¦
গণতন্ত্রের অপর নাম সহনশীলতা

আবদুল লতিফ মন্ডল | প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৫

আসন্ন ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন যখন সাময়িকভাবে হলেও সহিংস রাজনীতি ও আন্দোলনের প্রায় অবসান ঘটিয়ে দেশে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে, ঠিক তখনই সরকারের বিভিন্ন মহলের উসকানিমূলক ও অগণতান্ত্রিক বক্তব্য সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আগামী সাধারণ নির্বাচনের পথ সুগম হওয়া নিয়ে জনমনে সন্দেহ ও সংশয় দানা বাঁধতে শুরু করেছে। সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে ব্যর্থ হলে এবং ক্ষমতাসীন দল যেভাবে তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের অনুকূলে জোর প্রচারণা চালাচ্ছে, বিরোধী দলগুলোকে তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের অনুকূলে অনুরূপ প্রচারণা চালানোর সুযোগ না দিলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং নির্বাচনের ফলাফল জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
প্রধানমন্ত্রী ও তার একাধিক মন্ত্রীর সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই এ ভূমিকা দেয়া হল। ১১ এপ্রিল গাজীপুরের শ্রীপুরে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের ওপর নির্মিত মাওনা ফ্লাইওভার উদ্বোধনের পর সুধীসমাজে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, খালেদা জিয়ার এদেশে রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের সমর্থনে যেসব যুক্তি দেখিয়েছেন সেগুলো হল- খালেদা জিয়া ৯২ দিনে হরতাল-অবরোধের নামে ১৫০ জন নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছেন। তার নির্দেশে বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীরা রাস্তায় নির্বিচারে শত শত যানবাহন ভাংচুর করেছে ও পেট্রলবোমা মেরে জ্বালিয়ে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মতে, যে নেত্রী এমন মানবতাবিরোধী অপরাধ করতে পারে, তার এদেশে রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। এর আগে ৭ এপ্রিল গণভবনে আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর কার্যনির্বাহী সংসদ, নগরের থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং কাউন্সিলর প্রার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আদালতে হাজির হওয়া ও ঘরে ফেরাকে উদ্দেশ করে কিছুটা ব্যঙ্গ্যাত্মক সুরে বলেন, খালেদা জিয়া দলীয় কার্যালয়ে অবস্থান নিয়ে বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন না হলে তিনি ঘরে ফিরবেন না। কিন্তু তিনি ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে আদালতে হাজির হয়েছেন, ঘরেও ফিরেছেন।
বাবু যত বলে পারিষদ-দল বলে তার শতগুণ-এর মতো প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সুর ধরে একাধিক মন্ত্রী কয়েক ধাপ এগিয়ে বক্তব্য দিতে শুরু করেছেন। ৮ এপ্রিল রাজধানীর এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেছেন, খালেদা জিয়া সিটি নির্বাচনে প্রচারণায় নামবেন বলে শুনছি। বাংলার মানুষ এত বোকা নয়। খালেদা জিয়া খুনি। তাকে রাস্তায় নামতে দেয়া হবে না। ৯ এপ্রিল স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম তার নিজ নির্বাচনী এলাকা সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছেন, আন্দোলনের নামে নারী-শিশুসহ নিরীহ অনেক মানুষের রক্ত ঝরিয়ে পেট্রলবোমা মেরে সাধারণ মানুষকে হত্যা করে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এখন শূন্য হাতে ঘরে ফিরে গেছেন। সব হারিয়ে তিনি এখন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এরকম আরও উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। নিবন্ধের কলেবর ঠিক রাখতে তা থেকে বিরত থাকা হল।
কাউকে খুনি হিসেবে সাব্যস্ত করার এখতিয়ার একমাত্র আদালতের। অবরোধ-হরতাল চলাকালে যানবাহনে পেট্রলবোমা নিক্ষেপসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দুটি অঙ্গসংগঠনের পক্ষ থেকে ৬টি মামলা করা হয়েছে। খালেদা জিয়া ছাড়াও এসব মামলায় বিএনপি ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের বহু সংখ্যক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এসব মামলার কোনো অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা যায়নি। খালেদা জিয়া আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই যদি তাকে খুনি আখ্যায়িত করা হয়, তবে তা আদালতকে প্রভাবিত করার শামিল।
এদিকে খালেদা জিয়া নিজে এবং তার দলের নেতারা বলেছেন, বিএনপি নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়। সরকার নিজেই নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে বিএনপির ওপর দোষ চাপাচ্ছে। বিএনপি শুধু নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথাই অস্বীকার করেনি, দুষ্কৃতকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে। তাছাড়া দলটি পেট্রলবোমাসহ সব নাশকতার আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করেছে। সুশীলসমাজের কেউ কেউ আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছেন। তদন্ত কমিটি গঠিত হলে এবং কমিটির রিপোর্টে খালেদা জিয়া নাশকতামূলক কার্যাবলীর জন্য হুকুমদাতা ও দলটির নেতাকর্মীরা নির্দেশ বাস্তবায়নকারী হিসেবে চিহ্নিত হলে তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা সহজ হবে। এতে বিএনপি জনগণের কাছে একটি সন্ত্রাসী দল হিসেবে চিহ্নিত হবে। তারা বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। বিএনপিকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার এ মোক্ষম সুযোগটি শাসক দল আওয়ামী লীগ কেন কাজে লাগাচ্ছে না তা বোধগম্য নয়। তবে কি সরকারের ভয় আছে যে, নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠিত হলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসতে পারে?
সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে রয়েছেন। প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা নির্বাচনী প্রচারে মাঠে নামতে পারছেন না। রাজনৈতিক মামলায় জর্জরিত প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকরা ভুগছেন গ্রেফতার আতংকে। প্রতিনিয়ত তাদের পুলিশের তাড়া খেয়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, কিছু কিছু এলাকায় প্রার্থীদের আত্মীয়স্বজনদেরও পিছু নিয়েছে আইনশৃংখলা বাহিনীর অসাধু সদস্যরা। চলছে রমরমা আটক বাণিজ্য। কেউ যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন এবং প্রার্থীরা যাতে সুন্দরভাবে প্রচারণা চালাতে পারেন, সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে আইনশৃংখলা বাহিনীকে নির্দেশ প্রদান করেই নির্বাচন কমিশনের বসে থাকলে চলবে না, নির্দেশ যেন পালিত হয় কমিশনকে তা নিশ্চিত করতে হবে। সব প্রার্থীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির দায়িত্ব পালনে কমিশনের ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এদিকে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সব প্রার্থীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি সম্পর্কিত বিএনপির দাবির প্রতি কটাক্ষ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের সুরের পেছনে কোন বেসুর বাজছে, সেটা বোধগম্য নয়। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলতে তারা কী চাচ্ছে? লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অর্থ শেখ হাসিনার মতো একজন ঝানু রাজনীতিক বোঝেন না তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। অনেকে মনে করেন, আসলে শাসক দল আওয়ামী লীগ চায় না বিএনপি আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করুক। বিএনপি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করায় মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের বক্তব্যে তাই হতাশার সুর ফুটে উঠেছে। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে বিএনপি দশম সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে বিরত থাকে। ওই নির্বাচনের পর সরকারের খেলা বুঝতে পেরে বিএনপি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলে শাসক দল আওয়ামী লীগে
হতাশা সৃষ্টি হয়।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও এর বিকাশে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিকল্প নেই- সে নির্বাচন জাতীয় বা স্থানীয় যে পর্যায়েই অনুষ্ঠিত হোক। সারা বিশ্বে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে ক্ষমতাসীন সরকার এরূপ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের মতপার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দল ছায়া সরকারের ভূমিকা পালন করে। বিরোধী দল জনগণকে এ ধারণা দিতে চায় যে তারা সরকার গঠন করলে তা ক্ষমতাসীন সরকারের চেয়ে ভালো হবে। তাই ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলের বক্তব্য, দাবি ইত্যাদিকে ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে মোকাবেলা করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বাচনের নামে ধোঁকা দিয়ে বিভিন্ন দেশে যেসব ক্ষমতাসীন দল পুনরায় ক্ষমতায় আসীন হয়েছে এবং স্বৈরাচার হয়ে উঠেছে, তারা সাময়িকভাবে সফল হলেও শেষ পর্যন্ত জনগণের
রোষানলে পড়ে ক্ষমতা হারানোর ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এমন একটি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতায় আসীন হয়েছে, যে নির্বাচনে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দলসহ সিংহভাগ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেনি। এতে ছিল না জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ। ফলে সরকারবিরোধী জোট, সিংহভাগ মানুষ এবং আন্তর্জাতিক মহল থেকে দাবি উঠেছে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে নতুন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের। সরকারবিরোধী জোট, সংসদে বিরোধী দলসহ জনগণের দাবি, আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হোক। সরকার সব প্রার্থীর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করুক। সরকারকে উপর্যুক্ত সব দাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে, কারণ গণতন্ত্রের অপর নাম সহনশীলতা।
আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক
[email protected]
উপসম্পাদকীয় পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close