¦
দাদাগিরি!

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন | প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০১৫

সাধারণত কেউ কাউকে বিগ ব্রাদার বললে বুঝতে হবে, কথাটা নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কলকাতাসহ সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে এটাকে দাদাগিরি বলা হয়। একজন সবল একজন দুর্বলের প্রতি অন্যায়-অত্যাচার বা গায়ের জোর খাটালে সেটাই হল দাদাগিরি!
সেই অর্থে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত বারবার আমাদের সঙ্গে দাদাগিরি করে চলেছে। চুক্তি অনুযায়ী আমরা সেই কবে সীমান্তের ভূমি প্রত্যর্পণ করলেও ভারত তাদের অংশ আজও ফেরত দেয়নি। সংবিধান সংশোধনের কথা বলে বারবার তা বিলম্বিত করা হচ্ছে। আর এভাবেই বছরের পর বছর সীমান্ত চুক্তি, তিস্তা চুক্তি ইত্যাদি সবকিছু ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
একজন ব্যবসায়ী জানালেন, ভারতের সঙ্গে ব্যবসা করাটাও মুশকিল। আমদানি-রফতানিতে আমাদের তুলনায় তারা বহুগুণ বেশি সুবিধায় থাকা সত্ত্বেও আমরা ব্যবসা করতে গেলে অন্যকিছু না পেলে নন ট্যারিফ শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী তিনি একবার কিছু পণ্য পাঠালে তখন তাকে পণ্যের মান যাচাই সংক্রান্ত সনদ দিতে বলা হয়। অথচ সে মুহূর্তে বিষয়টি নিতান্তই অবান্তর। এভাবে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ভারতের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছেন।
বর্তমানে আমাদের দেশের কতিপয় সন্ত্রাসী ভারতে আশ্রয় নিয়ে তাদের কেউ কেউ সেখানে ধরা পড়ে আদালতে বিচারাধীন থাকায় এ দেশের ভালো মানুষরা সেখানে গেলেও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। মুম্বাই ক্যান্সার হাসপাতালে এক ব্যক্তি তার স্ত্রীকে নিয়ে গেলে গভীর রাতে হোটেলে পুলিশ হানা দিয়ে তাদের হয়রান করেছেন বলে জানালেন। তিনি জানালেন, পৃথিবীর প্রায় ৫০টি দেশ তিনি ভ্রমণ করেছেন; কিন্তু রাত ২টার সময় হোটেল কক্ষে পুলিশের হানা দেয়ার ঘটনা তার জানা নেই!
উদাহরণ দিলে আরও দেয়া যাবে। কিন্তু এ স্বল্প পরিসরে তার সুযোগ কম। যেমন সীমান্ত হত্যার কথা এক্ষেত্রে বলাই যায়। এসব কারণে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বেশিরভাগই ভারতবিদ্বেষী। এসব অন্যায়-অবিচারের ঘটনাগুলো একশ্রেণীর রাজনৈতিক দল ও মিডিয়া ব্যাপকভাবে প্রচার করে এ দেশের মানুষকে বেশ ভালোভাবেই ভারতবিমুখ করে তুলেছে। আমাদের মনে হয়, এসবের সত্যতা ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা তথা সরকারেরও জানা আছে। এসব জানলেও হয়তো তারা তাতে কান দেবেন না। কারণ ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ একটি ছোট রাষ্ট্র এবং সবদিক বিবেচনায় দুর্বলও বটে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বের প্রেক্ষাপটে ভারতকে এ ধ্যান-ধারণা নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। বর্তমান বিশ্বায়নের ক্ষেত্রে ভারতকে চোখ মেলে দেখতে হবে। ছোট ছোট পড়শীকে অবহেলার চোখে দেখলে একদিন বড় পড়শীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এ অবস্থায় আমাদের মতো ছোট ছোট দেশকেও ভারতের গুরুত্ব ও সম্মান দিতে হবে। সরকারি পর্যায়ে তা করলে দুই দেশের জনসাধারণও সেটা উপলব্ধি করে পরস্পরকে গুরুত্ব ও সম্মান দেবেন। জনসাধারণের কথাও এক্ষেত্রে এ কারণে এসে যায় যে, একবার আমি এক বন্ধুসহ ভারতের তামিলনাড়ু, পন্ডিচেরি, গোয়া, মুম্বাই ভ্রমণ শেষে কর্নাটক ভ্রমণে ছিলাম। এমন সময় ট্রেনের মধ্যে কয়েকজন ব্যক্তি আমাদের পরিচয় জানতে পেরে নানা কথা শুরু করে দিলেন। একপর্যায়ে তিনি বললেন, তোমরা এতটা অকৃতজ্ঞ যে তোমাদের জাতির পিতা শেখ মুজিবকে পর্যন্ত হত্যা করেছ। তাদের এসব কথা বলার উদ্দেশ্যই ছিল বাংলাদেশীদের হেয় করা। তাদের কথার মধ্যে তাচ্ছিল্য ছিল। আমার সঙ্গের বন্ধুটি দীর্ঘদিন আমেরিকায় থেকে সেখানকার সিটিজেন। সে এসব বিষয়ে কোনো কিছু না বললেও আমি চুপ থাকতে পারলাম না। বলে বসলাম, ‘তোমরাও তো তোমাদের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করেছ।’ আমার জবাব শুনে পরে তারা আর কোনো কথা বলেননি।
এবার সাম্প্রতিক একটি ঘটনা উল্লেখ করেই লেখাটি শেষ করব। তা হল, আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ। এবারের বিশ্বকাপের সময় ভারতীয় আইপিএল কেলেংকারির হোতা বর্তমান আইসিসি চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন বাবু বাংলাদেশের সঙ্গে যা করলেন, তা অত্যন্ত নিকৃষ্ট ও জঘন্য। বাংলাদেশ-ভারত খেলার দিন পাকিস্তানি এবং ইংলিশ আম্পায়ারের কীর্তি সেদিন সবাই যেমন দেখেছিলেন, ঠিক তেমনি বর্তমান আইসিসি প্রেসিডেন্ট আহম মুস্তফা কামালও দেখেছিলেন। খেলা শেষে শেন ওয়ার্ন, ভিভিএস লক্ষ্মণসহ অনেক দেশের অনেক ক্রিকেপ্রেমীই এ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। মুস্তফা কামালও একজন দর্শক ও ক্রিকেটপ্রেমী হিসেবে আম্পায়ারিং নিয়ে একটি মন্তব্য করায় ভারতীয় মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। আর তা নিয়ে শ্রীনিবাসন ফাইনাল খেলার আগের রাতে মিটিং ডেকে জানিয়ে দেন, আইসিসি প্রেসিডেন্টকে এবার ট্রফি হস্তান্তর করতে দেয়া হবে না। তিনি নিজেই ট্রফি হস্তান্তর করবেন। এতদিনের নিয়ম-কানুন সবকিছু ভঙ্গ করে গায়ের জোরে চেয়ারম্যান হিসেবে তিনিই ট্রফিটি হস্তান্তর করলেন। অথচ প্রচলিত নিয়মে চেয়ারম্যান নন, প্রেসিডেন্টের ট্রফি হস্তান্তর করার কথা এবং এটা তার আইসিসি কর্তৃক প্রদত্ত সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু বহু কাণ্ডের জন্মদাতা শ্রীনিবাসন গায়ের জোরে তার সে অধিকার কেড়ে নিলেন। কারণ তিনি বিগ ব্রাদার! তাই জোর খাটানোটাও তার অধিকারই বটে! কিন্তু প্রশ্ন হল, এভাবে দাদাগিরি করাটা কি তার ঠিক হল?
মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : রাজনীতিক, কলামিস্ট
 

উপসম্পাদকীয় পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close