¦
মুক্তিযুদ্ধে কূটনৈতিক ফ্রন্টের প্রথম সৈনিক কেএম শিহাবউদ্দিনের জীবন, কর্ম ও মৃত্যু

মহিউদ্দিন আহমদ | প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৫

রাষ্ট্রদূত কেএম শিহাবউদ্দিনের অপ্রত্যাশিত মৃত্যু সংবাদ শুনে গত ১৫ এপ্রিল প্রথমে ইন্নালিল্লাহি পড়লাম; তারপর প্রথম প্রতিক্রিয়া হল, যা হোক এতদিন পর শিহাবউদ্দিন ভাই দেশের সর্বোচ্চ সিভিলিয়ান পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এর জন্য বিবেচিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলেন! সাবেক পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসের যে তিনজন বাঙালি কর্মকর্তা গত ৪৪ বছরে মুক্তিযুদ্ধে কূটনৈতিক ফ্রন্টে তাদের অবদানের জন্য এই পুরস্কারের স্বীকৃতি পেয়েছেন, তাদের সবাই তাদের মৃত্যুর পরই মরণোত্তর পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এই তিনজন হচ্ছেন- জনাব এনায়েত করিম, জনাব হোসেন আলী এবং জনাব শাহ এএমএস কিবরিয়া।
৭১-এ এনায়েত করিম সাহেব ছিলেন ওয়াশিংটনে পাকিস্তান অ্যাম্বাসিতে ডেপুটি চিফ অব মিশন, হোসেন আলী সাহেব কলকাতায় পাকিস্তান ডেপুটি হাইকমিশনে ডেপুটি হাইকমিশনার, কিবরিয়া সাহেব ছিলেন ওয়াশিংটনে পাকিস্তান অ্যাম্বাসির পলিটিক্যাল কাউন্সিলর। ওয়াশিংটনে তখন এনায়েত করিম সাহেব এবং কিবরিয়া সাহেবের সঙ্গে বাঙালি কূটনীতিবিদ আরও যারা পদত্যাগ করেছিলেন পাকিস্তানের গণহত্যার প্রতিবাদে, তাদের মধ্যে ছিলেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী, তখন ইকোনমিক কাউন্সেলর জনাব এএমএ মুহিত, এডুকেশনাল কাউন্সেলর আবু রশীদ মতিন উদ্দিন এবং থার্ড সেক্রেটারি (এখন নয়াদিল্লিতে আমাদের হাইকমিশনার) সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী। এনায়েত করিম, শাহ কিবরিয়া এবং সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী পরে আমাদের ফরেন সেক্রেটারিও হয়েছিলেন।
একাত্তরেই হার্টের গুরুতর রোগী এনায়েত করিম সাহেব ফরেন সেক্রেটারি থাকাকালে মারা যান ১৯৭৪-এ, হোসেন আলী স্বাভাবিক মৃত্যুর পর তাকে দাফন করা হয় কানাডাতে। আর হবিগঞ্জে আততায়ীর বোমা হামলায় কিবরিয়া সাহেবের মৃত্যু বিএনপি-জামায়াতিদের এক চরম কলঙ্ক। দ্রুত চিকিৎসার্থে তাকে ঢাকা আনার জন্য একটি হেলিকপ্টার জোগাড় করা যায়নি। তখন জাতীয় সংসদের সদস্য কিবরিয়া সাহেবের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার বারো-চৌদ্দ ঘণ্টা পর, পরদিন সকালে পত্রিকা পড়ে!!
দুই.
’৭১-এ বাংলাদেশের জনযুদ্ধটাতে ছাত্র-শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, কৃষক, শ্রমিক, আর্মি, পুলিশ, ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস তখন, পরে বিডিআর এবং এখনকার বিজিবিকে তখন তাই বলা হতো), তরুণ-তরুণী, প্রৌঢ় প্রবীণ, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-মুসলমান- এতসব ভিন্ন ভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের মুক্তিযোদ্ধা! তাদের সঙ্গে দুনিয়ার বিভিন্ন পাকিস্তান দূতাবাসে কর্মরত বাঙালি কূটনীতিবিদ ও স্টাফের মধ্যে অনেকেই তাদের লোভনীয় এবং গ্ল্যামার অ্যান্ড গ্লিটজ’-এর ক্যারিয়ারের তোয়াক্কা না করে চাকরি ছেড়ে দিয়ে আর সব মুক্তিযোদ্ধার মতো এক কাতারে নেমে এসেছিলেন।
’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের এই কূটনৈতিক ফ্রন্টটি খুলেছিলেন কেএম শিহাবউদ্দিন; তখন তিনি নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনের এক অতি নবীন সেকেন্ড সেক্রেটারি। সাবেক পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে তিনি যোগ দিয়েছিলেন ১৯৬৬-তে। তার এই একই ব্যাচের আর দুই সদস্য ছিলেন বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী এবং আগের আওয়ামী লীগ সরকারের এক মন্ত্রী, এখন অসুস্থ, মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ। এই তিনজনের প্রথমজন, কেএম শিহাবউদ্দিন পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে প্রথম বিদেশ পোস্টিং পেলেন নয়াদিল্লিতে, মাহমুদ আলী নিউইয়র্কে এবং মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ টোকিওতে। মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ চাকরিতে আমার এক বছরের সিনিয়র; কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনমিকস ডিপার্টমেন্টে তিনি আমাদের পড়িয়েছেন। এই ইকোনমিকসে তার আর দুই বিশিষ্ট ছাত্র ছিল তৌফিক ইলাহী চৌধুরী বীরবিক্রম এবং মাহবুব উদ্দিন আহমেদ (এসপি মাহবুব) বীরবিক্রম।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই নয়াদিল্লিতে কেএম শিহাবউদ্দিন সিদ্ধান্ত নিলেন পাকিস্তানের চাকরি তিনি আর করবেন না, প্রকাশ্যেই তিনি পাকিস্তানের ‘গভর্নমেন্ট বাই মার্ডার’-এর সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করবেন। ভারতে অবস্থান করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করতে হলে একটি অফিস খোলার দরকার হবে, তাকে ভারতে থাকতে অনুমতির দরকার হবে- এসব পেতে পেতে ৬ এপ্রিল ১৯৭১ এসে গেল। এবং সেদিন রাতে তিনি পাকিস্তান হাইকমিশনের ভাড়া করা বাড়ি থেকে তার তরুণী স্ত্রী বুলবুল ভাবী-এর দুই শিশু কন্যা ইলোরা এবং ফারাহকে নিয়ে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে বের হয়ে এলেন। ইলোর বয়স তখন তিন বছর, আর ফারাহ মাত্র ১৯ মাস। কঠোর সতর্কতা এবং নিরাপত্তার দরকার ছিল, কারণ নয়াদিল্লিতে পাকিস্তানের ব্যাপক গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, বুঝতে পারলে তাদের ‘কিডন্যাপ’ করে পাকিস্তান হাইকমিশনের বিরাট কমপ্লেক্সে মাসের পর মাস আটকে রাখতে পারত, বড় বাক্সে ভরে পাকিস্তানে পাচারের চেষ্টাও করতে পারত। এমন পাচারের ঘটনা সাধারণত ঘটে না, তবে এমন উদাহরণও আছে।
শিহাবউদ্দিন যখন এ সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করবেন, তখন নয়াদিল্লির টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রবীণ, সর্বজনশ্রদ্ধেয় বাঙালি সাংবাদিক দিলীপ মুখার্জির বাসায় ৬ এপ্রিলের মধ্যরাতে এক সংবাদ সম্মেলনে তার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন। লক্ষ করার বিষয়, তখনও মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়নি, মুজিবনগর সরকার গঠিত হয় ১০ এপ্রিল।
কেএম শিহাবউদ্দিন এই ঘোষণাটি দিলেন আর সারা দুনিয়ার গণমাধ্যমে শিরোনামও হলেন তাৎক্ষণিকভাবে। এমন একটি ঘটনা যে আগে কোনোদিন কোথাও ঘটেনি। কারণ কূটনৈতিক পেশার ধর্ম এবং চরিত্রই হচ্ছে, নীরবে, নিভৃতে পর্দার আড়ালে কাজ করতে হয়। নরম, নমনীয় ভাষায় কথা বলতে হয়।
কিন্তু এই রাতে কেএম শিহাবউদ্দিন প্রকাশ্যেই গর্জন করে বেরিয়ে এলেন, তার এই চরম সিদ্ধান্তে তিনি ‘টোটাল, আনকন্ডিশনাল, আনকোয়ালিফায়েড সাপোর্ট’ পেলেন তার স্ত্রী বুলবুল ভাবীর। সাপোর্ট পেলেন পাকিস্তান হাইকমিশনের তখনকার এসিস্ট্যান্ট প্রেস এটাচি বাঙালি আমজাদুল হকেরও (আমজাদুল হকের ছোট ভাই সাংবাদিক নাজমুল হককে ’৭১-এর ১১ ডিসেম্বর আলবদর বাহিনী উঠিয়ে নিয়ে হত্যা করে)। আমজাদুল হক তখন ‘সিঙ্গেল’ একা, বিয়ে-শাদি করেননি।
আমজাদুল হক পরে কয়েকবার আমাকে বলেছেন, সেদিন ৩ ডিসেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ফোরমার অ্যাম্বাসেডরস’ আয়োজিত কেএম শিহাবউদ্দিনের এক স্মরণসভায় আবার বললেন- সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে আমজাদুল হক যখন বুলবুল ভাবীকে বললেন, দেখুন আমার কোনো সন্তান, সংসার নেই, আপনাদের দুটো শিশু সন্তান, গ্লামারাস ফরেন সার্ভিস জীবনের সবে শুরু, বাংলাদেশ হবে তা নিশ্চিত, কিন্তু নিশ্চিত নই এই কখন কীভাবে হবে; তো এমন সব, এত সব অনিশ্চয়তার মধ্যে শিহাবউদ্দিন সাহেব চাকরি ছেড়ে দিলে জীবন কোথায় কীভাবে কাটবে তা কি ভেবেছেন?
তখন এই মহিলার উত্তর ছিল, দেখুন আমজাদ সাহেব, যদি একান্তই এমন কোনো দুরবস্থায় পড়ি তাহলে প্রথমে বাচ্চা দুটোকে গলা টিপে মেরে ফেলব, তারপর নিজেরা আত্মহত্যা করব। তবুও পাকিস্তান নামের দেশটিতে আর ফিরে যাব না।
শিহাবউদ্দিন ভাই একজন সিংহপুরুষ ছিলেন, বুলবুল ভাবী একজন সিংহ নারী। আর সন্তানগুলো, এখন চার কন্যা- ইলোরা, ফারাহানা, সারাহ, শারমীন, এক একটি সিংহ শাবক। হার্ভার্ডের মতো আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের লেখাপড়া।
শিহাবউদ্দিন ভাইয়ের ৬৬ ব্যাচের আর দুই মুক্তিযোদ্ধা কূটনীতিবিদ হলেন ওয়ালিউর রহমান, সুইজারল্যান্ডের রাজধানী বার্নে, ’৭১-এর নভেম্বরের ২ তারিখে পদত্যাগ এবং আনোয়ার হাসিম। আমাদের আরেক ফরেন সেক্রেটারি মুস্তাফিজুর রহমান পদত্যাগ করেছিলেন ১৯৭১-এর ৩ অক্টোবরে। প্রথম দিকের এক ফরেন সেক্রেটারি এসএ করীম করেছিলেন নিউইয়র্কে, যখন পাকিস্তানের উপস্থায়ী প্রতিনিধি, আগস্ট মাসের ৪ তারিখে।
তিন.
কেএম শিহাবউদ্দিন পরে প্যারিস ও বৈরুতে কূটনৈতিক দায়িত্বে ছিলেন, ছিলেন লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে ডেপুটি হাইকমিশনার। রাষ্ট্রদূত ছিলেন চার চারটি দেশে- পোল্যান্ড, কুয়েত, ফ্রান্স ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ২০০১-এ অবসর নিয়ে ডিওএইচএসে ভাড়া বাসায় থাকতেন। নিজের বারিধারার বাড়ি ভাড়া দিয়েছিলেন। বারিধারার বাসা ভাড়া দিয়ে তার সংসার চলত।
২০০৫ সালে একটি বই লিখেছিলেন শিহাবউদ্দিন ভাই। প্রায় সাড়ে তিনশ পৃষ্ঠার বই, নাম There and Back Again: A Diplomat's Tale (দেয়ার অ্যান্ড ব্যাক এগেইন) প্রকাশক ইউপিএল। তখন এমিরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে প্রেস ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে এই বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছিল। বইটির তৃতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম Nineteen Seventy One এবং চতুর্থ অধ্যায়, Opening the Diplomatic Front of the War; প্রথমটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪০ এবং দ্বিতীয়টির ২৫।
’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি কূটনীতিকদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছেন শিহাবউদ্দিন। বর্ণনা করেছেন কারা তখন বাংলাদেশের মান-ইজ্জতের লড়াইতে রাস্তায় নেমে এসেছিলেন কূটনীতিবিদদের স্বাভাবিক আচরণ বর্জন করে। এই তালিকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর কথাও আছে। আর বাঙালি কূটনীতিবিদ যারা করেননি তার বর্ণনাও তিনি সংক্ষেপে দিয়েছেন।
বইটির শেষদিকে পূর্বে টোকিও থেকে পশ্চিমে ওয়াশিংটনে মুক্তিযুদ্ধের কূটনৈতিক ফ্রন্টে অংশগ্রহণকারী ১১৬ জনের নামের একটি তালিকা দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় সংখ্যাটি কলকাতার, ৬৫ জন। কলকাতায় পাকিস্তান ডেপুটি হাইকমিশনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ৭১-এর ১৮ এপ্রিল।
মুক্তিযুদ্ধের কূটনৈতিক ফ্রন্টের এই তালিকায় তিনজন বাঙালি রাষ্ট্রদূতও আছেন। ইরাকে তখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আবুল ফতেহ, ২১ আগস্ট ৭১; ফিলিপিনসে পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত কেকে পন্নী, ১৪ সেপ্টেম্বর ৭১ এবং আর্জেন্টিনায় পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আবদুল মোমেন, ১১ অক্টোবর ৭১। কলকাতায় ডেপুটি হাইকমিশনার হোসেন আলী এবং রাষ্ট্রদূত আবুল ফতেহ ছিলেন ১৯৪৯ সালের পাকিস্তানের প্রথম ফরেন সার্ভিস ব্যাচের দুই বাঙালি কর্মকর্তা। আবুল ফতেহ মাহবুবুল আলম চাষীর পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় ফরেন সেক্রেটারি ছিলেন।
কূটনৈতিক যোদ্ধাদের একেকজন গণহত্যার প্রতিবাদে এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের দাবিতে চাকরি ছেড়েছেন, আর সারা দুনিয়ার মিডিয়া, সরকারি ও বেসরকারি মহলে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন।
এই লেখাটির জন্য শিহাবউদ্দিন ভাইয়ের বইটির এই দুটি অধ্যায় যখন আবার পড়ছিলাম, তখন কতগুলো জায়গায় তার কর্মতৎপরতা, সর্বস্তরের ভারতীয় জনগণের সাপোর্ট, মিসেস ইন্দিরা গান্ধী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং, সিদ্ধার্থ শংকর রায়, ড. ত্রিগুনো সেনসহ ভারতের জাতীয় ও আঞ্চলিক নেতানেত্রীদের সঙ্গে তার দেখা সাক্ষাৎ, কথাবার্তা পড়তে পড়তে চোখের পানি এসে গিয়েছিল।
রাষ্ট্রদূত হিসেবে শিহাবউদ্দিনের আর দুটি বড় কৃতিত্ব, ১৯৯০ সালে যখন তিনি কুয়েতে রাষ্ট্রদূত, তখন সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করে নেয় এবং সব রাষ্ট্রদূতকে কুয়েত থেকে তাদের দূতাবাস বাগদাদে সরিয়ে নিতে হুকুম জারি করে। তাদের যুক্তি ছিল, কুয়েত এখন আর স্বাধীন সার্বভৌম কোনো দেশ নয়, কুয়েত এখন ইরাকের একটি প্রদেশ মাত্র। রাষ্ট্রদূত শিহাবউদ্দিন সাদ্দাম হোসেনদের এই হুকুম মানেননি। যতদিন সম্ভব কুয়েতেই থেকেছেন আর সাদ্দাম হোসেনদের একটি কূটনৈতিক বার্তাও দিয়েছেন- তোমাদের এই দখল বাংলাদেশ মানে না, কুয়েত স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ, আমরা আমাদের অ্যাম্বাসি এই কুয়েত সিটিতেই রাখব। বাংলাদেশের এমন শক্ত দৃঢ় অবস্থানকে কুয়েত সরকার পরে বিভিন্নভাবে স্বীকৃতি দেয়, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
রাষ্ট্রদূত হিসেবে তার জীবনের সর্বোত্তম সাফল্য ছিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগের আমলে ২০০০ সালের মার্চ মাসে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফর। গত ৪৪ বছরে ওই একবারই কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন।
চার.
৭১-এর ৬ এপ্রিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক যুদ্ধ ঘোষণা করার পর পাকিস্তানিরা তাকে দুষ্কৃতকারী বেঈমান, গাদ্দার ইত্যাদি বিশেষণে গালিগালাজ করেছে। তা অবশ্যই প্রত্যাশিত ছিল। সব মুক্তিযোদ্ধাকেই তারা এখন এমনভাবে ‘সম্মানিত’ করেছে।
বাংলাদেশেও এই কেএম শিহাবউদ্দিনকে অপমানিত হতে হয়েছে। প্রথমবার যখন তিনি লন্ডনে ডেপুটি হাইকমিশনার, এআরএস দোহা তখন লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার। প্রেসিডেন্ট এরশাদের ‘জানি দোস্ত’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে এই দোহা যতসব অপকর্ম করেছে, তার একটি ছিল- দোহা ক্ষমতা পেয়েই শিহাবউদ্দিন ভাইকে ঢাকায় বদলি করে এনে পাঠিয়ে দিল রিলিফ মিনিস্ট্রিতে, মানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিতাড়িত।
১৯৮২-৮৩তে দোহা পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে অনেক সন্ত্রাস করেছে। আমাদের এক সাবেক পররাষ্ট্র সচিব আতাউল করীমকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়ে নির্বাসনে পাঠায়। নির্বাসনে পাঠায় ইরানি বিপ্লবের সময় ১৯৭৯-তে এক সফল রাষ্ট্রদূত, হুমায়ুন কবীরকে দেশে ডেকে এনে সড়ক মন্ত্রণালয়ে যুগ্মসচিব হিসেবে। তবে জেনারেল এরশাদ কেএম শিহাবউদ্দিনকে মর্যাদাও দিলেন, তাকে রিলিফ মিনিস্ট্রির জয়েন্ট সেক্রেটারি-ইন-চার্জ বানালেন। মানে, তার ওপর কোনো সচিব, অতিরিক্ত সচিব থাকল না। আর মাত্র ১০ মাসের মাথায় পাঠালেন পোল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত করে, রাষ্ট্রদূত জীবনের শুরু তার এখানেই। এখানে আবার তিনি পেলেন আমজাদুল হককে, একজন ঊর্ধ্বতন কূটনীতিবিদ হিসেবে তার অ্যাম্বাসিতে।
দ্বিতীয়বার শিহাবউদ্দিন ভাই অপমানিত হন, তার মৃত্যুর পর। তাকে দাফন করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় চট্টগ্রামের চন্দনাইশে, গ্রামের বাড়িতে। তখন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মেসবাহউদ্দিন প্রশ্ন তোলেন, রাষ্ট্রদূত শিহাবউদ্দিনের তো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সার্টিফিকেট নেই, সুতরাং তিনি তো মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মৃত্যুর পর ‘গার্ড অব অর্নার’ পাওয়ার যোগ্য নন!! জেলা প্রশাসকের অতি ‘সহি’ কথা। তিনি তো কানুনের মানুষ। কানুনে না থাকলে, সরকারি গেজেটে নাম না থাকলে শিহাবউদ্দিন কীভাবে ‘গার্ড অব অনার’ পাবেন? প্রচারবিমুখ এ মুক্তিযোদ্ধাকে এই ট্রিটমেন্ট! শেষ পর্যন্ত স্থানীয় এমপি নজরুল ইসলাম এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের আপসহীন অবস্থান এবং সুপারিশে তাকে ‘গার্ড অব অনার’ দেয়া হয়।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কূটনৈতিক ফ্রন্টের দ্বিতীয় সৈনিক আমজাদুল হক ‘রাজউক’-এর একটি আবাসিক এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা কোটায় দরখাস্তই করতে পারেননি; কারণ তারও তো কোনো সার্টিফিকেট নেই। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীরও কোনো সার্টিফিকেট নেই।
আর আমি? গত ১১ জুন, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমাকে একটি সার্টিফিকেট দেয়ার জন্য পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকের সুপারিশসহ আমার দরখাস্ত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পাঁচ, পাঁচ মাস পর, মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী মোজাম্মেল হক গত ১৫ নভেম্বর প্রথম আমাকে জানান, আমার নাম গেজেট করা হবে শিগগির। তারপর তিনি আরও এমন দুইবার বলেছেন, কিন্তু গেজেট তো আর হয় না।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একের পর এক অপমান; এই কাহিনী আর একদিন।
‘শিউলী তলা’ উত্তরা; সোমবার ১৪ ডিসেম্বর ২০১৫
মহিউদ্দিন আহমদ : মুক্তিযোদ্ধা কূটনীতিবিদ, সাবেক সচিব, কলাম লেখক
উপসম্পাদকীয় পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close