¦
নারীর ক্ষমতায়নকে করতে হবে দৃশ্যমান

আয়শা খানম | প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০১৫

আন্তর্জাতিক নারী দিবস, বৈশ্বিক নারীর মানবাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক তাৎপর্যপূর্ণ দিন। যদিও এর সূচনা হয়েছিল নারীর অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। ধীরে ধীরে তা নারীর সামাজিক, রাজনৈতিক, মানবাধিকারে জড়িত হয়ে একটি পূর্ণ সামগ্রিক অধিকার দিবস হিসেবে পরিণত হয়। তাই আজ এই দিবসটি পালিত হয় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে। এ দিবসে যা কিছু অর্জন হয়েছে তা কীভাবে সুসংহত করা যায়, আরও প্রসারিত করা যায়। আর যা হয়নি, হওয়ার পথে বাধা তা চিহ্নিত করে নতুন কৌশল, পরিকল্পনার কথা ভাবতে হবে। তাই এদিনে আমরা ফিরে তাকাই নিজ দেশের দিকে।
৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস রাষ্ট্র ও সমাজের নারীর প্রতি দৃষ্টি ফেরানো, নারীর মানবাধিকার রক্ষার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় করণীয় পালনের অঙ্গীকারের দিবস। বাংলাদেশেও নারীর বর্তমান চলমান অগ্রযাত্রাকে আরও গতিশীল ও পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী করার লক্ষ্যে সমাজ, রাষ্ট্র, সরকারের আরও অনেক করণীয় রয়েছে। বিশ্ব নারী সমাজের অর্জন ও সাফল্যকে স্থায়ী করা ও বিরাজমান বাধা কাটিয়ে আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য দরকার পরিকল্পনা, অঙ্গীকার। তাই বিশ্ব নারী সমাজ আন্দোলনের আহ্বান নারীর ক্ষমতায়ন মানবতার ক্ষমতায়ন, নারীর ক্ষমতায়নকে বাস্তবায়ন ও দৃশ্যমান করতে হবে। বাংলাদেশে নারীর সাফল্যের বহু ইতিবাচক ঘটনা রয়েছে- ২০১৪ সালের ১৭ ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সামরিক বিমানবাহিনীর দু’জন নারী তামান্না-ই-লুফিৎ ও নাইমা হক বিমান চালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। এটা যেমন আমাদের সমাজ ইতিহাসে এক নারী সমাজের অগ্রগতির মাইলফলক ঘটনা। এ অগ্রগতির পাশাপাশি আমাদের সমাজে অনেক অন্ধকার, অনেক নিরাশার চিত্রও রয়েছে। যা আমাদের অনেক অর্জনকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ম্লান করে দেয়। নারীর এই অর্জনের পাশাপাশি রয়েছে বর্বরতারু শিকার হওয়া অনেক নারীর মানবতা লংঘিত হওয়ার ঘটনাও। টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলার সোহাগপাড়া গ্রামে প্রবাসী মজিবর রহমানের স্ত্রী ও তিন মেয়েকে পুড়িয়ে হত্যার মতো নৃশংসতম ঘটনা। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌনকর্মী অপবাদে কীটতত্ত্ববিভাগের মাস্টার্সের ছাত্রীর আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা। কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার বজরা বাজার এলাকায় মাদ্রাসা শিক্ষকের হাতে ৭ম শ্রেণীর ছাত্রীর শ্লীলতাহানির ঘটনা, মাগুরা জেলার সদর উপজেলার বরইচারা অভয়াচরণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের মানসিক নির্যাতনে দশম শ্রেণীর এক ছাত্রীর আÍহত্যার ঘটনা, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সহকারী শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীদের গোপনে ভিডিও ধারণ এবং একজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী দ্বারা ছাত্রীদের যৌন হয়রানির ঘটনা। এ ধরনের ঘটনা মানবতার উন্নয়নকে ব্যাহত করছে।
ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে গণতন্ত্রের চর্চা, গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ও গণতন্ত্রের নীতিমালাকে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বাস্তবায়িত করার জন্য যে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট, দৃঢ় ভূমিকা পালন করা দরকার, আইনের শাসন, রাষ্ট্রীয় জীবনে মূলকেন্দ্রিক বিষয় হওয়া দরকার, সেক্ষেত্রে আমাদের আরও অনেক করণীয় রয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, তথ্য কমিশন, আইন কমিশন, নির্বাচন কমিশনের যাত্রা শুরু হয়েছে। তবে আরও অনেকটা পথ পাড়ি দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এক্ষেত্রে যেমন রাষ্ট্রের ভূমিকা রয়েছে তেমনি সমগুরুত্বপূর্ণভাবে রয়েছে সচেতন নাগরিক সমাজের দায়বদ্ধ ভূমিকা। যে ভূমিকার মাধ্যমে নারী-পুরুষ সমতাপূর্ণ মানবিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন কার্যকর হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা জাতীয় সংসদে ৬৮ নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন। যাদের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়েছেন ১০ জন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন ৮ জন। বাকি ৫০ জন সংরক্ষিত আসনে মনোনীত হয়েছেন। স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদে ১৩ হাজার ৬৩৮ নারী সংরক্ষিত আসনে এবং উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৪৫৯ নারী রয়েছেন।
বাংলাদেশের নারী হিমালয়ের চূড়ায় ওঠা থেকে শুরু করে চাতালের কাজ, সেনাবাহিনী থেকে চা বাগানের দুটি পাতা একটি কুঁড়ি সংগ্রহ, প্যারাসুট জাম্পিং থেকে শান্তি মিশনে, সামরিক বাহিনী থেকে সাংবাদিকতা, গণমাধ্যম কর্মীর ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন ও ভূমিকা, সিডর, আইলা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা, রাজনৈতিক দুর্যোগ মোকাবেলা থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা, পোশাক শিল্প, শিল্প কারখানা, কৃষি, ব্যাংক, প্রশাসন, অফিস-আদালত, আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল সর্বত্র নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে। কার্যকর ভূমিকা রাখছেন। জাতীয় সংসদ, ইউনিয়ন পরিষদ, তৃণমূলে মন্ত্রিসভায় তথা রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বত্র, সাধারণ গণনারী, গণপেশাজীবী নারী দায়বদ্ধতা দক্ষতা যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর হওয়া ও সমতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পূর্বের তুলনায় বাংলাদেশ ক্রমশ সামনে অগ্রসর হচ্ছে এবং তা জাতিসংঘে তথা বৈশ্বিকভাবে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে।
জাতিসংঘের ২০১৫-এর প্রতিপাদ্য ‘নারীর ক্ষমতায়ন মানবতার উন্নয়ন’ একে ধরে আমাদের বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ ও নারী আন্দোলনের শপথ নেয়া প্রয়োজন। সব বিভ্রান্তি ও বাধা, পশ্চাৎপদতা, গোঁড়ামি, কুসংস্কার, অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা করে এগিয়ে আসতে হবে। নারীর নিজেকেও এগিয়ে আসতে হবে সাহসী ও প্রত্যয়ীভাবে। তাহলে অর্থপূর্ণ হবে ৮ মার্চ পালন করা। ৮ মার্চের ঐতিহাসিক আহ্বান- অর্জনকে, সাফল্যকে স্থায়ী করে বাধা ও সংকটকে দূর করার লক্ষ্যে আপসহীনভাবে এগিয়ে চলা। এ হোক ২০১৫-এর ৮ মার্চের অঙ্গীকার।
লেখক : সভানেত্রী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
 

সুরঞ্জনা পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close