¦
নয় বছরে ১২ সুপারিশের একটিও বাস্তবায়ন হয়নি

যুগান্তর রিপোর্ট | প্রকাশ : ০৯ মে ২০১৫

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে প্রায় নয় বছর আগে গঠিত কমিটির ১২টি সুপারিশের একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। ২০০৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আফতাব আহমাদ দুষ্কৃতকারীদের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেলে সেই সময়ে গঠিত তদন্ত কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা জোরদারে এসব সুপারিশ করে। পরে ২০০৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের এক সভায় কমিটির যেসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি তা বাস্তবায়নে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ ফুলার রোডের নিজ বাসভবনে অধ্যাপক ড. আফতাব আহমাদের গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থার নাজুক দিক নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৬ সালের ৪ অক্টোবর তৎকালীন প্রো-ভিসিকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা ছিলেন- তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ, কলা অনুষদের ডিন ড. সদরুল আমিন, বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. তাজমেরী এসএ ইসলাম, আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক বোরহান উদ্দীন খান, সিন্ডিকেট সদস্য ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম, সিন্ডিকেট সদস্য শামসুজ্জামান দুদু, ফুলার রোড আবাসিক এলাকা কল্যাণ সমিতির সভাপতি এবং সদস্যসচিব ছিলেন তৎকালীন প্রক্টর।
কমিটি চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী, সিকিউরিটি (নিরাপত্তা) অফিসার, জুনিয়র সিকিউরিটি অফিসার, সাবেক ভারপ্রাপ্ত সিকিউরিটি অফিসার, সিকিউরিটি গার্ডদের সঙ্গে কথা বলে এবং সরেজমিনে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ২০০৭ সালের ১৫ মে সর্বশেষ সভাসহ মোট ৫টি সভার মাধ্যমে নিরাপত্তা জোরদারে ১২টি সুপারিশ করে। সুপারিশসমূহ হল- অবিলম্বে নিরাপত্তাসংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন এবং সেই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ও শৃংখলার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে সিকিউরিটি অফিসকে এস্টেট অফিসের আওতায় না রেখে স্বতন্ত্র অফিস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিকিউরিটি গার্ডদের নির্দিষ্ট প্যাটার্নের ইউনিফর্ম দিতে হবে এবং সেই ইউনিফর্ম কর্তব্যরত অবস্থায় পরিধানের বিষয় কড়াকড়ি আরোপ করতে হবে। সিকিউরিটি গার্ডদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দানের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য বিএনসিসিকে নিয়োজিত করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮টি চেকপোস্টে অবশ্যই সার্বক্ষণিক সিকিউরিটি গার্ডের ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিক্ষকদের আবাসিক এলাকার গেটসমূহে প্রতি শিফটে দুজন করে গার্ড নিয়োজিত রাখা দরকার। উভয় ক্ষেত্রে প্রয়োজনে আনসার নিয়োগ করা যেতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকায় কোনো অবৈধ ও ভ্রাম্যমাণ দোকান থাকতে পারবে না। টিএসসি এলাকা ব্যতীত বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য কোনো এলাকায় সন্ধ্যার পর বহিরাগত কেউ বিনা প্রয়োজনে অবস্থান করতে পারবে না। বহিরাগতদের অহেতুক আড্ডা বন্ধে নোটিশসংবলিত সাইনবোর্ড স্থাপন করতে হবে। ফুলার রোডসহ আবাসিক এলাকার রাস্তাসমূহে যানবাহন ও বহিরাগতদের চলাচল সীমিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের মাঠসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকায় সার্বক্ষণিক সিকিউরিটি মোবাইল টিম রাখতে হবে। এ জন্য একটি পিকআপ ভ্যানসহ পর্যাপ্ত ট্রান্সপোর্ট (যানবাহন) থাকতে হবে। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ক্যাম্পাস পুলিশ গঠন করারও সুপারিশ করে কমিটি।
১২টি সুপারিশ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এর কোনোটিই পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। তবে শিক্ষকদের আবাসিক এলাকায় প্রতি শিফটে দুজন গার্ড নিযুক্ত, নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম এবং সার্বক্ষণিক মোবাইল টিমের সুপারিশগুলো আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছে। ২০০৮ সালের নভেম্বরের ১৯ তারিখ সিকিউরিটি অফিস তদন্ত রিপোর্টের বাস্তবায়নের পর্যায় উল্লেখ করে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেয় রেজিস্ট্রারকে। পরবর্তী সময়ে এগুলো বাস্তবায়নে আর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। সেই সময়ে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে সিকিউরিটি অফিসের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮টি চেকপোস্টের মধ্যে হাইকোর্টেরটি ২০০৭ সালে সমাবর্তন উপলক্ষে ভেঙে ফেলা হয়। পরে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে এ বিষয়ে বারবার লিখিত ও মৌখিক তাগাদা দিলেও তা আর পুনঃস্থাপন করা হয়নি। বাকি ৭টি চেকপোস্টের মধ্যে শহীদ মিনার চেকপোস্টটি বুয়েটের আপত্তির কারণে স্থাপন করা যায়নি। এর ফলে বকশিবাজার এলাকা দিয়ে ভারি যানবাহন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করছে। এ ছাড়া বর্তমানে বাকি ছয়টি চেকপোস্টের পাঁচটিতেই কোনো নিরাপত্তাকর্মী থাকে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অনবরত ভারি যানবাহন ঢুকে পড়ছে। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে বলে অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়। সর্বশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলক্ষেতসংলগ্ন গেটে মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ স্থাপন করা হয়। সৌন্দর্য বৃদ্ধি ব্যতীত এ গেটটি নিরাপত্তা বৃদ্ধিতে কোনো ভূমিকা নেই। কারণ এটিতে যানবাহন চলাচল সীমিত করার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী মফিজুল ইসলাম জানান, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রবেশপথে নতুন করে গেট নির্মাণের পরিকল্পনাও নেই।
সুপারিশের বাইরে একটি বিষয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা হল বহিরাগতদের হলে অবস্থান। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হল, জগন্নাথ হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলসহ প্রায় সব হলেই ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের যোগসাজশে বহিরাগতরা থাকেন। ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল কলেজ, এমনকি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকেন।
সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বক্তব্য : এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট ম্যানেজার সুপ্রিয়া দাস যুগান্তরকে বলেন, গেটগুলো নিয়ন্ত্রণ খুবই জরুরি। তবে আমাদের সেই পরিমাণ জনবল নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিকিউরিটি গার্ডদের অধিকাংশই বিভিন্ন হল অফিস, অনুষদ, ইন্সটিটিউট ও বিভিন্ন বিভাগের অধীনে ন্যস্ত। কেন্দ্রীয়ভাবে তাদের একত্রিত করা গেলে এ সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে। এ ছাড়া যানবাহন সমস্যার কথাও স্বীকার করেন তিনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক ড. এম আমজাদ আলী যুগান্তরকে বলেন, কমিটি এবং তার সুপারিশের ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। গেটের নিরাপত্তা নিয়ে ইতিপূর্বে আমরা বেশ কয়েকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক যুগান্তরকে বলেন, যদি সেই সময়ে কমিটি কোনো সুপারিশ করে থাকে তাহলে না দেখে আমি কিছু বলতে পারব না। বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে হলে নতুন করে বিবেচনা করতে হবে। সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে তিনি বলেন, আমাদের একার পক্ষে এটি সম্ভব নয়। পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় এটি সম্ভব হবে। ক্যাম্পাস পুলিশের ব্যাপারে তিনি বলেন, এটি আমাদের প্রস্তাব নয়, সরকারের প্রস্তাব। বিষয়টি নিয়ে কথা হচ্ছে।
খবর পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close