¦

এইমাত্র পাওয়া

  • চাঁদা না দেয়ায় নরসিংদীর পলাশে সন্ত্রাসীদের হামলায় সাবেক ফুটবলার নাদিরুজ্জামান খন্দকার নিহত
এ অপসংস্কৃতির শেষ কোথায়?

মাহমুদুল বাসার | প্রকাশ : ২৫ মে ২০১৫

২০ মে একটি জাতীয় পত্রিকায় খবর এসেছে, ওষুধ চোরাচালান, ভেজাল ওষুধ উৎপাদন ও অপারেশনে ব্যবহৃত মানহীন সামগ্রী ব্যবহার রোধে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। স্বাস্থ্য সচিব, ওষুধ প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক, পরিচালককে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে। প্রশাসনের বাঁকে বাঁকে ২/৪টা সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত প্রলম্বিত হচ্ছে। যে কোনো সরকারকে মোকাবেলা করতে হয় তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে এবং একই সঙ্গে প্রশাসনের অবৈধ নিষ্ক্রিয়তাকে। তবে প্রশাসনের অন্যান্য স্তরে যে দুর্নীতি-অনিয়ম, অন্যায়-অবিচার চলে তার ক্ষতি হতে থাকে ধীরে ধীরে। কিন্তু রাষ্ট্রের আত্মায় প্রচণ্ড অভিঘাত লাগে পুলিশ প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও বিচারহীনতায়। পহেলা বৈশাখে টিএসসিতে যে নারী লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটেছে, তখন ঘটনাস্থলেই ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা অন্তত দুজন নিপীড়ককে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছিল। পুলিশ তাদের ছেড়ে দিয়েছে। আমার ব্যক্তিগত অনুমান, নিপীড়করা পুলিশকে উৎকোচ দিয়েছে।
পুলিশের এহেন দায়িত্বহীনতার খবর পড়ে মানসিকভাকে বিপন্ন হয়ে পড়ি। ইচ্ছে করছিল নিজের চুল নিজেই ছিঁড়ে ফেলি। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্রাইম জোনে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা রাষ্ট্রের ভিতে আঘাত করে, সরকারের ইমেজের মুখেও কালি লেপন করে। পহেলা বৈশাখের নারী লাঞ্ছনার ঘটনায় প্রথম প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে ছাত্র ইউনিয়ন এবং গণজাগরণ মঞ্চ। তারা জোরালো ভাষায় পুলিশের দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। তারা নারী লাঞ্ছনার প্রতিকার চেয়ে ঢাকায় ডিএমপি অফিস ঘেরাও করতে গেলে পুলিশ তাদের সঙ্গে নির্দয় আচরণ করেছে। এজন্য সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, পুলিশ শিষ্টের দমন আর দুষ্টের পালন করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রেও হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জানতে চেয়েছেন প্রশাসনের ব্যর্থতার কথা, নিষ্ক্রিয়তা আর উদাসীনতার কথা। রুল জারি করে মহামান্য আদালত জানতে চেয়েছেন, কেন দায়িত্বপ্রাপ্তদের শাস্তি দেয়া হবে না।
তিন মাসের মধ্যে পরপর পাঁচজন ব্লগারকে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। এর দায় স্বীকার করেছে জঙ্গি সংগঠনগুলো। গণজাগরণ মঞ্চের নেতা ইমরান এইচ সরকার প্রকাশ্য দিবালোকে সরকারের প্রশাসনকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছেন সিলেটে। অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের আয়তন খুব ছোট। এদিক থেকে খুনি-সন্ত্রাসী-ধর্ষকদের পাকড়াও করার সুবিধা অনেক। অথচ পুলিশ পাঁচজন ব্লগারের হত্যাকারীদের ধরতেই পারল না। এটা তো চরম ব্যর্থতা। কারা ব্লগারদের হত্যা করেছে এ নিয়ে তো কোনো জল্পনা-কল্পনার অবকাশ নেই। সন্ত্রাসী-জঙ্গিদের সংগঠন এর দায় স্বীকার করেছে সগৌরবে। তাহলে সেসব সংগঠনের হোতাদের গ্রেফতার করা হয় না কেন? ব্লগার হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ প্রশাসনের সিরিয়াসনেস নেই কেন?
পুলিশ প্রশাসনের কঠোর কর্তব্য হচ্ছে খুনিদের ধরা, শাস্তির আওতায় আনা। সে কাজটি হচ্ছে কোথায়? ওয়াশিকুর রহমান বাবুর দুজন খুনিকে পাকড়াও করেছে হিজড়ারা। হিজড়াদের মনেও দয়া আছে, দায়িত্ববোধ আছে, পুলিশের তাও নেই। সব ট্রাফিকের সিগন্যাল যেমন একই রকম, সব সরকারের পুলিশ একই রকম দায়িত্বহীন। এর মধ্যে আবার পত্রিকায় দেখেছি, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাতকে সপরিবারে হত্যার হুমকি দিয়েছে চিহ্নিত মৌলবাদীরা। এরপর ১০ বিশিষ্ট নাগরিককে হত্যার হুমকি দিয়ে উড়োচিঠি পাঠানো হয়েছে। অবাক হচ্ছি, এ ব্যাপারে প্রশাসনের তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই। ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশকে নির্মম হত্যার ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তাকে দায়ী করেছেন ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং ইমরান এইচ সরকার। সরকারদলীয় একজন এমপি মুহম্মদ জাফর ইকবালকে কটূক্তি করায় এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কলাম লিখেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. মো. আনোয়ার হোসেন (দৈনিক জনকণ্ঠ, ১৯.০৫.১৫)। জনপ্রিয় কলাম লেখক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী যুগান্তরে কলাম লিখেছেন একই বিষয়ের ওপর। এমন ২/১ জন এমপি প্রধানমন্ত্রীর কষ্টার্জিত ক্রেডিবিলিটি ধুলায় লুণ্ঠিত করার জন্য যথেষ্ট। তাদের লাগাম টেনে ধরতে হবে সরকারকে নিজের স্বার্থে।
ব্লগার ড. অভিজিৎ হত্যার সময়ও পুলিশ দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। এ ব্যাপারে তার স্ত্রী রাফিদা আহমদ বন্যা ক্রুর ভাষায় অভিযোগ করেছেন। অভিযোগগুলো একের পর এক অরণ্যে রোদন করেই যাচ্ছে। এর পরিণতি পুলিশের জন্য খারাপ হবে না, খারাপ হবে সরকারের জন্য। পুলিশ তো যে পাত্রে যাবে সেই পাত্রের রঙ ধরবে। পুলিশ কীভাবে মতিয়া চৌধুরী আর মোহাম্মদ নাসিমকে রাস্তায় পিটিয়েছে আমাদের তা মনে আছে। পুলিশ শহীদ জননী জাহানারা ইমাম ও মহীয়সী কবি সুফিয়া কামালকেও ছাড়েনি। স্বাধীনতা-পরবর্তী ৪০ বছরে বিচারহীনতার সংস্কৃতি একই রকম আছে, পুলিশের স্বভাবও একই রকম আছে। বলা হয়, বাঘে ছুঁলে এক ঘা আর পুলিশের ১৮ ঘা। এ কথা সিভিল, নিরীহ নাগরিকের বেলায় ১৬ আনা প্রযোজ্য। এ কথা যদি ব্লগার হত্যাকারীদের বেলায় প্রযোজ্য হতো, তাহলে আমরা নিরাপত্তা খুঁজে পেতাম। পুলিশকে একচেটিয়া দোষ দিতে চাই না, তারা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভালো ভূমিকা নিয়েছে। জঙ্গি দমনে নিশ্চয়ই পুলিশের ভূমিকা ইতিবাচক। আমাদের দাবি হচ্ছে, প্রজাতন্ত্রের পুলিশও মানবিক চেতনার দ্বারা চালিত হবে। রাজীব হায়দারের মতো মেধাবী ব্লগার করুণভাবে নিহত হওয়ার পরই বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনী অধিকতর সচেতন হতে পারত।
বর্তমান সরকারের সদিচ্ছাকে আমরা কটাক্ষ করতে চাই না। কিন্তু সদিচ্ছাই সব কিছু নয়। সরকারের সদিচ্ছার ফাঁক গলে বিচারহীনতার দৃষ্টান্ত প্রলম্বিত হচ্ছে। খুন ও ধর্ষণ বেড়েই চলেছে। শাস্তি প্রদানকারী আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর শৈথিল্য এখানে ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। নদীর পানি যদি বিষাক্ত হয়, কোনো জীব তা থেকে রেহাই পাবে না। দেশে বিচারহীনতা যদি বেড়ে যায়, তাহলে একটা পর্যায়ে সন্ত্রাসীরা সরকার পক্ষের লোকজনদের ধরে ধরে হত্যা করবে, পুলিশ তামাশা দেখবে। পত্রিকায় দেখলাম (২০.০৫.১৫), লক্ষ্মীপুরে মামুনুর রশীদ খান নামে এক ছাত্রলীগ কর্মীকে গুলি করে হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা। সোমবার রাতে সদর উপজেলার চন্দ্রগঞ্জ আমানী লক্ষ্মীপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। সামনে এমন ঘটনা আরও ঘটলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না।
ইংরেজ ঔপনিবেশিক আমলে বিচারহীনতাই স্বাভাবিক ছিল বলে রবীন্দ্রনাথ তিরস্কারের সুরে বলেছিলেন, বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে। ইংরেজ সেনাপতি ডায়ার পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগে ১৯১৯ সালে ঠাণ্ডা মাথায় শত শত ভারতবাসীকে হত্যা করেছিল। সাক্ষাৎকারে ডায়ার বুক ফুলিয়ে সে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। ডায়ারের কোনো বিচার হয়নি। আমরা ইংরেজ তাড়িয়েছি, পাকিস্তানি খান সেনা তাড়িয়েছি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য, বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার জন্য নয়।
মাহমুদুল বাসার : গবেষক ও প্রাবন্ধিক
উপসম্পাদকীয় পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close