¦
মানব পাচার প্রতিরোধে প্রয়োজন আইনের প্রয়োগ ও সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ

সালমা আলী | প্রকাশ : ১৩ মে ২০১৫

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে গমনেচ্ছু ভাগ্যবিড়ম্বিত বাংলাদেশী নাগরিকদের অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন, আর যারা বেঁচে আছেন তাদের অনেককেই কারাভোগ করতে হয়েছে, অনেকে মুক্তিপণ দিয়ে সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবৈধভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে যাত্রা করছেন হাজারও মানুষ। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি-মার্চ ২০১৫ সময়ে বঙ্গোপসাগর দিয়ে ২৫ হাজার মানুষ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়েছেন এবং নিহত হয়েছেন ৩০০ জন। এ পর্যন্ত ২ হাজার ১২৫ বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করা হয়েছে। থাই নিরাপত্তারক্ষীদের অভিযানের কারণে গ্রেফতার এড়াতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রায় ৮ হাজার অভিবাসী বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ড উপকূলের কাছে সাগরে অপেক্ষা করছেন (যুগান্তর, ১২ মে ২০১৫)। ১১ মে ২০১৫ তারিখে ১ হাজার ৪০০ অভিবাসীকে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া উপকূল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে (প্রথম আলো, ১২ মে ২০১৫)। মালয়েশিয়ার অবকাশ দ্বীপ লংকাবির
পুলিশ জানায়, ১ হাজার ১৮ জনের মধ্যে ৫৫৫ জন বাংলাদেশী ও ৪৬৩ জন রোহিঙ্গা। তাদের মধ্যে নারী ১০১ জন ও শিশু ৫২টি।
উপরের তথ্যগুলো অভিবাসীদের নিরাপত্তা ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে ভীষণ উদ্বেগের। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের জঙ্গলে মালয়েশিয়া সীমান্তের কাছে গণকবরের সন্ধান লাভ এবং বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী নাগরিক উদ্ধারের ঘটনায় সারা বিশ্ব স্তম্ভিত। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গণমাধ্যম অনুসন্ধান চালায় এবং ভয়াবহ চিত্র প্রকাশ করে। মানব পাচার প্রতিরোধে
আঞ্চলিক উদ্যোগের পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ জরুরি।
বিপুল জনগোষ্ঠীর এ বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। আবার সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিদেশে অভিবাসনের সাধারণ প্রক্রিয়ায় বিড়ম্বনা ও ব্যয় বেশি। এসব কারণেই ভাগ্য ফেরানোর আশায় কিছু দরিদ্র, বেকার মানুষ অবৈধভাবে বিদেশে গমনের চেষ্টা করছেন। সুযোগসন্ধানী ও প্রতারক দালালচক্র তাদের মুনাফা অর্জনের আশায় বিগত কয়েক বছর ধরে দরিদ্র, বেকার ও অসচেতন জনগোষ্ঠীকে নানা প্রলোভনে প্রলুব্ধ করে অবৈধ ও জীবনের ঝুঁকি রয়েছে এমন পথে অভিবাসন করাচ্ছে। এ বিষয়ে ইতিপূর্বে সংবাদপত্রে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি এসব ঘটনায় বাংলাদেশে খুব সামান্যই আইনের প্রয়োগ দেখা যায়।
বাংলাদেশে মানব পাচার অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা ও অধিকার বাস্তবায়ন, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা এবং পাচারকারীদের শাস্তির জন্য রয়েছে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২। মানব পাচার প্রতিরোধ সংক্রান্ত জাতিসংঘ কনভেনশন ২০০০ এবং সার্ক কনভেনশন অনুসরণ করে সংঘবদ্ধভাবে সংঘটিত আন্তঃদেশীয় অপরাধগুলো প্রতিরোধ ও দমনের জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে এ আইনকে সঙ্গতিপূর্ণ করা হয়েছে। এই আইন অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃদেশীয় সব ধরনের মানব পাচারকে অপরাধ বলে গণ্য করার পাশাপাশি পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন করে অপরাধীদের কঠোর শাস্তির বিধান করেছে, যদিও অদ্যাবধি এ ধরনের পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়নি। এ আইনে ক্যামেরা ট্রায়াল, ভিডিও কনফারেন্স, বৈদেশিক ডকুমেন্ট প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ, সারভাইভারদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়, সেবা ও আর্থিক সহায়তা ইত্যাদির সুযোগ থাকায় আইনটি মানব পাচারের শিকার ব্যক্তি, বিশেষত নারী ও শিশুদের জন্য সময়োপযোগী। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে উদ্ধার ও পুনর্বাসনে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যোগাযোগ দেশে-বিদেশে স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে কম সময়ের মধ্যে প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যাচ্ছে।
তবে এ আইন প্রয়োগে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। এ আইনের বিধিমালা তৈরি না হওয়ায় সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আইনটির পরিপূর্ণ সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। মামলা দায়ের হলেও অনেক ক্ষেত্রে ভয়-ভীতি দেখিয়ে বা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির দরিদ্রতার সুযোগ নিয়ে অর্থের বিনিময়ে আপস-মীমাংসা করা হয়। তাছাড়া সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কর্তৃক অপরাধ সংঘটনের স্থান, অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম ও ঠিকানা যথাযথভাবে বলতে না পারা, তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষী ও সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির নিরাপত্তার অভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা, আইন সম্বন্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধি, বিচারিক কর্মকর্তাসহ সাধারণ মানুষের অসচেতনতার কারণে পাচারকারী ব্যক্তিদের অনেকে আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। আবার যাদের গ্রেফতার করে বিচারে সোপর্দ করা হচ্ছে, তারা মূলত মাঠপর্যায়ে সরাসরি পাচারের সঙ্গে জড়িত; কিন্তু পাচারের মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
মানব পাচার সংক্রান্ত মামলাগুলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পরিচালিত হচ্ছে, যার ফলে মামলাজট আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তদন্ত কাজ ৯০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করার বিধান থাকলেও সমিতির অ্যান্টি-ট্রাফিকিং সেল কর্তৃক ৩০টি মামলা মনিটর করে দেখা যায়, গড়ে তদন্ত কাজ শেষ করতে সময় লেগেছে ১৯৫ দিন। এক্ষেত্রে একটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন সর্বনিু ৬৯ দিনে এবং অন্য একটি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন সর্বোচ্চ ৪০৮ দিনে দাখিল করা হয়েছে। ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার কার্য সম্পন্ন করার বিধান থাকলেও বিগত দু’বছরে একটি মামলাও আইনানুগ প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হয়নি। আইনটি সম্পর্কে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিনিধি, বিচারিক কর্মকর্তাসহ সাধারণ মানুষের সচেতনতা খুবই কম।
মানব পাচারের শিকার ব্যক্তির প্রত্যাবাসন ও সামাজিক-অন্তর্ভুক্তকরণে দেশে প্রত্যাবর্তন, প্রত্যাবাসন এবং সমাজে অন্তর্ভুক্তকরণের কাজে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সরকারের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা কিংবা বেসরকারি সংস্থাগুলো কর্তৃক Standard Operating Procedure (SOP) অনুসরণ করার বিধান থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা মানা হয় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমন্বয়ের অভাবে মানব পাচারের সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে হয়রানির শিকার হতে হয়। প্রত্যাবর্তন ও প্রত্যাবাসনে SOP অনুসরণে বাংলাদেশ ও ভারত ঐকমত্যে উপনীত হয়েছে। কিন্তু মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের সঙ্গে মানব পাচার প্রতিরোধ সম্পর্কিত কোনো কার্যক্রম পরিলক্ষিত হয় না। সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে মানব পাচার দমনে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া সময়ের দাবি। এ ছাড়া প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক পাচারের শিকার ব্যক্তি ফেরত আসছেন। SOP অনুসরণের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর জরুরি।
জাতীয় পর্যায়ে মানব পাচার দমনে গঠিত টাস্কফোর্স নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কাজ করছে। কিন্তু আইনানুযায়ী জেলা পর্যায়ে কাউন্টার ট্রাফিকিং কমিটি গঠন করা হলেও এসব কমিটির কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। কাগজে-কলমে নিয়মিত সভা হলেও সেখানে সংশ্লিষ্টদের অংশগ্রহণ বা আলোচনার সুযোগ খুবই কম। এমনকি উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি থাকলেও এসব কমিটি এবং কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ মানুষ তেমন সচেতন নয়। ফলে মানব পাচার দমনে মাঠপর্যায়ে যে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠার প্রত্যাশা ছিল, তা দেখা যাচ্ছে না।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত সচিত্র প্রতিবেদনে মানব পাচারের যে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে, তা জরুরি ও কার্যকর প্রতিরোধ এবং প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে কমিয়ে আনা সম্ভব। কক্সবাজারে পাচারকারী চক্রকে ধরতে পুলিশি অভিযান শুরু হয়েছে। কিন্তু যারা ধরা পড়ছে, তারা কেউই অপরাধের মূল হোতা নয়। অন্যদিকে পুলিশের এনকাউন্টারের কারণে আটককৃত ব্যক্তিদের হত্যার জন্য দায়ী মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে।
বিদ্যমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ সতর্কতার পাশাপাশি কমিউনিটি পর্যায়ে ব্যাপক জনসচেতনতাসহ বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন। কক্সবাজার জেলার সমুদ্র উপকূল ও সীমান্তকে পুলিশ, বিজিবি ও কোস্টগার্ডের সদস্য দ্বারা নিয়মিতভাবে সতর্ক নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। মানব পাচার রোধে এশীয় অঞ্চলের সরকারগুলো কম গুরুত্ব দিচ্ছে। সার্কসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ফোরাম বা জোট নেতাদের এ সংকট সমাধানে একযোগে এগিয়ে আসা জরুরি। অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও ফলপ্রসূ সম্পর্ক স্থাপনে প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ প্রচেষ্টায় বিদেশে বাংলাদেশী দূতাবাসগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। তাদের জবাবদিহিতার আওতায় এনে আইনানুগ দায়িত্ব পালনকল্পে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানব পাচার দমনেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। অন্যদিকে আইনের আওতায় ভিডিও কনফারেন্স সুবিধা কাজে লাগানো এবং সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ও সাক্ষীদের সুরক্ষার জন্য পৃথক আইন প্রণয়নে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন ওই আইনের বিধিমালা প্রণয়ন। পাচারের ফলে যারা অঙ্গহানির শিকার হয়েছে ও বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের ক্ষতিপূরণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের উচিত দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে
আলোচনা করা। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ইউএনএইচসিআর, আইএলও, আইওএম ও জাতীয় পর্যায়ের বেসরকারি সংগঠন এবং বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে মানব পাচার রোধে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হবে।
সালমা আলী : নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি
 

উপসম্পাদকীয় পাতার আরো খবর
    ৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

    ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

    প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

    পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

    Developed by
    close
    close