¦

এইমাত্র পাওয়া

  • চাঁদা না দেয়ায় নরসিংদীর পলাশে সন্ত্রাসীদের হামলায় সাবেক ফুটবলার নাদিরুজ্জামান খন্দকার নিহত
আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নজরুল

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী | প্রকাশ : ২৫ মে ২০১৫

আজ এগারোই জ্যৈষ্ঠ। আজ থেকে একশ’ ষোল বছর আগে অবিভক্ত বাংলার মাটিতে যে মানুষটির জন্ম হয়েছিল তাকে নানা পরিচয়ে ভূষিত করা হয়। কেউ তাকে বলেছেন বিদ্রোহী কবি। কেউ বলেছেন প্রেমের কবি। কেউ বলেছেন গানের কবি। তিনি নিজের সম্পর্কে বলেছেন, ‘কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুজে তার সই সবই।’ নিজের সম্পর্কে তিনি আরও বলেছেন,
‘পরোয়া করি না বাঁচি না বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,
মাথার উপর জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে
প্রার্থনা করো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস
আমার রক্ত লেখায় যেন হয় তাহাদের সর্বনাশ।’
তিনি অমর কবি হওয়ার সাধনা করেননি। কিন্তু কুড়ি শতকের প্রথমার্ধের সেই যুগের হাওয়া কেটে গেলেও তিনি বেঁচে আছেন শুধু বিদ্রোহের কবি হিসেবে নয়, প্রেমের এবং সাম্যের কবি হিসেবেও। আবুল মনসুর আহমদ বহু আগে কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, ‘বাঙালি হিন্দুদের রবীন্দ্রনাথ আনন্দময়ীর আগমনের গান শুনিয়েছেন। নজরুল বাঙালি মুসলমানের আকাশে রমজানের চাঁদের আলো ফুটিয়েছেন।’
কথাটা সঠিক। আবার সার্বিক অর্থে সঠিক নয়। নজরুল আনন্দময়ীর আগমনের গান গেয়েছেন। শ্যামা সঙ্গীত রচনা করেছেন। আবার আরবি-ফার্সি শব্দের মিশ্রণে অপূর্ব গীত ও গজল তৈরি করে বাংলার মুসলমানকে উপহার দিয়েছেন। অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও তাকে সানন্দে গ্রহণ করেছে। এককথায় তিনি ছিলেন বাংলার লোক-জাতীয়তার প্রতিভূ। পরবর্তী সময়ে যা রূপান্তরিত হয়েছে সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদে। তাই তিনি হয়েছেন স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় কবি।
নজরুল ছিলেন প্রেমের কবি এবং দ্রোহের কবিও। তার দ্রোহ ছিল দেশী-বিদেশী অত্যাচারীয় খক্ষকৃপাণের বিরুদ্ধে। আবার তার প্রেম ছিল বাংলার মাটির সহজিয়া প্রেম। তার নিজের কথায়, ‘এক হাতে মোর শ্যামের বাঁশরি, আর হাতে রণতূর্য।’ তার দ্রোহ ছিল সব অন্যায়, অসত্য ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে। তার প্রেম ছিল বাংলার সহজিয়া প্রেম। জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের সব ভেদাভেদ মুছে এক মানবতার পবিত্র বৃন্তে তিনি জীবনকে ফোটাতে চেয়েছেন।
তিনি ছিলেন বাংলার কবি। বাঙালির কবি। সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের ঘোর বিরোধী। লোকায়ত সংস্কৃতির ভিত্তিতে তিনি যে বাঙালির অভিন্ন কালচারাল নেশনহুডের স্বপ্ন দেখেছিলেন, রাজনৈতিক বিভাজন তাকে ভাঙতে পারেনি। তিনি নিজেও ভাগ হননি। তাই অন্নদাশঙ্কর রায় একবার লিখেছিলেন-
‘ভাগ হয়ে গেছে বিলকুল
ভাগ হয়ে গেছে সব কিছু আজ
ভাগ হয়নিকো নজরুল।’
বাঙালির অবিভক্ত কালচারাল নেশনহুডের প্রতীক নজরুল। তিনি তাদের দ্রোহে উজ্জীবিত করেছেন। প্রেম ভালোবাসার গানে তাদের হৃদয় ভাসিয়েছেন। আবার বাঙালির আত্মঘাতী চরিত্রটির প্রতিও কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
পোয়েটদের নাকি প্রোফেটও বলা হয়। তারা ভবিষ্যৎদ্রষ্টাও। নজরুলের বেলায় এ কথাটা সঠিক বলা চলে। স্বাধীনতার পর দুই বাংলাতেই মূল্যবোধের যে অবক্ষয়; সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে পচন; সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও মধ্যযুগীয় হিংস্র মৌলবাদের উত্থান, তা যেন ভবিষ্যৎদ্রষ্টার মতো নজরুল প্রায় শতবর্ষ আগেই প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাই লিখতে পেরেছিলেন-
‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে আমরা তখনও বসে
বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজি হাদিস কোরান চষে
ভেতরের দিকে যতো মরিয়াছি বাহিরের দিকে ততো,
গুনতিতে মোরা বাড়িয়া চলেছি গোরুছাগলের মতো।’
বাংলা ও বাঙালির বর্তমানের নানাবিধ উন্নয়নের মধ্যেও তার সামাজিক জীবনের এই অবক্ষয়ের আভাস নজরুল প্রায় শতবর্ষ আগেই পেয়েছিলেন। বাঙালির (দুই বাংলারই) এই চরিত্রটির কথা জেনেই নীরদ সি চৌধুরী তাকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘আত্মঘাতী বাঙালি’।
রবীন্দ্রযুগে জন্মগ্রহণ করে রবীন্দ্র বলয়ের মধ্যে নিজের একটি বলয় সৃষ্টি করা নজরুলের কম কৃতিত্বের কথা নয়। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন বাঙালিকে বিশ্ব বাঙালিত্বে উন্নীত করতে। আর নজরুল চেয়েছেন বাঙালির আবহমান কালের স্বজাতিত্ববোধের নবজাগরণ ঘটাতে। যে জাগরণ প্রচেষ্টা বা সংগ্রামের প্রতিনিধিত্ব করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই স্বাধীন বাংলা ও বাঙালি যে চরিত্রভ্রষ্ট হতে পারে, তার আভাসও ভবিষ্যৎদ্রষ্টা কবি পেয়েছিলেন স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বহু আগে।
নজরুল কাব্যের আরেকটি বৈশিষ্ট্য রাজনৈতিক জাগরণের মন্ত্রোচ্চারণের পাশাপাশি ধর্মান্ধতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিরোধ চেতনা। তার ফলে আজকের বাংলাদেশে ধর্মপিশাচ একদল মৌলবাদী যেমন কথায় কথায় মুক্ত চেতনার মানুষকে নাস্তিক, মুরতাদ আখ্যা দেয়, বিজ্ঞানমনস্ক ব্লগারদের হত্যা করে, গত শতকের অবিভক্ত বাংলায় তেমনি তারা নজরুলকেও কাফের আখ্যা দিয়ে হত্যা করতে চেয়েছিল। এই হিংস্র মৌলবাদীদের ফতোয়ার জবাবে নজরুল লিখেছিলেন,
‘ফতোয়া দিলাম কাফের কাজী ও
যদিও শহীদ হইতে রাজি ও।’
অর্থাৎ যে নজরুল দেশ ও জাতির জন্য শহীদ হতে রাজি, অজ্ঞ মৌলবাদীরা তাকে কাফের আখ্যা দেয়।
গত শতকের ত্রিশের দশকের কলকাতাকেন্দ্রিক আধুনিক বাঙালি কবিদের একটা অংশ যেমন প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায় (আরও পরে সুকান্ত ভট্টাচার্য) প্রমুখ রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক বর্ণিত ‘মাটির কাছাকাছি’ কবি হওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তখন তাদের পথ দেখিয়েছিলেন নজরুল। তার ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো বাংলা সাহিত্যে গণসাহিত্য যুগের উদ্বোধন ঘটায়। সাম্যবাদীতে নজরুল লিখেছিলেন, ‘দেখিনু সেদিন রেলে, কুলি বলে এক বাবুসাব তারে নিচে দিল ঠেলে ফেলে।’ তারই প্রতিধ্বনি করেই যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখেছিলেন, ‘আমি কবি যতো মুটে মজুরের, আমি কবি যতো ইতরের।’
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় কবি রোগাক্রান্ত ও প্রায় জীবন্মৃত ছিলেন। স্বাধীন বাংলার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে কলকাতা থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। তাকে বাংলাদেশের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এটা ছিল বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রীয় চরিত্রের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। নজরুল যে সেক্যুলার, সমাজবাদী, শোষণমুক্ত বাংলাদেশের কথা ভাবতেন (দেশটির বিভক্ত হওয়ার কথা তিনি অবশ্যই তখন ভাবেননি), স্বাধীন বাংলাদেশে চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতির মধ্যে তা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। তিনি স্বাধীন বাংলার রাজধানী ঢাকায় এসেছেন। কিন্তু জীবন্মৃত অবস্থায় তার সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নের কথা বুঝতে পারেননি।
বঙ্গবন্ধু হত্যার এক বছর পর ঢাকায় (২৯ আগস্ট ১৯৭৬) কবি নজরুলের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর আগেই সামরিক শাসকরা রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিটি যেমন ভাঙতে শুরু করেন, তেমনি শুরু হয় নজরুলকেও সমগ্র বাঙালিসত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে কেবলমাত্র বাঙালি মুসলমানের কবি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা। তার গজল-গানগুলোকে বেতার-টেলিভিশনে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা শুরু হয়। তার কোনো কোনো কবিতা ও গান ইসলামীকরণের ধাক্কায় পড়ে। সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী রাজনৈতিক দলগুলো নজরুলের কবিতার অর্থের বিকৃতি ঘটিয়ে তাদের স্বার্থে তার ব্যবহারে দ্বিধা দেখায়নি।
নজরুলের একটি গানের পঙ্ক্তি হচ্ছে, ‘দাওয়াত এসেছে নয়া জামানার।’ এই দাওয়াত কথাটি গ্রহণ করে জামায়াতে ইসলামী লন্ডনে তাদের একটি সহযোগী সংস্থা গড়ে তুলেছে দাওয়াতুল ইসলাম নামে নজরুলের একটি বিখ্যাত কবিতার পঙ্ক্তি হচ্ছে, ‘আমরা শক্তি আমরা বল, আমরা ছাত্রদল।’ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়া তার দলের ছাত্র সংস্থা গঠনের সময় সাধারণ ছাত্রদের বিভ্রান্ত করার জন্য নজরুলের কবিতা থেকে ছাত্রদল নামটি গ্রহণ করেন। তার সম্ভবত আশা ছিল, নজরুলের নামের ও কবিতার মহিমায় তার ছাত্রদল ছাত্রসমাজের কাছে বিপুল সমর্থন পাবে। নজরুল যদি আজ বেঁচে থাকতেন এবং ছাত্রদলের কার্যকলাপ দেখতেন, তাহলে সম্ভবত এই কবিতাটি তার কাব্যগ্রন্থ থেকে প্রত্যাহার করতে চাইতেন।
সাহিত্যের একটা সহজাত ক্ষমতা আছে। ফলে কোনো কলুষ সহজে তাকে গ্রাস করতে পারে না। নজরুল ও নজরুল সাহিত্যের ব্যাপারেও এটা লক্ষ্য করা যায়। নজরুল সারা জীবন সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। জিন্নাহর ধর্মীয় দ্বিজাতিতত্ত্ব ও ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন। তারপরও শেষ জীবনে তার রোগাক্রান্ত অবস্থার সুযোগ নিয়ে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী দলগুলো তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে তার সাহিত্যকে ব্যবহারের অপচেষ্টা করেছে। তাদের চেষ্টা সফল হয়নি। নজরুল-সাহিত্যই তার নিজস্ব শক্তি দ্বারা এই অপচেষ্টা ব্যর্থ করে চলেছে।
নজরুল-সাহিত্যের উদার মানবতাবাদ সব ধরনের ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরোধী। বাংলাদেশে নজরুল গবেষণা যত বাড়ছে, ততই তার লোকায়ত চরিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে এবং সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের পথনির্দেশ করছে।
নজরুল অবিভাজ্য। তাকে সাম্প্রদায়িক চক্র ভাগ করতে পারেনি। নজরুল গভীরভাবে মানবতাবাদী। মৌলবাদীরা তার সাহিত্যের সেই চরিত্রচ্যুতি ঘটাতে পারেনি। নজরুল আজ বেঁচে নেই। কিন্তু এখনও তিনি সব গোঁড়ামি ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় দ্রোহীশক্তি।
লন্ডন, ২৩ মে শনিবার, ২০১৫
 

উপসম্পাদকীয় পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close