¦
হাই বয়, জানো না কী মিস করছো

মাহবুব কামাল | প্রকাশ : ০৮ মে ২০১৫

নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যারা মেশামেশি করেন না, তাদের পক্ষে এদের ভাষা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। যেমন, এদের কাছে জটিল শব্দের অর্থই পাল্টে গেছে। শব্দটির অর্থ- উত্তর দেয়া শক্ত এমন অর্থাৎ দুর্বোধ্য; গোলমেলেও বলা যেতে পারে। কিন্তু এখনকার তরুণ-তরুণীরা শব্দটিকে চমৎকার বা উৎকৃষ্ট অর্থে ব্যবহার করে থাকে। নতুন প্রজন্ম যখন বাংলা শব্দের ভিন্ন অর্থ করছে, কখনও আবার গঠন করছে নিজেদের মতো করে বাক্যরীতি, তখন নিজেকে প্রশ্ন করি- রবীন্দ্রনাথ কি এদের জীবনে এখন প্রাসঙ্গিক? অবশ্য রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের কোনো কোনো বামপন্থী মহল অনেক আগেই প্রশ্ন তুলেছে। তাদের মতে, রবীন্দ্রনাথের মানবতাবোধ বাজারে চালানো যায় না; প্রাইভেট প্রপার্টির মেন্টাল কমপ্লেক্স (ব্যক্তি সম্পদজনিত মানসিক জটিলতা বা উদ্বেগ) থাকলে একজন মানুষ কখনোই প্রকৃত মানবতাবাদী হতে পারে না। তারা বলেন, প্রকৃত মানবতাবাদী হতে হলে শুধু দান-খয়রাত করলে চলবে না, তাকে ব্যক্তি-সম্পত্তির মোহ ত্যাগ করতে হবে অর্থাৎ তাকে হতে হবে মার্কসবাদী; রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ ভড়ং ছাড়া অন্য কিছু নয়।
রবীন্দ্রনাথ কেন তার সব সম্পদ গরিব-দুখীদের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে গান্ধীর মতো নেংটি-চটি পরেননি, বেঁচে থাকলে তাকে জিজ্ঞেস করা যেতো; তবে যখন পড়ি- এ জগতে হায় সেই বেশি চায়, আছে যার ভূরি ভূরি/রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি- তখন ভূমিহীনদের জন্য তার দরদ ও ভূস্বামীদের প্রতি ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি মার্কসবাদী ছিলেন না, ছিলেন কবি ও দার্শনিক। তার কাছ থেকে ফলিত মার্কসবাদ (applied marxism) আশা করা সঙ্গত নয়।
যাকগে, আমাদের প্রসঙ্গ নতুন প্রজন্মের জীবনে রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা। আসলে তরুণ প্রজন্মের ভাষা যতোই ফাং-ফুং কিংবা তাদের জীবন হাই-ফাই হোক না কেন, চেতন বা অবচেতন- তারা কি রবীন্দ্রনাথমুক্ত থাকতে পারছে? আমি আমার উপজেলার একটি কলেজের অধ্যক্ষের বিদায় অনুষ্ঠানে ছিলাম। ইন্টারমেডিয়েটের এক ছাত্রী তো রবীন্দ্রনাথকে ধার না করে পারলো না। কাঁদো কাঁদো স্বরেই আবৃত্তি করলো- যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়। আরেক ছাত্র একই কবিতার অন্য দুটি ছত্র আওড়ালো- পশ্চাতের ঊর্মিরে ডাকিছে সম্মুখের ঢেউ, যেতে নাহি দিব হায় নাহি শোনে কেউ। কই, তারা তো বললো না- গুড বাই স্যার, টেক কেয়ার! একদিন বাসে আমার পেছনের সিটে বসেছিল এক তরুণ ও তার তরুণী প্রেমিকা। মেয়েটির গায়ের রঙ নিয়ে চলে তর্ক। মেয়েটি বলছে, সে কালো; ছেলেটি তা কিছুতেই মানছে না, সে বলছে- তুমি উজ্জ্বল শ্যাম। তর্কের একপর্যায়ে ছেলেটি বললো- ঠিক আছে তুমি কালোই। কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তা সে যতই কালো ইত্যাদি ইত্যাদি।
ধরুন, এক তরুণ মোবাইলে তার বান্ধবীকে বলছে- আই ফিল লোন, বিলিভ মি, আই কান্ট লিভ উইদাউট ইউ। এটা দিয়ে কি একাকীত্বটাকে ঠিকমতো বোঝানো গেল? ছেলেটি যদি রবীন্দ্রনাথকে ব্যবহার করে বলতো- জানো একেলা কাহারে বলে, যবে ভরা মন নিয়ে বসে আছি, দিতে চাই নিতে কেউ নাই- তাহলে কেমন হতো? একাকীত্বকে এভাবে আর কে বর্ণনা করতে পেরেছেন? একাকীত্ব মানে নির্জনে থাকা নয়, একাকীত্ব মানে দেয়ার আছে, নেয়ার কেউ নেই।
তরুণ প্রজন্ম আসলে কী মিস করছে, তারা সেটা জানে না। তারা বড়জোর রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনে। তাও সেটা বাণীর কারণে নয়, সুরের কারণে। সেই সুরটাও আবার তরুণ-তরুণীর উপযোগী করে পাল্টে ফেলা হচ্ছে। কলকাতার বেডরুম ছবিতে মায়াবন বিহারিনী হরিণী গানটি জেনারেশনাইজড করা হয়েছে যেমন।
প্রশ্ন জাগে বটে, রবীন্দ্রনাথ কি আসলেই বয়স্কদের কবি, তরুণদের নয়? তা না হলে শুধু গিন্নিরাই কেন বলেন- যা কিছু হারায়, কেষ্টা বেটাই চোর? তাদের সন্তান-সন্ততিরা বলে না কেন? রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী নাটকটি দেখতে গিয়ে লক্ষ করলাম, দর্শকদের ৯০ শতাংশই বয়স্ক-বয়স্কা। আবার মলিয়েরের কোনো নাটক দেখতে যান, দেখবেন হলভর্তি তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী। তবে কি রবীন্দ্রনাথের রস আস্বাদন করতে হলে বিশেষ ম্যাচিউরিটির দরকার হয়? কিন্তু আমাদের এখনকার তরুণ প্রজন্ম তো যথেষ্ট ম্যাচিউর। হতে পারে, তাদের সময় খুব কম, ইন্টারনেট তাদের সময়ের বেশিরভাগই দখলে নিয়ে রেখেছে। বাকি সময়টুকুর ক্ষেত্রে তারা
হয়তো অপরচুনিটি কস্ট্ করে। রবীন্দ্র-রসের মুচকি হাসি ছেড়ে মলিয়েরের অট্টহাসিতে
যোগ দিয়েই সময়ের অপটিমাম সদ্ব্যবহার
করে তারা।
আমরা নাইন-টেনে থাকতে নিঃশ্বাস বন্ধ করে রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ পড়েছি। এখনকার একই ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদেরও নিঃশ্বাস বন্ধ থাকে, তবে হাতে ধরা থাকে হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস। আমি একটু আগেই বললাম, এখনকার তরুণ প্রজন্ম যথেষ্ট ম্যাচিউর। তাহলে তারা পরীকে আজ কী সুন্দর লাগছে!- এমন বাক্যকেই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাহিত্য মনে করছে কেন? রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্য-বর্ণনার খোঁজ পায়নি বলে? অথবা এমনও হতে পারে, রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ইংরেজ উচ্ছেদ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, ইন্টারনেট, মোবাইল ইত্যাদি দেখে যেতে পারেননি বলে একসময় মানসিক ভাংচুর কেমন হবে, বঙ্গসন্তানরা কী মানসিকতায় বেড়ে উঠবে তা বুঝে উঠতে পারেননি।
মাহবুব কামাল : সাংবাদিক
[email protected]
উপসম্পাদকীয় পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close