¦
শুধু মানুষ নয়, পুড়ছে অর্থনীতিও

ড. আর এম দেবনাথ | প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

ব্যবসায়ীরা রাজনীতির লোক নন, নন শিল্পপতিরাও। তারা ব্যস্ত থাকেন যার যার ব্যবসা, শিল্প অথবা কারখানা নিয়ে। লাভ বা মুনাফা অর্জনই তাদের উদ্দেশ্য। এহেন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা যখন রাস্তায় নামেন তখন বুঝতে হবে তারা বিপদে পড়েছেন। তারা বিপদে কেন, বস্তুত বিপদে ব্যবসা ও অর্থনীতি। বিষয়টা আরও ব্যাপকতর হতো যদি কৃষক ভাইয়েরা রাস্তায় নামতে পারতেন। শত হোক জিডিপিতে এখনও তারা প্রায় ২০ শতাংশ অবদান রাখেন এবং এ খাতে প্রায় ৭০ শতাংশ লোক নিয়োজিত। না, তারা ক্ষুব্ধ হলেও রাস্তায় নেই। রাস্তায় ব্যবসায়ীরা, ঠিক ২০১৩ সালের মতো। ২০১৩ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে ব্যবসায়ীরা রাস্তায় নিমেছিলেন। বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। এক বছর যেতে না যেতেই তারা আবার রাস্তায় নামছেন। খবরের কাগজে দেখলাম দেশের ৩ কোটি ব্যবসায়ী আগামী রোববার সহিংসতার প্রতিবাদে মাঠে নামবেন। হাতে থাকবে তাদের জাতীয় পতাকা। স্লোগান ‘সবার উপরে দেশ, দেশ বাঁচাও অর্থনীতি বাঁচাও’। কর্মসূচিটি চলবে মাত্র ১৫ মিনিট। সারা দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা যার যার ব্যবসা, অফিস, কারখানা, শিল্প প্রতিষ্ঠানের সামনে নেমে আসবেন পতাকা হাতে। স্লোগান দেবেন। গাইবেন সর্বাগ্রে জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ এ উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা সারা দেশে জেলায় জেলায়, বিভাগে-বিভাগে ব্যাপক কর্মতৎপরতা চালাচ্ছেন বলে খবরে বলা হয়েছে। কর্মসূচিতে ব্যবসায়ী নেতারা অংশগ্রহণ করবেন। এটা পরিষ্কার, তারা বর্তমান সহিংস অবরোধ ও হরতালের পরিসমাপ্তি চান। তারা নির্বিঘেœ ব্যবসা করতে চান। আমদানি-রফতানি নির্বিঘেœ করতে চান। এসব দাবি নিয়ে নেতারা কর্মসূচি শেষে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং ২০-দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি দেবেন বলে জানা গেছে।
ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদ, অনুষ্ঠেয় কর্মসূচি এবং স্মারকলিপি পেশের ফলাফল কী হবে এ ব্যাপারে আমার ধারণা ব্যবসায়ীরা নিশ্চিত নন। নিশ্চিত নন বস্তুতপক্ষে কেউ-ই। কিন্তু একটি বিষয়ে সবাই একমত যে, ব্যবসায়ীরা যারপরনাই ক্ষতিগ্রস্ত, ব্যবসা ও অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত। আমদানি-রফতানি, পাইকারি-খুচরা ব্যবসা, ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত। শিল্পকারখানা ক্ষতিগ্রস্ত। আগে এসব ক্ষতির কোনো হিসাব করার ব্যবস্থা ছিল না। আশাপ্রদ খবর যে, ব্যবসায়ীরা এখন তাদের ব্যবসার ক্ষতি নিরূপণ করার একটা ব্যবস্থা করেছেন। এর থেকে দেশবাসী অর্থনীতির ক্ষতির একটা হিসাব করতে পারে। কাগজে ক্ষতির অনেক হিসাবই দৈনিক ছাপা হচ্ছে। ওসবে না গিয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (ডিসিসিআই) হিসাবে যাওয়া যাক। তাদের উদ্ধৃত করে কাগজে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক সহিংসতার এক মাসে দেশের সর্বমোট আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৬৮ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পোশাক খাতে। এ খাতে ক্ষতির পরিমাণ ২৫ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। তারপরই পরিবহন খাতের ক্ষতি। এক্ষেত্রে ক্ষতির পরিমাণ ৯ হাজার কোটি টাকা। কৃষির ক্ষতি তৃতীয় স্থানে। কৃষি খাতে ক্ষতির পরিমাণ ৮ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা। আবাসন খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পর্যটন ও বাজার-দোকান খাতে ক্ষতির পরিমাণ যথাক্রমে ৬ হাজার ৩০০ কোটি এবং ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। উৎপাদন ক্ষতি দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা। এই সাতটি খাতের পর আরও আটটি খাতের হিসাব দেয়া হয়েছে। এগুলো হচ্ছে : স্থলবন্দর ও সেতু, সিরামিক, পোলট্রি, প্লাস্টিক, বীমা, হকার্স, আমদানি পণ্য ও হিমায়িত খাদ্য। এ আটটি খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা।
এই যে ক্ষতির হিসাব দেয়া হয়েছে, তা কীভাবে নিরূপিত হয়েছে, সেই পদ্ধতি নিখুঁত কি-না- এই প্রশ্ন এখানে
করার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই বলে মনে করি। প্রশ্নটি নিখুঁত হিসাবের নয়। কারণ চোখের সামনেই আমরা দেখতে পাচ্ছি ব্যবসা ও অর্থনীতি আগুনে পুড়ছে। মানবিক ক্ষতির কথা বলছি না। প্রতিদিন কত মানুষ আগুনে পুড়ছে, কত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এর সংখ্যা হিসাব করা হয়তো যাবে; কিন্তু আর্থিক মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। এ পৈশাচিক কর্মকাণ্ড জাতির জন্য যেমন লজ্জাজনক, তেমনি ব্যবসায়িক ও আর্থিক ক্ষতি অবহনযোগ্য।
আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। বহু কষ্টে বাংলাদেশ ৬-সাড়ে ৬ শতাংশ জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে অনেক দিন যাবৎ। অর্থনীতির সব ম্যাক্রো সূচক ইতিবাচক। অর্থনীতি শক্ত-সবল ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে। ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা যখন ২০২১ সালকে লক্ষ্য করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, কৃষকরা যখন একের পর এক সাফল্য দেখিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময়ই সহিংসতা, নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড। বাস পুড়ছে, ট্রাক পুড়ছে, রেলগাড়ি পুড়ছে, মানুষ দগ্ধ হচ্ছে, দগ্ধ নিরীহ মানুষ মৃত্যুবরণ করছে। চট্টগ্রামে পণ্য যেতে পারে না। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আমদানিকৃত পণ্য আসতে পারছে না। ব্যবসায়ীদের পণ্য দেশের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারছে না। পোশাক খাতের কাজ বিঘ্নিত হচ্ছে। শ্রমিকরা সময়মতো হাজিরা দিতে পারছে না, বাড়ি ফিরতে পারছে না। লাখ লাখ ট্রাক-বাস টার্মিনালে দিন কাটাচ্ছে। লাখ লাখ ট্রাক-বাস কর্মচারী-শ্রমিক বেকার। তাদের দৈনন্দিন মজুরি-বেতন পাওয়ার ব্যবস্থা নেই। কৃষিপণ্য ক্ষেতে মারা যাচ্ছে। এসব কাঁচামাল ধরে রাখার উপায় নেই। ক্ষেতেই পচছে, নষ্ট হচ্ছে এসব পণ্য। কৃষকের পণ্যের কোনো ক্রেতা নেই। শাকসবজি ইত্যাদির মৌসুম এখন। আলু, পটল, ঝিঙ্গা, চিচিঙ্গা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, বরবটি, বেগুন ইতাদির মৌসুম এখন। কৃষক অফুরন্ত ফলিয়েছে। অথচ এর দাম নেই। ফড়িয়া, মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীদের ব্যবসা বিঘ্নিত। আবাসন শিল্পের মালিকরা ফতুর। বেচা-কেনা বন্ধ। এ শিল্পের শ্রমিকরা বেকার। আবাসন শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত শত ধরনের শিল্পের কাজে চলছে মন্থরতা। ইট, বালি, সিমেন্ট, রড ব্যবসায় মন্দা। হোটেল সব খালি। পর্যটনের সঙ্গে জড়িত হোটেল-মোটেল শিল্প ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত। নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যটনের মৌসুম। অথচ পর্যটন কর্মীরা হতাশার জীবন কাটাচ্ছে। খুচরা দোকানে বিক্রি নেই। মলগুলোতে লোক নেই। বাণিজ্য মেলা জমেনি এবার। বেচাকেনার পরিমাণ হতাশাজনক। বইমেলা শুরু হয়েছে এক তারিখ থেকে। ক্রেতা নেই। বই ঘাঁটাঘাঁটির লোক আছে। সহিংস রাস্তায় কে বেরোবে, তাও ছেলেমেয়েদের নিয়ে। কাঁচাবাজার ফাঁকা। মাছ-মুরগির ব্যবসায় মন্দা। শীতকালে হাঁসের মাংস খায় মানুষ। বাজারে এরও সরবরাহ ও চাহিদা নামমাত্র। হকারদের তো মরণদশা। শীতবস্ত্র বিক্রেতাদের ব্যবসা যাচ্ছে খুবই খারাপ। এক কথায় অর্থনীতির এমন কোনো খাত নেই যে খাত আক্রান্ত নয় মন্দায়।
চলছে ‘ক্যাশের’ সংকট। ব্যাংকের এক শাখা থেকে অন্য শাখায় ক্যাশ যায় পুলিশ প্রহরায়, লাগে ট্রান্সপোর্ট। কোথায় পুলিশ, কোথায় ট্রান্সপোর্ট? ফলে চলছে ‘ক্যাশ’ সংকট। ব্যাংকাররা প্রমাদ গুনছেন। ব্যবসা খারাপ মানেই ব্যবসায়ীর ‘ক্যাশ ফ্লো’ বিঘিœত। তার বেচাকেনা না হলে সে ব্যাংকের টাকা দেবে কোত্থেকে। আসছে প্রস্তাব ঋণ পুনঃতফসিলের, পুনর্গঠনের। এর অর্থই ব্যাংকের ক্ষতি। কোনো ব্যাংকই এ ক্ষতি থেকে রেহাই পাবে না। রেহাই পাবে না
বীমা ব্যবসায়ীরাও। এ প্রেক্ষাপটেই ব্যবসায়ীরা মাঠে নেমেছেন। তারা নিজেরা বাঁচতে চান, দেশকে
বাঁচাতে চান। তাই স্লোগান ‘দেশ-বড়’। দুঃখ হচ্ছে একটা, হতাভাগা এই দেশে চলে উল্টোটি। এখানে ‘দেশের চেয়ে দল বড়’, ‘দলের চেয়ে নেতা বড়’, ‘নেতার চেয়ে ছেলে-মেয়ে বড়’। এ অবস্থায় বর্তমান প্রতিবাদের ফল কী দাঁড়াবে, তা দেখার বিষয়। কিন্তু যা দেখার বিষয়, সেটা হচ্ছে অর্থনীতির রক্তক্ষরণ। কীভাবে?
বর্তমান অবরোধ কর্মসূচি চলছে ৫ জানুয়ারি থেকে। কলাম লিখছি ৫ ফেব্র“য়ারি। ৩১-৩২ দিন বর্তমান অবরোধ কর্মসূচির বয়স। শুধু অবরোধ নয়। এর সঙ্গে চলছে হরতাল। সারা দেশে হরতাল, জেলায় জেলায় বিশেষ হরতাল, এলাকায় এলাকায় হরতাল। এক জেলা অচল তো আরেক জেলা বন্ধ। অবরোধ ও হরতাল চলছে অব্যাহতভাবে। এতদিন ছিল আশংকা। এতদিন আমরা বলেছি এবং কলাম লিখেছি- অর্থনীতিতে ধস নামবে, অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ হবে। এখন আর আশংকার খবর নয়। এখন আশংকা সত্য হওয়ার খবর। রফতানির প্রবৃদ্ধি জানুয়ারি মাসে মন্থর হয়ে এসেছে। রেমিটেন্সের প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি হ্রাস পেয়েছে। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। নন-ফুড মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। তথ্যে দেখা যাচ্ছে, রফতানির গড় প্রবৃদ্ধি ২০১৪ সালের শেষ ছয় মাসে যা ছিল, তার চেয়ে কম হারে রফতানি বেড়েছে জানুয়ারি মাসে। সম্ভাবনাময় খাত ‘উইভেন’-এর রফতানি কমছে বেশি হারে। রেমিটেন্সের প্রবৃদ্ধির হার জানুয়ারি মাসে ছিল ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের হারের চেয়ে কম। শতকরা হারের উল্লেখ আর করছি না। যেখানে ২০১৪ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজারে ডলার বিক্রি করেছে আমদানির চাহিদা মেটানোর জন্য, সেখানে জানুয়ারি মাসে বিপুল পরিমাণ ডলার বাংলাদেশ ব্যাংক খোলাবাজার থেকে ক্রয় করেছে। এর অর্থ, মূলধনী যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য পণ্যের ঋণপত্র খোলার পরিমাণ জানুয়ারি মাসে হ্রাস পেয়েছে। এসব খারাপ লক্ষণ। আর এসব দেখেশুনেই ব্যবসায়ীরা রাস্তায় নেমেছেন ব্যবসা ছেড়ে, কারখানা ছেড়ে। তারা ‘বৈশ্য’ (ব্যবসায়ী)। ‘বৈশ্য’ শক্তি ছাড়া ‘ক্ষত্রিয়’ (দেশ শাসক/সম্ভাব্য শাসক) শক্তি চলতে পারে না। দেখা যাক কী হয় শেষ পর্যন্ত।
ড. আর এম দেবনাথ : সাবেক অধ্যাপক, বিআইবিএম
[email protected]
 

উপসম্পাদকীয় পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close