¦
গৈলা স্কুল ১২৩ বছরে

অজয় দাশগুপ্ত | প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০১৫

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সহজ পাঠ-এ উল্লেখ করেছেন বরিশালের গৈলা গ্রামের নাম। প্রত্যন্ত এ গ্রামের নাম জানা তার পক্ষে স্বাভাবিক। মংপুতে রবীন্দ্রনাথ এবং ন হন্যতে গ্রন্থের লেখক মৈত্রেয়ী দেবী রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। মৈত্রেয়ী দেবীর বাবা ড. সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত এবং মা ড. সুরমা দাশগুপ্ত (দুজনেই দুবার করে পিএচডি ডিগ্রি লাভ করেছিলেন কলকাতা ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে) রবীন্দ্রনাথের পরিচিত ছিলেন। গৈলায় তাদের বাড়ির নাম ছিল কবীন্দ্র বাড়ি এবং সেখানে ১৮৯৬ সালে কবীন্দ্র কলেজ নামে একটি কলেজ ছিল, যেখানে কাব্য, ব্যাকরণ, ন্যায় ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের শিক্ষা দেয়া হতো। এ কলেজে ছাত্রদের জন্য হোস্টেল ছিল। তৎকালীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থান থেকে শিক্ষার্থীরা এ কলেজে পড়তে আসত। একইভাবে ওই সময়ে গৈলার ছাত্ররা বরিশাল, ঢাকা কিংবা কলকাতায় পড়তে যেত। ঢাকায় পড়ার জন্য যেতে ৭-৮ দিনে প্রমত্ত পদ্মা-মেঘনা নৌকায় পাড়ি দিতে হতো।
১৮৯৩ সালের ২৩ জানুয়ারি এ গ্রামেই গৈলা স্কুল প্রতিষ্ঠিতি হয়। প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন কৈলাশচন্দ্র সেন। তিনি স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেও উচ্চপদস্থ সরকারি চাকরি ছেড়ে গ্রামের স্কুলে যোগ দেন। প্রথম দিনেই ছাত্রছাত্রী ছিল ১২২ জন। কয়েক বছরের মধ্যেই এ সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যায়। ছাত্রী সংখ্যা বেশি হওয়ায় এবং দূরের মেয়েদের আসা-যাওয়ার সমস্যা বিবেচনা করে ১৯১৩ সালে পুব পাড়ায় মেয়েদের জন্য একটি ইংরেজি বিদ্যালয় চালু হয়েছিল। একই সঙ্গে গৈলা স্কুলে মেয়েদের জন্য চালু ছিল মর্নিং স্কুল। স্কুল পরিচালনার জন্য অভিভাবকদের নিয়ে একটি সাধারণ পরিষদ ছিল। গৈলা গ্রামের যারা এমএ-এমএসসি বা এ ধরনের ডিগ্রি অর্জন করতেন, তারাও এ পরিষদের সদস্য হিসেবে গণ্য হতেন।
সে সময়েই গৈলা গ্রামে এ ধরনের ডিগ্রিপ্রাপ্ত নারী-পুরুষ ছিলেন অনেক। ১৮৮৫ থেকে ১৮৯২ সাল পর্যন্ত এ গ্রামের অন্তত ১৫ জন স্নাতক বা তদূর্ধ্ব ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৮৯৩ থেকে ১৯৪০-এর দশক পর্যন্ত এ গ্রাম থেকে অন্তত ৪০ জন ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। এমএ-এমএসসি ও সমপর্যায়ের পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণী পেয়েছিলেন অন্তত ২২ জন। এমবিবিএস ডাক্তার ছিলেন ৩৩ জন এবং গ্রাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ার ৪৩ জন। গ্রামে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী নারী ছিলেন অর্ধশয়ের বেশি।
এই গৈলা গ্রামেরই বাসিন্দা ছিলেন বিজয় গুপ্ত। তিনি অন্তত ৫০০ বছর আগে মনসা মঙ্গল কাব্য রচনা করেছিলেন বাংলায়, যখন অধিকতর প্রচলিত ভাষা ছিল সংস্কৃত। গৈলা দাশের বাড়ির কুসুম কুমারী দেবীর কবিখ্যাতি ছিল। আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে কবিতার রচয়িতা ছিলেন তিনি। তারই পুত্র বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে স্বীকৃত জীবনানন্দ দাশ।
গৈলা স্কুল এখন মডেল স্কুল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। বর্তমানে ছাত্রছাত্রী প্রায় দেড় হাজার। প্রতিবছর দুশরও বেশি ছাত্রছাত্রী মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। জনপ্রিয় রাজনীতিক ও কৃষক দরদী হিসেবে পরিচিত আবদুর রব সেরনিয়াবাত টানা দুই দশক এ স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির কর্ণধার ছিলেন। তার পুত্র জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান ও সাবেক চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ স্কুলটির উন্নতির বিষয়ে বিশেষভাবে মনোযোগী। এ স্কুলের ব্যবস্থাপনায় তিন দশক যুক্ত ছিলেন ইউসুফ হোসেন মোল্লা। তিনি সম্প্রতি ইন্তেকাল করেছেন। এ বিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র সুনীল কুমার গুপ্ত, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এমএ মালেক এবং সৈয়দ আবুল হোসেন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী কিংবা মন্ত্রীর মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেন। স্কুলটি বরাবরই শিক্ষার মান নিয়ে গর্ব করতে পারে। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের পিএইচডি গবেষণার সময়কালীন শিক্ষক অমিয় দাশগুপ্ত ২০ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি গৈলা স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। তার সম্পর্কে অমর্ত্য সেন লিখেছেন, মাস্টার মশাই সবসময় বলতেন, তার জীবনে যা কিছু অর্জন তার মূলে গৈলা স্কুলের শিক্ষা। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও স্কুলটি অগ্রণী। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় স্কুলের ফুটবল দল শ্রেষ্ঠত্বের সম্মান লাভ করেছে।
বিদ্যালয়ের শতবর্ষ উপলক্ষে সাবেক ছাত্রছাত্রীরা নির্মাণ করে দিয়েছে শতবর্ষ ভবন। সাবেক ছাত্র সৈয়দ আবুল হোসেনের দেয়া ৫ লাখ টাকার একটি বৃত্তি তহবিল থেকে বার্ষিক পরীক্ষায় কৃতিত্ব প্রদর্শনকারী ছাত্রছাত্রীরা নিয়মিত বৃত্তি পায়।
অজয় দাশগুপ্ত : সাংবাদিক
উপসম্পাদকীয় পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close