¦
খেলাকে পুঁজি করে জুয়ার আসর

যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ | প্রকাশ : ২৪ মার্চ ২০১৫

মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম ও সাব্বির আহমেদ সুবীর
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেছি খেলাকে পুঁজি করে বাজি ধরার দৌড়ঝাঁপ, আবার শুনেছি গোপন জুয়ার আসরের কিছু তথ্য। কামরাঙ্গীরচর থানার এলাকাগুলোতে ক্রিকেটপ্রেমীর সংখ্যা একটু বেশি। এমনটাই মনে হল আবু সাহেবের বাজার ও আশপাশে ঘুরে। আবু সাহেবের বাজারে চোখে পড়ে টিভির দোকানে ক্রিকেটপ্রেমীদের উপচেপড়া ভিড়। বাজারের চত্বর থেকে একটু ডান দিকে গেলে একটি আওয়ামী লীগের ক্লাবে ক্রিকেট ভক্তরা খেলা দেখছেন। জানা যায়, এটি ফেরদৌস মোল্লার ক্লাব নামে পরিচিত। একটু আড়াল করে ইয়াসিন আলীর (ছদ্ম নাম) সঙ্গে কথা হয়। ক্লাবে বাজি ধরা হয় নাকি জানতে চাইলে তিনি জানান, বাংলাদেশের খেলা বা গুরুত্বপূর্ণ খেলার দিন বাজি ধরা হয়।
ইয়াসিনকে সঙ্গে নিয়ে একটু সামনে গেলে একটি কাপড়ের দোকান সম্পর্কে জানা হয়। এখানে প্রভাবশালীরা একসঙ্গে ক্রিকেট খেলা দেখতে বসেন। কিন্তু তারা একপর্যায়ে প্রতি বলে, প্রতি ওভারে এবং প্রতি রানকে টার্গেট করে মোটা অংকের অর্থ সামনে ফেলেন। তবে আইপিএলের সময় এ আসরটা বেশি জমে উঠে। এখানে লাখ লাখ টাকা পর্যন্ত বাজি ধরা হয় বলে জানান তিনি। দোকানে পূর্বদিকে একটি লন্ড্রিতে পর্দা নামিয়ে ভেতরে খেলাকে পুঁজি করে জুয়ার আসর বসে। মাঝে মাঝে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। একটু সামনে একটি টিভির দোকানে কয়েকজন লোক খেলা দেখছে, এখানেও কম-বেশি বাজি ধরা হয় বলে জানান ইয়াসিন। টেলিকম লাইব্রেরি নামের একটি দোকানে ক্রিকেট খেলার সময় এলাকার যুবকদের ভিড় জমে। খেলা দেখা শেষ হলে কেউ পকেট ভারি করে আবার কেউ পকেট ফাঁকা করে ঘরে ফেরেন। এভাবেই এখানকার অলিতে-গলিতে ক্রিকেটকে পুঁজি করে পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে অর্থের বাজিতে মেতে উঠছেন আবার কেউ নতুন করে বাজি ধরা শিখছেন।
কথা হয় পুরান ঢাকার বাসিন্দা ফয়সাল আহমেদ সঙ্গে। খেলার সময় বাজি ধরার প্রসঙ্গে তিনি জানান, এখানে সব ধরনের লোকজনের পদচারণায় এলাকাগুলো জনাকীর্ণ রূপ পেয়েছে। তাই অপরাধের প্রবণতাও একটু বেশি আর যে কোনো খেলা শুরু হলে একশ্রেণীর লোকদের মাঝে উৎসবের আমেজ চলে আসে। খেলাকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে বিভিন্ন জায়গায় জুয়া খেলার আসর বসে। তবে বিশেষ করে রায় সাহেব বাজার, টিপু সুলতান রোড, ইসলামপুর, বাংলাবাজারে এসব কার্যকলাপ বেশি দৃষ্টিগোচর হয়। খেলা শুরু হলে সদরঘাটের মাঝিদের একাংশ টিভির ঘরে চলে আসেন এবং লঞ্চের ভেতরে স্টাফদের একাংশ প্রকাশ্যে জুয়া খেলতে বসেন। তিনি আরও জানান, এসব খেলাকে পুঁজি করে যখন টাকা-পয়সার লেনদেন হয় তখন প্রশাসনও ভাগ বসান। আবার মাঝে মাঝে জুয়াড়িরা মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে।
টঙ্গীর অলিগলিতে চলছে ক্রিকেট ‘জুয়াবাজি’ : অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের মাঠে বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলা চললেও খেলার হার-জিতকে কেন্দ্র করে সারা বাংলাদেশের মতো গাজীপুরের টঙ্গীর অলিগলিতে চলছে ক্রিকেট খেলা নিয়ে রমরমা ‘জুয়াবাজি’। টঙ্গী এলাকার চায়ের দোকান, রেস্তোরাঁ, আবাসিক বাসাবাড়ি, বিভিন্ন বেসরকারি অফিসসহ বিভিন্ন জায়গায় খেলার দিনে নিয়মিত বসছে জমজমাট জুয়াবাজির আসর। জুয়াড়িচক্রের পক্ষ থেকে প্রতি বাজিতেই চায়ের দোকানি ও রেস্তোরাঁর মালিকদেরও দেয়া হচ্ছে লভ্যাংশ থেকে একটি সম্মানী। লোভনীয় অফারের মোহে জুয়াড়িরা নিজের প্রিয় দলের প্রতি ভালোবাসা ছেড়ে তার জুয়াবাজির দলকে সমর্থন করছেন অবলীলায়। জুয়াকে কেন্দ্র করে একশ্রেণীর প্রতারক জুয়ার আসর বসিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, টঙ্গীর বাস্তুহারা এরশাদনগর, হোসেন মার্কেট, কলেজগেট, স্টেশনরোড, টঙ্গীবাজার, হাজীর মাজার বস্তি, আমতলী কেরানীরটেক বস্তি, ভাদাম এলাকাসহ টঙ্গীর অলিগলি ও বস্তির খুপড়ি ঘরে বসছে এসব আসর। খেলা শুরুর পর থেকেই জুয়াড়িরা প্রতিটি বলে, প্রতিটি রানে, প্রতি ওভারে, প্রতি ১০ ওভারে কত রান হতে পারে, নির্দিষ্ট বোলিংয়ে চার-ছক্কা হবে কি, হবে না? কে আজকের ম্যাচে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হবে, কে সর্বোচ্চ উইকেট ও রান নেবে, কত ওভারে কে কত করবে, কোন দল জিতবে এবং কোন দল হারবে এসব নিয়েই সর্বোপরি চলছে জুয়াড়িদের বিভিন্ন অংকের জুয়াবাজি। সর্বনিু ৫শ’ টাকা থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত চলে জুয়ার ডাক। এসব জুয়ার আসরে কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, গাড়ি চালকসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষ জুয়া ধরে হেরে তাদের সর্বস্ব হারাচ্ছেন। এসব জুয়ার আসরে হার-জিতকে কেন্দ্র করে প্রায় সময় হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটছে।
টঙ্গীর বিভিন্ন এলাকার চায়ের দোকান ও রেস্তোরাঁয় ঘুরে দেখা যায়, খেলা চলাকালীন টঙ্গী কলেজগেট এলাকার অটোরিকশা চালক আশরাফ মিয়া (২৫) জানান, ‘বিয়ে কইর‌্যা যৌতুকের ট্যাকা থাইক্যা ৬০ হাজার টাকা দিয়া একটা অটোরিকশা কিনছিলাম। এই গাড়িডা দিয়া সারাদিন গাড়ি চালাইয়া মা-বাবা-স্ত্রী নিয়া ভালোই সংসার চলছিল। বিশ্বকাপ খেলার শুরু থেকে সারা দিন রিকশা চালাইয়া যা পাইতাম, তা জুয়া খেইল্যা শেষ কইরা অবশেষে ভাবছিলাম সব ক্ষতি পুষিয়ে আসবে। সেই লোভে গত বাংলাদেশ-ভারতের খেলায় শেষ সম্বল অটোরিকশাটি ৩০ হাজার ট্যাকায় দাম ধইরা জুয়াড়িচক্রের কাছে বাংলাদেশ দল বিজয়ী হবে বলে জুয়াবাজি ধরেছিলাম। কিন্তু বাংলাদেশ দল হারায় আমিও সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছি।’
বিশ্বকাপে ১৯ মার্চের বাংলাদেশ বনাম ভারতের খেলায় জুয়াবাজি রেখেছিলেন টঙ্গী বাজারের জুয়াড়িচক্রের নেতা মাহবুব হাসান। কেমন করে জুয়াবাজি খেলেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘খেলায় বাজি ধরবেন এমন একদলের একটি সিন্ডিকেট গঠন করি। এর মধ্যে অফার দেয়া হয় আজকে বাংলাদেশ দল বিজয়ের পক্ষে যদি বাজি ধরেন প্রতি হাজারে ৫ হাজার টাকা লভ্যাংশ দেয়া হবে। আর ভারতের পক্ষে বিজয়ের বাজি ধরলে প্রতি হাজারে ৫শ’ টাকা দেয়া হবে। এমন অফারে বাংলাদেশ দল বিজয়ের পক্ষে কেউ কেউ ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাজি ধরেছেন। আর ভারতের পক্ষে বিজয়ের জন্য ১ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত রাখা হয়।’
এ বিষয়ে টঙ্গী থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘লোকমুখে অনেক কিছু শুনেছি। কিন্তু কীভাবে জুয়াবাজি খেলে, কোথায় খেলে তা আমার জানা নেই। খেলা হল বিনোদন, তা নিয়ে জুয়াবাজি করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।
 

প্রতিমঞ্চ পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close