¦
চেতনাঋদ্ধ এক সৃজনশীল মানুষ

এম নজরুল ইসলাম | প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৫

বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে অন্যতম দিকপাল তিনি। রং-তুলিতেই ফুটিয়ে তুলেছেন নিজের পরিচয়। রেখেছেন সৃজনশীলতার অনন্য স্বাক্ষর। শিল্পকলার নিমগ্ন শিল্পী হাশেম খান আজ পা দিলেন ৭৪-এ। ১৯৪২ সালের এই দিনে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের সেকদী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন কুমিল্লা জেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইউসুফ খান ও মা (গৃহিণী) নূরেন্নেসা খানমের ১৪ সন্তানের মধ্যে তিনি ৬ষ্ঠ।
বাংলাদেশের চিত্রকলায় শিল্পী হাশেম খানের নিজস্বতা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতিমান এই শিল্পী দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে শিল্পচর্চায় নিয়োজিত। ১৯৬৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত চারুকলা ইন্সটিটিউটে অধ্যাপনা করেছেন। দেশের চারুকলা বিকাশের আন্দোলনে, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এবং প্রগতিশীল সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ সৃষ্টিতে তিনি নিবেদিতপ্রাণ। তরুণ বয়সে তিনি কচি-কাঁচার মেলার মাধ্যমে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের উপদেশ ও সহযোগিতায় শিশু চিত্রকলাকে সংস্কৃতি চর্চার বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। আজ শিশু চিত্রকলা বাংলাদেশে শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। তিনি এ ধারার পথিকৃৎ।
হাশেম খান ছাত্রজীবন থেকে বঙ্গবন্ধুর অনুসারী ছিলেন। তিনি ষাটের দশকে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের প্রায় সব পোস্টার, ফেস্টুন, ছবি, প্রচার পুস্তিকার প্রচ্ছদ এঁকেছেন। ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তি সনদ ঐতিহাসিক ছয় দফার লোগো, পতাকা নকশা, পোস্টার ও অন্যান্য শিল্পকর্ম করেছেন শিল্পী হাশেম খান। ছয় দফা সর্বপ্রথম জনগণের সম্মুখে ঘোষণার জন্য তৎকালীন হোটেল ইডেনের সামনে যে মঞ্চ তৈরি হয়েছিল, তার ‘ব্যাকসিনে’ ছয় দফার প্রতীকী নকশা দিয়ে সাজিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে যে ঐতিহাসিক পোস্টার ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন?’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল, তা এঁকেছিলেন শিল্পী হাশেম খান।
বাংলাদেশের সংবিধান গ্রন্থটির শিল্পমান সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য ১৯৭৩ সালের মে মাসে বঙ্গবন্ধু শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে গণভবনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। শিল্পাচার্য তার প্রিয়ভাজন শিল্পী হাশেম খানকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন। রুমে ঢুকতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আবেদিন ভাই আসুন।’ তারপর দু’জনে করমর্দন করলেন। শিল্পাচার্য তার প্রিয় ছাত্র হাশেম খানকে পরিচয় করিয়ে দিতে শুরু করলেন। বঙ্গবন্ধু মাঝখানে শিল্পাচার্যকে হাতের ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আবেদিন ভাই, আপনি বসুন, আমিই ওর পরিচয় দিচ্ছি। ও আমার ছয় দফার মনোগ্রাম, নকশা, পোস্টার করেছিল। ছয় দফা ঘোষণার জন্য যে মঞ্চ তৈরি হয়েছিল তার ব্যাকসিনটা ও এত সুন্দরভাবে করেছিল, আমার এখনও সব মনে আছে। ছয় রং, ছয়টি গঠন ও আকৃতি ইত্যাদি দিয়ে সেদিন ছয় দফার যে ব্যাখ্যা দিয়েছিল, আমি আগে ভাবতেই পারিনি আমার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও বাঙালিদের ন্যায্য অধিকারসহ নকশা, ছবি দিয়ে ছয় দফার এত চমৎকার ব্যাখ্যা হয়। আবেদিন ভাই, সংবিধান গ্রন্থে ছবি আঁকার জন্য আপনি ঠিক লোককেই পছন্দ করেছেন।’
বঙ্গবন্ধুর জীবনভিত্তিক প্রায় ৩০০ ছবির একটি অ্যালবামের তিনি নির্বাহী সম্পাদক। ওই অ্যালবামের সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা, যা ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হয়। ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশু গ্রন্থমালা’ সিরিজের সম্পাদকীয় বোর্ডের তিনি সভাপতি। ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. মুনতাসীর মামুনের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চিত্রের তিনটি অ্যালবামের ও বাংলাদেশ ব্যাংকের শিল্পকলা সংগ্রহ অ্যালবামের তিনি যুগ্ম সম্পাদক। ঢাকা নগর জাদুঘরের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্মিতব্য স্বাধীনতা স্তম্ভের জুরি বোর্ড ও বাস্তবায়ন বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যানও ছিলেন। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির জাতীয় কমিটির অন্যতম উপদেষ্টা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘরের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিল্পী হাশেম খান এখন প্রতিষ্ঠানটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবইয়ের অলংকরণ ছাড়াও তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের চারুকলা ও ললিতকলাবিষয়ক পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করেছেন। ১৯৬১ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশে ও আন্তর্জাতিক অসংখ্য প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন বরেণ্য চিত্রশিল্পী হাশেম খান। শিল্পকর্মে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৯২ সালে একুশে পদক লাভ করেন। ২০১১ সালে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়া তিনি দেশী ও আন্তর্জাতিক বহু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। তিনি একজন সুলেখকও। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত গ্রন্থ ১৭টি।
আজ তার ৭৪তম জন্মদিনে আমাদের সশ্রদ্ধ অভিবাদন। শুভ জন্মদিন হাশেম ভাই।
এম নজরুল ইসলাম : অস্ট্রিয়া প্রবাসী মানবাধিকার কর্মী, লেখক ও সাংবাদিক
[email protected]
 

উপসম্পাদকীয় পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close