সঙ্গেই জোড় বাধে। এরা সাধারণত মাঝারি আকৃতির গাছের ডালে বসে থাকে এবং উড়ন্ত পোকামাকড় ধরে খায়। তবে মাঝে মাঝে মাটিতে নেমে মাটিতে থাকা লার্ভা, কীটপতঙ্গ খেয়ে থাকে। শান্ত ও লাজুক স্বভাবের এ পাখি কিউ... কিউ... কিউ... শব্দে ডাকতে থাকে। তবে প্রজননকালে স্ত্রী পাখিকে আকৃষ্ট করার জন্য পুরুষ পাখি টিয়াউপ... টিয়াউপ... টিয়াউপ... সুর ধরে গান গাইতে থাকে। এরা প্রতি বছর এপ্রিল-জুলাইয়ের দিকে প্রজনন করে এবং গাছে কোটরে বাসা তৈরি করে ৩ থেকে ৪টি ডিম পাড়ে।
বিশ্বব্যাপী লালমাথা কুচকুচি আজ অস্তিত্ব সংকটে। আমাদের দেশও তার ব্যতিক্রম নয়। ক্রমাগত দেশের চিরসবুজ বনাঞ্চল উজাড় হওয়ায় অদূর ভবিষ্যতে সুন্দর এ পাখিটিকে আমাদের প্রকৃতিতে আর দেখাই যাবে না। প্রকৃতিতে পাখি ধরে রাখতে হলে দরকার বন। আর তার জন্য প্রয়োজন সবার সদিচ্ছা আর প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা।
লেখক : বন্যপ্রাণি গবেষক
 

প্রকৃতি ও জীবন পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close