¦

এইমাত্র পাওয়া

  • সংবিধান সংশোধনী বিলের প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করেছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত
খন্দকারের বই ১৯৭১ : ভেতরে বাইরে

বদরুদ্দীন উমর | প্রকাশ : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৪

অবসরপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল আবদুল করিম খন্দকার ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ওপর একটি স্মৃতিচারণমূলক বই লিখেছেন। এ বইয়ে তিনি যুদ্ধের সময় তার কাজ ও নানা অভিজ্ঞতার বিষয়ে লিখেছেন এবং সেই সঙ্গে লিখেছেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে ফেব্র“য়ারি-মার্চ মাসের কিছু ঘটনার কথা। তিনি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি নন। আবার তিনি এমন অশিক্ষিত ও কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষও নন, যিনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে ও সংকট উপলব্ধি করতে অক্ষম। খুব সাদামাটা ভাষায় লেখা তার এ বইটি পড়লে এটা সহজেই বোঝা যায়। ১৯৭১ সালের রাজনীতি ও যুদ্ধের প্রসঙ্গ উঠলেই অনেকের কাণ্ডজ্ঞান রহিত হয়। তথা, যুক্তি ইত্যাদির কোনো পরোয়া না করে তারা কতগুলো মিথ্যার পূজারি হিসেবে এমন সব কথাবার্তা বলেন ও দাবি করতে থাকেন, যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। আলোচ্য বইটিতে খন্দকার যা লিখেছেন, এর মধ্যে তার বাস্তববুদ্ধির পরিচয় খুব উল্লেখযোগ্য।
লেখক সম্পর্কে এসব কথা বলার প্রয়োজন হল এ কারণে যে, বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ও তাদের ঘানি টানা বুদ্ধিবীজীরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এমনকি জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা ও তার ওপর গালাগালি বর্ষণসহ বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দাবিও তোলা হয়েছে। ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’ নীতির দ্বারা তাড়িত কোনো কোনো সুপরিচিত লেখকও বসে নেই। খন্দকার সাহেব তার বইটি লিখে এ ধরনের সত্য হত্যাকারীর জন্য টিনের তলোয়ার ঘোরানোর এক সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। তিনি দৈনিক পত্রিকার পাতায় যথারীতি তার এই তলোয়ারের খেলা দেখিয়েছেন। এসব সত্ত্বেও ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ইতিহাসের একটি আকর গ্রন্থ হিসেবে বইটির গুরুত্ব কানাকড়িও খর্ব হয়নি।
‘১৯৭১ : ভেতরে বাইরে’ নামে খন্দকারের বইটিতে এমন অনেক বিষয় আছে যা গুরুতর আলোচনার যোগ্য। কিন্তু সেগুলোকে বাইরে রেখে শুধু দুটি বিষয় নিয়ে আওয়ামী লীগ মহলে মাতামাতি চলছে। প্রথমটি হল শেখ মুজিব কর্তৃক তার ৭ মার্চের রেসকোর্স ময়দানের বক্তৃতার শেষে জয় বাংলার পর জয় পাকিস্তান বলা। দ্বিতীয়টি হল, শেখ মুজিব কর্তৃক ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার দাবি নাকচ করা। এ দুই বিষয় নিয়ে বেশ কড়া বিতর্ক সত্তর দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে চলে আসছে। মঈদুল হাসান, উইং কমান্ডার এসআর মীর্জা ও একে খন্দকারের মধ্যকার সংলাপভিত্তিক ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর : কথোপকথন’ নামে বইটিতে এ বিষয়ে একটি কথা বলা হয়েছে, যা খন্দকার তার আলোচ্য বইটিতে বলেছেন। বিস্ময়ের ব্যাপার হল, এই একই কথা আগে বললেও তার বিরুদ্ধে সামান্য কিছু কথাবার্তা ছাড়া যে ধরনের প্রতিক্রিয়া এখন খন্দকারের বইটির বিরুদ্ধে দেখা যাচ্ছে তেমন কিছু আগে দেখা যায়নি। এখন মনে হয় আওয়ামী লীগের অবস্থা আগের থেকে অনেক খারাপ হওয়ার কারণে প্রতিক্রিয়াও হচ্ছে তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে।
৭ মার্চের বক্তৃতা শেখ মুজিব যে ‘জয় পাকিস্তান’ বলে শেষ করেছিলেন এটা আমিও শুনেছিলাম। এটা কোনো ‘কানকথা’ নয়। আওয়ামী লীগওয়ালাদের এক্ষেত্রে সুবিধা হয়েছে যে, তখনকার দিনে কোনো টেপরেকর্ডার বা মোবাইল ফোন ছিল না। রেডিও পাকিস্তানে বক্তৃতার যে টেপ ছিল, সেটা সে সময় আওয়ামী লীগের লোকদের হাতে থাকায় ‘জয় পাকিস্তান’ শব্দ কেটে দিয়ে তারা এই কথার বস্তুগত ভিত্তি চিরতরে নষ্ট করেছিল। এরপর থাকে শুধু যুদ্ধের কথা। কেউ বলেন, তিনি ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছিলেন, কেউ বলেন তিনি তা বলেননি। মিথ্যাবাদী হলে একথা শুনেও তা শোনেনি বলতে অসুবিধা নেই। এ বিষয়ে সত্য-মিথ্যার কোনো বস্তুগত প্রমাণ দেয়া কারও পক্ষে এখন সম্ভব নয়। কিন্তু টেপরেকর্ডারে ধারণকৃত কোনো তথ্যের ভিত্তিতে শেখ মুজিব কর্তৃক ‘জয় পাকিস্তান’ বলা প্রমাণ করা এখন সম্ভব না হলেও এর অন্য ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ উপস্থিত করা সম্ভব। আইন ও ইতিহাসের ক্ষেত্রে একে বলা হয়, circumstantial evidence বা পরিস্থিতিভিত্তিক প্রমাণ। এ ধরনের প্রমাণের গুরুত্ব এমন যে, কোনো মামলায় এর ভিত্তিতে আসামির শাস্তি হতে পারে। এর ভিত্তিতে খুনের আসামির ফাঁসি পর্যন্ত হতে পারে এবং হয়ে থাকে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর ’৭১-এর জানুয়ারিতে পল্টন ময়দানের এক জনসভা বক্তৃতায় শেখ মুজিব যে ‘জয় পাকিস্তান’ বলেছিলেন, এটা আজ পর্যন্ত কেউ অস্বীকার করেননি। তিনি একজন পাকিস্তানি ছিলেন এবং নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়া ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ব্যাপারে তার কোনো সংশয় ছিল না। পরবর্তী সময়ে এক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দেখা দিলেও এবং চারদিকে স্বাধীনতার আওয়াজ উঠতে থাকলেও শেষ পর্যন্ত শেখ মুজিব এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন। তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের মধ্যে তার এই চিন্তার প্রবল বিরোধিতা ছিল এবং তাদের চাপের মুখেই তিনি ৭ মার্চ তার রেসকোর্স বক্তৃতায় ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম’ ইত্যাদি বলেছিলেন এবং বলেছিলেন ঘরে ঘরে দুর্গ তৈরির কথা। কিন্তু সেটা যে ছিল ফাঁকা কথা তা কয়েকদিন পরই প্রমাণিত হল। ৭ তারিখের পর থেকে আওয়ামী লীগ বেসামরিক সরকারের কর্তৃত্ব হাতে নিলেও ১৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকায় আসার পর ১৬ তারিখ থেকেই শুরু হয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার বৈঠক। কয়েক দিন ধরে প্রতিদিনই এই বৈঠক হতো। এগুলোতে বসে শেখ মুজিব এবং অন্য আওয়ামী নেতারা যে বাংলাদেশ স্বাধীন করার আন্দোলন করতেন না, এটা আওয়ামী লীগের উত্তেজিত নেতা, বুদ্ধিজীবী ও লেখকরা কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না। বৈঠকগুলোতে যে আলোচনা হচ্ছিল তা হল, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ কর্তৃক সরকার গঠন। এসব নিয়ে ইয়াহিয়ার সঙ্গে আলোচনাকারী শেখ মুজিব এবং অন্য আওয়ামী লীগ নেতারা প্রত্যেক বৈঠকের পরই আশাবাদ ব্যক্ত করতে থাকেন। তাদের এই আশাবাদের বিষয়টি পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলে স্পষ্টভাবেই বোঝা যায় যে, পরিস্থিতির মধ্যে, বিশেষত ১ মার্চের পর থেকে, সামগ্রিকভাবে যে পরিবর্তন দ্রুত ঘটছিল সে বিষয়ে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না। পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারার ব্যাপার ছাড়া অন্য কিছুর স্থান তাদের চিন্তায় ছিল না।
সেই অবস্থায় ৭ মার্চের জনসভায় শেখ মুজিবের পক্ষে তার গরম বক্তৃতা ‘জয় পাকিস্তান’ বলে শেষ করার মধ্যে অস্বাভাবিক কিছুই ছিল না। তাছাড়া আরেকটি বিষয়ও এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। শেখ মুজিব তার বক্তৃতার এক পর্যায়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লোকদের উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘তোমরা আমার ভাই’। তাদের ক্যান্টনমেন্টে ফেরত গিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের বা ভাগাভাগির প্রক্রিয়া সহজ করার পরামর্শও তিনি দিয়েছিলেন। যাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তিনি দেশের লোককে ‘ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার’ নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাদের আবার আদর করে ‘ভাই’ বলার মধ্যে যে সশস্ত্র যুদ্ধের কোনো মানসিকতা বা প্রস্তুতি ছিল না এটা বলাই বাহুল্য। কাজেই আবার বলতে হয় যে, সেই অবস্থায় শেখ মুজিবের বক্তৃতার শেষে ‘জয় পাকিস্তান’ বলা স্বাভাবিক ছিল। তিনি তা বলেছিলেন এবং রেসকোর্সের ময়দানে এবং রেডিও-টেলিভিশনে লাখ লাখ মানুষ তা শুনেছিলেন। এ কথা বলার জন্য একে খন্দকারের বিরুদ্ধে গালাগালি বর্ষণের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সত্য ইতিহাস প্রতিষ্ঠার কোনো সম্পর্ক নেই। ঐতিহাসিক ঘটনা বিচারে গুরুত্বপূর্ণ circumstantial evidence-কে অস্বীকার করার মধ্যে মিথ্যা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছাড়া আর কী থাকতে পারে?
এবার আসা যেতে পারে খন্দকারের দ্বিতীয় আক্রান্ত বক্তব্যের বিষয়ে। তিনি অনেক রকম বাস্তব ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেছেন, আওয়ামী লীগের নেতারা ২৬ মার্চ শেখ মুজিব কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার যে কথা প্রচার করে থাকেন, তার মধ্যে কোনো সত্যতা নেই। এসব কথা তিনি ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় শোনেননি। তাজউদ্দীনসহ অন্য কোনো আওয়ামী লীগ নেতাও একথা বলেননি। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিব নিহত হওয়ার আগে পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো কথাবার্তা অথবা বিতর্ক হয়নি। এটা হল পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগওয়ালাদের তথ্যবিহীন রাজনৈতিক প্রচারণা। এ বিষয়টি আমিও কয়েক বছর আগে বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেছি Oxford University Press কর্তৃক প্রকাশিত Emergence of Bangladesh নামক আমার গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে Declaration of Independence শীর্ষক শেষ অধ্যায়ে। তথ্য-প্রমাণাদির অভাব এবং circumstantial evidence-এর ভিত্তিতে আমি দেখিয়েছি, শেখ মুজিব কর্তৃক ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার বিষয়টি সর্বৈব মিথ্যা এবং আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্যপূর্ণ প্রচারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।
খন্দকার সামরিক বাহিনীর লোক। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে বিমান বাহিনীর বাঙালি অফিসারদের মধ্যে সর্বজ্যেষ্ঠ। কাজেই সামরিক বাহিনীর ভেতর থেকে তিনি তখন যা দেখেছিলেন তার অনেক বিবরণ তিনি দিয়েছেন। ’৭১-এর যুদ্ধের অব্যবহিত আগে সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে ঘটতে থাকা ঘটনাবলী এবং সামরিকসহ বাঙালি সশস্ত্র বাহিনীর লোকদের সঙ্গে শেখ মুজিব ও তার দলের নেতাদের ইচ্ছাকৃত বিচ্ছিন্নতার বিষয়ে খন্দকার যা লিখেছেন, কোনো যথার্থ ঐতিহাসিকই তা উপেক্ষা করতে পারেন না। লেনদেনে সিদ্ধহস্ত লেখকদের পক্ষে এসব তথ্য ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়ায় অসুবিধা নেই। কারণ ইতিহাস রচনা নয়, ইতিহাস বিকৃত করাই তাদের কাজ। কিন্তু কোনো দায়িত্বশীল ও যোগ্য ঐতিহাসিকেরই শেখ মুজিব কর্তৃক বাঙালি সশস্ত্র বাহিনীর লোকদের থেকে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও প্রক্রিয়াকে বিচ্ছিন্ন রাখার বিষয়টিকে অগুরুত্বপূর্ণ এবং হিসাব অযোগ্য বিষয় মনে করার কোনো সুযোগ নেই। যুদ্ধের চরিত্র যাই হোক, তার জন্য দরকার সশস্ত্র লোকজন ও সশস্ত্র বাহিনী। এক্ষেত্রে প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ সামরিক লোকরা যদি যুদ্ধে যোগদান করতে আগ্রহী ও ইচ্ছুক থাকেন, তাহলে তাদের উপেক্ষা করা কোনোমতেই সঠিক হতে পারে না। স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা যুদ্ধের চিন্তা মাথায় থাকলে যুদ্ধে শরিক হতে আগ্রহী সশস্ত্র সামরিক লোকদের কেউই এভাবে উপেক্ষা করতে পারেন না। কিন্তু শেখ মুজিব ও তার সঙ্গী-সাথী আওয়ামী নেতৃত্ব সশস্ত্র বাহিনীর লোকদের নিজেদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত করতে চাননি, কারণ শেখ মুজিব চেয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে। এক্ষেত্রে জানুয়ারি মাসে ঢাকায় এসে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিষয়ে যে প্রতারণাপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেটাও শেখ মুজিবের এই আকাক্সক্ষাকে দৃঢ় করেছিল। কাজেই জনগণ বা সশস্ত্র বাহিনীর বাঙালিরা নয়, ইয়াহিয়ার ওপরই ছিল তার প্রকৃত আস্থা।
সামরিক বাহিনীর বাঙালিদের সঙ্গে শেখ মুজিব যদি সম্পর্ক স্থাপন করতেন, তাদের যদি তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতেন, তাহলে সমগ্র রাজনৈতিক পরিস্থিতি কী চরিত্র পরিগ্রহ করত সেটা বোঝা যায় চট্টগ্রামের স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ও পাকিস্তান রেডিওর বাঙালি কর্মচারীদের সহায়তায় মেজর জিয়াউর রহমান কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষণার প্রতিক্রিয়া থেকে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সে সময়ে বসে পড়ার পর সেই ঘোষণা সামরিক-বেসামরিক লোকদের মধ্যে যে উৎসাহের সৃষ্টি করেছিল, সেটা শুধু খন্দকারের বইতেই লেখা হয়নি; কর্নেল নূরুজ্জামান এবং ফারুক আজিজ খানের মতো আওয়ামী লীগ সমর্থক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও নিজের নিজের যুদ্ধকালীন স্মৃতিচারণায় সেই উৎসাহ-উদ্দীপনার কথা বলেছেন। এ প্রসঙ্গে যে বিষয়টি বলা দরকার তা হল, ইয়াহিয়া কর্তৃক ১ মার্চের সংসদ অধিবেশন বাতিল করার সঙ্গে সঙ্গেই ঢাকাসহ দেশের সর্বত্র জনগণের এক অভ্যুত্থান পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এই অভ্যুত্থানের চরিত্র ও সম্ভাবনা বিষয়েও শেখ মুজিবের কোনো ধারণা ছিল না। তিনি যদি জনগণের ওপর নির্ভরশীল হতেন এবং সামরিক বাহিনীর বাঙালি সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেন তাহলে ৭ মার্চ রেসকোর্সের ময়দানের বক্তৃতার শেষে দেশের লোককে ঘরে ঘরে দুর্গ তৈরির আহ্বান না জানিয়ে এবং বক্তৃতার শেষে ‘জয় পাকিস্তান’ না বলে ওই মহাসমাবেশেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে সমবেত লাখ লাখ মানুষকে ক্যান্টনমেন্টের দিকে পরিচালনা করতেন এবং বাঙালি সামরিক লোকদের ক্যান্টনমেন্টের দখল নেয়ার আহ্বান জানাতেন। বিমানবন্দর দখল সহজেই হতো এবং তখনও পর্যন্ত পাকিস্তানি সৈন্যদের সংখ্যা কম থাকায় জনগণের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে বাঙালি সামরিক সদস্যরা ক্যান্টনমেন্ট দখল করতেন। সেই সংঘর্ষে হাজার হাজার লোক নিহত হতে পারতেন, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে ওই দিনই পাকিস্তান সরকারের পতন হতো। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে লাখ লাখ মানুষ নিহত হওয়া, হাজার হাজার নারী ধর্ষিত হওয়া এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের ভারতে গিয়ে বাংলার স্বাধীনতার জন্য তাদের কাছে ধরনা দিতে হতো না। কিন্তু শেখ মুজিব এবং অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতার সে রকম কোনো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল না। শেখ মুজিব যেখানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য দলবল নিয়ে একেবারে শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মতো এক ফ্যাসিস্ট ও দুশমনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর ছিলেন, সেখানে এ ধরনের কোনো স্ট্র্যাটেজিক চিন্তা তাদের চিন্তার ধারেকাছেও যে থাকার কথা নয়, এটা বলাই বাহুল্য। কাজেই ৭ মার্চের পর পাকিস্তানিদের হিংস্র যুদ্ধ প্রস্তুতির পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ জনগণের জন্য কোনো যুদ্ধ পরিকল্পনা নয়, অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি উপস্থিত করে সরকার পরিচালনার কাজে নিযুক্ত হয়েছিল! এর যৌক্তিক পরিণতি যা হওয়ার তাই হয়েছিল।
শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগের এই অবস্থা হলেও তাদের ছাত্র সংগঠনের অবস্থা ছিল অন্যরকম। তারা স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার জন্য শেখ মুজিবের ওপর চাপ সৃষ্টি করছিল। ১৯৭১ সালের আগে ১৯৬৯-৭০ সালে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো’ আওয়াজ দিত তাদের সমাবেশ ও মিছিলে। তখনও পর্যন্ত সে রকম কোনো আওয়াজ ছাত্রলীগ দিত না। কিন্তু ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ছাত্রলীগের এই আওয়াজ ছিল সব থেকে শক্তিশালী। এ নিয়ে ছাত্রলীগের তৎকালীন নেতারা আওয়ামী লীগের মধ্যে একটা প্রেসার গ্র“প হিসেবে কাজ করছিল। তাদের চিন্তা এদিক দিয়ে শেখ মুজিব এবং তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের থেকে অনেক অগ্রসর ছিল। এই অগ্রসর চিন্তা থেকেই তারা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তৈরি করে ২৩ মার্চ ঢাকাসহ সারা দেশে পাকিস্তান দিবস উপলক্ষে পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের জন্য জনগণের কাছে আহ্বান জানিয়েছিল। সেদিন তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিয়ে শেখ মুজিবের বাড়ি পর্যন্ত সর্বত্র বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিল। ক্যান্টনমেন্ট, প্রেসিডেন্ট ভবনসহ সামান্য কয়েকটি সরকারি অফিস ছাড়া অন্য কোনো জায়গাতেই সেদিন পাকিস্তানের পতাকা ওড়েনি। জনগণ সে কর্মসূচিকে যেভাবে সাড়া দিয়েছিলেন, তার থেকেই বোঝা গিয়েছিল বাংলার জনগণ স্বাধীনতা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন। এদিক থেকে বলতে গেলে ছাত্রলীগের সেই পতাকা উত্তোলনই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। তার সঙ্গে শেখ মুজিবের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এর প্রতি তার কোনো সমর্থন ছিল এমন কোনো তথ্য-প্রমাণও কেউ আজ পর্যন্ত হাজির করেননি। সেটা করতে না পারার কারণ, ২৩ তারিখ পর্যন্ত শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগ নেতারা ইয়াহিয়ার ওপর আস্থা রেখে আলোচনার অগ্রগতির কথা বলছিলেন!! এসব কথা হল একেবারে নিরেট সত্য।
এ পরিস্থিতিতে নানা ধরনের circumstantial evidence-এর ভিত্তিতে এটা প্রমাণসিদ্ধভাবেই বলা যায় যে, শেখ মুজিবের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া একেবারেই অসম্ভব ছিল। তাছাড়া যে কথাটি এ প্রসঙ্গে খুব জোর দিয়ে বলা দরকার তা হল, একটি দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা ও স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করা কোনো ফাজলামির ব্যাপার বা এক ব্যক্তির কাজ নয়। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়, শেখ মুজিব কোনো অজ্ঞাত লোকের মাধ্যমে চিরকুট পাঠিয়ে সিগনালের সহায়তায় চট্টগ্রামে তার স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠিয়েছিলেন। এই ‘চিরকুট কাহিনী’ নতুন নয়। তাদের দাবি হল, ২০ ফেব্র“য়ারি ১৯৫২ তারিখের আগেই শেখ মুজিব ফরিদপুর জেলে স্থানান্তরিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি নাকি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাথরুমের জানালা থেকে চিরকুট ফেলে ২০ তারিখে জারিকৃত ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ‘নির্দেশ’ দিয়েছিলেন। তিনি নাকি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের পরিচালক ইত্যাদি!! ১৯৭১ সালেও চিরকুট পাঠিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার যে কথা বলা হয় সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। শেখ মুজিব তাজউদ্দীন আহমদ বা অন্য কাউকে স্বাধীনতা ঘোষণা বা ওই ধরনের কোনো নির্দেশ দেননি, এ কথা বলায় তার বিরুদ্ধে কলম চালিয়ে তাকে বিশ্রী ভাষায় গালাগাল করা হচ্ছে। জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ তার প্রতি গালি বর্ষণ করছে, এমনকি ১৯৭২ সালে পতাকা উত্তোলনকারী ছাত্রলীগ নেতাদের একাংশ পর্যন্ত গালি বর্ষণের এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে নেই! আওয়ামী লীগ মিথ্যার যে সংস্কৃতি দেশজুড়ে চালু করেছে এসবই হল তার পরিণতি।
আগেই বলা হয়েছে, স্বাধীনতার ঘোষণা কোনো এক ব্যক্তির ব্যাপার নয়। এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী কেন্দ্রীয় কমিটির কোনো বৈঠক হওয়ার প্রমাণ নেই। আজ পর্যন্ত এ ধরনের কোনো বৈঠকের কথা তাদের পক্ষ থেকেও কেউ বলেননি। এমনকি এ নিয়ে শেখ মুজিব তাজউদ্দীন আহমদ, নজরুল ইসলাম, কামাল হোসেন, আমীর-উল ইসলাম প্রমুখের সঙ্গে কোনো অনানুষ্ঠানিক বৈঠক পর্যন্ত করেছেন, এমন কথা তাদের কেউ বলেননি। সেই পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি সবার কাছ থেকে গোপন রেখে চিরকুটের মাধ্যমে চট্টগ্রামে কোনো স্থানীয় নেতার কাছে তা পাঠিয়ে দিলেন, একথা বিশ্বাস করা কোনো সৎ ও স্বাভাবিক বুদ্ধিসম্পন্ন লোকের পক্ষে সম্ভব নয়। একথা আমিও আমার Emergence of Bangladesh-এ লিখেছি এবং খন্দকার সাহেবও তার বইয়ে লিখেছেন যে, ঢাকায় তখন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে দুই শতাধিক বিদেশী সাংবাদিক অবস্থান করছিলেন। নিজেদের দলের কোনো নেতার কাছে না হলেও সেই হোটেলে যে কোনো বিদেশী সাংবাদিকের কাছে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠালে সেটা সঙ্গে সঙ্গে দুনিয়াময় ছড়িয়ে পড়ত। তাছাড়া রেডিওর দখলও তখন তাদের হাতে ছিল। রেডিওর মাধ্যমেও তা প্রচার করা যেত। কিন্তু সে কাজ না করে একজন অজ্ঞাতনামা লোকের হাতে চিরকুট দিয়ে সিগনালের (যা তখন পাকিস্তানিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল) মাধ্যমে চট্টগ্রামের একজন স্থানীয় নেতার কাছে পাঠানোর গল্প হাজির করে মানুষকে সেটা বিশ্বাস করার জন্য বলা এবং কেউ তা বিশ্বাস না করলে তাকে গালাগাল করা মানুষের বুদ্ধি বিবেচনাকে বুড়ো আঙুল দেখানো ছাড়া আর কী?
শেখ মুজিব যে ২৬ মার্চ কোনো স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি এবং দেয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না, এ বিষয়ে আর একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ পরৎপঁসংঃধহঃরধষ বারফবহপব-এর উল্লেখ এখানে করব। ২৫ মার্চ সন্ধ্যা ও রাত ৯-১০টা পর্যন্ত যারা তার সঙ্গে পরামর্শ বা নির্দেশের জন্য দেখা করতে গিয়েছিলেন, তাদের প্রত্যেককে তিনি নিরাপদ জায়গায় পালিয়ে যেতে বলেছিলেন। চিরকুট পাঠিয়ে সেই রাত্রেই স্বাধীনতার ঘোষণা চট্টগ্রামে পাঠানোর কথা বলা হলেও তাজউদ্দীন বা অন্য কোনো আওয়ামী লীগ নেতা ও সহকর্মীকে স্বাধীনতা বিষয়ে তিনি কিছুই বললেন না। তার থেকে বড় কথা হল, অন্য সবাইকে পালিয়ে যেতে বললেও তিনি নিজে কোথাও না গিয়ে নিজের বাড়িতে থেকে গেলেন! অপেক্ষা করতে থাকলেন পাকিস্তানি বাহিনী কখন তাকে গ্রেফতার করতে আসবে তার জন্য!! তারা তাকে ধরে নিয়েও গেল। এর এক ফাঁকে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণার চিরকুট চট্টগ্রাম পাঠালেন এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির মাধ্যমে!!! এ এক অত্যাশ্চর্য কথা। দুনিয়ার অনেক দেশে সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছে। সেই যুদ্ধে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তারা শত্র“র ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেই যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন।
এ বিষয়ে আরও অনেক কিছু লেখা যায় এবং অন্যত্র আমি লিখেছি, কিন্তু এই ক্ষুদ্র পরিসরে তা সম্ভব নয় এবং তার প্রয়োজনও এখানে নেই। পরিশেষে এটা অবশ্যই বলা দরকার, আবদুল করিম খন্দকার তার আলোচ্য বইটি লিখে বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের পরিস্থিতি ও স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে যেসব তথ্য উপস্থিত করেছেন, তার জন্য বাংলাদেশের সত্য ইতিহাস জানতে আগ্রহী ব্যক্তিদের অনেক ধন্যবাদ তার প্রাপ্য। তথ্যের নামে আওয়ামী লীগ পরিবেশিত অনেক আবর্জনা যে এই বইয়ে পরিবেশিত তথ্যের কারণে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে এবং বইটি ইতিহাসের একটি আকর গ্রন্থ হিসেবে ভবিষ্যতে ঐতিহাসিকদের দ্বারা ব্যবহৃত হয়ে আওয়ামী লীগের তৈরি মিথ্যার মূর্তি চূর্ণ করতে সহায়ক হবে এতে সন্দেহ নেই।
১২.০৯.২০১৪
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল
 

উপসম্পাদকীয় পাতার আরো খবর
    ৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

    ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

    প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

    পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

    Developed by
    close
    close