¦
ডেঙ্গুজ্বর : বিভ্রান্তি ও করণীয়

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ | প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০১৫

বাংলাদেশে ডেঙ্গুজ্বরের প্রাদুর্ভাব অনেক আগে থেকে। প্রায় প্রতি বর্ষাতেই কমবেশি ডেঙ্গুজ্বর হয়ে থাকে।
ডেঙ্গুজ্বরে কি মৃত্যুর ঝুঁকি আছে : অনেকে মনে করেন, ডেঙ্গুজ্বর মারাত্মক রোগ এবং এতে রোগী মারা যায়। এ ধারণা ভুল। চিকিৎসা করা হলে সাধারণ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত প্রায় শতভাগ রোগীই ভালো হয়ে যায়। বলা হয়, ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারে মৃত্যু হার ৫ থেকে ১০ শতাংশ, কিন্তু বাস্তবে অভিজ্ঞতায় দেখেছি, এ হার ১ শতাংশের নিচে।
জ্বর কমে গেলে কি বিপদ কেটে গেল : ডেঙ্গুতে জ্বর সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় দিন থাকে, তারপর ভালো হয়ে যায়। কখনও দুই বা তিন দিন পর আবার জ্বর আসতে পারে। জ্বর কমে গেলে বা ভালো হয়ে গেলে অনেক রোগী, এমনকি অনেক চিকিৎসকও মনে করেন রোগ সম্পূর্ণ ভালো হয়ে গেছে। মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গুজ্বরে মারাত্মক সমস্যা হওয়ার সময় এটাই। এ সময় প্লাটিলেট কাউন্ট কমে যায় এবং রক্তক্ষরণসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। জ্বর কমে যাওয়ার পরবর্তী কিছুদিনকে তাই বলা হয় ক্রিটিক্যাল পিরিয়ড। এ সময় সচেতন থাকা জরুরি।
মা ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত অবস্থায় বাচ্চাকে কি বুকের দুধ খাওয়াবেন : ডেঙ্গুজ্বর ভাইরাসবাহিত, মশার কামড়ের মাধ্যমে হয়ে থাকে। মায়ের বুকের দুধে এ ভাইরাস থাকে না। কাজেই আক্রান্ত অবস্থায় মা বাচ্চাকে তার বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন।
ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে কি একত্রে থাকা যাবে : ডেঙ্গু কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে এক বিছানায় শোয়া, একসঙ্গে থাকা-খাওয়া বা রোগীর ব্যবহার্য কোনো জিনিস ব্যবহার করায় কোনো বাধা নেই।
ডেঙ্গুজ্বরে কী কী পরীক্ষা করতে হয় : সব রোগীর ক্ষেত্রেই ব্লাড সুগার পরীক্ষা করা উচিত। ডেঙ্গুতে সাময়িকভাবে ব্লাড সুগার বেড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া ডেঙ্গুতে রুটিন পরীক্ষা করা হয়, কিছু সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রেই এ পরীক্ষা করা উচিত। ডেঙ্গুতে সাধারণত লিভারের প্রদাহ (হেপাটাইটিস) হয়ে থাকে, এ কারণে রক্তে লিভারের পরীক্ষাগুলো স্বাভাবিক নাও হতে পারে। যেমন- এসজিপিটি, এসজিওটি, এলকালাইন ফসফাটেজ ইত্যাদি বাড়তে পারে। তাই ডেঙ্গুজ্বর শনাক্ত হয়ে গেলে লিভারের এ পরীক্ষা বারবার করার দরকার নেই, রোগের চিকিৎসায়ও লাভ হয় না।
পেটের আলট্রাসনোগ্রাম করা হলে অনেক ক্ষেত্রেই পেটে পানি (এসাইটিস) পাওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রেও রোগীর চিকিৎসার কোনো পরিবর্তন হবে না বা অতিরিক্ত কোনো ওষুধ দেয়া লাগে না। তাই রুটিন হিসেবে পেটের আলট্রাসনোগ্রাম করার দরকার নেই।
বুকের এক্স-রে করলে বুকের ডান দিকে পানি পাওয়া যেতে পারে। যদি রোগীর শ্বাসকষ্ট থাকে, তবে এক্স-রে করা যেতে পারে। বুকে পানি জমলেও তা বের করার প্রয়োজন সাধারণত হয় না। ডেঙ্গুর চিকিৎসার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তা এমনিতেই ভালো হয়ে যায়।
চিকিৎসা বিষয়ে বিভ্রান্তি : ডেঙ্গু যেহেতু ভাইরাসজনিত কারণে হয়, সেহেতু উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেয়া হয়। যেমন, জ্বর হলে প্যারাসিটামলজাতীয় ওষুধ ও এর সঙ্গে প্রচুর পানি এবং শরবতজাতীয় তরল খাওয়ানোই যথেষ্ট।
রক্ত পরিসঞ্চালনের প্রয়োজনীয়তা আছে কি : ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় রোগী ও চিকিৎসক উভয়ই রক্ত পরিসঞ্চালনের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। যদি রক্তক্ষরণ না হয় এবং রোগীর রক্তের হিমোগ্লোবিন যদি স্বাভাবিক থাকে, তবে রক্ত পরিসঞ্চালন করার প্রয়োজন নেই। এ ক্ষেত্রে রক্ত দিলে লাভ তো হবেই না, বরং অন্য জটিল, এমনকি হার্ট ফেইলিউরও হতে পারে। রক্তের প্লাটিলেট কম হলেই অনেকে রক্ত দিয়ে থাকেন। এতে কোনো লাভ হবে না। মনে রাখতে হবে, শুধু কম প্লাটিলেট কাউন্টের জন্য রক্ত দেয়া উচিত নয়।
প্লাটিলেট কখন দেব, কখন না : ডেঙ্গুজ্বরের পাঁচ বা ছয় দিনে রোগের স্বাভাবিকতাতেই প্লাটিলেট কাউন্ট কমতে থাকে, দুই বা তিন দিন পর তা আপনা আপনি কোনো চিকিৎসা ছাড়াই বাড়তে শুরু করে। প্লাটিলেট কাউন্ট অল্প কমে গেলেই রোগী ও চিকিৎসক খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং প্লাটিলেট পরিসঞ্চালনের সিদ্ধান্ত নেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্লাটিলেট পরিসঞ্চালনের প্রয়োজন হয় না। এক ইউনিট প্লাটিলেটের জন্য চার ইউনিট রক্ত প্রয়োজন হয় এবং সেপারেটর দিয়ে আলাদা করতে হয়, যা ব্যয়বহুল। রক্তে প্লাটিলেটের হাফ লাইফ মাত্র ছয় ঘণ্টা। প্লাটিলেট পরিসঞ্চালনের সুফল হয় স্বল্পমেয়াদে। এ ছাড়া অপ্রয়োজনীয় এবং তাড়াহুড়া করে প্লাটিলেট দেয়ায় হেপাটাইটিস-বি অথবা সি, এমনকি এইচআইভি দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
লেখক : ডিন, মেডিসিন অনুষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
 

সুস্থ থাকুন পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close