jugantor
দেশপ্রেমের চশমা
একাদশ সংসদ নির্বাচন সমাচার

  মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার  

২৮ জুন ২০১৪, ০০:০০:০০  | 

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির প্রহসনের দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর সরকার ও সংসদ গঠিত হয়েছে। এ সংসদ নির্বাচন নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। লেখালেখিও কম হয়নি। চরিত্র, প্রকৃতি, স্বরূপ, বৈশিষ্ট্য, কারচুপি, দুর্নীতি, সহিংসতা ও মেজাজে এ সংসদীয় নির্বাচনটি ছিল নেতিবাচক দিক দিয়ে অনন্য রেকর্ডধারী একটি নির্বাচন। এ নির্বাচন ছিল এমন অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্যধারী, যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই অংশগ্রহণকারী একটি দল ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়ে সরকার গঠনের যোগ্যতা অর্জন করে। এ নির্বাচনে ৯ কোটি ১৯ লাখ ভোটারের মধ্যে ৪ কোটি ৮০ লক্ষাধিক ভোটারের ভোট দেয়ার সুযোগ ছিল না। বাকি ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৩৮ সহস্রাধিক ভোটার ভোটদানের সুযোগ পেলেও বিরোধীদলীয় বর্জন এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে ভোট কেন্দ্রমুখী হননি। এ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ প্রক্রিয়া, মনোনয়নপত্র জমাদান ও প্রত্যাহারের মেলোড্রামা, প্রচারণা এবং নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালন ভঙ্গিমা, নির্বাচনী পরিবেশ, দুটি বড় দলের প্রধান নেতার গৃহবন্দিত্ব, নিরাপত্তা ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, ভোট কেন্দ্র ও ভোটগ্রহণের পরিবেশ, প্রশাসনের আচরণ এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।

নির্বাচনটিতে সহিংসতার মাত্রা ছিল এতই বেশি যে, সেনাবাহিনীর সহায়তা নিয়েও নির্বাচন কমিশন ৪৮টি ভোট কেন্দ্রে সময়মতো নির্বাচনী সরঞ্জাম পৌঁছাতে পারেনি। একজন প্রিসাইডিং অফিসারকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। নির্বাচনী সিডিউল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন পর্যন্ত সময়ে সহিংসতায় ১৪৯ জন নিহত এবং ৪ হাজার ৮৮৬ জন আহত হন। একই সময়ে ১০ জন গুম এবং নির্বাচন ও নির্বাচনের পরের দিন নিহত হন যথাক্রমে ২৫ এবং ৬ জন। নির্বাচন বিরোধিতাকারীদের পক্ষ থেকে ৫৩১টি ভোট কেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ১২ সহস্রাধিক ভোট কেন্দ্র এবং তার আশপাশে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। সহিংসতাজনিত কারণে ১৭ জেলার চারশ’ ভোট কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। ৪১টি ভোট কেন্দ্রে একটিও ভোট পড়েনি। ২৪ জন প্রার্থী নির্বাচন চলাকালীন নির্বাচন বর্জন করেন। নির্বাচন বিরোধিতাকারীরা নির্বাচনের দিন দুটি জেলায় (চাঁদপুর ও নোয়াখালী) নির্বাচনের কুলখানির আয়োজন করেন। একতরফা হওয়ায় সরকারি দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারে বাধা পেতে হয়নি। অনেক ভোট কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসারের ভোট প্রদানের ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আর কেন্দ্র দখল, সিল মেরে বাক্স ভরাসহ নির্বাচনী কারচুপির অন্যসব ভঙ্গিমাও এ নির্বাচনে বাধাহীনভাবে চর্চিত হয়। সবকিছু মিলিয়ে বিচার করলে সংসদীয় নির্বাচনের ইতিহাসে নেতিবাচক দিক থেকে এ নির্বাচন ছিল একটি অনন্য রেকর্ডধারী নির্বাচন।

দশম সংসদ নির্বাচন যত খারাপই হোক, নির্বাচনটি হয়েছে। সরকার ও সংসদও গঠিত হয়েছে। তবে ক্ষমতাসীন হয়ে সরকার যদি তাদের ভাষায় এ ‘নিয়ম রক্ষার’ নির্বাচনের ওপর ভর করে মেয়াদ পূরণের চেষ্টা না করে আরেকটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গণরায় নিয়ে দেশ পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করত, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ত। কিন্তু সরকার সে পথে না গিয়ে বিরোধী দলকে নাস্তানাবুদ করে, বিভিন্ন কলাকৌশলে জামায়াত-হেফাজতকে নিষ্ক্রিয় এবং বিএনপিকে দুর্বল ও একা করে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চাইছে। এ ক্ষেত্রে কামিয়াব হতে সরকার যেসব পন্থা অবলম্বন করছে, তার মধ্যে প্রধান হল মামলা-অস্ত্র। বিএনপি যাতে আন্দোলনে না নামতে পারে সেজন্য একদিকে যেমন দলটিকে সভা-সমাবেশ করতে অনুমতি দেয়া হচ্ছে না, তেমনি অন্যদিকে দলীয় নেতাদের মামলা-হামলায় কাবু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দলটির প্রায় সব নেতার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং দলীয় যুব ও ছাত্র সংগঠনের ছয়জন নেতা এরই মধ্যে মামলায় সেঞ্চুরি করেছেন। এ সেঞ্চুরিয়ানরা হলেন- মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল (১১০), সাইফুল ইসলান নিরব (১৩০), সুলতান সালাউদ্দিন টুকু (১৬০), এসএম জাহাঙ্গীর (১১৬), ইসহাক সরকার (১৭০) ও হাবিবুর রশীদ হাবিব (১৪০)। মামলায় হাফ সেঞ্চুরি এবং কোয়ার্টার সেঞ্চুরি করা বিএনপি নেতাদের সংখ্যা অনেক বেশি। সরকার বুঝতে পারছে না যে, এ পথে অগ্রসর হলে তাদের হ্রাসপ্রাপ্ত জনপ্রিয়তা আরও নিুগামী হবে।

সরকার খেলা, মেলা, আর উপজেলা নির্বাচন দিয়ে বেশ কিছুদিন জনগণকে দশম নির্বাচনের নেতিবাচকতা ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করলেও ওই প্রচেষ্টায় সফল হতে পারেনি। দেশের মতো বিদেশেও দশম সংসদ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশগুলোর পার্লামেন্টে এ নির্বাচনের নেতিবাচকতা আলোচিত হয়েছে এবং বাংলাদেশকে আরেকটি অর্থবহ নির্বাচন করার লক্ষ্যে ওই দেশগুলোর পক্ষ থেকে সংলাপ শুরু করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। তবে সরকারপ্রধান বিদেশে গেলে রেওয়াজ অনুযায়ী লালগালিচা সংবর্ধনা পাচ্ছেন। সরকারকে মেনে নিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও পারস্পরিক চুক্তিও স্বাক্ষরিত হচ্ছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ওইসব সরকার দশম সংসদ নির্বাচনকে ভালো নির্বাচনের সনদ দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, দশম সংসদ নির্বাচন হওয়ার পর বিভিন্ন দেশ এ নির্বাচন সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেছে এবং এখনও ওইসব দেশ তাদের সে অবস্থান থেকে সরে আসেনি।

দশম সংসদ নির্বাচনের পর বিভিন্ন দেশ, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওই নির্বাচন সম্পর্কে ব্যক্ত প্রতিক্রিয়া এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। যুক্তরাষ্ট্র দশম সংসদ নির্বাচনের পর ওই নির্বাচনকে বলেছিল ‘গ্রহণযোগ্য নয়’, যুক্তরাজ্য বলেছিল, তারা ‘হতাশ ও উদ্বিগ্ন।’ জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেছিলেন, তিনি ‘মর্মাহত’, কমনওয়েলথ বলেছিল, ‘হতাশাজনক’ এবং ইকোনমিস্ট একে আখ্যায়িত করেছিল ‘নষ্ট নির্বাচন’ হিসেবে। এএফপি নির্বাচনটিকে ‘সবচেয়ে রক্তাক্ত নির্বাচন’ এবং কলকাতা টেলিগ্রাফ আখ্যায়িত করেছিল ‘ভুয়া নির্বাচন’ হিসেবে। বাংলাদেশী রাজনৈতিক নেতা ও সুশীল সমাজের মধ্যে খালেদা জিয়া একে ‘কলংকময় প্রহসন’, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ‘গিনেস বুকে স্থান পাওয়ার মতো নির্বাচন’, ওবায়দুল কাদের ‘সর্বজনগ্রাহ্য হয়নি’, চরমোনাই পীর ‘ভোটারবিহীন নির্বাচন’, ড. বদিউল আলম মজুমদার ‘কোনো মানদণ্ডেই গ্রহণযোগ্য বলা যায় না’, বদরুদ্দোজা চৌধুরী ‘জাতির সঙ্গে তামাশা’ ব্যারিস্টার রফিকুল হক ‘ইলেকশন নয় সিলেকশন’ এবং নির্বাচনের দিন একটি দৈনিকে প্রকাশিত মন্তব্য প্রতিবেদনে এ লেখক এ নির্বাচনকে ‘নিকৃষ্ট নির্বাচন’ আখ্যায়িত করেছিলেন।

লক্ষণীয়, সরকারি দলের নেতা-মন্ত্রীরাও কখনও এ নির্বাচনের প্রশংসা করেননি। তাদের অনেকে নির্বাচন-পূর্ব বক্তব্যে নির্বাচনটিকে ‘নিয়ম রক্ষার’, ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার’, বা ‘বাধ্যবাধকতার’ নির্বাচন বলে এ নির্বাচন হয়ে গেলে একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের পর তারা পরিবর্তিত সুরে বক্তব্য দিচ্ছেন। এখন বলছেন, তারা পাঁচ বছরের জন্য ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হয়েছেন; কাজেই একাদশ সংসদ নির্বাচনের আলোচনা শুরু হবে ২০১৯ সালে। বিএনপির মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিকে কটাক্ষ করে খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন কি ছেলের হাতের মোয়া, না মামুর বাড়ির আবদার যে চাইলেই দেয়া হবে?’ বিএনপির সুসংগঠিত হয়ে মধবর্তী নির্বাচনের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাজপথে নামার মতো অবস্থা তৈরি করতে না পারার সুযোগ নিয়ে সরকার একাদশ সংসদ নির্বাচন না দিয়েই ক্ষমতায় থাকতে চাইছে। সরকারের কি কোনো দায়িত্ববোধ নেই? কেউ মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি না করলে কি সরকার জনগণের মতামত না নিয়েই একটি নামকাওয়াস্তের নির্বাচনের ওপর ভর করে পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে চেষ্টা করবে?

সরকার যদি নিজেদের গণতান্ত্রিক চরিত্রসম্পন্ন জনগণের সরকার বলে দাবি করতে চায়, তাহলে তাদের অচিরেই একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করে ওই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় নিয়ে দেশ পরিচালনা করতে হবে। তা না হলে একদিকে দেশে ও বিদেশে ক্রমান্বয়ে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পেতে থাকবে, অন্যদিকে দেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক সুশাসন ও শৃংখলা ভেঙে পড়বে। সরকার গঠনের ক্ষেত্রে যদি শৃংখলা, গণতন্ত্র ও সুশাসনের চর্চা বিঘ্নিত হয়, তাহলে সমাজ ও রাজনীতিতে কীভাবে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হবে? এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জে, ফেনীর ফুলগাজী ও রাজধানীর মিরপুরের কালসীতে তার নমুনা দেখা গেছে। সরকার যদি ক্ষমতাসীন হওয়ার পরপরই কিছুটা সময় নিয়ে হলেও একাদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করত, তাহলে নাগরিক সমাজে সরকারের অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হওয়ার মধ্য দিয়ে জনমনে ন্যায়নীতিবোধ, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হতো। তাহলে হয়তো শক্তির দাপট ও অগণতান্ত্রিক অপশক্তির চর্চা সমাজ ও রাজনীতিতে হ্রাস পেত। এখন সরকারকেই ঠিক করতে হবে, তারা সমাজ ও রাজনীতিতে শৃংখলা, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক নীতিমালার চর্চা চান, নাকি জনগণের ইচ্ছাকে দমিত করে শক্তি প্রয়োগের নীতিমালা প্রতিষ্ঠিত করতে চান। বলার অপেক্ষা রাখে না, শৃংখলা, সুশাসন ও গণতন্ত্র চাইলে দ্রুত অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আয়োজন করে জনগণের মতামত নিয়ে সরকারকে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে হবে। দেশের কল্যাণকামী নাগরিকরা ভাবছেন, সরকার নিজের ভুল বুঝতে পারবে এবং বিরাধী দলকে নাস্তানাবুদ না করে বিএনপির মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিকেন্দ্রিক আন্দোলনের চাপের অপেক্ষা না করে সুশাসন, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের স্বার্থে অচিরেই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা ও নির্বাচনের সময়কাল নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করবে।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

akhtermy@gmail.com



সাবমিট
দেশপ্রেমের চশমা

একাদশ সংসদ নির্বাচন সমাচার

 মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার 
২৮ জুন ২০১৪, ১২:০০ এএম  | 
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির প্রহসনের দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর সরকার ও সংসদ গঠিত হয়েছে। এ সংসদ নির্বাচন নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। লেখালেখিও কম হয়নি। চরিত্র, প্রকৃতি, স্বরূপ, বৈশিষ্ট্য, কারচুপি, দুর্নীতি, সহিংসতা ও মেজাজে এ সংসদীয় নির্বাচনটি ছিল নেতিবাচক দিক দিয়ে অনন্য রেকর্ডধারী একটি নির্বাচন। এ নির্বাচন ছিল এমন অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্যধারী, যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই অংশগ্রহণকারী একটি দল ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়ে সরকার গঠনের যোগ্যতা অর্জন করে। এ নির্বাচনে ৯ কোটি ১৯ লাখ ভোটারের মধ্যে ৪ কোটি ৮০ লক্ষাধিক ভোটারের ভোট দেয়ার সুযোগ ছিল না। বাকি ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৩৮ সহস্রাধিক ভোটার ভোটদানের সুযোগ পেলেও বিরোধীদলীয় বর্জন এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে ভোট কেন্দ্রমুখী হননি। এ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ প্রক্রিয়া, মনোনয়নপত্র জমাদান ও প্রত্যাহারের মেলোড্রামা, প্রচারণা এবং নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালন ভঙ্গিমা, নির্বাচনী পরিবেশ, দুটি বড় দলের প্রধান নেতার গৃহবন্দিত্ব, নিরাপত্তা ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, ভোট কেন্দ্র ও ভোটগ্রহণের পরিবেশ, প্রশাসনের আচরণ এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।

নির্বাচনটিতে সহিংসতার মাত্রা ছিল এতই বেশি যে, সেনাবাহিনীর সহায়তা নিয়েও নির্বাচন কমিশন ৪৮টি ভোট কেন্দ্রে সময়মতো নির্বাচনী সরঞ্জাম পৌঁছাতে পারেনি। একজন প্রিসাইডিং অফিসারকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। নির্বাচনী সিডিউল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন পর্যন্ত সময়ে সহিংসতায় ১৪৯ জন নিহত এবং ৪ হাজার ৮৮৬ জন আহত হন। একই সময়ে ১০ জন গুম এবং নির্বাচন ও নির্বাচনের পরের দিন নিহত হন যথাক্রমে ২৫ এবং ৬ জন। নির্বাচন বিরোধিতাকারীদের পক্ষ থেকে ৫৩১টি ভোট কেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ১২ সহস্রাধিক ভোট কেন্দ্র এবং তার আশপাশে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। সহিংসতাজনিত কারণে ১৭ জেলার চারশ’ ভোট কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। ৪১টি ভোট কেন্দ্রে একটিও ভোট পড়েনি। ২৪ জন প্রার্থী নির্বাচন চলাকালীন নির্বাচন বর্জন করেন। নির্বাচন বিরোধিতাকারীরা নির্বাচনের দিন দুটি জেলায় (চাঁদপুর ও নোয়াখালী) নির্বাচনের কুলখানির আয়োজন করেন। একতরফা হওয়ায় সরকারি দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারে বাধা পেতে হয়নি। অনেক ভোট কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসারের ভোট প্রদানের ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আর কেন্দ্র দখল, সিল মেরে বাক্স ভরাসহ নির্বাচনী কারচুপির অন্যসব ভঙ্গিমাও এ নির্বাচনে বাধাহীনভাবে চর্চিত হয়। সবকিছু মিলিয়ে বিচার করলে সংসদীয় নির্বাচনের ইতিহাসে নেতিবাচক দিক থেকে এ নির্বাচন ছিল একটি অনন্য রেকর্ডধারী নির্বাচন।

দশম সংসদ নির্বাচন যত খারাপই হোক, নির্বাচনটি হয়েছে। সরকার ও সংসদও গঠিত হয়েছে। তবে ক্ষমতাসীন হয়ে সরকার যদি তাদের ভাষায় এ ‘নিয়ম রক্ষার’ নির্বাচনের ওপর ভর করে মেয়াদ পূরণের চেষ্টা না করে আরেকটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গণরায় নিয়ে দেশ পরিচালনার উদ্যোগ গ্রহণ করত, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ত। কিন্তু সরকার সে পথে না গিয়ে বিরোধী দলকে নাস্তানাবুদ করে, বিভিন্ন কলাকৌশলে জামায়াত-হেফাজতকে নিষ্ক্রিয় এবং বিএনপিকে দুর্বল ও একা করে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চাইছে। এ ক্ষেত্রে কামিয়াব হতে সরকার যেসব পন্থা অবলম্বন করছে, তার মধ্যে প্রধান হল মামলা-অস্ত্র। বিএনপি যাতে আন্দোলনে না নামতে পারে সেজন্য একদিকে যেমন দলটিকে সভা-সমাবেশ করতে অনুমতি দেয়া হচ্ছে না, তেমনি অন্যদিকে দলীয় নেতাদের মামলা-হামলায় কাবু করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দলটির প্রায় সব নেতার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং দলীয় যুব ও ছাত্র সংগঠনের ছয়জন নেতা এরই মধ্যে মামলায় সেঞ্চুরি করেছেন। এ সেঞ্চুরিয়ানরা হলেন- মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল (১১০), সাইফুল ইসলান নিরব (১৩০), সুলতান সালাউদ্দিন টুকু (১৬০), এসএম জাহাঙ্গীর (১১৬), ইসহাক সরকার (১৭০) ও হাবিবুর রশীদ হাবিব (১৪০)। মামলায় হাফ সেঞ্চুরি এবং কোয়ার্টার সেঞ্চুরি করা বিএনপি নেতাদের সংখ্যা অনেক বেশি। সরকার বুঝতে পারছে না যে, এ পথে অগ্রসর হলে তাদের হ্রাসপ্রাপ্ত জনপ্রিয়তা আরও নিুগামী হবে।

সরকার খেলা, মেলা, আর উপজেলা নির্বাচন দিয়ে বেশ কিছুদিন জনগণকে দশম নির্বাচনের নেতিবাচকতা ভুলিয়ে রাখতে চেষ্টা করলেও ওই প্রচেষ্টায় সফল হতে পারেনি। দেশের মতো বিদেশেও দশম সংসদ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশগুলোর পার্লামেন্টে এ নির্বাচনের নেতিবাচকতা আলোচিত হয়েছে এবং বাংলাদেশকে আরেকটি অর্থবহ নির্বাচন করার লক্ষ্যে ওই দেশগুলোর পক্ষ থেকে সংলাপ শুরু করার তাগিদ দেয়া হয়েছে। তবে সরকারপ্রধান বিদেশে গেলে রেওয়াজ অনুযায়ী লালগালিচা সংবর্ধনা পাচ্ছেন। সরকারকে মেনে নিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও পারস্পরিক চুক্তিও স্বাক্ষরিত হচ্ছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ওইসব সরকার দশম সংসদ নির্বাচনকে ভালো নির্বাচনের সনদ দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, দশম সংসদ নির্বাচন হওয়ার পর বিভিন্ন দেশ এ নির্বাচন সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেছে এবং এখনও ওইসব দেশ তাদের সে অবস্থান থেকে সরে আসেনি।

দশম সংসদ নির্বাচনের পর বিভিন্ন দেশ, প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওই নির্বাচন সম্পর্কে ব্যক্ত প্রতিক্রিয়া এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। যুক্তরাষ্ট্র দশম সংসদ নির্বাচনের পর ওই নির্বাচনকে বলেছিল ‘গ্রহণযোগ্য নয়’, যুক্তরাজ্য বলেছিল, তারা ‘হতাশ ও উদ্বিগ্ন।’ জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন বলেছিলেন, তিনি ‘মর্মাহত’, কমনওয়েলথ বলেছিল, ‘হতাশাজনক’ এবং ইকোনমিস্ট একে আখ্যায়িত করেছিল ‘নষ্ট নির্বাচন’ হিসেবে। এএফপি নির্বাচনটিকে ‘সবচেয়ে রক্তাক্ত নির্বাচন’ এবং কলকাতা টেলিগ্রাফ আখ্যায়িত করেছিল ‘ভুয়া নির্বাচন’ হিসেবে। বাংলাদেশী রাজনৈতিক নেতা ও সুশীল সমাজের মধ্যে খালেদা জিয়া একে ‘কলংকময় প্রহসন’, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ‘গিনেস বুকে স্থান পাওয়ার মতো নির্বাচন’, ওবায়দুল কাদের ‘সর্বজনগ্রাহ্য হয়নি’, চরমোনাই পীর ‘ভোটারবিহীন নির্বাচন’, ড. বদিউল আলম মজুমদার ‘কোনো মানদণ্ডেই গ্রহণযোগ্য বলা যায় না’, বদরুদ্দোজা চৌধুরী ‘জাতির সঙ্গে তামাশা’ ব্যারিস্টার রফিকুল হক ‘ইলেকশন নয় সিলেকশন’ এবং নির্বাচনের দিন একটি দৈনিকে প্রকাশিত মন্তব্য প্রতিবেদনে এ লেখক এ নির্বাচনকে ‘নিকৃষ্ট নির্বাচন’ আখ্যায়িত করেছিলেন।

লক্ষণীয়, সরকারি দলের নেতা-মন্ত্রীরাও কখনও এ নির্বাচনের প্রশংসা করেননি। তাদের অনেকে নির্বাচন-পূর্ব বক্তব্যে নির্বাচনটিকে ‘নিয়ম রক্ষার’, ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার’, বা ‘বাধ্যবাধকতার’ নির্বাচন বলে এ নির্বাচন হয়ে গেলে একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের পর তারা পরিবর্তিত সুরে বক্তব্য দিচ্ছেন। এখন বলছেন, তারা পাঁচ বছরের জন্য ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হয়েছেন; কাজেই একাদশ সংসদ নির্বাচনের আলোচনা শুরু হবে ২০১৯ সালে। বিএনপির মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিকে কটাক্ষ করে খাদ্যমন্ত্রী বলেছেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন কি ছেলের হাতের মোয়া, না মামুর বাড়ির আবদার যে চাইলেই দেয়া হবে?’ বিএনপির সুসংগঠিত হয়ে মধবর্তী নির্বাচনের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাজপথে নামার মতো অবস্থা তৈরি করতে না পারার সুযোগ নিয়ে সরকার একাদশ সংসদ নির্বাচন না দিয়েই ক্ষমতায় থাকতে চাইছে। সরকারের কি কোনো দায়িত্ববোধ নেই? কেউ মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি না করলে কি সরকার জনগণের মতামত না নিয়েই একটি নামকাওয়াস্তের নির্বাচনের ওপর ভর করে পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে চেষ্টা করবে?

সরকার যদি নিজেদের গণতান্ত্রিক চরিত্রসম্পন্ন জনগণের সরকার বলে দাবি করতে চায়, তাহলে তাদের অচিরেই একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করে ওই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের রায় নিয়ে দেশ পরিচালনা করতে হবে। তা না হলে একদিকে দেশে ও বিদেশে ক্রমান্বয়ে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পেতে থাকবে, অন্যদিকে দেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক সুশাসন ও শৃংখলা ভেঙে পড়বে। সরকার গঠনের ক্ষেত্রে যদি শৃংখলা, গণতন্ত্র ও সুশাসনের চর্চা বিঘ্নিত হয়, তাহলে সমাজ ও রাজনীতিতে কীভাবে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হবে? এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জে, ফেনীর ফুলগাজী ও রাজধানীর মিরপুরের কালসীতে তার নমুনা দেখা গেছে। সরকার যদি ক্ষমতাসীন হওয়ার পরপরই কিছুটা সময় নিয়ে হলেও একাদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করত, তাহলে নাগরিক সমাজে সরকারের অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হওয়ার মধ্য দিয়ে জনমনে ন্যায়নীতিবোধ, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত হতো। তাহলে হয়তো শক্তির দাপট ও অগণতান্ত্রিক অপশক্তির চর্চা সমাজ ও রাজনীতিতে হ্রাস পেত। এখন সরকারকেই ঠিক করতে হবে, তারা সমাজ ও রাজনীতিতে শৃংখলা, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক নীতিমালার চর্চা চান, নাকি জনগণের ইচ্ছাকে দমিত করে শক্তি প্রয়োগের নীতিমালা প্রতিষ্ঠিত করতে চান। বলার অপেক্ষা রাখে না, শৃংখলা, সুশাসন ও গণতন্ত্র চাইলে দ্রুত অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আয়োজন করে জনগণের মতামত নিয়ে সরকারকে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে হবে। দেশের কল্যাণকামী নাগরিকরা ভাবছেন, সরকার নিজের ভুল বুঝতে পারবে এবং বিরাধী দলকে নাস্তানাবুদ না করে বিএনপির মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিকেন্দ্রিক আন্দোলনের চাপের অপেক্ষা না করে সুশাসন, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের স্বার্থে অচিরেই স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা ও নির্বাচনের সময়কাল নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করবে।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

akhtermy@gmail.com



 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র