jugantor
এই ক্রুসেড- সেই ক্রুসেড

  ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী  

০৮ অক্টোবর ২০১৫, ০০:০০:০০  | 

এখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ‘জঙ্গি’ নিধন চলছে। কারা এই জঙ্গি? আফগানিস্তানের আল কায়দা ও তালেবান দিয়ে শুরু, এখন ‘আইএস’ এবং তার ছায়া-উপচ্ছায়া। এই নিধনযজ্ঞে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর কোয়ালিশনে এখন প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে যুক্ত হয়েছে পৃথিবীর প্রায় সব ধনী দেশ।

এর লক্ষ্য কি জঙ্গি নির্মূল করা? নাকি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান দেশগুলোতে নাক গলিয়ে তাদের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই উস্কে দিয়ে সেখানে ‘বরের ঘরের মাসী, কনের ঘরের পিসী’ হয়ে হামলা চালানোর ক্ষেত্র তৈরি করা?

যুক্তরাষ্ট্রের চরম রক্ষণশীল মৌলবাদী গোষ্ঠীর ‘থিংক-ট্যাংক’ নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আভাস দিয়েছিল- গোটা একবিংশ শতাব্দীজুড়ে চলবে তথাকথিত ‘Clash of Civilization’, দুই সভ্যতার লড়াই, একদিকে থাকবে পশ্চিমা সভ্যতা, অপরদিকে মুসলিম ও চৈনিক সভ্যতা। মাঝখানে গ্রে-এরিয়াতে থাকবে রাশিয়া ও ভারত।

কী আশ্চর্য। ঠিক একবিংশ শতাব্দীর সূচনাতেই, ২০০১ সালে, ঘটে গেল টুইন টাওয়ার হামলা। তারপরই শুরু হয়ে গেল ইসলাম ও মুসলমানকে জঙ্গিবাদের ধারক বানিয়ে চানমারির টার্গেট করে তথাকথিত 'Legal War on Terror (LWOT)'। (এখানে ‘Legal’ শব্দটার প্রয়োগ লক্ষণীয়। ওটা যে মোটেই ‘Legal’ নয়, সেই মর্ম-গ্লানি ঢাকার জন্যই কি এ শব্দটির প্রয়োগ?)

তবে, বাস্তবতা হচ্ছে ‘জঙ্গিবাদ’ ঠেকানোর জন্য পশ্চিমের এই সমরাভিযান এখন পর্যন্ত কোনো কাজে আসছে বলে মনে হচ্ছে না। বরঞ্চ হিতে বিপরীত ঘটিয়ে গোটা বিশ্বকেই জঙ্গিবাদের চারণক্ষেত্রে পরিণত করা হচ্ছে। অপরদিকে মুসলমান জঙ্গিদের বিপরীতে নানারূপে আবির্ভূত হচ্ছে নব্য খ্রিস্টান মৌলবাদ। যা হাজার বছর আগেকার ক্রুসেড বা খ্রিস্টীয় ধর্মযুদ্ধের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ মন্তব্য করেছিলেন- ‘শুরু হল নতুন ক্রুসেড’ (This Crusade, this war on terror is going to take a while)। এর মধ্য দিয়ে কি পশ্চিমের রক্ষণশীল খ্রিস্টানত্বের অন্তরের ভাষার প্রকাশ ঘটেছিল?

‘ক্রুসেড’-এর ইতিহাস তো কম-বেশি সবারই জানা। তবু আজকের দিনের নবীন পাঠকদের জন্য তার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরার চেষ্টা করব।

মদীনায় মুসলমান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তা অতি দ্রুত বিস্তার লাভ করে একাদশ শতাব্দী নাগাদ প্রায় গোটা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল মুসলমান শাসনের অধীনস্থ হয়ে পড়ে। পবিত্র নগরী জেরুজালেমও মুসলমানদের করায়ত্ত হয়। এই মুসলমান আধিপত্য ইউরোপের অবশিষ্ট অঞ্চলের খ্রিস্টান শাসকদের ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই পটভূমিতে পুণ্যভূমি জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের ডাক দিলে খ্রিস্টান জগতে অভূতপূর্ব সাড়া জাগে।

ইতিহাসে ৪টি প্রধান এবং আরও কয়েকটি অপ্রধান ক্রুসেডের বিবরণ পাওয়া যায়।

প্রথম ক্রুসেড (১০৯৬-৯৯)

১০৯৫ সালে কনস্টান্টিনোপলের (বর্তমান তুরস্কের ইস্তান্বুল) সম্রাট অষবীরঁং তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য পোপ টৎনধহ ওও-কে পশ্চিমের দেশগুলো থেকে যোদ্ধা সংগ্রহ করে পাঠাতে অনুরোধ জানান। ওই সময় পূর্ব ও পশ্চিমের খ্রিস্টানদের মধ্যে প্রবল বিরোধ থাকা সত্ত্বেও পোপ তার অনুগত পশ্চিমের খ্রিস্টানদের মুসলমানদের হাত থেকে ‘পবিত্র স্থান’ পুনরুদ্ধার করার জন্য অস্ত্র ধারণ করার আহ্বান জানান। বলা হয়, এ ধর্মযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যে যোদ্ধারা জেরুজালেমের গির্জায় প্রবেশ করতে পারবে, তারা চার্চের পবিত্র ক্রুশ চিহ্ন ধারণ করার এবং যিশুর লোক হিসেবে সরাসরি স্বর্গে প্রবেশের অধিকার পাবে। (আইএস জঙ্গিরাও কি একই প্রলোভন দেখায় না?)। এতে প্রচণ্ড সাড়া পাওয়া যায়। পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন ছোট-বড় রাজ-রাজরা এতে সাড়া দেন। হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও ভাড়াটে যোদ্ধা জড়ো হয়ে ৪টি অস্ত্রসজ্জিত বিশাল বাহিনী গড়ে ওঠে। ১০৯৬ সালের আগস্টে এসব বাহিনী বাইজেন্টাইন যাত্রা শুরু করে। এই সুসজ্জিত বাহিনীকে পাশ কাটিয়ে কিছু অতি উৎসাহী ‘নাইট’ (রাজার প্রতি অনুগত অপেশাদার যোদ্ধা) সাধারণ মানুষদের একটি বাহিনী নিয়ে আগেভাগে বসফরাস প্রণালী অতিক্রম করে মুসলিম বাহিনীর মুখোমুখি হয় এবং সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত হয়। এরকম আরেকটি ক্রুসেডার বাহিনী রাইনল্যান্ডে বিভিন্ন শহরে ইহুদিদের ওপর বেপরোয়া হামলা চালায়। যা ইহুদি-খ্রিস্টান সম্পর্কে মারাত্মক অবনতি ঘটায়।

মূল চার ক্রুসেডার বাহিনী কনস্টান্টিনোপল পৌঁছার পর সম্রাট আলেকসিয়াস তাদের নেতাদের এই মর্মে ওয়াদা করতে বলেন যে, তুর্কি এবং অন্যদের কাছ থেকে যেসব এলাকা তারা দখল করতে পারবে সেগুলো তার অধীনস্থ হবে। একটি বাহিনীর নেতা তাতে রাজি হলেও অপর তিন বাহিনীর নেতা তাতে রাজি হল না। তা সত্ত্বেও বাইজেন্টাইন ও ক্রুসেডারদের সম্মিলিত বাহিনী প্রথমে সেলজুক তুর্কিদের রাজধানী (বর্তমান তুরস্কের ইজনিক শহর) দখল করে সিরিয়ার ওপর দিয়ে এগিয়ে গিয়ে জেরুজালেম পৌঁছাতে সক্ষম হয়। জেরুজালেম তখন মিসরীয় ফাতেমি শাসকদের অধীনে ছিল। ফাতেমিরা ছিল শিয়া আর সেলজুকরা সুন্নি। দুয়ের মধ্যে প্রচণ্ড বৈরিতা। এই বৈরিতার পরিপূর্ণ সুযোগ পেয়েছে ক্রুসেডাররা। (পাঠক কি আজকের ইরাক-সিরিয়ায় সেই একই দৃশ্য দেখতে পাচ্ছেন?)। জেরুজালেমের মুসলমান শাসক ক্রুসেডারদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু আত্মসমর্পণের শর্ত ভঙ্গ করে শুরু হয়ে যায় নগরজুড়ে ব্যাপক ও নির্মম হত্যাযজ্ঞ- নারী-শিশু নির্বিশেষে এবং লুণ্ঠন। (এটাই ধর্মযুদ্ধ!)।

ক্রুসেডার রাষ্ট্রসমূহ এবং দ্বিতীয় ক্রুসেড (১১৪৭-৪৯)

বিজয়ী ক্রুসেডার বাহিনী চারটি এলাকায় কর্তৃত্ব স্থাপন করতে সক্ষম হয়- জেরুজালেম, এডেসা, অ্যানটিওচ ও ত্রিপলি (লিবিয়ার ত্রিপলি নয়, ভূমধ্যসাগরের পূর্বতীরে একটি বন্দর)। ১১৩০ সালে মুসলিম বাহিনী পাল্টা ‘জিহাদ’ শুরু করে এবং মসুলের শাসক সেলজুক সেনাপতি জাঙ্গি ১১৪৭ সালে এডেসা থেকে খ্রিস্টানদের বিতাড়িত করে দিলে ইউরোপের খ্রিস্টান শাসকরা বিচলিত হয়ে পড়েন এবং দ্বিতীয় ক্রুসেডের প্রস্তুতি শুরু হয়। ফ্রান্সের রাজা খড়ঁরং ঠওও ও জার্মানির রাজা Conrad III-এর নেতৃত্বে ১১৪৭ সালে দ্বিতীয় ক্রুসেড শুরু হয়। প্রথমে কনরাডের বাহিনী তুর্কী বাহিনীর হাতে সম্পূর্ণ নাস্তানাবুদ হয়ে যায়। এরপর লুইস ও কনরাড যৌথভাবে জেরুজালেমে প্রায় ৫০ হাজার ক্রুসেডার একত্রিত করে দামেস্ক আক্রমণ করলে দামেস্কের শাসক মসুলে জাঙ্গির উত্তরসূরি নূর আল্-দীনের সহায়তা কামনা করেন। সম্মিলিত মুসলিম বাহিনীর কাছে ক্রুসেডার বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলে ক্রুসেডার বাহিনী জেরুজালেমে ফিরে যেতে বাধ্য হয় এবং এভাবে দ্বিতীয় ক্রুসেড সমাপ্ত হয়।

তৃতীয় ক্রুসেড (১১৮৯-৯২)

জেরুজালেম থেকে ক্রুসেডাররা বারংবার মিসরে হামলা চালিয়ে সেখানে নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলতে থাকলে মসুলের শাসক নূর আল্দীন তার সেনাপতি শিরকুহ এবং ভাতিজা সালাউদ্দীনের নেতৃত্বে এক বাহিনী সেখানে পাঠান। এই বাহিনী পঠিয়ে সেখান থেকে ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করে এবং শিরকুহ কায়রোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। শিরকুহ মৃত্যুবরণ করলে সালাউদ্দীন মিসরের কর্তৃত্বে চলে আসেন। ১১৭৪ সালে চাচা নূর আল্দীনের মৃত্যুর পর তিনি ক্রুসেডারদের জেরুজালেম রাজ্য আক্রমণ করেন। জেরুজালেমের খ্রিস্টান বাহিনী হাত্তিনের যুদ্ধে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয় এবং সালাউদ্দীন জেরুজালেম ও তার সন্নিহিত এলাকায় তার শাসন কায়েম করেন। এ ঘটনা তৃতীয় ক্রুসেডের সূত্রপাত ঘটায়।

জার্মানির সম্রাট ফ্রেডরিক বার্বাদোসা, ফ্রান্সের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ এবং ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম রিচার্ডের নেতৃত্বে ক্রুসেডার বাহিনী সিরিয়ার উদ্দেশে অগ্রসর হয়। পথিমধ্যে আনাতোলিয়ায় বার্বাদোসা পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করেন। রাজা রিচার্ডের বাহিনী ১১৯১ সালের সেপ্টেম্বরে আরসুফের যুদ্ধে সালাউদ্দীনের বাহিনীকে পরাজিত করে। রিচার্ড অতঃপর জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হন। কিন্তু তিনি জেরুজালেম আক্রমণ করতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন। বেশ কয়েক মাস মুখোমুখি অবস্থানের পর ১১৯২ সালের সেপ্টেম্বরে রিচার্ড ও সালাউদ্দীন শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। এতে জেরুজালেম শহর বাদ দিয়ে জেরুজালেম রাজ্য পুনঃস্থাপিত হয়।

চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ ক্রুসেড (১১৯৮-১২২৯)

পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট ১১৯৮ সালে চতুর্থ ক্রুসেডের ডাক দেন। কিন্তু ইউরোপ ও বাইজেন্টাইনের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ক্রুসেডারদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় বাইজেন্টাইন সম্রাট তৃতীয় অ্যালেক্সিয়াসের স্থলে তার ভাতিজাকে সিংহাসনে বসানো। এতে তারা সফল হয় (১২০৩)। বিনিময়ে নতুন সম্রাট চতুর্থ অ্যালেক্সিয়াস বাইজেন্টাইন চার্চকে রোমের অধীনস্থ করার চেষ্টা করলে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হন। ১২০৪ সালে এক প্রাসাদ অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন। ক্রুসেডাররা তখন কনস্টান্টিনোপল আক্রমণ করে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিশাল ও মনোরম রাজধানী শহরটি দখল করে সম্পূর্ণ লণ্ডভণ্ড করে ফেলে। তারা সেখানে রোমান চার্চের প্রতিদ্বন্দ্বী ‘ইস্টার্ণ অর্থডক্স’ চার্চের বহু ভবন আগুন লাগিয়ে ভস্মীভূত করে, চার্চের যাজক ও নান্দের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। এভাবেই ৪র্থ ক্রুসেড সমাপ্ত হয়।

ত্রয়োদশ শতাব্দীর অবশিষ্ট দিনগুলোতে অনেকগুলো ‘ছোটখাটো ক্রুসেড’ চালানো হয়। এ সবের লক্ষ্য যত না মুসলিম আধিপত্যের বিরুদ্ধে ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল খ্রিস্টান ‘ধর্মদ্রোহী’দের বিরুদ্ধে। ১২০৮ থেকে ১২২৯ সাল পর্যন্ত চলেছে ‘আলবিগেন্সিয়ান ক্রুসেড’, যার লক্ষ্য ছিল ফ্রান্সের ভিন্নমতাবলম্বী কাথারি বা আলবিগেন্সিয়ান খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে। ১২১১ থেকে ১২২৫ পর্যন্ত ক্রুসেড চলেছে প্যাগান ট্রানসিলভেনিয়ার বিরুদ্ধে।

পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট ১২১৬ সালে তার মৃত্যুর আগে পঞ্চম ক্রুসেডের ডাক দেন। এবারে ক্রুসেডাররা স্থল ও সমুদ্র উভয় পথে মিসর আক্রমণ করে। কিন্তু তাদের ১২২১ সালে সালাউদ্দীনের ভাতিজা আল-মালিক আল কামালের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনীর কাছে পরাজয় বরণ করতে হয়।

১২২৯ সালে ষষ্ঠ ক্রুসেড শুরু করেন সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডরিক। তিনি আল-কামালের সঙ্গে ১০ বছরের শান্তিচুক্তি করে বিনিময়ে জেরুজালেম নগরীতে ক্রুসেডারদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন। এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে জেরুজালেম আবার মুসলমানদের কর্তৃত্বে চলে যায়।

ক্রুসেডের সমাপ্তি

ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ক্রুসেডার গ্রুপ জেরুজালেম দখল করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। ‘সপ্তম ক্রুসেডে’ (১২৩৯-৪১) শ্যাম্পেইনের রাজা Thibault IV জেরুজালেম দখল করতে সক্ষম হন। কিন্তু ১২৪৪ সালে মিসরের সুলতান তাকে সেখান থেকে হটিয়ে দিতে সক্ষম হন।

১২৪৯ সালে ফ্রান্সের রাজা Louis IX মিসরের বিরুদ্ধে ‘অষ্টম ক্রুসেড’-এর সূচনা করে পরের বছর মানসুরার যুদ্ধে পরাজিত হন। এ সময় মিসরে মামলুক রাজবংশের পত্তন ঘটে। মামলুক বাহিনী ১২৬০ সালে প্যালেস্টাইনে চেংগিস খানের মোংগোল বাহিনীর গতিরোধ করতে সক্ষম হয়। চেংগিস খান ও তার উত্তরাধিকারীরা খ্রিস্টান শক্তির মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। মামলুক সুলতান বায়বার ১২৬৮ সালে খ্রিস্টার এন্টিওচ রাজ্য আক্রমণ করে বিধ্বস্ত করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে Louis IX আরেকটি ক্রুসেডের সূচনা করেন। উত্তর আফ্রিকায় তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যার সমাপ্তি ঘটে। এরপর নতুর মামলুক সুলতান কালাওয়ান ১২৮১ সালে মোংগোলদের সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত করে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন। ১২৯০ সালে ক্রুসেডার রাজ্যসমূহের শেষ অবস্থানগুলো রক্ষার জন্য ভেনিস ও আরাগন থেকে এক বিশাল নৌবাহিনী আগমন করে। পরের বছর সুলতান কালাওয়ানের ছেলে আল আশরাফ খলিল এক বিশাল বাহিনী নিয়ে ভূমধ্যসাগর উপকূলে ক্রুসেডারদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি আক্রে বন্দর আক্রমণ করেন। সাত সপ্তাহ অবরুদ্ধ থাকার পর আক্রে বন্দর দখল হলে প্রায় দুই শতাব্দীকালের ক্রুসেডের অবসান ঘটে। অতঃপর জেরুজালেমে মুসলিম আধিপত্য বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বজায় থাকে।

পাদটীকা

অষ্টাদশ শতাব্দীর 'Enlightenment scholar' স্যার স্টিভেন রানচিমেন (Sir Steven Runciman) ‘ক্রুসেড’-এর নৈতিকতা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। তার ভাষায় ‘High ideals were besmirched by cruelty and greed ... the Holy War was nothing more than a long act of intolerance in the name of God’.

সাম্প্রতিককালের ঐতিহাসিক Thomas Madden মনে করেন 'the crusade, first and foremost, was a war against Muslims for the defense of the Christian faith... They began as a result of a Muslim conquest of Christian territories.' Madden বলেন, প্রথম ক্রুসেড আহ্বানকারী পোপ আরবানের ঘোষণা ছিল 'the Christians of the East must be free from the brutal and humiliating conditions of Muslim rule.' অর্থাৎ, ধর্ম নয়, রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণই ছিল মূল লক্ষ্য।

আমেরিকান সাংবাদিক Alexander Cockburn প্রেসিডেন্ট বুশের ‘ক্রুসেড’ মন্তব্য সম্পর্কে লিখতে গিয়ে একে ‘দশম ক্রুসেড’ আখ্যা দিয়েছেন। পোপ ফ্রন্সিস ২০১৪ সালে আইএসের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর আহ্বান জানালে আরেকজন প্রখ্যাত আমেরিকান সাংবাদিক Max Fisher তাকেও ‘দশম ক্রুসেড’-এর ডাক বলে অভিহিত করেছেন।

‘এই ক্রুসেড’ ও ‘সেই ক্রুসেড’ কি এক সূত্রে গাঁথা? উভয়ের চরিত্র ও লক্ষ্যও কি অভিন্ন? এ নিয়ে আমরা বারান্তরে আলোচনা করব।

ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক

shapshin@gtlbd.com


 

সাবমিট

এই ক্রুসেড- সেই ক্রুসেড

 ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী 
০৮ অক্টোবর ২০১৫, ১২:০০ এএম  | 

এখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ‘জঙ্গি’ নিধন চলছে। কারা এই জঙ্গি? আফগানিস্তানের আল কায়দা ও তালেবান দিয়ে শুরু, এখন ‘আইএস’ এবং তার ছায়া-উপচ্ছায়া। এই নিধনযজ্ঞে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর কোয়ালিশনে এখন প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে যুক্ত হয়েছে পৃথিবীর প্রায় সব ধনী দেশ।

এর লক্ষ্য কি জঙ্গি নির্মূল করা? নাকি মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান দেশগুলোতে নাক গলিয়ে তাদের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই উস্কে দিয়ে সেখানে ‘বরের ঘরের মাসী, কনের ঘরের পিসী’ হয়ে হামলা চালানোর ক্ষেত্র তৈরি করা?

যুক্তরাষ্ট্রের চরম রক্ষণশীল মৌলবাদী গোষ্ঠীর ‘থিংক-ট্যাংক’ নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আভাস দিয়েছিল- গোটা একবিংশ শতাব্দীজুড়ে চলবে তথাকথিত ‘Clash of Civilization’, দুই সভ্যতার লড়াই, একদিকে থাকবে পশ্চিমা সভ্যতা, অপরদিকে মুসলিম ও চৈনিক সভ্যতা। মাঝখানে গ্রে-এরিয়াতে থাকবে রাশিয়া ও ভারত।

কী আশ্চর্য। ঠিক একবিংশ শতাব্দীর সূচনাতেই, ২০০১ সালে, ঘটে গেল টুইন টাওয়ার হামলা। তারপরই শুরু হয়ে গেল ইসলাম ও মুসলমানকে জঙ্গিবাদের ধারক বানিয়ে চানমারির টার্গেট করে তথাকথিত 'Legal War on Terror (LWOT)'। (এখানে ‘Legal’ শব্দটার প্রয়োগ লক্ষণীয়। ওটা যে মোটেই ‘Legal’ নয়, সেই মর্ম-গ্লানি ঢাকার জন্যই কি এ শব্দটির প্রয়োগ?)

তবে, বাস্তবতা হচ্ছে ‘জঙ্গিবাদ’ ঠেকানোর জন্য পশ্চিমের এই সমরাভিযান এখন পর্যন্ত কোনো কাজে আসছে বলে মনে হচ্ছে না। বরঞ্চ হিতে বিপরীত ঘটিয়ে গোটা বিশ্বকেই জঙ্গিবাদের চারণক্ষেত্রে পরিণত করা হচ্ছে। অপরদিকে মুসলমান জঙ্গিদের বিপরীতে নানারূপে আবির্ভূত হচ্ছে নব্য খ্রিস্টান মৌলবাদ। যা হাজার বছর আগেকার ক্রুসেড বা খ্রিস্টীয় ধর্মযুদ্ধের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ মন্তব্য করেছিলেন- ‘শুরু হল নতুন ক্রুসেড’ (This Crusade, this war on terror is going to take a while)। এর মধ্য দিয়ে কি পশ্চিমের রক্ষণশীল খ্রিস্টানত্বের অন্তরের ভাষার প্রকাশ ঘটেছিল?

‘ক্রুসেড’-এর ইতিহাস তো কম-বেশি সবারই জানা। তবু আজকের দিনের নবীন পাঠকদের জন্য তার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরার চেষ্টা করব।

মদীনায় মুসলমান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তা অতি দ্রুত বিস্তার লাভ করে একাদশ শতাব্দী নাগাদ প্রায় গোটা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল মুসলমান শাসনের অধীনস্থ হয়ে পড়ে। পবিত্র নগরী জেরুজালেমও মুসলমানদের করায়ত্ত হয়। এই মুসলমান আধিপত্য ইউরোপের অবশিষ্ট অঞ্চলের খ্রিস্টান শাসকদের ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই পটভূমিতে পুণ্যভূমি জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের ডাক দিলে খ্রিস্টান জগতে অভূতপূর্ব সাড়া জাগে।

ইতিহাসে ৪টি প্রধান এবং আরও কয়েকটি অপ্রধান ক্রুসেডের বিবরণ পাওয়া যায়।

প্রথম ক্রুসেড (১০৯৬-৯৯)

১০৯৫ সালে কনস্টান্টিনোপলের (বর্তমান তুরস্কের ইস্তান্বুল) সম্রাট অষবীরঁং তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য পোপ টৎনধহ ওও-কে পশ্চিমের দেশগুলো থেকে যোদ্ধা সংগ্রহ করে পাঠাতে অনুরোধ জানান। ওই সময় পূর্ব ও পশ্চিমের খ্রিস্টানদের মধ্যে প্রবল বিরোধ থাকা সত্ত্বেও পোপ তার অনুগত পশ্চিমের খ্রিস্টানদের মুসলমানদের হাত থেকে ‘পবিত্র স্থান’ পুনরুদ্ধার করার জন্য অস্ত্র ধারণ করার আহ্বান জানান। বলা হয়, এ ধর্মযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যে যোদ্ধারা জেরুজালেমের গির্জায় প্রবেশ করতে পারবে, তারা চার্চের পবিত্র ক্রুশ চিহ্ন ধারণ করার এবং যিশুর লোক হিসেবে সরাসরি স্বর্গে প্রবেশের অধিকার পাবে। (আইএস জঙ্গিরাও কি একই প্রলোভন দেখায় না?)। এতে প্রচণ্ড সাড়া পাওয়া যায়। পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন ছোট-বড় রাজ-রাজরা এতে সাড়া দেন। হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও ভাড়াটে যোদ্ধা জড়ো হয়ে ৪টি অস্ত্রসজ্জিত বিশাল বাহিনী গড়ে ওঠে। ১০৯৬ সালের আগস্টে এসব বাহিনী বাইজেন্টাইন যাত্রা শুরু করে। এই সুসজ্জিত বাহিনীকে পাশ কাটিয়ে কিছু অতি উৎসাহী ‘নাইট’ (রাজার প্রতি অনুগত অপেশাদার যোদ্ধা) সাধারণ মানুষদের একটি বাহিনী নিয়ে আগেভাগে বসফরাস প্রণালী অতিক্রম করে মুসলিম বাহিনীর মুখোমুখি হয় এবং সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত হয়। এরকম আরেকটি ক্রুসেডার বাহিনী রাইনল্যান্ডে বিভিন্ন শহরে ইহুদিদের ওপর বেপরোয়া হামলা চালায়। যা ইহুদি-খ্রিস্টান সম্পর্কে মারাত্মক অবনতি ঘটায়।

মূল চার ক্রুসেডার বাহিনী কনস্টান্টিনোপল পৌঁছার পর সম্রাট আলেকসিয়াস তাদের নেতাদের এই মর্মে ওয়াদা করতে বলেন যে, তুর্কি এবং অন্যদের কাছ থেকে যেসব এলাকা তারা দখল করতে পারবে সেগুলো তার অধীনস্থ হবে। একটি বাহিনীর নেতা তাতে রাজি হলেও অপর তিন বাহিনীর নেতা তাতে রাজি হল না। তা সত্ত্বেও বাইজেন্টাইন ও ক্রুসেডারদের সম্মিলিত বাহিনী প্রথমে সেলজুক তুর্কিদের রাজধানী (বর্তমান তুরস্কের ইজনিক শহর) দখল করে সিরিয়ার ওপর দিয়ে এগিয়ে গিয়ে জেরুজালেম পৌঁছাতে সক্ষম হয়। জেরুজালেম তখন মিসরীয় ফাতেমি শাসকদের অধীনে ছিল। ফাতেমিরা ছিল শিয়া আর সেলজুকরা সুন্নি। দুয়ের মধ্যে প্রচণ্ড বৈরিতা। এই বৈরিতার পরিপূর্ণ সুযোগ পেয়েছে ক্রুসেডাররা। (পাঠক কি আজকের ইরাক-সিরিয়ায় সেই একই দৃশ্য দেখতে পাচ্ছেন?)। জেরুজালেমের মুসলমান শাসক ক্রুসেডারদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু আত্মসমর্পণের শর্ত ভঙ্গ করে শুরু হয়ে যায় নগরজুড়ে ব্যাপক ও নির্মম হত্যাযজ্ঞ- নারী-শিশু নির্বিশেষে এবং লুণ্ঠন। (এটাই ধর্মযুদ্ধ!)।

ক্রুসেডার রাষ্ট্রসমূহ এবং দ্বিতীয় ক্রুসেড (১১৪৭-৪৯)

বিজয়ী ক্রুসেডার বাহিনী চারটি এলাকায় কর্তৃত্ব স্থাপন করতে সক্ষম হয়- জেরুজালেম, এডেসা, অ্যানটিওচ ও ত্রিপলি (লিবিয়ার ত্রিপলি নয়, ভূমধ্যসাগরের পূর্বতীরে একটি বন্দর)। ১১৩০ সালে মুসলিম বাহিনী পাল্টা ‘জিহাদ’ শুরু করে এবং মসুলের শাসক সেলজুক সেনাপতি জাঙ্গি ১১৪৭ সালে এডেসা থেকে খ্রিস্টানদের বিতাড়িত করে দিলে ইউরোপের খ্রিস্টান শাসকরা বিচলিত হয়ে পড়েন এবং দ্বিতীয় ক্রুসেডের প্রস্তুতি শুরু হয়। ফ্রান্সের রাজা খড়ঁরং ঠওও ও জার্মানির রাজা Conrad III-এর নেতৃত্বে ১১৪৭ সালে দ্বিতীয় ক্রুসেড শুরু হয়। প্রথমে কনরাডের বাহিনী তুর্কী বাহিনীর হাতে সম্পূর্ণ নাস্তানাবুদ হয়ে যায়। এরপর লুইস ও কনরাড যৌথভাবে জেরুজালেমে প্রায় ৫০ হাজার ক্রুসেডার একত্রিত করে দামেস্ক আক্রমণ করলে দামেস্কের শাসক মসুলে জাঙ্গির উত্তরসূরি নূর আল্-দীনের সহায়তা কামনা করেন। সম্মিলিত মুসলিম বাহিনীর কাছে ক্রুসেডার বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলে ক্রুসেডার বাহিনী জেরুজালেমে ফিরে যেতে বাধ্য হয় এবং এভাবে দ্বিতীয় ক্রুসেড সমাপ্ত হয়।

তৃতীয় ক্রুসেড (১১৮৯-৯২)

জেরুজালেম থেকে ক্রুসেডাররা বারংবার মিসরে হামলা চালিয়ে সেখানে নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলতে থাকলে মসুলের শাসক নূর আল্দীন তার সেনাপতি শিরকুহ এবং ভাতিজা সালাউদ্দীনের নেতৃত্বে এক বাহিনী সেখানে পাঠান। এই বাহিনী পঠিয়ে সেখান থেকে ক্রুসেডারদের বিতাড়িত করে এবং শিরকুহ কায়রোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। শিরকুহ মৃত্যুবরণ করলে সালাউদ্দীন মিসরের কর্তৃত্বে চলে আসেন। ১১৭৪ সালে চাচা নূর আল্দীনের মৃত্যুর পর তিনি ক্রুসেডারদের জেরুজালেম রাজ্য আক্রমণ করেন। জেরুজালেমের খ্রিস্টান বাহিনী হাত্তিনের যুদ্ধে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয় এবং সালাউদ্দীন জেরুজালেম ও তার সন্নিহিত এলাকায় তার শাসন কায়েম করেন। এ ঘটনা তৃতীয় ক্রুসেডের সূত্রপাত ঘটায়।

জার্মানির সম্রাট ফ্রেডরিক বার্বাদোসা, ফ্রান্সের রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ এবং ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম রিচার্ডের নেতৃত্বে ক্রুসেডার বাহিনী সিরিয়ার উদ্দেশে অগ্রসর হয়। পথিমধ্যে আনাতোলিয়ায় বার্বাদোসা পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করেন। রাজা রিচার্ডের বাহিনী ১১৯১ সালের সেপ্টেম্বরে আরসুফের যুদ্ধে সালাউদ্দীনের বাহিনীকে পরাজিত করে। রিচার্ড অতঃপর জেরুজালেমের দিকে অগ্রসর হন। কিন্তু তিনি জেরুজালেম আক্রমণ করতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন। বেশ কয়েক মাস মুখোমুখি অবস্থানের পর ১১৯২ সালের সেপ্টেম্বরে রিচার্ড ও সালাউদ্দীন শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। এতে জেরুজালেম শহর বাদ দিয়ে জেরুজালেম রাজ্য পুনঃস্থাপিত হয়।

চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ ক্রুসেড (১১৯৮-১২২৯)

পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট ১১৯৮ সালে চতুর্থ ক্রুসেডের ডাক দেন। কিন্তু ইউরোপ ও বাইজেন্টাইনের ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ক্রুসেডারদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় বাইজেন্টাইন সম্রাট তৃতীয় অ্যালেক্সিয়াসের স্থলে তার ভাতিজাকে সিংহাসনে বসানো। এতে তারা সফল হয় (১২০৩)। বিনিময়ে নতুন সম্রাট চতুর্থ অ্যালেক্সিয়াস বাইজেন্টাইন চার্চকে রোমের অধীনস্থ করার চেষ্টা করলে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হন। ১২০৪ সালে এক প্রাসাদ অভ্যুত্থানে তিনি নিহত হন। ক্রুসেডাররা তখন কনস্টান্টিনোপল আক্রমণ করে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিশাল ও মনোরম রাজধানী শহরটি দখল করে সম্পূর্ণ লণ্ডভণ্ড করে ফেলে। তারা সেখানে রোমান চার্চের প্রতিদ্বন্দ্বী ‘ইস্টার্ণ অর্থডক্স’ চার্চের বহু ভবন আগুন লাগিয়ে ভস্মীভূত করে, চার্চের যাজক ও নান্দের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালায়। এভাবেই ৪র্থ ক্রুসেড সমাপ্ত হয়।

ত্রয়োদশ শতাব্দীর অবশিষ্ট দিনগুলোতে অনেকগুলো ‘ছোটখাটো ক্রুসেড’ চালানো হয়। এ সবের লক্ষ্য যত না মুসলিম আধিপত্যের বিরুদ্ধে ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল খ্রিস্টান ‘ধর্মদ্রোহী’দের বিরুদ্ধে। ১২০৮ থেকে ১২২৯ সাল পর্যন্ত চলেছে ‘আলবিগেন্সিয়ান ক্রুসেড’, যার লক্ষ্য ছিল ফ্রান্সের ভিন্নমতাবলম্বী কাথারি বা আলবিগেন্সিয়ান খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে। ১২১১ থেকে ১২২৫ পর্যন্ত ক্রুসেড চলেছে প্যাগান ট্রানসিলভেনিয়ার বিরুদ্ধে।

পোপ তৃতীয় ইনোসেন্ট ১২১৬ সালে তার মৃত্যুর আগে পঞ্চম ক্রুসেডের ডাক দেন। এবারে ক্রুসেডাররা স্থল ও সমুদ্র উভয় পথে মিসর আক্রমণ করে। কিন্তু তাদের ১২২১ সালে সালাউদ্দীনের ভাতিজা আল-মালিক আল কামালের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনীর কাছে পরাজয় বরণ করতে হয়।

১২২৯ সালে ষষ্ঠ ক্রুসেড শুরু করেন সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রেডরিক। তিনি আল-কামালের সঙ্গে ১০ বছরের শান্তিচুক্তি করে বিনিময়ে জেরুজালেম নগরীতে ক্রুসেডারদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হন। এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে জেরুজালেম আবার মুসলমানদের কর্তৃত্বে চলে যায়।

ক্রুসেডের সমাপ্তি

ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন ক্রুসেডার গ্রুপ জেরুজালেম দখল করার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। ‘সপ্তম ক্রুসেডে’ (১২৩৯-৪১) শ্যাম্পেইনের রাজা Thibault IV জেরুজালেম দখল করতে সক্ষম হন। কিন্তু ১২৪৪ সালে মিসরের সুলতান তাকে সেখান থেকে হটিয়ে দিতে সক্ষম হন।

১২৪৯ সালে ফ্রান্সের রাজা Louis IX মিসরের বিরুদ্ধে ‘অষ্টম ক্রুসেড’-এর সূচনা করে পরের বছর মানসুরার যুদ্ধে পরাজিত হন। এ সময় মিসরে মামলুক রাজবংশের পত্তন ঘটে। মামলুক বাহিনী ১২৬০ সালে প্যালেস্টাইনে চেংগিস খানের মোংগোল বাহিনীর গতিরোধ করতে সক্ষম হয়। চেংগিস খান ও তার উত্তরাধিকারীরা খ্রিস্টান শক্তির মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়। মামলুক সুলতান বায়বার ১২৬৮ সালে খ্রিস্টার এন্টিওচ রাজ্য আক্রমণ করে বিধ্বস্ত করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে Louis IX আরেকটি ক্রুসেডের সূচনা করেন। উত্তর আফ্রিকায় তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যার সমাপ্তি ঘটে। এরপর নতুর মামলুক সুলতান কালাওয়ান ১২৮১ সালে মোংগোলদের সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত করে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন। ১২৯০ সালে ক্রুসেডার রাজ্যসমূহের শেষ অবস্থানগুলো রক্ষার জন্য ভেনিস ও আরাগন থেকে এক বিশাল নৌবাহিনী আগমন করে। পরের বছর সুলতান কালাওয়ানের ছেলে আল আশরাফ খলিল এক বিশাল বাহিনী নিয়ে ভূমধ্যসাগর উপকূলে ক্রুসেডারদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি আক্রে বন্দর আক্রমণ করেন। সাত সপ্তাহ অবরুদ্ধ থাকার পর আক্রে বন্দর দখল হলে প্রায় দুই শতাব্দীকালের ক্রুসেডের অবসান ঘটে। অতঃপর জেরুজালেমে মুসলিম আধিপত্য বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বজায় থাকে।

পাদটীকা

অষ্টাদশ শতাব্দীর 'Enlightenment scholar' স্যার স্টিভেন রানচিমেন (Sir Steven Runciman) ‘ক্রুসেড’-এর নৈতিকতা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। তার ভাষায় ‘High ideals were besmirched by cruelty and greed ... the Holy War was nothing more than a long act of intolerance in the name of God’.

সাম্প্রতিককালের ঐতিহাসিক Thomas Madden মনে করেন 'the crusade, first and foremost, was a war against Muslims for the defense of the Christian faith... They began as a result of a Muslim conquest of Christian territories.' Madden বলেন, প্রথম ক্রুসেড আহ্বানকারী পোপ আরবানের ঘোষণা ছিল 'the Christians of the East must be free from the brutal and humiliating conditions of Muslim rule.' অর্থাৎ, ধর্ম নয়, রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণই ছিল মূল লক্ষ্য।

আমেরিকান সাংবাদিক Alexander Cockburn প্রেসিডেন্ট বুশের ‘ক্রুসেড’ মন্তব্য সম্পর্কে লিখতে গিয়ে একে ‘দশম ক্রুসেড’ আখ্যা দিয়েছেন। পোপ ফ্রন্সিস ২০১৪ সালে আইএসের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর আহ্বান জানালে আরেকজন প্রখ্যাত আমেরিকান সাংবাদিক Max Fisher তাকেও ‘দশম ক্রুসেড’-এর ডাক বলে অভিহিত করেছেন।

‘এই ক্রুসেড’ ও ‘সেই ক্রুসেড’ কি এক সূত্রে গাঁথা? উভয়ের চরিত্র ও লক্ষ্যও কি অভিন্ন? এ নিয়ে আমরা বারান্তরে আলোচনা করব।

ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক

shapshin@gtlbd.com


 

 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র