jugantor
শিল্পকলা ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে গণহত্যার বিভীষিকা স্মরণ

  হক ফারুক আহমেদ  

১০ ডিসেম্বর ২০১৫, ০০:০০:০০  | 

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক হানাদাররা যে গণহত্যা চালিয়েছিল তার নির্মম সাক্ষী পুরো বাংলাই। তবে বলা হয়ে থাকে খুলনার চুকনগরে একই সময়ে সবচেয়ে বেশি গণহত্যা হয়েছিল। কেউ বলে ১০ হাজার কেউ বলে ১৫ হাজার মানুষকে একসঙ্গে হত্যা করা হয়েছিল। চুকনগরে নির্মম গণহত্যায় হাজারো লাশের স্তূপের মধ্যে অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় এক কন্যাশিশু। সেদিনের ৫-৬ মাস বয়সী কন্যাশিশুটিই আজকের সুন্দরী বালা। গণহত্যার নির্মমতার এক সাক্ষী তিনি। বুধবার সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির উন্মুক্ত নন্দন মঞ্চে শহীদ স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন করেন তিনি। তার সঙ্গে এ সময় হাজারো মানুষ অংশ নেয়। শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে আন্তর্জাতিক গণহত্যা স্মরণ ও প্রতিরোধ দিবসে সারা দেশে এ কর্মসূচি পালিত হয়।

চলতি বছরে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণহত্যার বীভৎসতা ও গণহত্যায় নিহতদের স্মরণ করা হয়। জাতিসংঘে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বর নিহতদের স্মরণ ও মর্যাদা দান এবং গণহত্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে পালন করা হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে এবং জেলা ও উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় বুধবার জেলা ও উপজেলার বধ্যভূমিতে সন্ধ্যা ৬টায় আলোক প্রজ্বালনের মাধ্যমে দিনটিকে স্মরণ করা হয়।

যারা গণহত্যার শিকার হয়েছেন তাদের স্মরণ ও মর্যাদাদান এবং গণহত্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক দিবস পালন উপলক্ষে বুধবার সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির নন্দন মঞ্চে আলোক প্রজ্বালন, আলোচনা অনুষ্ঠান ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এতে ১৯৭১ সালে ২০ মে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর নামক স্থানে সংঘটিত গণহত্যার একমাত্র জীবিত সুন্দরী বালা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি সচিব বেগম আক্তারী মমতাজ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মফিদুল হক।

শিল্পকলায় গণহত্যায় শহীদ স্মরণে এ অনুষ্ঠান শুরু হয় সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। তারপর বাঁশিতে ওঠে করুণ সুর। বাঁশি বাজান শিল্পী মনিরুজ্জামান। তার বাঁশির সুরে অতিথি ও হাজারো মানুষ মোমবাতি প্রজ্বালন করেন। একসঙ্গে জ্বলে ওঠে হাজারো দীপশিখা। আর সেই প্রদীপশিখায় স্মরণ করা হয় একাত্তরের গণহত্যায় শহীদদের।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর : মা তার কোলের শিশুটিকেও নিয়ে এসেছেন গণহত্যার শিকারগ্রস্তদের স্মরণ আয়োজনে। ছোট্ট শিশুটিকে কোলে নিয়েই তিনি সবার সঙ্গে প্রদীপ প্রজ্বালন করেন। এসেছেন আরও অনেকেই। প্রথমবারের মতো পালিত হওয়া আন্তজার্তিক গণহত্যা স্মরণ ও প্রতিরোধ দিবসে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এমনি সাড়া পড়ে গিয়েছিল সাধারণ মানুষের। ১৯৭১ সালে পাক হানাদারদের দ্বারা সংঘটিত এ দেশের মানুষের ওপর নির্মম গণহত্যা তথা সারা বিশ্বে ঘটে যাওয়া গণহত্যার প্রতি ঘৃণা জানিয়েছেন সবাই আর গভীর মমতা আর আবেগে তারুণ্য প্রদীপ জ্বালিয়ে স্মরণ করল জাতির বীর সন্তানদের। ৯ ডিসেম্বরকে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক গণহত্যা স্মরণ ও প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রথম দিবসটির মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পালন করছে কবিতা আবৃত্তি, বাণী পাঠ, মোমবাতি প্রজ্বলন ও নাটক মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে মফিদুল হক বলেন, ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো জেনোসাইড কনভেনশনে স্বাক্ষর করে। সেই কনভেশন অনুযায়ী, বাংলাদেশ একাত্তরের নৃশংসতাকে জেনোসাইড ও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিচার শুরু করে। সূচনা বক্তব্যের আগে জাতিসংঘ প্রদত্ত বাণী পাঠ করেন মাহমুদা আখতার। শহীদ কবি মেহেরুন্নেসার ‘আজকের শপথ’ ও ‘রাজপথে আজ রক্তের প্রস্তুতি’ কবিতা দুটি আবৃত্তি করে শোনান তামান্না সারোয়ার নীপা। মন্টু খান রচিত ‘হায়নার খাঁচায় অদম্য জীবন’ থেকে পাঠ করেন সৈয়দ শহীদুল ইসলাম নাজু। শহীদ বুদ্ধিজীবী সেলিনা পারভীনের ‘একটি চিৎকার : বিধাতার’ কবিতাটি পাঠ করেন নায়লা তারান্নুম চৌধুরী কাকলী। রশীদ হায়দার সম্পাদিত ‘ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ১৯৭১’ গ্রন্থ থেকে পাঠ করেন মাসকুর-এ-সাত্তার কল্লোল। তিনি ওই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত কাজী মামুনুর রশীদের আলতাফ মাহমুদ ও লুৎফর রহমানের কুষ্টিয়ার গণহত্যা থেকে পাঠ করেন। সবশেষ পরিবেশনা ছিল বাবুল বিশ্বাসের রচনা ও আইরিন পারভীন লোপা নির্দেশিত পদাতিক নাট্য সংসদের ‘পোড়ামাটি’ নাটক মঞ্চায়ন। একাত্তরের বন্দি শিবিরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ নাটকটির কাহিনী রূপায়িত হয়েছে।



সাবমিট

শিল্পকলা ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে গণহত্যার বিভীষিকা স্মরণ

 হক ফারুক আহমেদ 
১০ ডিসেম্বর ২০১৫, ১২:০০ এএম  | 
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক হানাদাররা যে গণহত্যা চালিয়েছিল তার নির্মম সাক্ষী পুরো বাংলাই। তবে বলা হয়ে থাকে খুলনার চুকনগরে একই সময়ে সবচেয়ে বেশি গণহত্যা হয়েছিল। কেউ বলে ১০ হাজার কেউ বলে ১৫ হাজার মানুষকে একসঙ্গে হত্যা করা হয়েছিল। চুকনগরে নির্মম গণহত্যায় হাজারো লাশের স্তূপের মধ্যে অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় এক কন্যাশিশু। সেদিনের ৫-৬ মাস বয়সী কন্যাশিশুটিই আজকের সুন্দরী বালা। গণহত্যার নির্মমতার এক সাক্ষী তিনি। বুধবার সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির উন্মুক্ত নন্দন মঞ্চে শহীদ স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন করেন তিনি। তার সঙ্গে এ সময় হাজারো মানুষ অংশ নেয়। শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে আন্তর্জাতিক গণহত্যা স্মরণ ও প্রতিরোধ দিবসে সারা দেশে এ কর্মসূচি পালিত হয়।

চলতি বছরে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণহত্যার বীভৎসতা ও গণহত্যায় নিহতদের স্মরণ করা হয়। জাতিসংঘে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বর নিহতদের স্মরণ ও মর্যাদা দান এবং গণহত্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে পালন করা হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে এবং জেলা ও উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় বুধবার জেলা ও উপজেলার বধ্যভূমিতে সন্ধ্যা ৬টায় আলোক প্রজ্বালনের মাধ্যমে দিনটিকে স্মরণ করা হয়।

যারা গণহত্যার শিকার হয়েছেন তাদের স্মরণ ও মর্যাদাদান এবং গণহত্যা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক দিবস পালন উপলক্ষে বুধবার সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমির নন্দন মঞ্চে আলোক প্রজ্বালন, আলোচনা অনুষ্ঠান ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এতে ১৯৭১ সালে ২০ মে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর নামক স্থানে সংঘটিত গণহত্যার একমাত্র জীবিত সুন্দরী বালা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি সচিব বেগম আক্তারী মমতাজ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মফিদুল হক।

শিল্পকলায় গণহত্যায় শহীদ স্মরণে এ অনুষ্ঠান শুরু হয় সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। তারপর বাঁশিতে ওঠে করুণ সুর। বাঁশি বাজান শিল্পী মনিরুজ্জামান। তার বাঁশির সুরে অতিথি ও হাজারো মানুষ মোমবাতি প্রজ্বালন করেন। একসঙ্গে জ্বলে ওঠে হাজারো দীপশিখা। আর সেই প্রদীপশিখায় স্মরণ করা হয় একাত্তরের গণহত্যায় শহীদদের।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর : মা তার কোলের শিশুটিকেও নিয়ে এসেছেন গণহত্যার শিকারগ্রস্তদের স্মরণ আয়োজনে। ছোট্ট শিশুটিকে কোলে নিয়েই তিনি সবার সঙ্গে প্রদীপ প্রজ্বালন করেন। এসেছেন আরও অনেকেই। প্রথমবারের মতো পালিত হওয়া আন্তজার্তিক গণহত্যা স্মরণ ও প্রতিরোধ দিবসে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এমনি সাড়া পড়ে গিয়েছিল সাধারণ মানুষের। ১৯৭১ সালে পাক হানাদারদের দ্বারা সংঘটিত এ দেশের মানুষের ওপর নির্মম গণহত্যা তথা সারা বিশ্বে ঘটে যাওয়া গণহত্যার প্রতি ঘৃণা জানিয়েছেন সবাই আর গভীর মমতা আর আবেগে তারুণ্য প্রদীপ জ্বালিয়ে স্মরণ করল জাতির বীর সন্তানদের। ৯ ডিসেম্বরকে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক গণহত্যা স্মরণ ও প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রথম দিবসটির মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পালন করছে কবিতা আবৃত্তি, বাণী পাঠ, মোমবাতি প্রজ্বলন ও নাটক মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে মফিদুল হক বলেন, ১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো জেনোসাইড কনভেনশনে স্বাক্ষর করে। সেই কনভেশন অনুযায়ী, বাংলাদেশ একাত্তরের নৃশংসতাকে জেনোসাইড ও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিচার শুরু করে। সূচনা বক্তব্যের আগে জাতিসংঘ প্রদত্ত বাণী পাঠ করেন মাহমুদা আখতার। শহীদ কবি মেহেরুন্নেসার ‘আজকের শপথ’ ও ‘রাজপথে আজ রক্তের প্রস্তুতি’ কবিতা দুটি আবৃত্তি করে শোনান তামান্না সারোয়ার নীপা। মন্টু খান রচিত ‘হায়নার খাঁচায় অদম্য জীবন’ থেকে পাঠ করেন সৈয়দ শহীদুল ইসলাম নাজু। শহীদ বুদ্ধিজীবী সেলিনা পারভীনের ‘একটি চিৎকার : বিধাতার’ কবিতাটি পাঠ করেন নায়লা তারান্নুম চৌধুরী কাকলী। রশীদ হায়দার সম্পাদিত ‘ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ১৯৭১’ গ্রন্থ থেকে পাঠ করেন মাসকুর-এ-সাত্তার কল্লোল। তিনি ওই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত কাজী মামুনুর রশীদের আলতাফ মাহমুদ ও লুৎফর রহমানের কুষ্টিয়ার গণহত্যা থেকে পাঠ করেন। সবশেষ পরিবেশনা ছিল বাবুল বিশ্বাসের রচনা ও আইরিন পারভীন লোপা নির্দেশিত পদাতিক নাট্য সংসদের ‘পোড়ামাটি’ নাটক মঞ্চায়ন। একাত্তরের বন্দি শিবিরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ নাটকটির কাহিনী রূপায়িত হয়েছে।



 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র