jugantor
মানবাধিকার দিবস ২০১৫
মানবাধিকারের শিক্ষাটি কেমন হওয়া উচিত

  কাজী ফারুক আহমেদ  

১০ ডিসেম্বর ২০১৫, ০০:০০:০০  | 

আজ ১০ ডিসেম্বর সার্বজনীন মানবাধিকার দিবস। ১৯৪৮ সালের এদিনে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ৩০টি ধারা সংবলিত ঘোষণা গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালে সাধারণ পরিষদে প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর দিবসটি পালনের জন্য সব রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এ বছর দিবসটি উপলক্ষে এক বাণীতে বলেন, যেসব অমূল্য নীতিমালা সমুন্নত রাখতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, বিশ্বব্যাপী ব্যাপক নৃশংসতা ও লংঘনের ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে তার সপক্ষে অধিকতর আন্তর্জাতিক সক্রিয় কার্যক্রম সন্নিবেশ করতে হবে। জাতিসংঘের ৭০ বছর পূর্তিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আধুনিক মানবাধিকার আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিতে হবে। বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান এ বছরের মানবাধিকার দিবস প্রসঙ্গে বলেছেন, মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসীদের হত্যা, ধর্মীয় চরম পন্থা ও সাম্প্রদায়িক অসন্তোষ সৃষ্টিতে উসকানি, মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ও যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি মৌন সমর্থন মানবিক মর্যাদাকে হেয় করছে যা কাম্য নয়; এসবের কার্যকর প্রতিকার হওয়া দরকার। মানবাধিকার কমিশনের পূর্ণকালীন সদস্য কাজী রিয়াজুল হকও সম্প্রতি ঢাকার বাইরে এক আলোচনা সভায় বলেছেন, পরিবার ও সমাজ থেকেই মানবাধিকার রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

আমি এসব বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্ববহ মনে করি। পরিবার থেকেই এ উদ্যোগের সূচনা হওয়া দরকার এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের কাক্সিক্ষত ভূমিকা সেজন্য অপরিহার্য। নারী ও শিশু নির্যাতন, মানব পাচার, সীমান্তে মানুষ হত্যা, দেশের ভেতরে গণপিটুনিতে হত্যা, গুমের ঘটনা সব ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। এ নিয়ে বিতর্ক নেই যে, প্রতিবন্ধীদের প্রাপ্য অধিকার, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনগণের স্বীকৃতি এবং মর্যাদা এখনও বহুলাংশে অর্জিত হয়নি। সমাজে বঞ্চিত, দলিত মানুষের অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হলেও এখনও তা কাক্সিক্ষত মাত্রার ধারে কাছে নয়। সাধারণভাবে মানুষের জীবন যাত্রার মানের উন্নয়ন হয়েছে একথা সত্য। আয়ে বৈষম্য বৃদ্ধির মধ্যেই দারিদ্র্য হ্রাসের ধারাও অব্যাহত আছে। তারপরও ছিন্নমূল মানুষ, বস্তিবাসীর দৈনন্দিন জীবনে তার ছোঁয়া কমই লেগেছে। প্রায় পাঁচ কোটি তরুণ কর্মসংস্থানহীন। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে কৃষক বঞ্চিত। দেশের বেশিরভাগ মা ও শিশু পুষ্টিবঞ্চিত। পরিবারে কন্যাশিশু এখনও বৈষম্যের শিকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনন্দের মাধ্যমে অনুকূল পরিবেশে শিক্ষা লাভের অধিকার থেকে শিশু এখনও বঞ্চিত। প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর জন্য দুপুরের খাবার প্রদান কর্মসূচি প্রতীকীভাবে চালু হলেও তার ব্যাপ্তি খুবই সীমিত। প্রাথমিক ও পরবর্তী স্তরগুলোতে পাঠদানকারী শিক্ষকের বেতন-ভাতা একই যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতার অধিকারী সমাজের অন্য পেশার মানুষের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এখনও বেসরকারি স্কুল-কলেজে অনেকে বছরের পর বছর বিনা বেতনে পাঠদান করছেন ভবিষ্যতের আশায়। অন্যদিকে একই শ্রমদান সত্ত্বেও নারী শ্রমিকের পারিশ্রমিক পুরুষের তুলনায় কম। কিন্তু বেতন ও ভাতায় নারী-পুরুষ শিক্ষকের মধ্যে বৈষম্য না থাকলেও কর্মস্থলে ও পরিবারে নারী শিক্ষকের নিরাপত্তা এবং তার প্রাপ্য শারীরিক-মানসিক অনুকূল পরিবেশের অনুপস্থিতি এমনকি জীবনের ওপর হুমকির ঘটনাও লক্ষণীয়।

আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এসব অসঙ্গতি, অপ্রাপ্তি ও বঞ্চনার মধ্যে আজ মানবাধিকার দিবস পালিত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে আমি সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। বলা বাহুল্য শিক্ষা তথা প্রকৃত শিক্ষার ব্যাপক প্রসার এক্ষেত্রে অত্যাবশ্যক। যে শিক্ষা শিশুকাল থেকে প্রতিটি মানুষকে তার অধিকার সম্বন্ধে শিক্ষা দেবে, সচেতন করবে। ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকায় স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবাধিকার শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই এর উত্তম চর্চার দৃষ্টান্তগুলো উপস্থাপন হয়ে আসছে। ২০০৯ সালে ইউনেস্কোর তৎকালীন মহাপরিচালক কাইচিরো মাতসুরা, ডেমোক্রেটিক ইন্সটিটিউশন্স অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস অব দি অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন ইউরোপের পরিচালক জেনেস লেনারকিক, কাউন্সিল অব ইউরোপের সেক্রেটারি জেনারেল টেরি ডেভিস, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের কমিশনার নাভানিথেম পিল্লে ‘হিউম্যান রাইটস এডুকেশন ইন দি স্কুল সিস্টেম অব ইউরোপ, সেন্ট্রাল এশিয়া অ্যান্ড নর্থ আমেরিকা : এ কম্পেনডিয়াম অব গুড প্র্যাকটিস’ নামের একটি বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন। ওই বইতে প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো মানবাধিকার চর্চা বা অনুশীলনের ১০১টি ভালো দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়। মানবাধিকার শিক্ষার সংজ্ঞা প্রসঙ্গে ওই বইয়ে বলা হয় : ‘সার্বজনীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে প্রয়োজন শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও তথ্যের। সমন্বিত মানবাধিকার শিক্ষা শুধু মানবাধিকার সম্পর্কে জ্ঞান সরবরাহ ও তা রক্ষার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোকপাত করে না, দৈনন্দিন জীবনে তা কীভাবে দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োগ, সুরক্ষা ও উন্নয়ন করতে হয় তারও শিক্ষা দেয়। মানবাধিকার শিক্ষা সম্পর্কিত বইটিতে শতাধিক ভালো দৃষ্টান্তের উল্লেখ অত্যন্ত গুরুত্ববহ এ কারণে যে, শিশু-যুবা-বৃদ্ধ সবাইকে তত্ত্ব অপেক্ষা বাস্তব দৃষ্টান্ত অনেক বেশি আকৃষ্ট করে। অন্যদিকে প্রাথমিক অবস্থায় মানবাধিকার শিক্ষা একবার মনে দাগ কেটে গেলে তা সারা জীবনের জন্য স্থায়িত্ব লাভ করতে পারে।

আমাদের দেশে মানবাধিকার শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়টি অতীতে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। পাঠ্যক্রমে সেভাবে অন্তর্ভুক্তও ছিল না। শিক্ষকের পাঠদানের ব্যবহারসূচিতেও তার স্থান ছিল না। ২০১৩ সালে ও তার পরে প্রকাশিত প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকে মানবাধিকার বিষয়টি আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। শিশু, নারী ও প্রবীণের অধিকার সেখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নাগরিক অধিকার প্রসঙ্গে ষষ্ঠ শ্রেণীর বইতে বলা হয়েছে : ‘প্রতিটি নাগরিক রাষ্ট্রের কাছ থেকে পাঁচটি অধিকার দাবি করতে পারে : খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা। এগুলো একজন মানুষের মৌলিক চাহিদা। আবার এগুলো তার মৌলিক অধিকারও। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল নাগরিকদের জন্য এ অধিকারগুলো পাওয়া নিশ্চিত করা।’ শিশু অধিকার প্রসঙ্গে এতে বলা হয়েছে : ১. ১৮ বছরের নিচে সবাই শিশু। তবে কোনো কোনো দেশে এ বয়স দেশীয় আইনে আরও কম। সব শিশুর অধিকার সমান। অর্থাৎ ছেলেমেয়ে, ধনী-গরিব, জাতীয়তা, ধর্ম, শারীরিক সামর্থ্য কোনো কিছুতেই শিশুদের অধিকারের তারতম্য করা যাবে না। ২. বাবা-মা ও বড়দের শিশুর অধিকার সম্পর্কে সচেতন থেকেই তাদের সদুপদেশ দিতে ও পথ চলতে সাহায্য করতে হবে। ৩. শিশু তার নিজের ও বাবা-মায়ের নামসহ সঠিক পরিচয় ব্যবহারের অধিকারী হবে। ৪. শিশুর বেঁচে থাকা ও বড় হওয়ার অধিকার রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ৫. মা-বাবার নির্দেশনায় শিশুর স্বাধীন চিন্তাশক্তির প্রকাশ, বিবেক-বুদ্ধির বিকাশ এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। ৬. মারধর কিংবা অন্যায় বকাঝকা থেকে শিশুকে রক্ষা করার ব্যাপারে সরকারের দায়িত্ব আছে। ৭. শিশুরা যাতে সময়মতো খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ পায় রাষ্ট্রকে তা নিশ্চিত করতে হবে। ৮. সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতির শিশুদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ধর্ম, ভাষাচর্চার অধিকার রক্ষা করতে হবে। ৯. প্রতিটি শিশুর অবকাশ যাপন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের অধিকার রয়েছে। ১০. অর্থনৈতিক শোষণ এবং যে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুর বিরত থাকার অধিকার রক্ষা করতে হবে। ১১. শিশুকে কেউ যেন অন্যায় কাজে ব্যবহার করতে না পারে। শিশুর শারীরিক-মানসিক-নৈতিক ক্ষতি যাতে না হয় রাষ্ট্রকে তার ব্যবস্থা নিতে হবে। ১২. কোনো শিশুকে যুদ্ধে বা সরাসরি সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে দেয়া যাবে না। ১৩. শিশুর সম্মানবোধ, নিজস্ব গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে।

প্রবীণদের অধিকার প্রসঙ্গে সপ্তম শ্রেণীর বইতে বলা হয়েছে : ‘আমাদের সবারই পরিবারে ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে প্রবীণ কেউ না কেউ আছেন। পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে কিংবা রাস্তায় বেরোলেও আমরা অনেক প্রবীণ লোককে দেখতে পাই। চলাফেরায়, রাস্তা পেরোতে, যানবাহনে উঠতে তাদের অসুবিধাগুলো আমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারি। এ প্রবীণরা সব সময় প্রবীণ ছিলেন না। এক সময় তারা পরিবার ও সমাজের জন্য অনেক কিছু করেছেন। আজ বৃদ্ধ বয়সে তাদের প্রতিও সমাজের কিছু দায়িত্ব বা কর্তব্য রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আমরাও যে একদিন বৃদ্ধ হব সে- কথাটাও আমাদের মনে রাখা দরকার।’

আমাদের দেশে সাধারণত ষাটোর্ধ্ব বয়সের মানুষকে প্রবীণ বলে গণ্য করা হয়। কারণ ওই বয়সের পর মানুষ দৈনন্দিন জীবিকা উপার্জনের কাজ থেকে অবসর নেয়। বাংলাদেশে সরকারি চাকরি থেকে অবসরের বয়স ৫৯ বছর। বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কোনো কোনো পেশাজীবীর জন্য বয়সের এ সীমা সম্প্রতি ৬৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। যদিও ওই বয়সের পরও যে সব মানুষ তার কাজ করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে তা নয়। তবে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও ৬০ বা ৬৫ বছর বয়সের পর একজন মানুষকে প্রবীণ বা ‘সিনিয়র সিটিজেন’ গণ্য করা হয়। সমাজে তাদের বিশেষ সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। জাতিসংঘ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় কতিপয় নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এছাড়াও জাতিসংঘ প্রবীণদের অধিকার ও তাদের প্রতি কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে একটি বিশেষ দিনকে ‘প্রবীণ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

তবে পাঠ্যপুস্তকে ছাপা হলেই মানবাধিকার চর্চা ও অনুশীলন নিশ্চিত হয়ে যাবে এমন কথা ভাবার কারণ নেই। পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে, ব্যক্তিজীবনে আমরা তা কীভাবে প্রয়োগ করি, তার ওপরই এর কার্যকারিতা বেশি নির্ভর করে। আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত মানবাধিকার চর্চা ও বাস্তব প্রয়োগে অভ্যস্ত না হয়ে উঠব, ততদিন পর্যন্ত তা কাক্সিক্ষত মানে পৌঁছাবে না। যে শিক্ষক মানবাধিকার শিক্ষা দেবেন তার শিক্ষাদানের ধারা, মন-মানসিকতা শিক্ষার্থীকে আকর্ষণের সক্ষমতা সর্বোপরি সমাজের পারিপার্শ্বিকতা, জাতীয় নেতৃত্বের অনুকূল অবস্থান ও ভূমিকা এক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত বিবেচনায় নিতে হবে। অর্থাৎ সার্বিক বিবেচনায় স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে ও মহিমায় মানবিক অধিকার এবং মর্যাদার বিষয়টি এ দিনটিতে তুলে ধরা একান্ত আবশ্যক।

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : শিক্ষাবিদ, ইনিশিয়েটিভ ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান

principalqfahmed@yahoo.com





সাবমিট
মানবাধিকার দিবস ২০১৫

মানবাধিকারের শিক্ষাটি কেমন হওয়া উচিত

 কাজী ফারুক আহমেদ 
১০ ডিসেম্বর ২০১৫, ১২:০০ এএম  | 
আজ ১০ ডিসেম্বর সার্বজনীন মানবাধিকার দিবস। ১৯৪৮ সালের এদিনে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ৩০টি ধারা সংবলিত ঘোষণা গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালে সাধারণ পরিষদে প্রতি বছর ১০ ডিসেম্বর দিবসটি পালনের জন্য সব রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এ বছর দিবসটি উপলক্ষে এক বাণীতে বলেন, যেসব অমূল্য নীতিমালা সমুন্নত রাখতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, বিশ্বব্যাপী ব্যাপক নৃশংসতা ও লংঘনের ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে তার সপক্ষে অধিকতর আন্তর্জাতিক সক্রিয় কার্যক্রম সন্নিবেশ করতে হবে। জাতিসংঘের ৭০ বছর পূর্তিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আধুনিক মানবাধিকার আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিতে হবে। বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান এ বছরের মানবাধিকার দিবস প্রসঙ্গে বলেছেন, মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসীদের হত্যা, ধর্মীয় চরম পন্থা ও সাম্প্রদায়িক অসন্তোষ সৃষ্টিতে উসকানি, মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ও যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি মৌন সমর্থন মানবিক মর্যাদাকে হেয় করছে যা কাম্য নয়; এসবের কার্যকর প্রতিকার হওয়া দরকার। মানবাধিকার কমিশনের পূর্ণকালীন সদস্য কাজী রিয়াজুল হকও সম্প্রতি ঢাকার বাইরে এক আলোচনা সভায় বলেছেন, পরিবার ও সমাজ থেকেই মানবাধিকার রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

আমি এসব বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্ববহ মনে করি। পরিবার থেকেই এ উদ্যোগের সূচনা হওয়া দরকার এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের কাক্সিক্ষত ভূমিকা সেজন্য অপরিহার্য। নারী ও শিশু নির্যাতন, মানব পাচার, সীমান্তে মানুষ হত্যা, দেশের ভেতরে গণপিটুনিতে হত্যা, গুমের ঘটনা সব ক্ষেত্রেই তা প্রযোজ্য। এ নিয়ে বিতর্ক নেই যে, প্রতিবন্ধীদের প্রাপ্য অধিকার, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনগণের স্বীকৃতি এবং মর্যাদা এখনও বহুলাংশে অর্জিত হয়নি। সমাজে বঞ্চিত, দলিত মানুষের অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হলেও এখনও তা কাক্সিক্ষত মাত্রার ধারে কাছে নয়। সাধারণভাবে মানুষের জীবন যাত্রার মানের উন্নয়ন হয়েছে একথা সত্য। আয়ে বৈষম্য বৃদ্ধির মধ্যেই দারিদ্র্য হ্রাসের ধারাও অব্যাহত আছে। তারপরও ছিন্নমূল মানুষ, বস্তিবাসীর দৈনন্দিন জীবনে তার ছোঁয়া কমই লেগেছে। প্রায় পাঁচ কোটি তরুণ কর্মসংস্থানহীন। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে কৃষক বঞ্চিত। দেশের বেশিরভাগ মা ও শিশু পুষ্টিবঞ্চিত। পরিবারে কন্যাশিশু এখনও বৈষম্যের শিকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনন্দের মাধ্যমে অনুকূল পরিবেশে শিক্ষা লাভের অধিকার থেকে শিশু এখনও বঞ্চিত। প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর জন্য দুপুরের খাবার প্রদান কর্মসূচি প্রতীকীভাবে চালু হলেও তার ব্যাপ্তি খুবই সীমিত। প্রাথমিক ও পরবর্তী স্তরগুলোতে পাঠদানকারী শিক্ষকের বেতন-ভাতা একই যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতার অধিকারী সমাজের অন্য পেশার মানুষের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এখনও বেসরকারি স্কুল-কলেজে অনেকে বছরের পর বছর বিনা বেতনে পাঠদান করছেন ভবিষ্যতের আশায়। অন্যদিকে একই শ্রমদান সত্ত্বেও নারী শ্রমিকের পারিশ্রমিক পুরুষের তুলনায় কম। কিন্তু বেতন ও ভাতায় নারী-পুরুষ শিক্ষকের মধ্যে বৈষম্য না থাকলেও কর্মস্থলে ও পরিবারে নারী শিক্ষকের নিরাপত্তা এবং তার প্রাপ্য শারীরিক-মানসিক অনুকূল পরিবেশের অনুপস্থিতি এমনকি জীবনের ওপর হুমকির ঘটনাও লক্ষণীয়।

আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এসব অসঙ্গতি, অপ্রাপ্তি ও বঞ্চনার মধ্যে আজ মানবাধিকার দিবস পালিত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে আমি সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। বলা বাহুল্য শিক্ষা তথা প্রকৃত শিক্ষার ব্যাপক প্রসার এক্ষেত্রে অত্যাবশ্যক। যে শিক্ষা শিশুকাল থেকে প্রতিটি মানুষকে তার অধিকার সম্বন্ধে শিক্ষা দেবে, সচেতন করবে। ইউরোপ, এশিয়া ও উত্তর আমেরিকায় স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবাধিকার শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই এর উত্তম চর্চার দৃষ্টান্তগুলো উপস্থাপন হয়ে আসছে। ২০০৯ সালে ইউনেস্কোর তৎকালীন মহাপরিচালক কাইচিরো মাতসুরা, ডেমোক্রেটিক ইন্সটিটিউশন্স অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস অব দি অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন ইউরোপের পরিচালক জেনেস লেনারকিক, কাউন্সিল অব ইউরোপের সেক্রেটারি জেনারেল টেরি ডেভিস, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের কমিশনার নাভানিথেম পিল্লে ‘হিউম্যান রাইটস এডুকেশন ইন দি স্কুল সিস্টেম অব ইউরোপ, সেন্ট্রাল এশিয়া অ্যান্ড নর্থ আমেরিকা : এ কম্পেনডিয়াম অব গুড প্র্যাকটিস’ নামের একটি বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন। ওই বইতে প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো মানবাধিকার চর্চা বা অনুশীলনের ১০১টি ভালো দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হয়। মানবাধিকার শিক্ষার সংজ্ঞা প্রসঙ্গে ওই বইয়ে বলা হয় : ‘সার্বজনীন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে প্রয়োজন শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও তথ্যের। সমন্বিত মানবাধিকার শিক্ষা শুধু মানবাধিকার সম্পর্কে জ্ঞান সরবরাহ ও তা রক্ষার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোকপাত করে না, দৈনন্দিন জীবনে তা কীভাবে দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োগ, সুরক্ষা ও উন্নয়ন করতে হয় তারও শিক্ষা দেয়। মানবাধিকার শিক্ষা সম্পর্কিত বইটিতে শতাধিক ভালো দৃষ্টান্তের উল্লেখ অত্যন্ত গুরুত্ববহ এ কারণে যে, শিশু-যুবা-বৃদ্ধ সবাইকে তত্ত্ব অপেক্ষা বাস্তব দৃষ্টান্ত অনেক বেশি আকৃষ্ট করে। অন্যদিকে প্রাথমিক অবস্থায় মানবাধিকার শিক্ষা একবার মনে দাগ কেটে গেলে তা সারা জীবনের জন্য স্থায়িত্ব লাভ করতে পারে।

আমাদের দেশে মানবাধিকার শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়টি অতীতে খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। পাঠ্যক্রমে সেভাবে অন্তর্ভুক্তও ছিল না। শিক্ষকের পাঠদানের ব্যবহারসূচিতেও তার স্থান ছিল না। ২০১৩ সালে ও তার পরে প্রকাশিত প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকে মানবাধিকার বিষয়টি আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। শিশু, নারী ও প্রবীণের অধিকার সেখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নাগরিক অধিকার প্রসঙ্গে ষষ্ঠ শ্রেণীর বইতে বলা হয়েছে : ‘প্রতিটি নাগরিক রাষ্ট্রের কাছ থেকে পাঁচটি অধিকার দাবি করতে পারে : খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা। এগুলো একজন মানুষের মৌলিক চাহিদা। আবার এগুলো তার মৌলিক অধিকারও। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল নাগরিকদের জন্য এ অধিকারগুলো পাওয়া নিশ্চিত করা।’ শিশু অধিকার প্রসঙ্গে এতে বলা হয়েছে : ১. ১৮ বছরের নিচে সবাই শিশু। তবে কোনো কোনো দেশে এ বয়স দেশীয় আইনে আরও কম। সব শিশুর অধিকার সমান। অর্থাৎ ছেলেমেয়ে, ধনী-গরিব, জাতীয়তা, ধর্ম, শারীরিক সামর্থ্য কোনো কিছুতেই শিশুদের অধিকারের তারতম্য করা যাবে না। ২. বাবা-মা ও বড়দের শিশুর অধিকার সম্পর্কে সচেতন থেকেই তাদের সদুপদেশ দিতে ও পথ চলতে সাহায্য করতে হবে। ৩. শিশু তার নিজের ও বাবা-মায়ের নামসহ সঠিক পরিচয় ব্যবহারের অধিকারী হবে। ৪. শিশুর বেঁচে থাকা ও বড় হওয়ার অধিকার রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ৫. মা-বাবার নির্দেশনায় শিশুর স্বাধীন চিন্তাশক্তির প্রকাশ, বিবেক-বুদ্ধির বিকাশ এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। ৬. মারধর কিংবা অন্যায় বকাঝকা থেকে শিশুকে রক্ষা করার ব্যাপারে সরকারের দায়িত্ব আছে। ৭. শিশুরা যাতে সময়মতো খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ পায় রাষ্ট্রকে তা নিশ্চিত করতে হবে। ৮. সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র জাতির শিশুদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ধর্ম, ভাষাচর্চার অধিকার রক্ষা করতে হবে। ৯. প্রতিটি শিশুর অবকাশ যাপন, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের অধিকার রয়েছে। ১০. অর্থনৈতিক শোষণ এবং যে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুর বিরত থাকার অধিকার রক্ষা করতে হবে। ১১. শিশুকে কেউ যেন অন্যায় কাজে ব্যবহার করতে না পারে। শিশুর শারীরিক-মানসিক-নৈতিক ক্ষতি যাতে না হয় রাষ্ট্রকে তার ব্যবস্থা নিতে হবে। ১২. কোনো শিশুকে যুদ্ধে বা সরাসরি সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে দেয়া যাবে না। ১৩. শিশুর সম্মানবোধ, নিজস্ব গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে।

প্রবীণদের অধিকার প্রসঙ্গে সপ্তম শ্রেণীর বইতে বলা হয়েছে : ‘আমাদের সবারই পরিবারে ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে প্রবীণ কেউ না কেউ আছেন। পাড়া-প্রতিবেশীদের মধ্যে কিংবা রাস্তায় বেরোলেও আমরা অনেক প্রবীণ লোককে দেখতে পাই। চলাফেরায়, রাস্তা পেরোতে, যানবাহনে উঠতে তাদের অসুবিধাগুলো আমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারি। এ প্রবীণরা সব সময় প্রবীণ ছিলেন না। এক সময় তারা পরিবার ও সমাজের জন্য অনেক কিছু করেছেন। আজ বৃদ্ধ বয়সে তাদের প্রতিও সমাজের কিছু দায়িত্ব বা কর্তব্য রয়েছে। এ প্রসঙ্গে আমরাও যে একদিন বৃদ্ধ হব সে- কথাটাও আমাদের মনে রাখা দরকার।’

আমাদের দেশে সাধারণত ষাটোর্ধ্ব বয়সের মানুষকে প্রবীণ বলে গণ্য করা হয়। কারণ ওই বয়সের পর মানুষ দৈনন্দিন জীবিকা উপার্জনের কাজ থেকে অবসর নেয়। বাংলাদেশে সরকারি চাকরি থেকে অবসরের বয়স ৫৯ বছর। বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কোনো কোনো পেশাজীবীর জন্য বয়সের এ সীমা সম্প্রতি ৬৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। যদিও ওই বয়সের পরও যে সব মানুষ তার কাজ করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে তা নয়। তবে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও ৬০ বা ৬৫ বছর বয়সের পর একজন মানুষকে প্রবীণ বা ‘সিনিয়র সিটিজেন’ গণ্য করা হয়। সমাজে তাদের বিশেষ সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। জাতিসংঘ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় কতিপয় নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এছাড়াও জাতিসংঘ প্রবীণদের অধিকার ও তাদের প্রতি কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে একটি বিশেষ দিনকে ‘প্রবীণ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

তবে পাঠ্যপুস্তকে ছাপা হলেই মানবাধিকার চর্চা ও অনুশীলন নিশ্চিত হয়ে যাবে এমন কথা ভাবার কারণ নেই। পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে, ব্যক্তিজীবনে আমরা তা কীভাবে প্রয়োগ করি, তার ওপরই এর কার্যকারিতা বেশি নির্ভর করে। আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত মানবাধিকার চর্চা ও বাস্তব প্রয়োগে অভ্যস্ত না হয়ে উঠব, ততদিন পর্যন্ত তা কাক্সিক্ষত মানে পৌঁছাবে না। যে শিক্ষক মানবাধিকার শিক্ষা দেবেন তার শিক্ষাদানের ধারা, মন-মানসিকতা শিক্ষার্থীকে আকর্ষণের সক্ষমতা সর্বোপরি সমাজের পারিপার্শ্বিকতা, জাতীয় নেতৃত্বের অনুকূল অবস্থান ও ভূমিকা এক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত বিবেচনায় নিতে হবে। অর্থাৎ সার্বিক বিবেচনায় স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে ও মহিমায় মানবিক অধিকার এবং মর্যাদার বিষয়টি এ দিনটিতে তুলে ধরা একান্ত আবশ্যক।

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : শিক্ষাবিদ, ইনিশিয়েটিভ ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান

principalqfahmed@yahoo.com





 
শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র