¦
সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অসহিষ্ণু ও পাশবিক রাজনীতির অবসান ঘটাক

মইনুল হোসেন | প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০১৫

প্রধান বিরোধী জোট তিনটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর নির্বাচনের ভবিষ্যৎ নিয়ে উত্তপ্ত বিতর্ক ও ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। সরকার যদি বহুদলীয় গণতন্ত্রের অস্তিত্ব স্বীকার না করে, তাহলে এ সময়ে তড়িঘড়ি করে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ অবশ্যই আরও বেশি বেপরোয়া সংঘাতের জন্ম দেবে। তাই সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন প্রমাণ করবে রাজনৈতিক ধারায় শান্তিপূর্ণভাবে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সম্ভব হবে কি-না। সরকারের গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার ওপর নির্ভর করবে সিটি কর্পোরেশন কতটা জনসেবামূলক হবে।
প্রধানমন্ত্রীর আমলা-কাম-রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের পরামর্শে ও সক্রিয় অবদানে গত বছরের ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচন তথা জনগণের কাছে ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে স্বাধীন দেশের জনগণকেই ধোঁকা দেয়া হয়েছে। তাদের ভোটাধিকার অস্বীকার করা হয়েছে। নিশ্চয়ই জনসেবার রাজনীতির স্বার্থে জনগণকে সরকার গঠনের ব্যাপারে ভোটাধিকারহীন করে অসহায় করা হয় না। যে দেশের জনগণ নিজেরা নিজেদের সরকার নিয়োগ করতে পারে না, সে দেশের জনগণ সত্যিকার অর্থে স্বাধীনও নয়।
বস্তুত জনগণের নির্বাচনী রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে সরকার আরও ব্যাপকভাবে পুলিশি শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। দেশে আজ যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে তাকে সরকারের জন্য কিংবা জনগণের জন্য মোটেও সহজ পরিস্থিতি হিসেবে দেখা যাবে না। দেশের জন্য তো অবশ্যই এ ধরনের বিপজ্জনক পরিস্থিতি রীতিমতো দুশ্চিন্তার ব্যাপার। পুলিশের কাছে অসহায় অবস্থায় সরকার দেশে শান্তি-শৃংখলা ফিরিয়ে আনতে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারেনি।
আইন-শৃংখলার ক্ষেত্রে ব্যাপক নৈরাজ্য বিরাজ করা সত্ত্বেও সরকার উপলব্ধি করতে পারছে না যে, শান্তিপূর্ণ রাজনীতি করার গণতান্ত্রিক সুযোগ না থাকায় চরমপন্থীদের কর্মতৎপরতা বেড়েছে, যা দেশ শাসনে মোটেও সহায়ক হবে না। ব্যক্তিস্বার্থ শিকারীদের কথা শুনে দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।
কেবল অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই রাজনৈতিক সংকটের রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব। কিন্তু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো সদিচ্ছা কোথাও দেখা যাচ্ছে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে যদি তার উচ্চ শাসনতান্ত্রিক পদমর্যাদা ও দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়ে আগের মতো আজ্ঞাবহ সরকারি কর্মকর্তা থেকে যান, তবে তো সমস্যার সমাধান হবে না। স্বাধীনভাবে নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা দেয়ার শাসনতান্ত্রিক দায়িত্ব কিন্তু সরকারের নয়- দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। সার্বিকভাবে সরকার তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে বাধ্য। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে নিজেই নতজানু থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কোনোভাবে স্বাধীন থাকার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি।
সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন নিয়ে যত আলাপ-আলোচনা চলছে তার মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, নির্বাচন কমিশনের প্রধান কি এবার শাসনতন্ত্রের বিধান মেনে জনগণের আস্থা রক্ষায় স্বাধীন ভূমিকা রাখতে পারবেন? প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব পালনের স্বাধীনতা শাসনতন্ত্রই নিশ্চিত করেছে। আমরা সবাই চরিত্রহীন, মেরুদণ্ডহীন হলে জাতি নিয়ে সুন্দর স্বপ্ন দেখব কাদের নিয়ে? কিছু লোকের নতজানু মানসিকতার জন্য আমাদের জাতীয় মর্যাদা ভীষণভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। গণতান্ত্রিক রীতিনীতি উপেক্ষা করে ব্যক্তির খেয়ালখুশিমতো যেভাবে বাংলাদেশ শাসিত হয়ে আসছে, তাতে শিক্ষিত বিবেকবান মানুষের অস্তিত্ব সম্পর্কেই প্রশ্নবিদ্ধ হতে হচ্ছে আমাদের সবাইকে।
তাই যতক্ষণ না প্রধানমন্ত্রী ও তার সরকারের নির্বাচন প্রকৌশলীরা বিরোধী পক্ষকে নির্বাচনে অংশ নিতে স্বাগত জানাচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আসন্ন ঢাকা সিটি কর্পোরেশন উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রামের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা দেখছি না।
এটা বলা হচ্ছে এ কারণে যে, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ওপর সরকার তার পুরো নিয়ন্ত্রণ দেখাতে চাইবে। এদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট দেশব্যাপী এক মারাত্মক বাঁচা-মরার আন্দোলনে লিপ্ত রয়েছে। পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনরতদের সংঘাতের ঘটনা প্রায়ই সংঘটিত হচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন যদি ব্যর্থ করার ঘটনা ঘটে, তবে তা আন্দোলনে অপ্রত্যাশিত গতি সঞ্চার করবে এবং সেটা দেশের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য খুব খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে।
মনে হচ্ছে সরকার বা নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা থাকার জন্য নয়, চলমান আন্দোলনের স্বার্থেই বিএনপি জোট সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারকে প্রমাণ দিতে হবে তারা নিজেদের গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনায় কতটা পরিবর্তন মেনে নিতে পারবেন।
সমস্যা হল, সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা অথবা বিরোধী পক্ষের দাবি মেনে নিয়ে সমঝোতার স্বাক্ষর রাখা আওয়ামী লীগ সরকারের নতুন রাজনৈতিক পরিকল্পনাকারীদের মাথায় নেই। শাসনতন্ত্রের প্রতি এই পরিকল্পনাকারীদের কোনো শ্রদ্ধা নেই। শাসনতন্ত্র মেনে চলার ব্যাপারে কোনো সচেতনতা না থাকার কারণে বিরোধী দলকে সরকারে রেখে সরকারের জবাবদিহিতা এবং বিরোধী দলের শাসনতান্ত্রিক ভূমিকা অস্বীকার করা হচ্ছে। এভাবে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিদিনই নিশ্চিতভাবে শাসনতন্ত্র লংঘিত হচ্ছে। শুধু নির্বাচন বা শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রেই নয়, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতিটি পর্যায়ে ব্যক্তির খেয়ালখুশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। সংসদে বিরোধী দলের শাসনতান্ত্রিক ভূমিকা অস্বীকার করেও বুঝতে চাইছেন না যে, তারা পদে পদে শাসনতন্ত্রকে উপেক্ষা করে চলেছেন। তারপরও আমরা সরকারকে সংবিধানের প্রতিভূ ও সংরক্ষণকারী হিসেবে দেখতে চাই।
সত্যিকারের রাজনৈতিক নেতারা তাদের সাফল্যকে পরিমাপ করে থাকেন জনগণের জীবনমানের উন্নতি দেখে, অর্থনীতির সূচকের নিরিখে নয়। বর্তমান নেতৃত্বের অধীনে দেশের মানবিক পরিস্থিতি এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, জনজীবনে নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই, সামনে সুদিন আসবে সে আশাও সুদূর পরাহত। খুনখারাবি, চাঁদাবাজি ব্যাপক বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে এবং সর্বস্তরের মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে। প্রতিকারের ব্যাপারে তারা পুলিশের কাছ থেকে কোনো সহায়তা পাচ্ছে না। অপরাধীদের সঙ্গে পুলিশের সখ্যের কথাও অজানা নয়। একটি সুন্দর ও সুদক্ষ পুলিশ বাহিনীর সর্বনাশ করা হচ্ছে শুধু ক্ষমতা ধরে রাখার অশুভ প্রক্রিয়াকে শক্তি জোগানোর জন্য।
সরকারের সবাই আমাদের অগ্রগতির কথা শুনিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু জনগণ দেখতে পাচ্ছে কেবল তাদেরই উন্নতি হচ্ছে, যাদের দুর্নীতি করার সুযোগ রয়েছে, যাদের আইনের তোয়াক্কা করতে হচ্ছে না। গোষ্ঠীবিশেষের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণেই সরকার কোনো পর্যায়ে সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা ভাবতে পারছে না। জনমত যাচাইয়ের অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাহস দেখাতে না পারলে সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনকে সামনে রেখে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিবেশ সৃষ্টির যে আশা আমরা দেখতে চাচ্ছি তা পূরণ হবে না। সরকার সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করতে পারলে অসহিষ্ণু ও আতংক সৃষ্টিকারী ভয়াবহ রাজনীতির অবসান আশা করা যায়।
কঠিন সংকটের মধ্যেই যে আলোচ্য তিনটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হতে যাচ্ছে, তা বুঝতে তো কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এই গত সোমবারও রাজধানীতে বাসায় ঢুকে পরিবারের লোকজনের সামনে এক গৃহবধূকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। দেশে সরকার থাকলে একেবারে নির্ভয়ে খুন, গুম ও রাহাজানি চলতে পারে না। বাস্তবতা হল, ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতায় আছেন- সরকার পরিচালনায় নেই।
বড় মাপের নেতারা যখন সবাই জেলে অথবা গ্রেফতার এড়াতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, তখন বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণকে অবশ্যই একটি সাহসী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখতে হবে। তারা সাহস দেখাচ্ছেন নির্বাচনী রাজনীতিতে সরকার গণতান্ত্রিক নিয়ম-নীতি মানতে কতটা সহনশীল হতে প্রস্তুত আছেন তা দেখার জন্য। তাই সরকারকে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। এ মুহূর্তে যার বিরুদ্ধে মামলা আছে তাকে গ্রেফতার করা হবে এমন হুমকি পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও আসা শুভ লক্ষণ নয়।
নির্বাচন কমিশন নিজস্ব স্বাধীনতা রক্ষা করে সব প্রার্থীর প্রতি সুবিচার করার আশ্বাস দিয়েছে। অপরদিকে জনৈক নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, কাউকে গ্রেফতার করতে পুলিশকে নির্বাচন কমিশনের অনুমতি নিতে হবে না। ভুলে যাওয়া হচ্ছে যে, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজনে পুলিশসহ সমগ্র প্রশাসনের ওপর নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা থাকতে হয়। চারদিকে যে দায়িত্বহীনতা, অরাজকতা বিরাজ করছে সেটাই বিভিন্নভাবে প্রকাশ পাচ্ছে।
এটাও সুলক্ষণ নয়, যখন শুনি মন্ত্রীরা গোপন বৈঠকে বসে পরিকল্পনা করছেন কীভাবে সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে সরকার সমর্থনপুষ্ট প্রার্থীরা জয়ী হতে পারেন। একজন মন্ত্রী তো প্রকাশ্যেই নির্দেশ দিয়েছেন, যে কোনো মূল্যে সিটি কর্পোরেশনের তিনটিতেই সরকারকে বিজয়ী হতে হবে। যে কোনো মূল্যে নির্বাচনে জেতার জন্য ভোটের প্রয়োজন হয় না, যেমনটি হয়নি ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে।
সব হতাশার মধ্যেও আমাদের ঐকান্তিক প্রত্যাশা থাকবে, রাজনৈতিক নেতারা ভুল-ভ্রান্তি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবেন। শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য গণতান্ত্রিক সহনশীলতার গুরুত্ব অনুধাবন করবেন। শাসন ব্যবস্থায় শাসনতন্ত্র ও আইনের শাসনের প্রাধান্য নিশ্চিত করতে না পারলে দেশে রাজনৈতিক উত্তাপ-উত্তেজনা থেকেই যাবে।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ
উপসম্পাদকীয় পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close