¦
নারীর ক্ষমতায়নে মানবতার উন্নয়ন

| প্রকাশ : ০২ মার্চ ২০১৫

‘এ বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর’। অর্থাৎ পৃথিবী সৃষ্টির অর্ধেক রহস্যজুড়ে আছে নর-নারীর সমতায়ন। আজকের গ্লোবাল ভিলেজ এ অর্থে বলা হচ্ছে- ‘এমপাওয়ারিং ওমেন’। ২০১৫ সালের বিশ্ব নারী দিবসের প্রতিপাদ্য- ‘এমপাওয়ারিং ওমেন, এমপাওয়ারিং হিউম্যানিটি : পিকচার ইট’।
অর্থনীতির গোলকধাঁধায় বিশ্বের যে ক’টি দেশ আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে তাদের প্রত্যেকেই নারীর ক্ষমতায়ন সুনিশ্চিত করেছে। এ গ্লোবাল ভিলেজের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর সূচক কিন্তু নারীর অনিশ্চিত অংশগ্রহণ। অর্থাৎ নারীর কর্মময় অংশগ্রহণ ছাড়া সামগ্রিক অর্থনীতির সুফল পাওয়া আজকের আধুনিক সময়ে অসম্ভব প্রায়। নারীরা আজ শুধু শ্রমিক নয়, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসা, উদ্যোক্তা, সৃষ্টিশীল এমনকি রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে একে একে নিজেদের দক্ষতা, যোগত্য আর গ্রহণযোগতার প্রমাণ রেখে চলেছেন। মহাকাশযান, এভারেস্ট, শীর্ষ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সবখানেই নারীর সরব আর সফল উপস্থিতি। এমন উদাহরণ পুরুষ এবং বিশ্ব সমাজকে চমকে দিয়েছে। বদলে দিতে বাধ্য করেছে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। সব মিলিয়ে নারী এগিয়েছে নিজেদের আত্মরক্ষার সুকৌশলেই। এতে বদলেছে সমাজ, রাষ্ট্র, বিশ্ব, অর্থনীতি আর স্বনির্ভরতার সেকেলে অবয়ব। ঘুরে দাঁড়িয়েছে মানবতা, মানবাধিকার আর আত্মসম্মানের নতুন সূচক।
প্রসঙ্গত, বিশ্ব নারী দিবসের পেছনের ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে একটি সূচ কারখানার মহিলা শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন। ওই সময় ১২ ঘণ্টা কর্মদিবসের বিরুদ্ধে নারীরা আন্দোলনে সোচ্চার হয়ে ওঠেন। ফলে তাদের ওপর নেমে আসে পুলিশি নির্যাতন। ১৮৬০ সালে ওই কারাখানার নারী শ্রমিকরা ‘মহিলা শ্রমিক ইউনিয়ন’ গঠন করেন। আর সাংগঠনিকভাবে সরবে আন্দোলন পরিচালনা করেন।
এ আন্দোলনের ফলে ১৯০৮ সালে ১৫ হাজার নারী নির্দিষ্ট কর্ম ঘণ্টা, ভালো বেতন এবং ভোটের অধিকার দাবি নিয়ে নিউ ইয়র্ক সিটিতে মিছিল বের করেন। এর পরই ১৯১০ সালের ৮ মার্চ কোপেনহেগেন শহরে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলনে জার্মানির নারী নেত্রী কারা জেটকিন ৮ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন।
১৯১১ সালে উৎসাহ আর উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয়। ১৯৮৫ সালে ৮ মার্চকে জাতিসংঘও আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশে ১৯৯১ সালে প্রথমবার এ দিবস পালন করা হয়। ২০১৫ সালের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘এমপাওয়ারিং ওমেন এমপাওয়ারিং হিউম্যানিটি’। অর্থাৎ নারী ক্ষমতায়নেই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে সিডো সনদ গৃহিত হয়। আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় সব ধরনের ফোরামে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আন্তর্জাতিক সনদ এবং দলিল স্বাক্ষরের মাধ্যমে সামাগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে কাজ শুরু করে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ (২) নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী ও পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন’। স্কুল, কলেজ, অফিস আদালত, কর্মক্ষেত্র তথা সমাজের প্রতিটি অধ্যায়ে প্রতিনিয়তই নারীরা অবহেলিত এবং বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
বর্তমান সময়ের সবচেয়ে মারাত্মক সামাজিক ব্যাধি ‘ইভটিজিং’। এর শিকার হয়ে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে আত্মহনন আর অমানবিক হত্যার ঘটনা। একেবারেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এনে নারীকে মর্যাদার চোখে না দেখলে ইভটিজিং আইন করে বন্ধ করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, জার্মানি, কানাডা, ব্রিটেন ছাড়াও বিশ্বের উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে নারীরা কাজের সব ক্ষেত্রেই পারদর্শী হয়ে উঠেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের নারীরা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে সমাজের সব ক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে বিশ্ব দরবারে দেশের মানকে সমুজ্জ্বল করতে পারবেন।
সদ্য বাংলাদেশ সফরে আসা অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী অর্মত্য সেন বলেছেন, মানব সূচক উন্নয়নে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের নারীরা অনেক এগিয়ে গেছে। এটি জাতীয় অর্থনীতিতে এক ধরনের ইতিবাচক প্রভাব আনবে। তাছাড়া দেশের শীর্ষ কর্মপদে বাংলাদেশ নারীদের ক্ষমতায়নে অনেক দূর এগিয়েছে। এটিরও একটি শুভ প্রভাব অনিবার্য।
নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, নারী মুক্তি সমাজ বিকাশের পথকে আরও সুগম করবে। নিজের সাহস, যোগ্যতা, আত্মসম্মানবোধ ও সুশিক্ষার মাধ্যমে নারী তার নিজের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করছে। নারীকে পুরুষের মতো সমসুযোগ ও নারীর প্রতি বিভিন্ন ধরনের দৃশ্যমান বৈষম্য দূর করতে পারলেই অর্থনৈতিক মুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।
এ জন্য সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এনে সরকারি-বেসরকারি ও স্থানীয় জনউদ্যোগে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। আমাদের দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ছাড়াও সব ক্ষেত্রে পুরুষের মতো নারীর গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। এ জন্য সমাজের দায়িত্ববান ও সচেতন সবাইকে নারীর প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, স্নেহ আর বন্ধুসুলভ আচরণে উৎসাহ দেয়া উচিত।
 

সুরঞ্জনা পাতার আরো খবর
৭ দিনের প্রধান শিরোনাম

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৮৪১৯২১১-৫, রিপোর্টিং : ৮৪১৯২২৮, বিজ্ঞাপন : ৮৪১৯২১৬, ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৭, সার্কুলেশন : ৮৪১৯২২৯। ফ্যাক্স : ৮৪১৯২১৮, ৮৪১৯২১৯, ৮৪১৯২২০

Developed by
close
close