¦
নগর সরকারের কথা বলছেন না কেন?

শফিকুল ইসলাম খোকন | প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৫

অভিভাবক ছাড়া যেমন কোনো ব্যক্তি বা পরিবার চলে না, তেমনি সেই অভিভাবকহীন পরিবার আজ অভিভাবক পাওয়ার অপেক্ষা করছে। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে নগরবাসী অতিষ্ঠ। অনেকে বলেন, অপেক্ষায় থাকা বড় কষ্টের। দীর্ঘ এক যুগ পর হলেও সেই অপেক্ষা ও কষ্ট থেকে মুক্ত হতে যাচ্ছে নগরবাসী। সব ঠিকঠাক থাকলে আগামী ২৮ এপ্রিল ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা নগরবাসীদের দেখাচ্ছেন বাসযোগ্য ও নিরাপদ নগরীর স্বপ্ন। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। যদিও বিদ্যমান ব্যবস্থায় এসব প্রতিশ্রুতি পালনের সক্ষমতা কারও নেই।
নগরবাসীকে সেবা দেয়ার জন্যই সিটি কর্পোরেশনের জন্ম হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সিটি কর্পোরেশন একক কর্তৃপক্ষীয় কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। এছাড়া নগরগুলো (সিটি ও পৌর) একরূপ আইনে পরিচালিত হচ্ছে না। যেমন, ঢাকা নগর উন্নয়নের জন্য পৃথক পৃথক ৬টি বিভাগ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ওয়াসা পানি সরবরাহের জন্য এবং রাজউক বিল্ডিং অনুমোদনের জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু পৌর এলাকায় পানি সরবরাহ ও বিল্ডিং অনুমোদনের দায়িত্ব পৌরসভার হাতে ন্যস্ত রয়েছে। সেজন্য একরূপ আইন ও নিয়মে সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলো পরিচালিত হওয়া উচিত। সেই সঙ্গে নগরীয় কাজগুলো এককভাবে করার জন্য নগর কর্তৃপক্ষের হাতে প্রয়োজনীয় জনবল, অর্থবল ও ক্ষমতা প্রদান জরুরি।
বর্তমানে দেশের প্রায় ৫ কোটি মানুষ শহরে বসবাস করছে। ২০২০ সাল নাগাদ প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী এবং ২০৫০ সাল নাগাদ প্রায় গোটা জনগোষ্ঠী শহরবাসী হবে। সেজন্য এখনই দেশের ৩১৯টি নগরকে পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিত নগরে পরিণত করতে হবে এবং এ উদ্দেশ্যে একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এর ফলে গ্রামীণ কৃষি, গ্রামীণ জীবন, গ্রামীণ সমাজ, গ্রামীণ সভ্যতা, গ্রামীণ সংস্কৃতি ও গ্রামীণ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তে যথাক্রমে নগরীয় কৃষি, নগরীয় জীবন, নগরীয় সমাজ, নগরীয় সভ্যতা, নগরীয় সংস্কৃতি ও নগরীয় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠতে থাকবে। বর্তমানে বিপুল জনসংখ্যার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে গ্রামীণ কৃষি ব্যবস্থার পাশাপাশি নগর সরকারের মাধ্যমে প্রতি নগরে নগরীয় কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতের কৃষি হিসেবে নগরীয় কৃষির ওপর গুরুত্বারোপ অব্যাহত রাখতে হবে এবং নগর মানে কৃষি নয়- এমন ক্ষতিকর ভাবনার বিপরীতে কৃষিকে নিয়েই নগর- এই প্রয়োজনীয় ভাবনা সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
দ্রত নগরায়ণের ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ গ্রামভিত্তিক প্রশাসনিক ইউনিটের- ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা- বিলুপ্তি ঘটবে। ফলে সে সময় নগরগুলো বিভাগ/জেলার অধীনে পরিচালিত হবে। তখন গোটা সরকার ব্যবস্থা তিন স্তরবিশিষ্ট হয়ে যাবে। অর্থাৎ তখন কেন্দ্রীয় সরকার, বিভাগীয়/জেলা সরকার ও নগর সরকার থাকবে। অনেকে সরকারের আকার-আয়তন, স্তর বিন্যাসকরণ, প্রকারভেদকরণ, নগরায়ণ, বিদ্যুতায়ন, পেশাগত পরিবর্তন, শিক্ষার প্রসার, বহুতল ভবন, জনঘনত্ব, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার, সিস্টেম কস্ট, সেবা ও উন্নয়ন কস্টের বিষয়গুলো বিবেচনায় না এনে নতুন নতুন ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও প্রদেশ সৃষ্টির প্রস্তাব করছেন, যা খুবই অপ্রয়োজনীয় বলে প্রতীয়মান হয়। গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখায় উপস্থাপিত সমন্বিত স্তর বিন্যাসটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, গতিশীল ও সুদূরপ্রসারী বলে আমরা মনে করি।
নগর সরকারে তিনটি বিভাগ থাকবে- নগর প্রশাসন, নগর সংসদ/কাউন্সিল ও নগর আদালত। কাউন্সিলররা নগর সংসদের সদস্য হবেন (বর্তমানে কাউন্সিল না করেই কাউন্সিলর পদ সৃষ্টি করা হয়েছে)। নগর সংসদে নগরকেন্দ্রিক যাবতীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে এবং নগর সংসদে পাসকৃত সিদ্ধান্তগুলো নগর প্রশাসন বাস্তবায়ন করবে। মেয়র নগর প্রশাসনের প্রধান হবেন। নগর প্রশাসনের অধীনে দক্ষ জনবল থাকবে (যেমন- প্রকৌশলী, চিকিৎসক, পরিকল্পনাবিদ, নগর পরিবেশবিদ, নগর কৃষিবিদ ইত্যাদি কর্মকর্তা)। নগর প্রশাসনের অধীনে নগর পুলিশ বাহিনীও থাকবে। নগর আদালতের বিচারকরা পৃথকভাবে নিযুক্ত বা মনোনীত হবেন। তারা নগরীয় এলাকায় সংঘটিত অপরাধসমূহের বিচার করবেন। নগর সরকারের বাইরে একজন নগর ন্যায়পাল ও একটি নগর নির্বাচনিক বোর্ড থাকবে। নগর ন্যায়পাল নগর সরকারের তিন বিভাগের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ ও দুর্নীতির বিচার করবেন। নগরের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচনিক বোর্ড গঠিত হবে। নগর সরকারের মেয়াদ শেষে নগর নির্বাচনিক বোর্ড একক দায়িত্বে নির্বাচন সম্পন্ন করবে।
নগর সরকার ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হওয়ার পর নগরীয় এলাকায় ভবন ধস হলে দূরবর্তী কর্তৃপক্ষকে দোষারোপ করার সুযোগ থাকবে না। তবে ইউনিয়নকে দোতলা ভবন, নগরগুলোকে ছয়তলা ভবন এবং তদূর্ধ্ব ভবনগুলোর অনুমোদন দেয়ার ক্ষমতা জেলা সরকারের ওপর অর্পণ করা যেতে পারে। এ রূপরেখার আলোকে সমগ্র সরকার ব্যবস্থাকে সাজানো সম্ভব হলে গণতান্ত্রিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্থানীয়করণ, পরিবেশবান্ধব পরিকল্পিত নগর ও নগরায়ণ, সমহারে নারীদের গণতান্ত্রিক ক্ষমতায়নসহ গণতন্ত্রের পক্ষের যাবতীয় কাজ ও চিন্তা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হতে থাকবে, এটি নিশ্চিত করেই বলা যায়।
কৃষি জমি হ্রাস, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নদী ভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তন, কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধার আশায় মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে যাচ্ছে। সারা দেশে প্রতি বছর ১.৩৭ ভাগ হারে জনসংখ্যা বাড়লেও নগরগুলোতে জনসংখ্যা বাড়ছে শতকরা ৪ ভাগ হারে। ২০১১ সালে বিশ্বে নগরবাসীর সংখ্যা গ্রামবাসীর সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে পৃথিবীর জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৫১.৩ ভাগ নগরে বসবাস করে। ২০৫০ সালে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৫ ভাগ নগরে বসবাস করবে। আগেই বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ৫ কোটি মানুষ নগরে বসবাস করে। ২০২০ সালে ৫০ ভাগ অর্থাৎ ৮.৫ কোটি মানুষ নগরে বসবাস করবে এবং ২০৫০ সালে দেশের শতভাগ মানুষ অর্থাৎ ২৭ কোটি লোক নগরে বসবাস করবে। তখন নগরই হবে মানুষের স্থায়ী ঠিকানা। আমরা চাইলেও এই অনিবার্য বাস্তবতাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারব না।
পরিবেশের প্রতি চরম উদাসীনতা এবং অপরিকল্পিত নগর ও নগরায়ণের কারণে ঢাকা শহর আজকের মরণদশায় উপনীত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে এবং তাতে তাৎক্ষণিকভাবে ১ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশংকা রয়েছে। লক্ষণীয়, ঢাকা শহরকেন্দ্রিক একটিমাত্র সরকার ব্যবস্থা থাকার কারণে সমগ্র দেশের মানুষ ঢাকামুখী। তবে বর্তমানে ঢাকা শহরের যে অবস্থা, তা আগামীতে অন্যান্য শহরেও প্রকটভাবে দেখা দেবে, যার আলামত ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সেজন্য দেশের ৩১৯টি শহরে ৩১৯টি নগর সরকার গঠন করে তাদের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব ও পরিকল্পিত ৩১৯টি নগর গড়তে হবে এবং তা সবসময় বজায় রাখতে হবে। এতে একদিকে ঢাকা শহরকেন্দ্রিকতা রাতারাতি হ্রাস পাবে এবং অন্যদিকে ঢাকা শহরসহ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত দেশের ৩১৯টি শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন ভাবনা ও কর্মকাণ্ড পরিচালিত ও বিকশিত হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, আসুন আমরা আমাদের এ দেশটাকে নিজেদের মতো করে গড়ে তুলি। পাশাপাশি একটি পরিকল্পিত এবং দীর্ঘস্থায়ী নগর তথা নগর সরকার বাস্তবায়ন করি।
শফিকুল ইসলাম খোকন : স্থানীয় সরকার বিষয়ে গবেষক
[email protected]
উপসম্পাদকীয় পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close