jugantor
স্বদেশ ভাবনা
পৌর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ঘুরে দাঁড়াক নির্বাচন কমিশন

  আবদুল লতিফ মন্ডল  

১০ ডিসেম্বর ২০১৫, ০০:০০:০০  | 

পৌরসভা নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে। আগামী ৩০ ডিসেম্বর ২৩৫টি পৌরসভায় অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ তারিখ ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩ হাজার ৬৮৯ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে প্রার্থী সংখ্যা যথাক্রমে ১২২৩, ৯৭৯৮ ও ২৬৬৮ জন। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় সূত্রের বরাত দিয়ে ৫ ডিসেম্বর পত্রপত্রিকায় এসব তথ্য প্রকাশিত হয়। তবে ৫ ও ৬ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পর এসব পদে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা কমেছে। মেয়র পদে দেড়শ’র বেশি প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৮-তে। কমেছে কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে প্রার্থীর সংখ্যা। তবে রিটার্নিং অফিসার পর্যায়ে যাদের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষিত হয়েছে, তারা আপিল করার সুযোগ পাবেন। আপিলে যাদের মনোনয়নপত্র বৈধ বলে বিবেচিত হবে, তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন।

নির্দলীয়ভাবে পৌরসভার প্রধান নির্বাহী পদে নির্বাচনের সোয়াশ’ বছরের ঐতিহ্যের অবসান ঘটিয়ে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে পদটিতে (বর্তমানে মেয়র পদ) রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন ও প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নির্বাচন। অবশ্য পৌরসভার কাউন্সিলর পদে আগের মতোই নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন হবে। উল্লেখ্য, আমাদের এ উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনামলে লর্ড রিপনের সময় ১৮৮৪ সালে বেঙ্গল মিউনিসিপাল অ্যাক্ট পাস হয়। গঠিত পৌরসভায় সে সময় কমিশনারদের দুই-তৃতীয়াংশ নির্বাচিত এবং এক-তৃতীয়াংশ সরকার কর্তৃক মনোনীত হতেন। কমিশনাররা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যান ও একজনকে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন করতেন। সময়ের বিবর্তনে পৌরসভার কাঠামো এবং নির্বাচিত ব্যক্তিদের পদ ও পদবিতে পরিবর্তন এলেও এতদিন পৌরসভার প্রধান নির্বাহী পদে নির্দলীয়ভাবে নির্বাচনে কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে তিনটি বড় দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ মাত্র ২০টি দল আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বলে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ নিবন্ধিত দলগুলোর অর্ধেক পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। এ প্রসঙ্গে এটা বলা বোধহয় অত্যুক্তি হবে না যে, নিবন্ধিত অনেক দলের তেমন কোনো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক মতবাদ ও কর্মসূচি নেই। তাছাড়া এসব দল মূলত রাজধানীভিত্তিক। রাজধানীর বাইরে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে তাদের কোনো সংগঠন নেই বললেই চলে। এদের অনেকে বড় দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করে। রাজনৈতিক পালাবদলের সময় এরা বড় দলগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধে। এদের কেউ কেউ নিজেদের প্রতীকের বদলে বড় দলের নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে। সুযোগ বুঝে বড় দলগুলো এদের খেয়ালখুশিমতো ব্যবহার করে।

গণতন্ত্রের প্রসার ও উন্নয়নে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিকল্প নেই, তা সে নির্বাচন জাতীয় পর্যায়ের হোক কিংবা স্থানীয় সরকার পর্যায়ের। একমাত্র অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি নির্বাচন সম্ভব। তাই তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্রের প্রসার ও শক্তিশালীকরণে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের গুরুত্ব অপরিসীম। এ বিষয়ে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে আমাদের যা স্মরণে আসে তা হল, জাতীয় ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের নির্বাচন কমিশন ছাড়া আগের দলীয় বা সামরিক শাসকদের আমলের কমিশনগুলোর ভূমিকা গৌরবময় নয়। তারা জাতীয় বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারেননি। নির্বাচন কমিশনের চেয়ে ক্ষমতাসীন সরকার নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া বেশি নিয়ন্ত্রণ করেছে। বস্তুত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের স্বপ্ন স্বাধীনতার ঊষালগ্নেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও প্রশাসনযন্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। কোনো কোনো আসনে বিরোধী প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য করারও অভিযোগ ওঠে। ১১টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। নির্বাচন কমিশন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। মোট ৩০০ আসনের ২৯৩টিতেই বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ১৫ বছর অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসকরা প্রথমে তাদের ক্ষমতা দখলকে তথাকথিত বৈধতা দেয়ার জন্য ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ গণভোট অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় রায় নিজের পক্ষে নেন, এরপর তারা বেসামরিক লেবাস পরে যেসব সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন, সেগুলোর ফলাফল ছিল পূর্বনির্ধারিত। নির্বাচনের ফলাফল আগে থেকেই ছকে বাঁধা থাকায় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তা কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। এ ধরনের পূর্বনির্ধারিত প্রহসনের নির্বাচনগুলোর কারণে নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে (২০০৯-১৩) ২০১২ সালের প্রথম দিকে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত হয় বর্তমান নির্বাচন কমিশন। এ কমিশনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক একাধিক কমিশনার নিয়োগের অভিযোগ ওঠে। কমিশন ২০১৩ সালের মাঝামাঝি রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, খুলনা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনগুলোর নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে অনুষ্ঠানে সক্ষম হলেও তারা এ নিরপেক্ষতা বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি। পরে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানে কমিশন পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। কমিশন তাদের মেয়াদের প্রথমদিকে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানে সক্ষম হলেও পরবর্তী সময় কী কারণে জাতীয় পর্যায়ে এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার দুটি স্তরে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হল, তার জবাব কমিশনই ভালো জানে। তবে জনগণের কাছে নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি যে তলানিতে ঠেকেছে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন এরই মধ্যে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। বিএনপি এরই মধ্যে অভিযোগ করেছে, মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক স্থানেই তাদের প্রার্থীরা বাধার মুখে পড়েছেন। শাসক দল আওয়ামী লীগের এমপিদের আচরণ বিধিমালা ভঙ্গের অভিযোগ তো রয়েছেই। বিশিষ্টজনদের মতে, নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে আচরণ বিধিমালা ভঙ্গের ঘটনা তত বাড়বে। কালো টাকা ও পেশিশক্তির ব্যবহার বন্ধ করা তো কমিশনের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছেই।

তাই নির্বাচন কমিশন আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানে সক্ষম হবে কিনা, তা নিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্টজনের মাঝে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘এক্স-রে করে দেখুন আপনাদের মেরুদণ্ড ঠিক আছে কিনা। আপনাদের মেরুদণ্ড আছে কী নাই, তা প্রমাণের এটিই ভালো সময়। এই পৌরসভা নির্বাচনেই প্রমাণ হবে কমিশন স্বাধীন না পরাধীন।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেছেন, ‘আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন যে কমিশন পরিচালনা করবে, তার নিরপেক্ষতা নিয়ে অনেক কথা রয়েছে। বলা হচ্ছে, এ কমিশন সরকারের একটি ক্যাডার বাহিনী, তাদের একটি অঙ্গসংগঠন। এ নির্বাচন কীভাবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে, তা নির্বাচন কমিশনের জন্য একটা অগ্নিপরীক্ষা।’

কিছুটা হলেও আশার কথা যে, নির্বাচন কমিশনের মধ্যে তাদের দুর্বলতা সম্পর্কে উপলব্ধি এসেছে এবং কমিশন ত্রুটি-বিচ্যুতিমুক্ত পৌরসভা নির্বাচন সম্পন্নের ঘোষণা দিয়েছে। কমিশনের একজন সদস্য সম্প্রতি বলেছেন, অতীতে কিছুটা ত্রুটি-বিচ্যুতি হলেও আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষের দিকে। তাই তাদের কিছু হারানোর ভয় নেই। ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচন ও পরবর্তী সময় উপজেলা এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে কমিশনকে যে গ্লানি বহন করতে হচ্ছে, পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তারা সে গ্লানি কিছুটা হলেও মুছে দিতে পারে। জনগণের প্রত্যাশা, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পৌরসভা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ঘুরে দাঁড়াক নির্বাচন কমিশন।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

৮ ডিসেম্বর ২০১৫

latifm43@gmail.com


 

সাবমিট
স্বদেশ ভাবনা

পৌর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ঘুরে দাঁড়াক নির্বাচন কমিশন

 আবদুল লতিফ মন্ডল 
১০ ডিসেম্বর ২০১৫, ১২:০০ এএম  | 

পৌরসভা নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে। আগামী ৩০ ডিসেম্বর ২৩৫টি পৌরসভায় অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ তারিখ ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩ হাজার ৬৮৯ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে প্রার্থী সংখ্যা যথাক্রমে ১২২৩, ৯৭৯৮ ও ২৬৬৮ জন। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় সূত্রের বরাত দিয়ে ৫ ডিসেম্বর পত্রপত্রিকায় এসব তথ্য প্রকাশিত হয়। তবে ৫ ও ৬ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পর এসব পদে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা কমেছে। মেয়র পদে দেড়শ’র বেশি প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৮-তে। কমেছে কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে প্রার্থীর সংখ্যা। তবে রিটার্নিং অফিসার পর্যায়ে যাদের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষিত হয়েছে, তারা আপিল করার সুযোগ পাবেন। আপিলে যাদের মনোনয়নপত্র বৈধ বলে বিবেচিত হবে, তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন।

নির্দলীয়ভাবে পৌরসভার প্রধান নির্বাহী পদে নির্বাচনের সোয়াশ’ বছরের ঐতিহ্যের অবসান ঘটিয়ে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে পদটিতে (বর্তমানে মেয়র পদ) রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন ও প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নির্বাচন। অবশ্য পৌরসভার কাউন্সিলর পদে আগের মতোই নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন হবে। উল্লেখ্য, আমাদের এ উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনামলে লর্ড রিপনের সময় ১৮৮৪ সালে বেঙ্গল মিউনিসিপাল অ্যাক্ট পাস হয়। গঠিত পৌরসভায় সে সময় কমিশনারদের দুই-তৃতীয়াংশ নির্বাচিত এবং এক-তৃতীয়াংশ সরকার কর্তৃক মনোনীত হতেন। কমিশনাররা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যান ও একজনকে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচন করতেন। সময়ের বিবর্তনে পৌরসভার কাঠামো এবং নির্বাচিত ব্যক্তিদের পদ ও পদবিতে পরিবর্তন এলেও এতদিন পৌরসভার প্রধান নির্বাহী পদে নির্দলীয়ভাবে নির্বাচনে কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি।

নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে তিনটি বড় দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ মাত্র ২০টি দল আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বলে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ নিবন্ধিত দলগুলোর অর্ধেক পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। এ প্রসঙ্গে এটা বলা বোধহয় অত্যুক্তি হবে না যে, নিবন্ধিত অনেক দলের তেমন কোনো সুস্পষ্ট রাজনৈতিক মতবাদ ও কর্মসূচি নেই। তাছাড়া এসব দল মূলত রাজধানীভিত্তিক। রাজধানীর বাইরে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে তাদের কোনো সংগঠন নেই বললেই চলে। এদের অনেকে বড় দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি করে। রাজনৈতিক পালাবদলের সময় এরা বড় দলগুলোর সঙ্গে জোট বাঁধে। এদের কেউ কেউ নিজেদের প্রতীকের বদলে বড় দলের নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে। সুযোগ বুঝে বড় দলগুলো এদের খেয়ালখুশিমতো ব্যবহার করে।

গণতন্ত্রের প্রসার ও উন্নয়নে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিকল্প নেই, তা সে নির্বাচন জাতীয় পর্যায়ের হোক কিংবা স্থানীয় সরকার পর্যায়ের। একমাত্র অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি নির্বাচন সম্ভব। তাই তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্রের প্রসার ও শক্তিশালীকরণে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের গুরুত্ব অপরিসীম। এ বিষয়ে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে আমাদের যা স্মরণে আসে তা হল, জাতীয় ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের নির্বাচন কমিশন ছাড়া আগের দলীয় বা সামরিক শাসকদের আমলের কমিশনগুলোর ভূমিকা গৌরবময় নয়। তারা জাতীয় বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারেননি। নির্বাচন কমিশনের চেয়ে ক্ষমতাসীন সরকার নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া বেশি নিয়ন্ত্রণ করেছে। বস্তুত অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের স্বপ্ন স্বাধীনতার ঊষালগ্নেই ধূলিসাৎ হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও প্রশাসনযন্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। কোনো কোনো আসনে বিরোধী প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে বাধ্য করারও অভিযোগ ওঠে। ১১টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। নির্বাচন কমিশন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। মোট ৩০০ আসনের ২৯৩টিতেই বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ১৫ বছর অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসকরা প্রথমে তাদের ক্ষমতা দখলকে তথাকথিত বৈধতা দেয়ার জন্য ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ গণভোট অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে নির্বাচন কমিশনের সহায়তায় রায় নিজের পক্ষে নেন, এরপর তারা বেসামরিক লেবাস পরে যেসব সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন, সেগুলোর ফলাফল ছিল পূর্বনির্ধারিত। নির্বাচনের ফলাফল আগে থেকেই ছকে বাঁধা থাকায় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তা কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। এ ধরনের পূর্বনির্ধারিত প্রহসনের নির্বাচনগুলোর কারণে নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে (২০০৯-১৩) ২০১২ সালের প্রথম দিকে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত হয় বর্তমান নির্বাচন কমিশন। এ কমিশনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কট্টর সমর্থক একাধিক কমিশনার নিয়োগের অভিযোগ ওঠে। কমিশন ২০১৩ সালের মাঝামাঝি রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, খুলনা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনগুলোর নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে অনুষ্ঠানে সক্ষম হলেও তারা এ নিরপেক্ষতা বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি। পরে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানে কমিশন পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। কমিশন তাদের মেয়াদের প্রথমদিকে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানে সক্ষম হলেও পরবর্তী সময় কী কারণে জাতীয় পর্যায়ে এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার দুটি স্তরে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থ হল, তার জবাব কমিশনই ভালো জানে। তবে জনগণের কাছে নির্বাচন কমিশনের ভাবমূর্তি যে তলানিতে ঠেকেছে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন এরই মধ্যে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। বিএনপি এরই মধ্যে অভিযোগ করেছে, মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক স্থানেই তাদের প্রার্থীরা বাধার মুখে পড়েছেন। শাসক দল আওয়ামী লীগের এমপিদের আচরণ বিধিমালা ভঙ্গের অভিযোগ তো রয়েছেই। বিশিষ্টজনদের মতে, নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে আচরণ বিধিমালা ভঙ্গের ঘটনা তত বাড়বে। কালো টাকা ও পেশিশক্তির ব্যবহার বন্ধ করা তো কমিশনের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছেই।

তাই নির্বাচন কমিশন আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানে সক্ষম হবে কিনা, তা নিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিশিষ্টজনের মাঝে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘এক্স-রে করে দেখুন আপনাদের মেরুদণ্ড ঠিক আছে কিনা। আপনাদের মেরুদণ্ড আছে কী নাই, তা প্রমাণের এটিই ভালো সময়। এই পৌরসভা নির্বাচনেই প্রমাণ হবে কমিশন স্বাধীন না পরাধীন।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেছেন, ‘আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন যে কমিশন পরিচালনা করবে, তার নিরপেক্ষতা নিয়ে অনেক কথা রয়েছে। বলা হচ্ছে, এ কমিশন সরকারের একটি ক্যাডার বাহিনী, তাদের একটি অঙ্গসংগঠন। এ নির্বাচন কীভাবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে, তা নির্বাচন কমিশনের জন্য একটা অগ্নিপরীক্ষা।’

কিছুটা হলেও আশার কথা যে, নির্বাচন কমিশনের মধ্যে তাদের দুর্বলতা সম্পর্কে উপলব্ধি এসেছে এবং কমিশন ত্রুটি-বিচ্যুতিমুক্ত পৌরসভা নির্বাচন সম্পন্নের ঘোষণা দিয়েছে। কমিশনের একজন সদস্য সম্প্রতি বলেছেন, অতীতে কিছুটা ত্রুটি-বিচ্যুতি হলেও আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষের দিকে। তাই তাদের কিছু হারানোর ভয় নেই। ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচন ও পরবর্তী সময় উপজেলা এবং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে কমিশনকে যে গ্লানি বহন করতে হচ্ছে, পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তারা সে গ্লানি কিছুটা হলেও মুছে দিতে পারে। জনগণের প্রত্যাশা, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পৌরসভা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ঘুরে দাঁড়াক নির্বাচন কমিশন।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

৮ ডিসেম্বর ২০১৫

latifm43@gmail.com


 

 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র