¦
বিশেষজ্ঞ অভিমত

| প্রকাশ : ১৯ মে ২০১৫

ফরমালিন বা রাসায়নিক দ্রব্যযুক্ত ফল গ্রহণ করার ফলে মানব দেহের ক্ষতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এমএ জলিল চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানে ফরমালিন যুগ যুগ ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। মানুষের দেহের বিভিন্ন অংশ মূলত ফরমালিনের মাধ্যমে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। ডাক্তাররা যখন এটা ব্যবহার করা শুরু করলেন তখন থেকে আস্তে আস্তে ফরমালিনটাকে খাদ্যে ব্যবহার করা শুরু হয়। ২ পিপিএম ফরমালিন খাদ্যে মেশান যায়। এতে ফলে গুণাগুণের কোনো ক্ষতি হয় না, ফল সহজে নষ্ট হয় না। কিন্তু আমাদের দেশের কৃষকরা না বুঝে অনিয়মতান্ত্রিক ভাবে খাদ্যে ফরমালিন ব্যবহার করছেন। আবার যে খাদ্যে ফরমালিন ব্যবহার না করলেও চলে সেগুলোতেও তারা ফরমালিন ব্যবহার করছেন। তারা মনে করেন খাদ্যকে টিকিয়ে রাখতে ফরমালিনের বিকল্প নেই। কিন্তু এ ধারণাটা একেবারেই ভুল। তবে মৌসুমি ফলে ফরমালিনের ব্যবহার একপ্রকার জোর করে ফলের রং ও পরিপক্বতার রূপে আনা হচ্ছে। ফরমালিনযুক্ত ফল বা খাদ্য সবার শরীরে সমানভাবে কাজ করে না। গর্ভবতী মহিলা গ্রহণ করলে ক্ষতিটা একরকম আবার শিশুরা গ্রহণ করলে ভিন্ন ধরনের ক্ষতি হয়ে থাকে। পূর্ণ বা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে এর ক্ষতির মাত্রা আবার আরেক রকম। তবে শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয়। একটা শিশু যখন বড় হতে থাকে তখন ফরমালিনযুক্ত ফল খাওয়ার ফলে তার দেহে ফরমালিনের প্রভাবে বেড়ে ওঠার শক্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। এমনও হতে পারে, শিশুটির মূল আকৃতি গঠন হবে না। বয়স্ক মানুষের শরীরে যদি ফরমালিনের প্রভাব পড়ে তাহলে তার দেহের ক্ষতিটা সহজে আর পূরণীয় নয়, কারণ তার দেহ তো এমনিতেই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্যপ্রক্রিয়া শক্তি কমে গেছে, তার ওপর যদি আবার ফরমালিনের প্রভাব পড়ে তাহলে ব্যাপারটা খুব ভয়াবহ হয়ে যায়। বছরে কেউ একটা ফরমালিনযুক্ত ফল খেলেন, তাহলে তার দেহে সে রকম প্রভাব পড়বে। আপনি অতিরিক্ত মাত্রায় ফরমালিনযুক্ত ফল খেলেন আপনার দেহে এর প্রভাবটাও বেশি পড়বে। বাজার থেকে সরাসরি ফল কিনে এনে খাওয়া উচিত না। বাজার থেকে ফল নিয়ে আসার পর প্রায় ৩০ মিনিট পানিতে ভিজিয়ে রেখে তারপর হাত দিয়ে ভালো করে ধুয়ে ফল খাওয়ার উপযোগী করতে হবে। ফলকে পানিতে ভিজিয়ে রাখলে ফরমালিনের কার্যকারিতা অনেক কমে যায়। ফরমালিনটা মানবদেহে যাওয়ার পর পুরো শরীরে ছড়িয়ে যায়, ফলে মানুষ বড় ধরনের রোগের পড়তে পারেন। তবে ক্যান্সারের ঝুঁকিটা বেশি থাকে যেমন, লিভার ক্যান্সার, আলছার, গ্যাসটিকসহ আরও অনেক রোগ হতে পারে।
এ সমস্যা নিরসনে তিনি বলেন, আমরা একটু সচেতন হলেই আর সমস্যা হবে না। বাজার থেকে কিনে আনা ফলগুলো খাওয়ার আগে ৩০ মিনিট পানিতে রেখে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। এ বিষয়ে সরকারকে গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
কেমিক্যালে ৮৫ ভাগ গুণ নষ্ট
মৌসুমি ফলে ফরমালিন বা রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারে ফলের পুষ্টি ও মান সম্পর্কে ঢাবির পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নাজমা শাহীন যুগান্তরকে বলেন, মৌসুমি যেসব ফল আমাদের দেশে উৎপাদিত হয় সেগুলোতে পানির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। এ সময়টায় তাপমাত্রা বেশির কারণে আমাদের দেহে পানির পরিমাণ কম থাকে কিন্তু মৌসুমি ফলগুলো আমাদের দেহে পানির পরিমাণ পূরণ করতে পারে। এসব ফল থেকে আমরা ‘ভিটামিন সি’ অধিক পরিমাণে পাই। শাকসবজি রান্না করার ফলে ‘ভিটামিন সি’ এর পরিমাণ অনেক কমে যায় কিন্তু ফলের ক্ষেত্রে তা অক্ষুণ্ণ থাকে। আমরা মূলত ‘ভিটামিন সি’ ফল থেকে পাই। আমাদের দেশে যেসব জনসাধারণ রয়েছে তাদের দেহে ‘ভিটামিন-এ’-এর অভাব রয়েছে, এর অভাবে মানুষের রাতকানা রোগ হয়। মৌসুমি ফল আমে প্রচুর পরিমাণে ‘ভিটামিন-এ’ রয়েছে। তাই আমের মাধ্যমে দেহের ‘ভিটামিন-এ’-এর চাহিদা কিছুটা হলেও পূরণ করা সম্ভব। মৌসুমি ফলসহ আরও যেসব ফল রয়েছে এগুলো আমাদের দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই আমাদের দেহের জন্য এগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।
বর্তমানে কিছু অসাধু ব্যবসায়িক অধিক মুনাফার আশায় ফলকে দ্রুত বাজারজাত করণের উদ্দেশ্যে খাদ্যদ্রব্যে ফরমালিন বা কার্বাইড অতি মাত্রায় ব্যবহার করে থাকে। অপরিপক্ব ফলে এসব ব্যবহারের মাধ্যমে ক্রেতা সাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ফলকে দ্রুত পাকাতে ও রং সুদর্শন করতে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে অবলীলায়। এতে ফলের ৮৫ ভাগ গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়। ফল পরিপক্ব হলে ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে পচে যাওয়ার কথা কিন্তু বাজারে কিছু ফল সহজে পচে না। ব্যবসায়ীরা তাদের অজ্ঞতার কারণে এভাবে খাদ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করছে। মানবদেহ ২ পিপিএম ফরমালিন গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে কিন্তু যখন এর বেশি হয় তখন সেটা দেহের ক্ষতি করে। এতে ৪ থেকে ৫ বছর পরে একজন মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারে। আম, আনারস, লিচু, আঙুরসহ বেশ কিছু ফল দ্রুত পচনশীল বলে ব্যবসায়ীরা এগুলোতে বেশি রাসায়নিক ব্যবহার করে। এতে করে ফলের আকৃতি ও রং অনেক দিন ধরে অক্ষত অবস্থায় থাকে কিন্তু তখন ফলটার গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায় এবং মানবদেহের একাধিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সুস্থ থাকার জন্য একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন প্রায় ১১৫ গ্রাম ফল খাওয়া উচিত। আমরা প্রায় ৪০ থেকে ৫০ গ্রাম ফল খেতে পারি। কিন্তু তাও আবার মানসম্মত হয় না। ফরমালিনযুক্ত ফল বা সবজি থেকে রক্ষা পেতে সবার করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, বাজারে যদি ফরমালিন শনাক্তকারী মেশিন থাকে তাহলে মেশিনের মাধ্যমে ফল পরীক্ষা করে ক্রয় করতে হবে। যেসব ফলে মাছি বা মৌমাছি বসে না, সেসব ফল কেনা ঠিক না। বাজার থেকে কেনা ফলগুলো খাওয়ার আগে পানিতে কিছু সময় ডুবিয়ে রেখে ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। আবার দেশের বাইরে থেকে যেসব ফল সারা বছর ধরে আমাদের দেশে আমদানি হচ্ছে সেগুলোর ব্যাপারে সবাইকে সবচেয়ে বেশি সতর্ক হওয়া উচিত। - সাক্ষাৎকার গ্রহণ : আরিফুল ইসলাম
 

প্রতিমঞ্চ পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close