¦
ইতিহাস খুঁজে ফেরা

রীতা ভৌমিক | প্রকাশ : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৪

ঢাকার কয়েকজন সাংবাদিক কিশোরগঞ্জে ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি দেখার আমন্ত্রণ পেয়ে এক কথায় রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। এর পেছনে একটাই কারণ ছিল, কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক জায়গাগুলো ঘুরেফিরে দেখা। ঈশা খাঁর দুর্গ, জঙ্গলবাড়ি, উপেন্দ্র কিশোর রায়ের জমিদার বাড়ি, কবি চন্দ্রাবতীর শিব মন্দির, পাগলা মসজিদ, শহীদ মসজিদ, মঠখোলা কালী বাড়ি, শোলাকিয়ার মাঠের কথা বইয়ের পাতায় পড়ার সুযোগ হলেও দেখার সুযোগ কখনও হয়নি। ভোজন রসিকদের তো কিশোরগঞ্জের কাঁচাগোল্লা, পেয়ারা (মিষ্টি), পনিরের নাম শুনতেই জিভে জল এসে পড়ে। এছাড়া সত্যজিৎ রায়, কেদারনাথ মজুমদার, তাহেরউদ্দিন মল্লিক, বাংলাদেশের দু-দুজন প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান এবং অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদও এই কিশোরগঞ্জের কৃতী সন্তান। আগেই কথা ছিল, ঢাকার কল্যাণপুর থেকে তিনজন সাংবাদিককে নিয়ে ভোর ৬টায় বাসা থেকে আমাকে তুলে নিয়ে যাবে। আমাকে তুলে নেয়ার পর সময় টেলিভিশনের ফটোসাংবাদিক, ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য এবং ভারপ্রাপ্ত ভাইস চেয়ারম্যান ড. দুর্গাদাস ভট্টাচার্যকে সস্ত্রীক তুলে কিশোরগঞ্জের দিকে যাত্রা করি। ঢাকার উত্তরা পেরিয়ে রাজেন্দ্রপুর আসতেই সেখানকার সেনানিবাসের একটি দোকান থেকে সকালের জলখাবারের জন্য পরোটা, ভাজি, ওমলেট কেনা হয়। গাড়িতেই সবাই নাস্তা খেলাম। মাইক্রো গাজীপুরের কাপাসিয়ার পথ ধরে এগিয়ে চলেছে কিশোরগঞ্জের দিকে। পিচঢালা সরু রাস্তার দুপাশে কাঁঠাল গাছের সারি। আনারস, আখক্ষেত। দূরে মাটির ঘর। ব্রহ্মপুত্র নদীর ওপর ফকির মজনু শাহ আমানত সেতু পেরিয়ে ছোট ছোট কালভার্ট। গাড়ি ছুটে চলেছে। বীর উজলী চৌরাস্তা পেরিয়ে ডানে মোড় নেয়। টোপ কাপাসিয়া পেরিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলেছে। সামনেই সাইনবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লেখা পাকুন্দিয়া উপজেলা। ঐতিহাসিক দিক থেকে কিশোরগঞ্জের এ উপজেলার আলাদা একটা গুরুত্ব রয়েছে। দীনেশ চন্দ্র সেনের বৃহৎবঙ্গের দ্বিতীয় খণ্ডে উল্লেখ রয়েছে, এই উপজেলার এগার সিন্ধু ইউনিয়নে ঈশা খাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গের অবস্থান। নগুয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে পিকআপে জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়ায় এগার সিন্ধু যাওয়া যাবে।
১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে ঈশা খাঁ জঙ্গলবাড়ি অধিকার করেন। তা ছিল কোচ রাজাদের রাজধানী। তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জের অন্তর্গত কোচ রাজাদের মধ্যে লক্ষ্মণ হাজরা ও রাম হাজরা দুভাই একত্রে রাজত্ব করতেন। জঙ্গলবাড়ি দখলের পরপরই বাইশটি পরগনা ঈশা খাঁর দখলে আসে।
করিমগঞ্জে ঈশা খাঁর জঙ্গলবাড়িতে যে ঘরটায় ঈশা খাঁ থাকতেন সেই ঘরটা এখনও রয়েছে। তবে তার অবস্থা খুবই জরাজীর্ণ। এর সংস্করণ দরকার। এখানে বাস করছেন তার ৫৬তম বংশধর এমদাদ খাঁ। কিশোরগঞ্জের এক্রামপুর থেকে অটোতে জঙ্গলবাড়ি যাওয়া যাবে। ভাড়া লাগবে জনপ্রতি ২০ টাকা। এরপর মাইলখানেক গ্রামের ভেতর দিয়ে হেঁটে ঈশা খাঁর বাড়িতে পৌঁছাতে হবে। এখানে দেখা যাবে ঈশা খাঁর বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, পানিপথ- নদীর তিনদিকে রাস্তা, মাঝখানে পুকুরের মতো, তিনটি কবর।
পাকুন্দিয়ায় কিশোরগঞ্জের নতুন জেলখানা তৈরি হচ্ছে। জেলখানার উঁচু প্রাচীরের ভেতরের অংশ দেখার সুযোগ হল না। কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর দেখলাম বড় বড় পানের বরজ।
বেইলি সেতুর উপর দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদীর পূর্ব পাশে কিশোরগঞ্জ জেলার অবস্থান। গাড়ি এসে থামল কিশোরগঞ্জ সার্কিট হাউসে। সার্কিট হাউসের সামনের অংশে ফুল পাতাবাহারের বাগান। সার্কিট হাউসে এসে সবাই ফ্রেশ হয়ে আরেকবার নাস্তা করলাম। পরোটা, সবজি, ওমলেট, ভাজির সঙ্গে ছিল কিশোরগঞ্জের সবরি কলা। ফরমালিনমুক্ত হওয়ার কারণে সবাই দুটা-তিনটা কলা খেয়ে ফেলেন। এরপরই আমরা বেরুলাম ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান দেখতে। ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছয়তলা পর্যন্ত প্রত্যেকটি শ্রেণীকক্ষ, গ্রন্থাগার, শিক্ষককক্ষ, কম্পিউটার কক্ষ, শিক্ষার্থী কমনরুমগুলো ঘুরে দেখতে দেখতে চলে এলাম ষষ্ঠতলায়। এখানে খোলা আকাশের নিচে তৈরি করা হয়েছে অডিটোরিয়াম। এর চারপাশে প্রকৃতির ছোঁয়া। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ধানক্ষেত, দূরে গাছের সারি। চারদিকে প্রশান্তির ছায়া। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কিছুক্ষণ আলাপচারিতার পরই আমরা চলে যাই শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে। ঐতিহাসিক দিক থেকেও এ ঈদগাহ ময়দানের গুরুত্ব অনেক। এটি উপমহাদেশের বৃহত্তম ঈদ জামাতের মাঠ। প্রতি ঈদের জামাতে এ মাঠে তিন লাখের বেশি মানুষ নামাজ আদায় করেন। এর অবস্থান কিশোরগঞ্জ জেলা সদরের শোলাকিয়া এলাকায় মৃত নরসুন্দা নদীর তীর ঘেঁষে। ১৮২৮ খ্রিস্টাব্দে সাত একর জমিতে এই ঈদগাহ ময়দানটি নির্মিত হয়। এর নামকরণ নিয়ে নানা জনশ্র“তি রয়েছে, ঈদগাহ ময়দানের প্রথম জামাতে শোলাকিয়া সাহেব বাড়ির সৈয়দ আহমদ (র.)-এর তালুক সম্পত্তিতে তারই ইমামতিতে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এ কারণেও এর নাম হয়েছে শোলাকিয়া। একবার এ ঈদগাহে এক লাখ পঁচিশ হাজার মানুষ ঈদের নামাজ আদায় করেন। এ সোয়া লাখ থেকেই উচ্চারণ বিবর্তনে এ ঈদগাহের নাম হয়েছে শোলাকিয়া। অনেকের মতে, মোগল আমলে এখানে পরগনার রাজস্ব আদায়ের একটি অফিস ছিল। সেই অফিসের অধীন পরগনার রাজস্বের পরিমাণ ছিল সোয়া লাখ টাকা। এ থেকেও এই ঈদগাহের নাম শোলাকিয়া হতে পারে।
শোলাকিয়া মাঠের বিপরীতে শান বাঁধানো পুকুর। অনেকে পুকুরে কাপড় ধুচ্ছিলেন। গোসল করছিলেন। ঈদগাহ মাঠের প্রধান ফটকের কাছাকাছি প্রাচীন রেইনট্রিটি আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমরা সবাই রেইনট্রিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম। মাঠের ভেতরে ২৬৫টি কাতার দেখতে পেলাম।
সার্কিট হাউসে ফেরার পথে দেখলাম হারুয়া কলেজ রোডে কিশোরগঞ্জের বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুরু দয়াল সরকারি কলেজ, নরসুন্দা নদীর তীরে শান বাঁধানো ঘাটের পাশে তিনতলা বিশিষ্ট অফ হোয়াইট রঙের পাগলা মসজিদ। দেখা হল অষ্টগ্রামের শাহী কুতুব মসজিদ। হজরত শাহজালালের ৩৬০ জন আউলিয়ার একজন এখানে এসে আস্তানা গেড়েছিলেন। পরবর্তীতে তার নামে মসজিদের নামকরণ হয়। এও শোনা যায়, মসজিদটি মোগল আমলের স্থাপত্য। এরপর গাইটালে জজ কোর্ট, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারের কার্যালয় দেখে সার্কিট হাউসে এসে দুপুরের খাবার খেলাম। টাকি মাছের ভর্তা, কাঁচকি মাছের চচ্চড়ি, মুরগির মাংস, ডিম ভুনা, ডাল, ভাজি, সালাদ আরও কত কী! সন্ধ্যার আগে রওনা দিলাম ঢাকার উদ্দেশে।
কিভাবে যাবেন
ঢাকার মহাখালী এবং সায়েদাবাদ থেকে কিশোরগঞ্জ বাসে যেতে পারবেন। মহাখালী থেকে অনন্যা ক্লাসিক, অনন্যা পরিবহন, বিআরটিসি, উজানভাটি এবং সায়েদাবাদ থেকে হাওড় বিলাস, কিশোরগঞ্জ ৩২ -এ যাওয়া যাবে। ভাড়া পড়বে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা। রেলপথে ঢাকার কমলাপুর অথবা এয়ারপোর্ট থেকে কিশোরগঞ্জের ভাড়া পড়বে ১২০ টাকা।
ঘরে বাইরে পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close