¦
বাঘ ও মানুষের দ্বন্দ্ব-সংঘাত

মো. মাকছুদুর রহমান | প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৫

যুগ যুগ ধরে বিশ্বজুড়ে যেমন মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে রয়েছে সুসম্পর্ক তেমনি রয়েছে সংঘাতপূর্ণ আচরণের নজির। আর এ সবকিছুর সঙ্গেই জড়িত রয়েছে নিজেদের স্বার্থ। মানুষ যেমন স্বার্থের কারণে বাঘ শিকার করছে, তেমনি বাঘও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়ে মানুষ শিকার করছে। আর মানুষ ও বাঘের সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল হল বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় সুন্দরবন। প্রতি বছর এ বনে অসংখ্য কাঠ ও গোলপাতা আহরণকারী, বাওয়ালি, মৌয়ালি, জেলে ও স্থানীয়রা সম্পদ আহরণকালে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারায়। মানুষ ও বাঘের দ্বন্দ্ব এ অঞ্চলের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ফলে অসংখ্য নারী হয়েছে বিধবা, ছেলে-মেয়ে হয়েছে পিতৃহারা। আবার প্রতিবছর মানুষের হাতে বাঘের মৃত্যু ঘটায় বাঘের সংখ্যাও হ্রাস পাচ্ছে।
মানুষ ও বাঘের এ সংঘাতকে কেন্দ্র করে রয়েছে লোমহর্ষকর গল্প, কুসংস্কার ও নানা ধরনের কল্পকাহিনী। যে মহিলাদের স্বামী বাঘের আক্রমণে মারা যায় সে মহিলাদের বলা হয় বাঘবিধবা, স্থানীয় ভাষায় ‘অপয়া’ (খারাপ মহিলা/স্বামীখেকো মহিলা)। সমাজে তাদেরকে ঘৃণার চোখে দেখে। একদিকে জীবনসঙ্গী হারিয়ে ব্যথায় ব্যাকুল অন্যদিকে সমাজের কুসংস্কার এসব বিধবাদের প্রতিনিয়ত কুরে কুরে খায়। এরপর রয়েছে শ্বশুরবাড়ি ও বাবার বাড়ির অবহেলা, অত্যাচার-নির্যাতন। অন্যদিকে রয়েছে সামাজিক ঘৃণিত ব্যবস্থাপনা যা নিষ্পাপ জীবনকে প্রতিনিয়ত বিষিয়ে তোলে। জীবনের এই কঠিন যন্ত্রণা ও বাস্তবতার গ্লানি নিয়ে বাঘবিধবারা সুন্দরবনের মাছ, কাঁকড়া আহরণ ও অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবন নামক যন্ত্রটাকে টেনে নিয়ে চলে আমৃত্যু পর্যন্ত।
সুন্দরবনের সম্পদ আহরণ মোটেই সহজ নয়। বাঘের আক্রমণে প্রাণ যেতে পারে- এমন ঝুঁকি থাকার পরও প্রতিবছর বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে সুন্দরবনের সম্পদ আহরণ করতে যায় অসংখ্য বাওয়ালি, মৌয়ালি ও জেলে সম্প্রদায়। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে ক্লান্ত হয়ে অবশেষে পিতা-মাতা, স্ত্রী-সন্তানের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দিতে প্রতিযোগিতায় নামে বাঘের মুখ থেকে সম্পদ ছিনিয়ে আনার। এই প্রতিযোগিতায় যাওয়ার আগেও তারা জানে তাদের সবাই হয়তো প্রাণ নিয়ে ফিরে নাও আসতে পারে। তাই মধু মৌসুমে ১ এপ্রিল তারিখে প্রতি বছর সুন্দরবনে প্রবেশের আগে বন বিভাগে তাদের জন্য দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। সম্ভাব্যমরণের আগে দোয়া মাহফিলের এ দৃশ্য সত্যিই হৃদয়বিদারক। সুন্দরবনে সম্পদ আহরণকালে অনেক সময় নিজের ছেলে, আপন ভাই, বাবা-চাচাকে বাঘের কোলে রেখে বাড়ি ফেরার দৃশ্য সত্যি মর্মান্তিক। আবার অনেকে বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজের দক্ষতা ও প্রথাগত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ফিরে এসেছে প্রাণ নিয়ে। দ্বিতীয় জন্মের স্বাদ পেয়েছে তারা। বাঘের সঙ্গে যুদ্ধ করে ফিরে আসার সেসব কাহিনী সত্যিই লোমহর্ষক।
১৯২৭ সনের বন আইনের (২০০০ সনে সংশোধিত) ২৬ (১ক) (চ) ধারায় বাঘ মারলে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। সর্বনিু ছয় মাস সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বনিু পাঁচ হাজার টাকা থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২ এর ২৪ ধারায় অপরাধ একই আইনের ৩৬ ধারায় দণ্ড- সর্বনিম্ন ২ বছর, সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড ও সর্বনিু ১ লাখ, সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আমাদের শৌর্য ও বীর্যের প্রতীক বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, সুন্দরবন উপকূলবাসীকে বাঘ ও বাঘ সংরক্ষণ আইন সম্পর্কে সচেতন করে তোলা, বাঘের আক্রমণে নিহত পরিবারের উপযুক্ত সদস্যদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, লোকালয়ে বাঘ প্রবেশ করলে তাকে বনে ফেরত পাঠানো, গবেষণা প্রভৃতি কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাঘ সংরক্ষণে আমাদের এখনই সচেষ্ট হতে হবে।
লেখক : প্রধান নির্বাহী, বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি (বেডস্)
 

প্রকৃতি ও জীবন পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close