jugantor
নববর্ষ, সর্বজনীনতা ও সাম্প্রদায়িকতা

  ফরহাদ মজহার  

১৬ এপ্রিল ২০১৪, ০০:০০:০০  | 

বাংলা নববর্ষ নানা জনে নানা কারণে পালন করতেই পারেন। কিন্তু সেই অনুষ্ঠান বা উৎসবকে ‘বাঙালি’র বা সবার সর্বজনীন উৎসব বা সর্বজনীন সংস্কৃতি হিসেবে দাবির দরকার কী? একালে যে কারুরই নিজের মতো উৎসবের অধিকার আছে। কিন্তু সেটাই সবার সংস্কৃতি দাবি করা হলে তা বড় এক আপদ হয়ে ওঠে। একে গোষ্ঠীগতভাবে উদযাপন বা সম্প্রদায়গতভাবে সীমাবদ্ধ রাখা সাম্প্রদায়িকতারই নামান্তর। বাংলা নববর্ষ কোনো ধর্মের বা বিশেষ কোনো সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠান নয়। একে সর্বজনীন করে তোলার পেছনে সদর্থ থাকতেই পারে, যাতে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক একে নিজের উৎসব বলে মনে করে। বাংলাদেশের পাহাড়ের বা সমতলের ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠী বাঙালিদের নববর্ষকে বাঙালিদের ব্যাপার বলেই মনে করে। তাদের উৎসব বা সর্বজনীন মনে করে না। কারণ বাঙালিরা একে বাঙালিদের উৎসব দাবি করে তাদের আগাম খারিজ করে রাখে। আর, শহরে গড়ে ওঠা এ উৎসব কোনোভাবেই চিন্তা-চেতনায়, চরিত্রে ও অংশগ্রহণে বাংলার সাধারণ মানুষের উৎসব নয়। শহুরে উৎসব। শেকড় ছেঁড়া শহুরে মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক শূন্যতা বোধ বা আর্তি থেকে এর উৎপত্তি। সম্ভবত এখানেই এ শ্রেণীর সফলতা। ঠিক হোক কী অশুদ্ধ, এর ইতিবাচক দিক হচ্ছে সমষ্টির বোধ উদযাপনের একটা আর্তি। যা অনেককেই টানে। কিন্তু তার মন্দ দিক হচ্ছে, সর্বজনীনতার দাবি নিয়ে বাঙালিপনার খাপে ঢুকিয়ে একে সাম্প্রদায়িক চরিত্র দেয়া। তাছাড়া সর্বজনীন অর্থে একে ‘বাঙালির সংস্কৃতি’ দাবি করার কোনো ঐতিহাসিক বা প্রামাণ্য যুক্তি নেই।

সংস্কৃতি সবসময়ই বদলায়, তার বিবর্তন আছে। বিশুদ্ধ সংস্কৃতি বলে কিছু নেই। বিশুদ্ধ জাতিও নেই। যদি ছিটেফোঁটা আগে থেকেও থাকে, পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নে যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা আমাদের চোখের সামনে গড়ে উঠেছে তার মধ্যে বিশ্বব্যাপী আদান-প্রদান, লেনদেন, দেয়া-নেয়ার গতি তীব্রভাবে বেড়ে যাওয়ায় কিছুই নিজেকে ‘বিশুদ্ধ’ বলে দাবি করতে পারে না। সম্ভবও নয়। কিন্তু আমরা যখন নিজেদের ‘বাঙালি’ বলে জাহির করতে চাই আর নিজেদের শেকড় ও শুদ্ধতা সন্ধানে ব্যাকুল হয়ে পড়ি, তখন সেটা বিশুদ্ধবাদিতার অসুখ। এ অসুখ থেকে নিরাময় দরকার।

পরিবর্তন বা বিবর্তন কী জিনিস তা বোঝাবার জন্য জাকের নায়েকের উদাহরণ দেব। মাথার সঙ্গে সেঁটে থাকা বিশেষ ধরনের স্কিনক্যাপ টুপি পরে জাকির নায়েক ইসলাম নিয়ে পিস টিভিতে আমাদের যে বয়ান দিয়ে থাকেন, টেলিভিশন স্ক্রিনে তার সেই ছবির কথা ভাবুন। ফ্যাশন হিসেবে এ টুপি আমার পছন্দ। তার পিন্দনে স্যুট-টাই, পাশ্চাত্যের পোশাক। নাসারা বা খ্রিস্টানদের মতো টাই ঝুলে আছে তার গলায়। তিনি নিশ্চয়ই ভালো কিছু বলেন, নইলে এত মানুষ তার কথা শুনত না। পিস টিভিতে ইসলাম নিয়ে হামেশা তিনি আমাদের বয়ান দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি কী বলছেন, না বলছেন তার বিচার যারা ধর্মতত্ত্বে বিশেষজ্ঞ তারা করবেন, কিন্তু তিনি পোশাকে যে সংস্কৃতি ধারণ করেন সেটা হাইব্রিড। তা ভালো কী মন্দ সেটাও আমার তর্ক নয়। পোশাকের একটা বিবর্তন ঘটেছে এখানে। ইসলামী ধর্মতত্ত্ব যতই ‘মৌলবাদী’ হোক, তার পোশাকের রূপান্তর ঠেকাতে পারেনি। তিনি আরবীয় পোশাক পরেননি। ঔপনিবেশিক পোশাকের ওপর স্কিনক্যাপ টুপি পরিয়ে দিয়েছেন। ইংরেজের মাথায় একই টুপি চাপানো যায়। বাদামি হলেও তিনিও হয়তো পাশ্চাত্য সাহেবই, মাথায় শুধু একটা টুপি পরেছেন।

ইসলাম বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদবিরোধী একটি ধর্ম। কোনো বিশেষ সংস্কৃতির প্রতি তার পক্ষপাত নেই। জাকির নায়েক আরবীয় পোশাক পরছেন না। কিন্তু সেটা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে অসঙ্গত কিছু নয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক পরিবার, গোত্র, রক্ত, ভূখণ্ড, ভাষা বা সংস্কৃতির মধ্যস্থতায় নয়, আল্লার মধ্যস্থতায় হতে হবে, অর্থাৎ কোনো ইহলৌকিক ‘ইলাহ’ বা দেশকালের অধীনস্থ কোনো সত্তার মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের কিংবা মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক রচনা ইসলামের সাধনা নয়। সবাই আল্লার বান্দা, নিরাকারই মানুষের উপাস্য, দেশকালের অতীত যিনি তার মধ্য দিয়ে ইহলোকে অন্য সব ইহলৌকিক সত্তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ইসলামের মৌলিক রাজনৈতিক ও দার্শনিক প্রস্তাবনা। মানুষ জীবমাত্র নয়, তার পরমার্থিক সম্ভাবনা বিপুল। সেই সম্ভাবনার বিকাশের মধ্য দিয়েই মানুষের উম্মাহ কায়েম সম্ভব। বিচিত্র ও বিভিন্ন মানুষকে তাদের বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্য বজায় রেখেই ‘এক’-এর পরমার্থিক পতাকার নিচে সন্নিবেশ করতে চায় ইসলাম।

সেটা অবশ্যই সম্ভব, কারণ মানুষ জীব মাত্র নয়। জৈবিকতার অতিরিক্ত পরমার্থিকতার তাগিদ বোধ করে সে। অতএব একদিন মানুষ ঐক্যবদ্ধ হবে। মানুষের উম্মাহ বা বিশ্ব মানব সমাজ গঠনের দিকেই মানব প্রকৃতির তাগিদ। এটাই তার ধর্ম। ইসলাম এ প্রতিশ্র“তি দেয়। গোলকায়নের এ কালে বিশ্ব মানব সমাজ গড়ার সম্ভাবনা যতই বাড়ছে, এ রাজনৈতিক/দার্শনিক প্রস্তাবের শক্তিও বাড়ছে। ধর্মতত্ত্ব ও আত্মপরিচয়ের রাজনীতির বাইরে মুসলমানরা এর তাৎপর্য উপলব্ধি করে কি-না সেটা ভিন্ন তর্ক। আমরা সংস্কৃতির আলোচনাতেই থাকি।

ধর্মতাত্ত্বিক বিধিবিধানবিরোধী না হলে সংস্কৃতির বিবর্তনে, বৈচিত্র্যে, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ইসলাম আপত্তি করে না। বিধিবিধানের পরও সংস্কৃতির বিবর্তন, রূপান্তর, পরিবর্তন ঘটে। তাহলে জাকের নায়েকের পোশাকে ইসলামের আপত্তি থাকার কথা নয়। কঠোর ধর্মতাত্ত্বিক বিধিবিধানের মধ্যেও যদি সংস্কৃতির এ বিবর্তন ও পরিবর্তন ঘটে, পোশাকে যা দৃশ্যমান, তাহলে যেখানে এ বিধিবিধান শিথিল, সেখানে বিবর্তন আরও ত্বরান্বিত হওয়ারই কথা। তথাকথিত বাঙালি সংস্কৃতির ক্ষেত্রে হয়েছেও তাই।

দুই

বাংলা নববর্ষ পালন করার পক্ষে প্রেরণা ও যুক্তি আমরা সাহেবদের কাছে পেয়েছি। সেটা মুঘল আমলের জমিদার-মহাজনদের যুক্তি। সাহেবরা ‘নিউ ইয়ার’ পালন করেন। ইংরেজি নববর্ষে তারা সকালে পরস্পরকে বলেন, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’। শুনতে ভালো লাগে, সভ্য হয়েছি ভাব জাগে। অতএব আমাদের চামড়া বাদামি হওয়া সত্ত্বেও আমাদেরও ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ বলার একটা ব্যবস্থা থাকা চাই। নইলে সভ্য হব না। সাহেব হওয়ার বাসনায় আমরাও ‘নববর্ষের শুভেচ্ছা’ চালু করলাম। বাংলা নববর্ষের চল হল।

‘বাংলা নববর্ষ’ নামক আদৌ কিছু ছিল না তা নয়। ছিল। কারা করত? কোথায় ছিল? যা ছিল সেটা বাঙালির বা এ দেশের জনগোষ্ঠীর নববর্ষ নয়। সেটা ছিল সুদখোর মহাজন ও ব্যবসায়ীদের খেরোখাতা মেলানোর দিন। কার কাছে কী দেনা-পাওনা তার হিসাব মিলিয়ে নতুন লাল খেরোখাতা খোলার তারিখ। তাদের সংস্কৃতিও সংস্কৃতি। কিন্তু একটি বিশেষ সম্প্রদায় বা শ্রেণীর সংস্কৃতি সবার সংস্কৃতি বলে তাকে চালিয়ে দেয়া চলে না। পরজীবী। গ্রামের মানুষকে শোষণ করেই তারা টিকে থাকত। প্রহসন হলেও সত্য, এখনকার শহুরে বাংলা নববর্ষ বাংলাদেশের গ্রাম ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের শোষণ করে যে পরজীবী শ্রেণী টিকে আছে তাদেরই সংস্কৃতি। হোক তা। কিন্তু মুশকিল হয় যখন পরজীবীদের সংস্কৃতি সবার সংস্কৃতি বলে দাবি করা হয়। শহর ও পরজীবী শ্রেণী যখন তাদের সংস্কৃতিকেই সর্বজনীন দাবি করে, তখন সেটা আর সংস্কৃতি থাকে না। সেটা রাজনীতি। সংস্কৃতি নয়।

এখনও গ্রামের মানুষ নববর্ষকে জমিদার-মহাজনদের খাজনা আদায়ের দিন কিংবা সারা বছরের সুদের হিসাব মেলানোর জন্য যতটা বোঝে, তথাকথিত ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ হিসেবে বোঝে না বললেই চলে। চৈত্রসংক্রান্তির পরের দিন ঘর ধোয়ামোছা, গরুকে গোসল করানো ইত্যাদি অনেক কিছু করে তারা বটে, কিন্তু তাকে নববর্ষ নামক কোনো ধর্মীয়, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক উৎসব বলা যায় না।

বাংলা নববর্ষ বানানো জিনিস। বানাতে হয়েছে। তাতে কোনো দোষ নেই। সংস্কৃতি তৈয়ার হতেই পারে। কিন্তু বানিয়েছে যারা, তারা বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না, অথচ বাঙালির সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বয়ান রচনার জন্য তারা নিজেদের যোগ্য মনে করে। দরকার তাদের নিজেদের শেকড়ছুট পরজীবী জীবনযাপনের পর্যালোচনা করা। কিন্তু তারা সেটা করতে রাজি নয়। নিজের শ্রেণী আধিপত্য বজায় রাখার জন্যই ‘বাঙালির নববর্ষ’ নামক একটা বয়ান পরজীবী শ্রেণীকে বানাতে হয়েছে। তারপর সাহেবদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দাবি করতে হয়েছে, ‘এই দেখ আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি’। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাংলার কৃষকদের শোষণ-লুণ্ঠন করে যে অভিজাত জমিদার শ্রেণী গড়ে উঠেছিল আর তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল ঔপনিবেশিক কলকাতা শহর ও তার সংস্কৃতি, তাকেই ‘বাঙালি’ সংস্কৃতি বলে; বাংলাদেশের সব বর্ণ, শ্রেণী, লিঙ্গ বা সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি বলে দাবি করা হয়েছিল। এখনও দাবি করা হয়। এ গোত্রের ওপর বিষফোঁড়ার মতো এখন চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে তথাকথিত বাংলা নববর্ষ।

আগেই বলেছি, নতুন কোনো সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্যে দোষের কিছু নেই। বরং নতুনের মধ্য দিয়েই আমরা ভাষা, চিন্তা ও সংস্কৃতির জগতে নতুন দিগন্তের অনুসন্ধান করি। এর মধ্যে টানাপোড়েন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত তো থাকবেই। অতএব রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথসহ কলকাতাকেন্দ্রিক ‘বাঙালিত্ব’ অবশ্যই একটা ঐতিহাসিক অর্জন। ইউরোপীয় এনলাইটমেন্টের আদলে একে ‘বাংলার নবজাগরণ’ বলা হয়। এগুলো কথার কথা। তর্কবিতর্ক আছে। কিন্তু যা হয়েছে তাকে বাতিল বলে গণ্য করার যুক্তি আমরা দিচ্ছি না। মুশকিল হচ্ছে, ঔপনিবেশিক কলকাতা শহরে গড়ে ওঠা ও তাকে কেন্দ্র করে যে বাঙালি সংস্কৃতি, তার উপনিবেশিক উৎপত্তি আমরা ভুলে যেতে পারি না। তদুপরি তার বর্ণ, শ্রেণী ও পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাস ভুলে গিয়ে সেই অভিজাতদের সংস্কৃতিকেই আমরা ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ বলে দাবি করতে শুরু করেছি। আজ অবধি এটাই চলছে। আমাদের নববর্ষের আবাহন শুরু হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দিয়ে। আবহমান বাংলার কেচ্ছা গাওয়া আমরা এভাবেই শিখেছি। পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের এ যুগে তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন বেনিয়াদের স্বার্থ। বহুজাতিক কর্পোরেশন, যারা খাদ্যের মাঠকে বিশাল ফুলের মাঠে পরিণত করে চলেছে।

করুক তারা তাদের নাচনা, গানা ও মাস্তি। আপদ তখনই শুরু হয়, যখন তারা একে সবার সর্বজনীন সংস্কৃতি বলে দাবি করে। এদেশের মানুষ চৈত্রসংক্রান্তি পালন করে এসেছে। ইংরেজের নববর্ষ নয়। কাউকে চৈত্রসংক্রান্তি পালন করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। চাইলে সে নববর্ষ করুক। কিন্তু দাবি করা হয়, বাঙালির নাকি নববর্ষ ছিল। আর ‘বাঙালি’ নামক অদ্ভুত জীব যদি ‘আবহমান’ অর্থাৎ সৃষ্টির আদি থেকে ধরাতলে ভূমিষ্ঠ হয়ে থাকে তো আবহমান কাল ধরেই পান্তা ভাত ও ইলিশ মাছ খেয়ে আসছে। এর সঙ্গে বিশুদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতি পরজীবী শ্রেণী তার উদযাপনকেই সবার, তার সংস্কৃতিকেই সর্বজনীন বলে দাবি করছে। আপদ এখানে।

তিন

সর্বজনীনতার এ দাবির দরকার কী? প্রথম দরকার রাজনৈতিক। যারা নিজেদের বাঙালি সংস্কৃতির ধারক বলে মনে করেন, তাদের সর্বজনীনতার দাবি নিয়ে একই কাতারে আনা ও সংঘবদ্ধ করার জন্য এর দরকার আছে। বাংলাদেশের বিদ্যমান ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে জনমত তৈরি ও সমর্থনের ভিত্তি তৈরির জন্য বাঙালিত্ব মোক্ষম একটি হাতিয়ার। বাঙালিত্বের পতাকা তুলে বাঙালির ‘অপর’কে নির্মূল করার রাজনীতি সচল রাখার জন্যই এ সর্বজনীনতার দাবি। পাশাপাশি পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের এ কালে সম্পদের বিষম বণ্টন, শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের অবর্ণনীয় শোষণ ও নির্যাতন আড়াল করা এবং বহুজাতিক কোম্পানির জন্য বাংলাদেশকে লুণ্ঠনের স্বর্গরাজ্য বানানোর জন্য পরজীবী শ্রেণীর সংস্কৃতিকে সর্বজনীন সংস্কৃতি হিসেবে দাবি করা খুবই দরকার।

কিন্তু বাঙালির মধ্যে তারাও আছেন, যারা আন্তরিকভাবেই নিজেদের বাঙালি মনে করেন। কিন্তু বাঙালি ছাড়াও তার আরও নানা পরিচয় আছে। যেমন ভাষা ও সংস্কৃতি ছাড়া ধর্মও তার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের উৎস বা উপাদান। তারা অতএব সর্বজনীনতার দোহাই দেন না। ‘বাঙালিত্ব’ নামক পদার্থের ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় তারা কাতর বোধ করেন না। কারণ ইতিহাস এভাবে আঁকাবাঁকা পথেই অগ্রসর হয়। এটা সরলরেখা নয়। তাকে পর্যালোচনা করে বাছ-বিচার ও গ্রহণ বর্জন করেই নিজেদের নিরন্তর নতুনভাবে তৈরি করতে হয়। বিশুদ্ধ কোনো ‘জাতি’ বলে দুনিয়ায় কিছু নেই। বিশুদ্ধ সংস্কৃতি বলেও কিছু নেই। শহরের অনেকে, যারা কখনও গ্রামে থাকেননি বা গ্রামে থাকবেন না, তারা বাংলা নববর্ষের মধ্যে যে নির্মল আনন্দ খুঁজে পান তাকে গৌণ জ্ঞান করা বা অস্বীকার করার কোনো যুক্তি নেই।

বাংলা নববর্ষ বাঙালির সর্বজনীন সংস্কৃতি দাবি করার নগদ লাভ হচ্ছে, যারা নিজেদের শুধু ‘বাঙালি’ মনে করেন না বা বাঙালিয়ানার আড়ালে বিশেষ শ্রেণী বা গোষ্ঠীর মতলব বোঝেন, তাদের সাংস্কৃতিক/রাজনৈতিকভাবে কাবু করার জন্যও এটা বেশ শক্ত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। যারা বাঙালি জাতিবাদী রাজনীতির বিরোধী, তাদের অনায়াসে ধর্মপন্থী বা সাম্প্রদায়িক বলে নিন্দা করা সহজ হয়। সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অজ্ঞতা, নির্বিচার আবেগ ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলস্য যে জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রবল, তাদের সহজেই সর্বজনীনতার প্রপাগান্ডা দিয়ে বশে রাখা যায় এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার সহজ হয়। নতুন বছরে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়া কখনোই বাঙালির সংস্কৃতি ছিল না। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক অজ্ঞতা, নির্বিচার আবেগ ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলস্য কতটা প্রবল যে ইলিশ মাছ ধরা যখন নিষিদ্ধ, তখনও আমরা উৎসব করে ইলিশ হত্যা করছি। এমনই এ হত্যার অর্থনীতি যে ইলিশ অশ্লীল ও অবিশ্বাস্য দামে কিনতে ও সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে খেতে আমরা লজ্জা বোধ করি না।

এ থেকে সর্বজনীনতার দাবির আরও দুই আপদের দিক পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এক. যা কখনোই বাংলাদেশের কোনো শ্রেণী, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত নয় বা যুক্ত ছিল না, তাকে স্রেফ প্রপাগান্ডার জোরে সবার সংস্কৃতি বলে চালু করে দেয়া। দুই. জাতি হিসেবে নির্লজ্জ হওয়া। বিশেষত তরুণদের শেখানো যে, অকালে ইলিশ নিধনই আমাদের সংস্কৃতি। অথচ সত্য উল্টা। প্রাণ ও প্রাণবৈচিত্র্যের সুরক্ষা ও প্রাণের উদযাপনই আমাদের সংস্কৃতির প্রধান ধারা। নইলে প্রাণের যে বৈচিত্র্য আমরা ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের কৃষি প্রধান দেশে এখনও দেখি, তা গড়ে উঠতে পারত না।

প্রাণ ব্যবস্থাপনার শক্তিশালী ঐতিহ্য ছিল বাংলাদেশে। বাংলাদেশ মাছের প্রজাতি সংখ্যার দিক থেকে সারা ইউরোপের চেয়েও বেশি ছিল। ইতিমধ্যে আমরা ধ্বংস করে ফেলেছি বহু প্রজাতি। এখন ইলিশ ধ্বংস উৎসবে মেতে উঠেছি। বলছি, এটাই নাকি বাঙালি সংস্কৃতি। মাছের জ্ঞান আমরা হারিয়েছি অনেক আগেই। এখন মাছ নিধনই পরজীবী শ্রেণীর সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে। আমাদের খালে-বিলে-নদীতে-সমুদ্রে মাছ আপনাআপনি আসেনি। তার জন্য লৌকিক ব্যবস্থাপনার বিদ্যা আমাদের আয়ত্ত করতে হয়েছে। মাছের ক্ষেত্রে সেই বিদ্যা যাদের আয়ত্তে ছিল, তাদের আমরা জেলে বলি। তারা শুধু মাছ ধরতেন না, খোলা জলের খোলা পরিবেশে মাছ যেন থাকে ও বেড়ে ওঠে তার ব্যবস্থাও করতেন। প্রাণ ব্যবস্থাপনার বিদ্যা একদিনে বা সহজে গড়ে ওঠেনি। শত শত বছর লেগেছে। কিন্তু হারিয়েছে এক দশকে। ইউরোপের চেয়ে বেশি প্রজাতির মাছ আমাদের ছিল। যারা একসময় জেলে ছিলেন, তারা মাছের জীবন-চরিত্রের খোঁজখবর জানতেন। তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল অসামান্য। ফলে মাছের ডিম দেয়া, ছানা ফুটলে ছানা নিয়ে নদীতে, জলাশয়ে, পুকুরে বড় করা, কিছু প্রজাতির সমুদ্রে গিয়ে পড়ার হদিস তারা জানতেন। পদ্মার ইলিশ পদ্মার কারণে পদ্মার জেলেদের জন্যই পদ্মাকে তাদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার অভয় ক্ষেত্র হিসেবে চিনেছিল। আর যারা চেনাতে পারঙ্গম ছিলেন, বংশ পরম্পরায় তারা নিজেদের জলের দাস হিসেবে জীবন চর্চা করেছে।

জলদাস। শুধু এ দুটি শব্দবন্ধের পেছনে যে দীর্ঘ জ্ঞানচর্চা ও প্রাণ ব্যবস্থাপনার ইতিহাস রয়েছে, তার কিইবা আমরা খোঁজ নিয়েছি। মাছের সঙ্গে সঙ্গে আমরা হারিয়েছি জেলেদের। হারিয়েছি সেই জ্ঞান ও সংস্কৃতি, যা কোনোদিনও আমরা আর ফিরে পাব না। শুধু জেলে নয়, হারিয়েছি কৃষকের, বনবাসীর, গ্রাম-বাংলার বিচিত্র ও বিভিন্ন সংস্কৃতি- যাকে জীবনযাপন থেকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব।

যে পরজীবী শ্রেণী আজ আমাদের সংস্কৃতির সবক দেয়, তাদের না চিনলে আমরা ক্রমে ক্রমে সবই হারাব।

১৫ এপ্রিল ২০১৪। ২ বৈশাখ ১৪২১। শ্যামলী।








 

সাবমিট

নববর্ষ, সর্বজনীনতা ও সাম্প্রদায়িকতা

 ফরহাদ মজহার 
১৬ এপ্রিল ২০১৪, ১২:০০ এএম  | 

বাংলা নববর্ষ নানা জনে নানা কারণে পালন করতেই পারেন। কিন্তু সেই অনুষ্ঠান বা উৎসবকে ‘বাঙালি’র বা সবার সর্বজনীন উৎসব বা সর্বজনীন সংস্কৃতি হিসেবে দাবির দরকার কী? একালে যে কারুরই নিজের মতো উৎসবের অধিকার আছে। কিন্তু সেটাই সবার সংস্কৃতি দাবি করা হলে তা বড় এক আপদ হয়ে ওঠে। একে গোষ্ঠীগতভাবে উদযাপন বা সম্প্রদায়গতভাবে সীমাবদ্ধ রাখা সাম্প্রদায়িকতারই নামান্তর। বাংলা নববর্ষ কোনো ধর্মের বা বিশেষ কোনো সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠান নয়। একে সর্বজনীন করে তোলার পেছনে সদর্থ থাকতেই পারে, যাতে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক একে নিজের উৎসব বলে মনে করে। বাংলাদেশের পাহাড়ের বা সমতলের ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠী বাঙালিদের নববর্ষকে বাঙালিদের ব্যাপার বলেই মনে করে। তাদের উৎসব বা সর্বজনীন মনে করে না। কারণ বাঙালিরা একে বাঙালিদের উৎসব দাবি করে তাদের আগাম খারিজ করে রাখে। আর, শহরে গড়ে ওঠা এ উৎসব কোনোভাবেই চিন্তা-চেতনায়, চরিত্রে ও অংশগ্রহণে বাংলার সাধারণ মানুষের উৎসব নয়। শহুরে উৎসব। শেকড় ছেঁড়া শহুরে মধ্যবিত্তের সাংস্কৃতিক শূন্যতা বোধ বা আর্তি থেকে এর উৎপত্তি। সম্ভবত এখানেই এ শ্রেণীর সফলতা। ঠিক হোক কী অশুদ্ধ, এর ইতিবাচক দিক হচ্ছে সমষ্টির বোধ উদযাপনের একটা আর্তি। যা অনেককেই টানে। কিন্তু তার মন্দ দিক হচ্ছে, সর্বজনীনতার দাবি নিয়ে বাঙালিপনার খাপে ঢুকিয়ে একে সাম্প্রদায়িক চরিত্র দেয়া। তাছাড়া সর্বজনীন অর্থে একে ‘বাঙালির সংস্কৃতি’ দাবি করার কোনো ঐতিহাসিক বা প্রামাণ্য যুক্তি নেই।

সংস্কৃতি সবসময়ই বদলায়, তার বিবর্তন আছে। বিশুদ্ধ সংস্কৃতি বলে কিছু নেই। বিশুদ্ধ জাতিও নেই। যদি ছিটেফোঁটা আগে থেকেও থাকে, পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নে যে নতুন বিশ্বব্যবস্থা আমাদের চোখের সামনে গড়ে উঠেছে তার মধ্যে বিশ্বব্যাপী আদান-প্রদান, লেনদেন, দেয়া-নেয়ার গতি তীব্রভাবে বেড়ে যাওয়ায় কিছুই নিজেকে ‘বিশুদ্ধ’ বলে দাবি করতে পারে না। সম্ভবও নয়। কিন্তু আমরা যখন নিজেদের ‘বাঙালি’ বলে জাহির করতে চাই আর নিজেদের শেকড় ও শুদ্ধতা সন্ধানে ব্যাকুল হয়ে পড়ি, তখন সেটা বিশুদ্ধবাদিতার অসুখ। এ অসুখ থেকে নিরাময় দরকার।

পরিবর্তন বা বিবর্তন কী জিনিস তা বোঝাবার জন্য জাকের নায়েকের উদাহরণ দেব। মাথার সঙ্গে সেঁটে থাকা বিশেষ ধরনের স্কিনক্যাপ টুপি পরে জাকির নায়েক ইসলাম নিয়ে পিস টিভিতে আমাদের যে বয়ান দিয়ে থাকেন, টেলিভিশন স্ক্রিনে তার সেই ছবির কথা ভাবুন। ফ্যাশন হিসেবে এ টুপি আমার পছন্দ। তার পিন্দনে স্যুট-টাই, পাশ্চাত্যের পোশাক। নাসারা বা খ্রিস্টানদের মতো টাই ঝুলে আছে তার গলায়। তিনি নিশ্চয়ই ভালো কিছু বলেন, নইলে এত মানুষ তার কথা শুনত না। পিস টিভিতে ইসলাম নিয়ে হামেশা তিনি আমাদের বয়ান দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি কী বলছেন, না বলছেন তার বিচার যারা ধর্মতত্ত্বে বিশেষজ্ঞ তারা করবেন, কিন্তু তিনি পোশাকে যে সংস্কৃতি ধারণ করেন সেটা হাইব্রিড। তা ভালো কী মন্দ সেটাও আমার তর্ক নয়। পোশাকের একটা বিবর্তন ঘটেছে এখানে। ইসলামী ধর্মতত্ত্ব যতই ‘মৌলবাদী’ হোক, তার পোশাকের রূপান্তর ঠেকাতে পারেনি। তিনি আরবীয় পোশাক পরেননি। ঔপনিবেশিক পোশাকের ওপর স্কিনক্যাপ টুপি পরিয়ে দিয়েছেন। ইংরেজের মাথায় একই টুপি চাপানো যায়। বাদামি হলেও তিনিও হয়তো পাশ্চাত্য সাহেবই, মাথায় শুধু একটা টুপি পরেছেন।

ইসলাম বর্ণবাদ ও জাতীয়তাবাদবিরোধী একটি ধর্ম। কোনো বিশেষ সংস্কৃতির প্রতি তার পক্ষপাত নেই। জাকির নায়েক আরবীয় পোশাক পরছেন না। কিন্তু সেটা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে অসঙ্গত কিছু নয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক পরিবার, গোত্র, রক্ত, ভূখণ্ড, ভাষা বা সংস্কৃতির মধ্যস্থতায় নয়, আল্লার মধ্যস্থতায় হতে হবে, অর্থাৎ কোনো ইহলৌকিক ‘ইলাহ’ বা দেশকালের অধীনস্থ কোনো সত্তার মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের কিংবা মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক রচনা ইসলামের সাধনা নয়। সবাই আল্লার বান্দা, নিরাকারই মানুষের উপাস্য, দেশকালের অতীত যিনি তার মধ্য দিয়ে ইহলোকে অন্য সব ইহলৌকিক সত্তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ইসলামের মৌলিক রাজনৈতিক ও দার্শনিক প্রস্তাবনা। মানুষ জীবমাত্র নয়, তার পরমার্থিক সম্ভাবনা বিপুল। সেই সম্ভাবনার বিকাশের মধ্য দিয়েই মানুষের উম্মাহ কায়েম সম্ভব। বিচিত্র ও বিভিন্ন মানুষকে তাদের বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্য বজায় রেখেই ‘এক’-এর পরমার্থিক পতাকার নিচে সন্নিবেশ করতে চায় ইসলাম।

সেটা অবশ্যই সম্ভব, কারণ মানুষ জীব মাত্র নয়। জৈবিকতার অতিরিক্ত পরমার্থিকতার তাগিদ বোধ করে সে। অতএব একদিন মানুষ ঐক্যবদ্ধ হবে। মানুষের উম্মাহ বা বিশ্ব মানব সমাজ গঠনের দিকেই মানব প্রকৃতির তাগিদ। এটাই তার ধর্ম। ইসলাম এ প্রতিশ্র“তি দেয়। গোলকায়নের এ কালে বিশ্ব মানব সমাজ গড়ার সম্ভাবনা যতই বাড়ছে, এ রাজনৈতিক/দার্শনিক প্রস্তাবের শক্তিও বাড়ছে। ধর্মতত্ত্ব ও আত্মপরিচয়ের রাজনীতির বাইরে মুসলমানরা এর তাৎপর্য উপলব্ধি করে কি-না সেটা ভিন্ন তর্ক। আমরা সংস্কৃতির আলোচনাতেই থাকি।

ধর্মতাত্ত্বিক বিধিবিধানবিরোধী না হলে সংস্কৃতির বিবর্তনে, বৈচিত্র্যে, পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ইসলাম আপত্তি করে না। বিধিবিধানের পরও সংস্কৃতির বিবর্তন, রূপান্তর, পরিবর্তন ঘটে। তাহলে জাকের নায়েকের পোশাকে ইসলামের আপত্তি থাকার কথা নয়। কঠোর ধর্মতাত্ত্বিক বিধিবিধানের মধ্যেও যদি সংস্কৃতির এ বিবর্তন ও পরিবর্তন ঘটে, পোশাকে যা দৃশ্যমান, তাহলে যেখানে এ বিধিবিধান শিথিল, সেখানে বিবর্তন আরও ত্বরান্বিত হওয়ারই কথা। তথাকথিত বাঙালি সংস্কৃতির ক্ষেত্রে হয়েছেও তাই।

দুই

বাংলা নববর্ষ পালন করার পক্ষে প্রেরণা ও যুক্তি আমরা সাহেবদের কাছে পেয়েছি। সেটা মুঘল আমলের জমিদার-মহাজনদের যুক্তি। সাহেবরা ‘নিউ ইয়ার’ পালন করেন। ইংরেজি নববর্ষে তারা সকালে পরস্পরকে বলেন, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’। শুনতে ভালো লাগে, সভ্য হয়েছি ভাব জাগে। অতএব আমাদের চামড়া বাদামি হওয়া সত্ত্বেও আমাদেরও ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ বলার একটা ব্যবস্থা থাকা চাই। নইলে সভ্য হব না। সাহেব হওয়ার বাসনায় আমরাও ‘নববর্ষের শুভেচ্ছা’ চালু করলাম। বাংলা নববর্ষের চল হল।

‘বাংলা নববর্ষ’ নামক আদৌ কিছু ছিল না তা নয়। ছিল। কারা করত? কোথায় ছিল? যা ছিল সেটা বাঙালির বা এ দেশের জনগোষ্ঠীর নববর্ষ নয়। সেটা ছিল সুদখোর মহাজন ও ব্যবসায়ীদের খেরোখাতা মেলানোর দিন। কার কাছে কী দেনা-পাওনা তার হিসাব মিলিয়ে নতুন লাল খেরোখাতা খোলার তারিখ। তাদের সংস্কৃতিও সংস্কৃতি। কিন্তু একটি বিশেষ সম্প্রদায় বা শ্রেণীর সংস্কৃতি সবার সংস্কৃতি বলে তাকে চালিয়ে দেয়া চলে না। পরজীবী। গ্রামের মানুষকে শোষণ করেই তারা টিকে থাকত। প্রহসন হলেও সত্য, এখনকার শহুরে বাংলা নববর্ষ বাংলাদেশের গ্রাম ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের শোষণ করে যে পরজীবী শ্রেণী টিকে আছে তাদেরই সংস্কৃতি। হোক তা। কিন্তু মুশকিল হয় যখন পরজীবীদের সংস্কৃতি সবার সংস্কৃতি বলে দাবি করা হয়। শহর ও পরজীবী শ্রেণী যখন তাদের সংস্কৃতিকেই সর্বজনীন দাবি করে, তখন সেটা আর সংস্কৃতি থাকে না। সেটা রাজনীতি। সংস্কৃতি নয়।

এখনও গ্রামের মানুষ নববর্ষকে জমিদার-মহাজনদের খাজনা আদায়ের দিন কিংবা সারা বছরের সুদের হিসাব মেলানোর জন্য যতটা বোঝে, তথাকথিত ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ হিসেবে বোঝে না বললেই চলে। চৈত্রসংক্রান্তির পরের দিন ঘর ধোয়ামোছা, গরুকে গোসল করানো ইত্যাদি অনেক কিছু করে তারা বটে, কিন্তু তাকে নববর্ষ নামক কোনো ধর্মীয়, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক উৎসব বলা যায় না।

বাংলা নববর্ষ বানানো জিনিস। বানাতে হয়েছে। তাতে কোনো দোষ নেই। সংস্কৃতি তৈয়ার হতেই পারে। কিন্তু বানিয়েছে যারা, তারা বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখে না, অথচ বাঙালির সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বয়ান রচনার জন্য তারা নিজেদের যোগ্য মনে করে। দরকার তাদের নিজেদের শেকড়ছুট পরজীবী জীবনযাপনের পর্যালোচনা করা। কিন্তু তারা সেটা করতে রাজি নয়। নিজের শ্রেণী আধিপত্য বজায় রাখার জন্যই ‘বাঙালির নববর্ষ’ নামক একটা বয়ান পরজীবী শ্রেণীকে বানাতে হয়েছে। তারপর সাহেবদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দাবি করতে হয়েছে, ‘এই দেখ আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি’। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাংলার কৃষকদের শোষণ-লুণ্ঠন করে যে অভিজাত জমিদার শ্রেণী গড়ে উঠেছিল আর তাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল ঔপনিবেশিক কলকাতা শহর ও তার সংস্কৃতি, তাকেই ‘বাঙালি’ সংস্কৃতি বলে; বাংলাদেশের সব বর্ণ, শ্রেণী, লিঙ্গ বা সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি বলে দাবি করা হয়েছিল। এখনও দাবি করা হয়। এ গোত্রের ওপর বিষফোঁড়ার মতো এখন চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে তথাকথিত বাংলা নববর্ষ।

আগেই বলেছি, নতুন কোনো সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্যে দোষের কিছু নেই। বরং নতুনের মধ্য দিয়েই আমরা ভাষা, চিন্তা ও সংস্কৃতির জগতে নতুন দিগন্তের অনুসন্ধান করি। এর মধ্যে টানাপোড়েন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত তো থাকবেই। অতএব রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথসহ কলকাতাকেন্দ্রিক ‘বাঙালিত্ব’ অবশ্যই একটা ঐতিহাসিক অর্জন। ইউরোপীয় এনলাইটমেন্টের আদলে একে ‘বাংলার নবজাগরণ’ বলা হয়। এগুলো কথার কথা। তর্কবিতর্ক আছে। কিন্তু যা হয়েছে তাকে বাতিল বলে গণ্য করার যুক্তি আমরা দিচ্ছি না। মুশকিল হচ্ছে, ঔপনিবেশিক কলকাতা শহরে গড়ে ওঠা ও তাকে কেন্দ্র করে যে বাঙালি সংস্কৃতি, তার উপনিবেশিক উৎপত্তি আমরা ভুলে যেতে পারি না। তদুপরি তার বর্ণ, শ্রেণী ও পুরুষতান্ত্রিক ইতিহাস ভুলে গিয়ে সেই অভিজাতদের সংস্কৃতিকেই আমরা ‘বাঙালি সংস্কৃতি’ বলে দাবি করতে শুরু করেছি। আজ অবধি এটাই চলছে। আমাদের নববর্ষের আবাহন শুরু হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দিয়ে। আবহমান বাংলার কেচ্ছা গাওয়া আমরা এভাবেই শিখেছি। পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের এ যুগে তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন বেনিয়াদের স্বার্থ। বহুজাতিক কর্পোরেশন, যারা খাদ্যের মাঠকে বিশাল ফুলের মাঠে পরিণত করে চলেছে।

করুক তারা তাদের নাচনা, গানা ও মাস্তি। আপদ তখনই শুরু হয়, যখন তারা একে সবার সর্বজনীন সংস্কৃতি বলে দাবি করে। এদেশের মানুষ চৈত্রসংক্রান্তি পালন করে এসেছে। ইংরেজের নববর্ষ নয়। কাউকে চৈত্রসংক্রান্তি পালন করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। চাইলে সে নববর্ষ করুক। কিন্তু দাবি করা হয়, বাঙালির নাকি নববর্ষ ছিল। আর ‘বাঙালি’ নামক অদ্ভুত জীব যদি ‘আবহমান’ অর্থাৎ সৃষ্টির আদি থেকে ধরাতলে ভূমিষ্ঠ হয়ে থাকে তো আবহমান কাল ধরেই পান্তা ভাত ও ইলিশ মাছ খেয়ে আসছে। এর সঙ্গে বিশুদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতি পরজীবী শ্রেণী তার উদযাপনকেই সবার, তার সংস্কৃতিকেই সর্বজনীন বলে দাবি করছে। আপদ এখানে।

তিন

সর্বজনীনতার এ দাবির দরকার কী? প্রথম দরকার রাজনৈতিক। যারা নিজেদের বাঙালি সংস্কৃতির ধারক বলে মনে করেন, তাদের সর্বজনীনতার দাবি নিয়ে একই কাতারে আনা ও সংঘবদ্ধ করার জন্য এর দরকার আছে। বাংলাদেশের বিদ্যমান ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে জনমত তৈরি ও সমর্থনের ভিত্তি তৈরির জন্য বাঙালিত্ব মোক্ষম একটি হাতিয়ার। বাঙালিত্বের পতাকা তুলে বাঙালির ‘অপর’কে নির্মূল করার রাজনীতি সচল রাখার জন্যই এ সর্বজনীনতার দাবি। পাশাপাশি পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের এ কালে সম্পদের বিষম বণ্টন, শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের অবর্ণনীয় শোষণ ও নির্যাতন আড়াল করা এবং বহুজাতিক কোম্পানির জন্য বাংলাদেশকে লুণ্ঠনের স্বর্গরাজ্য বানানোর জন্য পরজীবী শ্রেণীর সংস্কৃতিকে সর্বজনীন সংস্কৃতি হিসেবে দাবি করা খুবই দরকার।

কিন্তু বাঙালির মধ্যে তারাও আছেন, যারা আন্তরিকভাবেই নিজেদের বাঙালি মনে করেন। কিন্তু বাঙালি ছাড়াও তার আরও নানা পরিচয় আছে। যেমন ভাষা ও সংস্কৃতি ছাড়া ধর্মও তার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের উৎস বা উপাদান। তারা অতএব সর্বজনীনতার দোহাই দেন না। ‘বাঙালিত্ব’ নামক পদার্থের ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় তারা কাতর বোধ করেন না। কারণ ইতিহাস এভাবে আঁকাবাঁকা পথেই অগ্রসর হয়। এটা সরলরেখা নয়। তাকে পর্যালোচনা করে বাছ-বিচার ও গ্রহণ বর্জন করেই নিজেদের নিরন্তর নতুনভাবে তৈরি করতে হয়। বিশুদ্ধ কোনো ‘জাতি’ বলে দুনিয়ায় কিছু নেই। বিশুদ্ধ সংস্কৃতি বলেও কিছু নেই। শহরের অনেকে, যারা কখনও গ্রামে থাকেননি বা গ্রামে থাকবেন না, তারা বাংলা নববর্ষের মধ্যে যে নির্মল আনন্দ খুঁজে পান তাকে গৌণ জ্ঞান করা বা অস্বীকার করার কোনো যুক্তি নেই।

বাংলা নববর্ষ বাঙালির সর্বজনীন সংস্কৃতি দাবি করার নগদ লাভ হচ্ছে, যারা নিজেদের শুধু ‘বাঙালি’ মনে করেন না বা বাঙালিয়ানার আড়ালে বিশেষ শ্রেণী বা গোষ্ঠীর মতলব বোঝেন, তাদের সাংস্কৃতিক/রাজনৈতিকভাবে কাবু করার জন্যও এটা বেশ শক্ত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। যারা বাঙালি জাতিবাদী রাজনীতির বিরোধী, তাদের অনায়াসে ধর্মপন্থী বা সাম্প্রদায়িক বলে নিন্দা করা সহজ হয়। সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অজ্ঞতা, নির্বিচার আবেগ ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলস্য যে জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রবল, তাদের সহজেই সর্বজনীনতার প্রপাগান্ডা দিয়ে বশে রাখা যায় এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার সহজ হয়। নতুন বছরে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়া কখনোই বাঙালির সংস্কৃতি ছিল না। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক অজ্ঞতা, নির্বিচার আবেগ ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলস্য কতটা প্রবল যে ইলিশ মাছ ধরা যখন নিষিদ্ধ, তখনও আমরা উৎসব করে ইলিশ হত্যা করছি। এমনই এ হত্যার অর্থনীতি যে ইলিশ অশ্লীল ও অবিশ্বাস্য দামে কিনতে ও সবাইকে দেখিয়ে দেখিয়ে খেতে আমরা লজ্জা বোধ করি না।

এ থেকে সর্বজনীনতার দাবির আরও দুই আপদের দিক পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এক. যা কখনোই বাংলাদেশের কোনো শ্রেণী, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত নয় বা যুক্ত ছিল না, তাকে স্রেফ প্রপাগান্ডার জোরে সবার সংস্কৃতি বলে চালু করে দেয়া। দুই. জাতি হিসেবে নির্লজ্জ হওয়া। বিশেষত তরুণদের শেখানো যে, অকালে ইলিশ নিধনই আমাদের সংস্কৃতি। অথচ সত্য উল্টা। প্রাণ ও প্রাণবৈচিত্র্যের সুরক্ষা ও প্রাণের উদযাপনই আমাদের সংস্কৃতির প্রধান ধারা। নইলে প্রাণের যে বৈচিত্র্য আমরা ঐতিহ্যগতভাবে আমাদের কৃষি প্রধান দেশে এখনও দেখি, তা গড়ে উঠতে পারত না।

প্রাণ ব্যবস্থাপনার শক্তিশালী ঐতিহ্য ছিল বাংলাদেশে। বাংলাদেশ মাছের প্রজাতি সংখ্যার দিক থেকে সারা ইউরোপের চেয়েও বেশি ছিল। ইতিমধ্যে আমরা ধ্বংস করে ফেলেছি বহু প্রজাতি। এখন ইলিশ ধ্বংস উৎসবে মেতে উঠেছি। বলছি, এটাই নাকি বাঙালি সংস্কৃতি। মাছের জ্ঞান আমরা হারিয়েছি অনেক আগেই। এখন মাছ নিধনই পরজীবী শ্রেণীর সংস্কৃতি হয়ে উঠেছে। আমাদের খালে-বিলে-নদীতে-সমুদ্রে মাছ আপনাআপনি আসেনি। তার জন্য লৌকিক ব্যবস্থাপনার বিদ্যা আমাদের আয়ত্ত করতে হয়েছে। মাছের ক্ষেত্রে সেই বিদ্যা যাদের আয়ত্তে ছিল, তাদের আমরা জেলে বলি। তারা শুধু মাছ ধরতেন না, খোলা জলের খোলা পরিবেশে মাছ যেন থাকে ও বেড়ে ওঠে তার ব্যবস্থাও করতেন। প্রাণ ব্যবস্থাপনার বিদ্যা একদিনে বা সহজে গড়ে ওঠেনি। শত শত বছর লেগেছে। কিন্তু হারিয়েছে এক দশকে। ইউরোপের চেয়ে বেশি প্রজাতির মাছ আমাদের ছিল। যারা একসময় জেলে ছিলেন, তারা মাছের জীবন-চরিত্রের খোঁজখবর জানতেন। তাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল অসামান্য। ফলে মাছের ডিম দেয়া, ছানা ফুটলে ছানা নিয়ে নদীতে, জলাশয়ে, পুকুরে বড় করা, কিছু প্রজাতির সমুদ্রে গিয়ে পড়ার হদিস তারা জানতেন। পদ্মার ইলিশ পদ্মার কারণে পদ্মার জেলেদের জন্যই পদ্মাকে তাদের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার অভয় ক্ষেত্র হিসেবে চিনেছিল। আর যারা চেনাতে পারঙ্গম ছিলেন, বংশ পরম্পরায় তারা নিজেদের জলের দাস হিসেবে জীবন চর্চা করেছে।

জলদাস। শুধু এ দুটি শব্দবন্ধের পেছনে যে দীর্ঘ জ্ঞানচর্চা ও প্রাণ ব্যবস্থাপনার ইতিহাস রয়েছে, তার কিইবা আমরা খোঁজ নিয়েছি। মাছের সঙ্গে সঙ্গে আমরা হারিয়েছি জেলেদের। হারিয়েছি সেই জ্ঞান ও সংস্কৃতি, যা কোনোদিনও আমরা আর ফিরে পাব না। শুধু জেলে নয়, হারিয়েছি কৃষকের, বনবাসীর, গ্রাম-বাংলার বিচিত্র ও বিভিন্ন সংস্কৃতি- যাকে জীবনযাপন থেকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব।

যে পরজীবী শ্রেণী আজ আমাদের সংস্কৃতির সবক দেয়, তাদের না চিনলে আমরা ক্রমে ক্রমে সবই হারাব।

১৫ এপ্রিল ২০১৪। ২ বৈশাখ ১৪২১। শ্যামলী।








 

 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র